ঢাকা, ২৮ মে ২০১৮, সোমবার
উত্তম কুমারের অজানা কথা (৩১)

‘খবরের কাগজ হাতে নিয়ে আমি আনন্দে ভরপুর হয়ে যেতাম’

| ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, বুধবার, ১১:৫৫

বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি মহানায়ক উত্তম কুমার অনন্য অভিনয় জাদুতে মুগ্ধতা বিলিয়েছেন দুর্নিবার। তার অভিনীত ছবি মানেই ভালোলাগার এক বিশাল প্রাপ্তি। পর্দায় এ নায়ক যেমন উজ্জ্বল তেমনই তার ব্যক্তিজীবনের চলাচলেও ছিল নানান রঙের মিশেল। সেই অজানা জীবনের গল্প তার বয়ান থেকে অনুলিখন করেছেন প্রখ্যাত সাংবাদিক-সাহিত্যিক গৌরাঙ্গপ্রসাদ ঘোষ যা পরবর্তী সময়ে ‘আমার আমি’ নামে বই আকারে প্রকাশ হয়। সে বই থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে উত্তম কুমারের আত্মজীবনী-

যে মুরলীবাবু একদিন আমাকে সাগ্রহে ডেকে পাঠিয়েছিলেন, সেই তিনিও আর যেন আশা স্থাপন করতে পারছেন না।
মনে পড়ে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে মনে পড়ে যাচ্ছে সুকুমারবাবুর কথা। যে মুহূর্তে আমি নিজের কাছে নিজেই দুর্বল হয়ে পড়েছি, ঠিক সেই মুহূর্তে সুকুমার দাশগুপ্ত কী জানি কেন আমার প্রতি সদয় হলেন।
মনে পড়ছে, যে সময়ে আমি পর পর তিনখানা ছবিই ফ্লপ হবার জন্যে নিজের ব্যর্থতায় ছটফট করছি, রীতিমতো অস্থির, ঠিক সেই সময় সুকুমার দাশগুপ্ত তার ‘সঞ্জীবনী’ ছবির জন্য আমাকে নির্বাচন করলেন।
এই ছবিতেও আমি নায়ক হবার সুযোগ পেলাম।
আমার বিপরীতে নায়িকা নির্বাচিত হলেন সন্ধ্যারানী।
এই ছবির চুক্তিপত্রে সই করবার পর থেকে আমি যেন আবার একটু একটু করে সহজ হয়ে যেতে লাগলাম। ছবির কাজ শুরু হয়নি।
সুকুমারবাবু যখন আমাকে নায়ক হিসাবে স্থির করে ফেলেছেন, তখন একদিন মুরলীধরবাবু সুকুমারবাবুকে ডেকে বলেছিলেন, এই চরিত্রে উত্তম কি অভিনয় করতে পারবে? না সুকুমার, তুমি বরং ছবি অথবা ধীরাজকেই নাও- উত্তম তৈরি হলে তখন নিও-
মুরলীবাবুর কণ্ঠে সংশয়। সুকুমারবাবু কিন্তু দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়!
তিনি সেদিন হাসতে হাসতে বলেছিলেন, আমরা যদি তৈরি না করি, তৈরি হওয়ার সুযোগ না দিই, তা হলে তৈরি হবে কেমন করে বলুন?
সঞ্জীবনী’র এই নায়ক মাতাল। একটি দুরূহ মাতাল চরিত্র। মুরলীবাবুর আশঙ্কা এই চরিত্রটিকে নিয়ে। তিনি সর্বতোভাবে সেই আশঙ্কা প্রকাশও করেছিলেন। সুকুমারবাবু তবুও নিজের দৃঢ়সঙ্কল্পে অবিচল রইলেন। আমাকে একান্ত আপনজনের মতো নিজের কাছে ডেকে এনে একদিন ভালো করে চরিত্রটি বোঝালেন। আমি আমার গভীর শ্রদ্ধা এবং একাগ্রতা দিয়ে সেই চরিত্রটা মনের মধ্যে গেঁথে ফেললাম।
