× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা
ঢাকা, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, শুক্রবার

প্রথম বর্ষ থেকেই ই-লাইব্রেরির ব্যবহার বাধ্যতামূলক হোক

মত-মতান্তর

মো. আল-আমিন | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, বুধবার, ৮:৫৮

চারিদিকে কপি-কাটের রাজত্ব। চুটিয়ে ব্যবসা করছে ফটোকপির দোকানিরা। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের সঙ্গে গবেষণায় মন না দিয়ে সময় ব্যয় করছে বিশ^বিদ্যালয়ের আশ-পাশের কম্পিউটারের দোকানে। অ্যাসাইনমেন্ট, টার্মপেপার থেকে শুরু করে প্রজেক্ট, থিসিসসহ সব ধরনের গবেষণাও মিলছে এসব দোকানে। শিক্ষার্থীরা গাদা গাদা বই পড়ার ঝামেলায় না গিয়ে দেদারসে কিনছে এসব রেডিমেট ডকুমেন্ট। এ যেন ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলছে স্বদেশ’। অথচ বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে সবকিছুই চলে এসেছে হাতের মুঠোয়। ইন্টারনেটের বদৌলতে নিমিষেই দেশ-বিদেশের সকল তথ্য মাউসের এক ক্লিকেই পেয়ে যাচ্ছি। এখন আর গাদাগাদা ক্যাটালগ ঘেটে বই খুজে পড়ার কোনো প্রয়োজন নেই। ই-লাইব্রেরির কল্যাণে গুগল বা নির্দিষ্ট লাইব্রেরির ওয়েবসাইটে সার্চ করলেই সামনে চলে আসছে সব। কিন্তু এই ই-লাইব্রেরির ব্যবহার না জানায় অসংখ্য ও অগণিত তথ্য-উপাত্তের মাঝে নিয়মিত হাবুডুবু খাচ্ছি আমরা। আর এই সমস্যা উত্তোরণের একমাত্র সমাধান হতে পারে একটি আদর্শ ও মান-সম্মত ই-লাইব্রেরি। যেখানে সহজেই পাঠক খুঁজে পাবে তার প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্ত।
শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে পর্যাপ্ত তথ্য আদান-প্রদানের অভাবে মান-সম্মত গবেষণা থেকে শুরু করে মেধা ও মননে বিকাশ থেকেও দেশ-জাতি বঞ্চিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতির উত্তোরণে একজন শিক্ষক খুব সহজেই ই-লাইব্রেরির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন শিক্ষার্থীদের। ¯œাতক প্রথম বর্ষ থেকেই লাইব্রেরি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে এবং সাপ্তাহিক বিভিন্ন ধরনের অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে শিক্ষার্থীদেরকে লাইব্রেরির সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে বেঁধে ফেলতে পারেন। এ ক্ষেত্রে একজন শিক্ষক লাইব্রেরিয়ানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান চর্চার পরিধি ও গতিবিধি মনিটরিং করতে পারেন।
একই সঙ্গে শিক্ষকের সাথে শিক্ষার্থীর এবং লাইব্রেরিয়ানের সঙ্গে পাঠকের সম্পর্কও হতে হবে উন্নত এবং সুদৃঢ়। যতোদিন এটি না হবে ততোদিন গাণিতিক হারে স্কুল, কলেজ, বিশ^বিদ্যালয় ও লাইব্রেরির সংখ্যা বাড়লেও একই হারে কমতে থাকবে শিক্ষার প্রকৃত মান ও পাঠকের সংখ্যা। একটি পরিবেশ বান্ধব ই-লাইব্রেরি হতে পারে পাঠকের জ্ঞান-তৃষ্ণা নিবারনের সর্বোৎকৃষ্ট স্থান। ১৩ শতকের জনপ্রিয় পার্শিক বিজালাল আদ-দিন মুহাম্মদ রুমী বলেছেন, আমাদের চারদিকে সৌন্দর্য ছড়িয়ে রয়েছে। সাধারণত একে বুঝতে একটি বাগানে হাটার প্রয়োজন। ঠিক একই রকম ধারাবাহিক, সুশৃঙ্খল ও সুসংঘবদ্ধ জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে লাইব্রেরির কোনো বিকল্প নেই। বিশ^ব্যাপী তথ্য-উপাত্ত, চিন্তা-চেতনা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, জ্ঞান ও বিজ্ঞানের এক মহাসমুদ্্র হলো লাইব্রেরি। একজন নাবিক যেমন যাত্রীদেরকে নিরাপদভাবে পারাপারের ক্ষেত্রে মোক্ষম ভূমিকা পালন করে থাকে। ঠিক তেমনিভাবে একজন দক্ষ লাইব্রেরিয়ান জ্ঞানের এই মহাসমুদ্রে প্রত্যেক পাঠককে অবাধ বিচরণের ক্ষেত্রে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করে থাকে।