কোনো কাজেই মন বসাতে পারি না। সব সময় শুধু সেই চরিত্রটা আমি নিজের ভেতর আঁকতে লাগলাম। মনে মনে রিহার্সাল ছাড়া আর কোনো কাজই আমার নেই। আমি শুটিং-এর দিনগুলোর জন্য ভেতরে ভেতরে প্রস্তুত হতে লাগলাম।
যথাসময়ে ছবির কাজ শুরু হয়ে গেল। তারপর একসময়ে যথারীতি ছবির সব কাজ সম্পূর্ণও হয়ে গেল। প্রস্তুতি চলতে লাগল ছবি মুক্তির।
আমি যেমন বিস্মিত হলাম, তেমনি হলাম মর্মাহত। তার কারণ, ছবির প্রচারে আমার কোনো স্থান নেই। কোনো বিজ্ঞাপনেই আমার নামটুকুও পর্যন্ত নেই। বড় বড় বিজ্ঞাপনে একমাত্র শ্লোগান ছাপা হতে লাগল-
সন্ধ্যারাণীর ভুমিকাভিনয়ে সমৃদ্ধ।
সেদিন একে কর্তৃপক্ষের বড় বেশি পক্ষপাতিত্ব বলেই মনে হয়েছিল আমার।
আমার ভেতরকার মানুষটা এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাঝে মাঝে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে চাইছিল, তথাপি মনকে কোনোমতেই দুর্বল হতে দিইনি। নিজেকে সান্ত¡না দিয়েছিলাম এই ভেবে, অভিনয় ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা পেলে বিজ্ঞাপনে আমার কথা, আমার নাম থাকবে নিশ্চয় একদিন।
অবশেষে ছবি মুক্তি পেল।
মুক্তি পেল ‘সঞ্জীবনী’। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা তাদের সমালোচনা স্তম্ভে লিখলেন নিজেদের বক্তব্য। কোথাও কোনো সমালোচনা বেরুলে আমি তন্নতন্ন করে খুজতাম নিজেকে, কোথাও সাংবাদিক-সমালোচকেরা অনুগ্রহ করে আমার নামটা বা আমার অভিনয়ের কথা উল্লেখ করেছেন কি না। কিন্তু আশাহত হলাম সেখানেও দৈনিক কাগজগুলো প্রাণ খুলে আমার কথা উল্লেখ করল না। যে কোনো কারণে হোক বরাবরই আমার নামটাকে ওরা এড়িয়ে যেতেন। এ সব জানতাম। তবুও সেই সমালোচনার কলমের লাইনের পর লাইন দেখতাম আমি বিশেষ আগ্রহ নিয়ে, আন্তরিকতা নিয়ে।
সৌভাগ্যবশত আনন্দবাজার পত্রিকা সেই সময়ে আমার প্রসঙ্গে অর্থাৎ ‘সঞ্জীবনী’র রবির সম্পর্কে লিখেছিল-
উত্তম কুমার স্থানে স্থানে অভিনয় ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন-
মাত্র দেড় অথবা দু’লাইনের খ্যাতি সেই আমার বড়-পাওয়া।
খবরের কাগজ হাতে নিয়ে আমি আনন্দে ভরপুর হয়ে যেতাম। সেই প্রশংসাতেই আমি সজীব। আমি যেন সার্থকতার সোপানে এসে দাঁড়িয়েছি। অবচেতন মানে সেই মুহূর্তে আমি আনন্দের আতিশয্যে হয়তো বা চোখের জল ফেলেছিলাম।
যা হোক, আনন্দবাজারের সেই সমালোচনাটুকু সেদিন যে আমাকে কতটা সতেজ করে তুলেছিল তা আজ আর বলে লাভ নেই।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।