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সকল লাইব্রেরি পাঠকহীনতায় ভুগছে। শুধু বিশ^বিদ্যালয় কেন্দ্রীক লাইব্রেরিগুলোতে শিক্ষার্থীদের পদচারণা লক্ষ করা যায়। কিন্তু অন্য সব লাইব্রেরিতে পাঠকের সংখ্যা একেবারে নেই বললেই চলে। এক্ষেত্রে লাইব্রেরিগুলো পাঠক ছাড়া মৃত গৃহের মত হয়ে পড়েছে। অথচ প্রখ্যাত সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী লাইব্রেরিকে মনের হাসপাতাল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। গ্রন্থাগার আইন পাসের ১৬৮ বছর পর দেশে প্রথমবারের মতো ৫ই ফেব্রুয়ারি পালিত হয়েছে জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস। এই উপলক্ষে দেয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন- গ্রন্থাগার হল জ্ঞানের ভান্ডার, জ্ঞানার্জন, গবেষণা, চেতনা ও মূল্যবোধের বিকাশ, সংস্কৃতি চর্চা ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষকে আলোকিত করে তোলা এবং পাঠাভ্যাস নিশ্চিত করণে গ্রন্থাগারের ভূমিকা অপরিসীম।
একুশ শতকের সব ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বর্তমান সরকার দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। তথ্য জ্ঞানের আলোয় গোটা দেশকে আলোকিত করতে বাংলাদেশ সরকার ও বৃটিশ কাউন্সিলের যৌথ উদ্যেগে অতি শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে ‘লাইব্রেরিস আনলিমিটেড’। প্রাথমিকভাবে ৩০টি আদর্শ লাইব্রেরি এবং একটি ই-লাইব্রেরি নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করা হবে। উন্নত করা হবে আরো ৩৯টি লাইব্রেরি। ফ্রি ইন্টারনেটসহ সব ধরনের অত্যাধুনিক সেবা নিশ্চত করা হবে। বিভিন্ন ধরনের ওয়ার্কশপ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য থাকবে আলাদা জায়গা। বিশ^মানের ট্রেনিং দেয়া হবে লাইব্রেরিয়ানদের। ডিজিটাল লিডারশীপ, কাস্টমার সার্ভিস, আইসিটিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাদের দেয়া হবে সঠিক প্রশিক্ষণ। বর্তমান সময়ে কিছু দক্ষ লাইব্রেরিয়ান পাঠকদের সুবিধার্থে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সম্প্রতি চালু করা হয়েছে ওপেন এক্সেস বাংলাদেশ নামে একটি ওয়েব পোর্টাল। যার মাধ্যমে একজন পাঠক, শিক্ষার্থী কিংবা গবেষক বিভিন্নভাবে উপকৃত হতে পারবে। এক্সেস করতে পারবে সকল সরকারী ও বেসরকারী ডেটা।
ই-লাইব্রেরির আধুনিকায়নে বিশে^র বিভিন্ন বিখ্যাত লাইব্রেরির সঙ্গে নেটওয়ার্ক স্থাপন করা খুবই জরুরি। এবং লাইব্রেরি গুলোকে পরিবেশ বান্ধব করার পাশাপাশি পাঠকদের অনলাইন ও অফ লাইন ভিত্তিক সুবিধা প্রদান করতে হবে। গবেষকদের গবেষণা কার্যক্রমের জন্য নিতে হবে কার্যকারী পদক্ষেপ নিয়মিত পাঠকদের মধ্যে প্রতি মাসে জ্ঞান ও সাহিত্য মূলক প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে হবে। এবং যদি আমরা বাংলাদেশের সকল স্বনাম ধন্য লাইব্রেরি গুলোতে যে সমস্ত বই বিশেষ করে ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান ও গবেষণা মূলক উপন্যাস/প্রবন্ধগুলো যদি ইংরেজিতে অনুবাদের পাশাপাশি বাংলা একটি ডিজিটাল ফরমেটে এবং বিশে^র বিখ্যাত বই, জার্নাল, সাময়িকী ইত্যাদি সবকিছুই বাংলায় অনুবাদ করে অনলাইন ভিত্তিক করে দিতে পারি তাহলে আমাদের তরুণ সমাজ যেমন উপকৃত হবে ঠিক একই ভাবে জাতি ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার কাছে বাংলা ভাষা, ইতিহাস, সংস্কৃতি ব্যপকভাবে পরিচিতি লাভ করবে। মানুষ মূলত খাবারের জন্য বেঁচে থাকে না, বরং বাঁচার জন্য খায়। ঠিক তেমনি কোন পাঠক বই পড়ার জন্য বেঁচে থাকে না বরং ভালোভাবে বাঁচার জন্য বই পড়ে। আর এই পড়াটা তখনি সার্থক হবে যখন পাঠকের কাছে ই-লাইব্রেরিই হবে দ্বিতীয় আবাসস্থল।
[আলীম/এমকে]

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
পাঠকের মতামত
**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।
মো. এবাদুর রহমান শাম
১১ এপ্রিল ২০১৮, বুধবার, ৩:৫২

কোটা বাতিল নয়; কোটা সংস্কার চাই মো. এবাদুর রহমান শামীম কোটা সংস্কার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ উত্তাল দেশের সব কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। ক্রমান্বয়ে আন্দোলনের দাবানল গোটা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ছাত্রীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আন্দোলনকে ভিন্ন মাত্রা দান করেছে। ছাত্র আন্দোলনের এমন উত্তাপ ৯০ দশকের পর আর দেখা যায়নি। গত কয়েক মাস ধরে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকুরিতে কোটা সংস্কারের জন্য আন্দোলন করে আসছে। শিক্ষার্থীদের এই ন্যায্য, যৌক্তিক ও সময়োপযোগী দাবির প্রতি মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতিবিদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রক্টর ও ভিসি, বিপিএসির সাবেক চেয়ারম্যান, সাবেক সচিবসহ সব মহলের অকুণ্ঠ সমর্থন অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে বিপিএসির অধীনে ১ম শ্রেণির সরকারি চাকুরির ক্ষেত্রে ৫৬ শতাংশ কোটা রয়েছে। তন্মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ, জেলা কোটা ১০ শতাংশ, নারী কোটা ১০ শতাংশ এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোটা ৫ শতাংশ। তবে এসব কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে ১ শতাংশ প্রতিবন্ধীদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে। অর্থাৎ মেধার ভিত্তিতে চাকুরির সুযোগ রয়েছে মাত্র ৪৪ শতাংশ চাকুরিপ্রার্থীর। এর বাইরে অন্যান্য সরকারি ও আধা-সরকারি চাকুরিতেও কোটা ব্যবস্থা বিদ্যমান রয়েছে। ফলে সরকারি চাকুরিতে মেধার চেয়ে কোটার মূল্যায়ন বেশি হওয়ায় মেধাবী চাকরিপ্রার্থীদের একটি বড় অংশ কোটা ব্যবস্থার বলি হয়ে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত চাকুরি হতে বঞ্চিত হচ্ছেন। উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিতদের প্রায় অর্ধেক বেকারত্বের করাল গ্রাসে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন। আর তাঁদের দীর্ঘদিনের লাঞ্ছনা-বঞ্চনার বহিঃপ্রকাশ এই কোটা সংস্কার আন্দোলন। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে একটা সময় পর্যন্ত মহান মুক্তিসংগ্রামে অংশগ্রহণকারী জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান-সন্ততি ও নারীসহ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য চাকুরিতে কোটা পদ্ধতির প্রয়োজন ছিল। তবে একবিংশ শতাব্দীর অবাধ প্রতিযোগিতার যুগে যেখানে আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে আমরা ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছি, সেখানে প্রচলিত কোটা ব্যবস্থার সংস্কার সময়ের দাবি বটে। পাশাপাশি রাষ্ট্রের প্রশাসন যন্ত্রসহ সরকারি কর্মকাণ্ডে দক্ষতা বাড়াতে মেধার প্রতি গুরুত্ব বাড়ানোর বিকল্প নেই। সংবিধানের ১৯ (১), ২৯ (১) ও ২৯ (২) অনুচ্ছেদে চাকুরির ক্ষেত্রে সব নাগরিকের সমান সুযোগের কথা বলা হলেও সংবিধানের ২৯(৩) অনুচ্ছেদে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্র কাঠামোর মূলস্রোতে নিয়ে আসার জন্য কোটার রাখার বিষয়ে বলা হয়েছে। বাস্তবিক অর্থে, ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটার অপব্যবহার হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট দিয়ে সচিব, উপসচিব ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক হওয়ার মতো ভুরি ভুরি প্রমাণ রয়েছে। সেই সুযোগে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যাও বাড়ছে। ফলে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা এর সুফল ভোগ করছে না। এই অবস্থায় স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর মুক্তিযোদ্ধার নাতি-নাতনির জন্য কোটা রাখার কোনো যৌক্তিকতা আছে বলে মনে হয় না। যেখানে এখনো মুক্তিযোদ্ধারা ভিক্ষা করে, জুতা সেলাই করে এবং অন্যের দয়াদাক্ষিণ্য নিয়ে দিনানিপাত করছে, যেখানে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা রাখার কোনো দরকার নেই। বরং এসব হত দরিদ্র মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পূর্ণ দায়িত্ব সরকারের নেওয়া উচিত। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের দৌরাত্ম কোটা সংস্কার আন্দোলনকে গণ-আন্দোলনে রূপ দেওয়ার পাশাপাশি সব মহলের সমর্থন লাভে সহায়তা করেছে। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো, মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদ পরিবারকে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদান ও স্বীকৃতির ক্ষেত্রে উপেক্ষা করা হয়েছে। এমনকি শহীদের কোনো তালিকাও করা হয়নি। আর শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের নারীদের অগ্রগতি অনেকক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে বেশি। চাকুরির লাভের ক্ষেত্রেও নারীর সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। নারীরাও মনে করেন, নারী কোটা তাঁদের অগ্রগতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এসব অবস্থার প্রেক্ষিতে বলা যায়, কোটা সংস্কারের জন্য আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ৫ দফা দাবি যৌক্তিক ও সময়োপযোগী। এ আন্দোলন কোনোক্রমেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী নয়। বরং প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের সূর্য সন্তানরাও মনে করেন, প্রচলিত কোটা ব্যবস্থা তাঁদের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেলা কোটা বিলুপ্তির দাবি সে তো অনেক পুরনো কথা। সাধারণ শিক্ষার্থীদের অহিংস আন্দোলন অনেকটা সহিংস আন্দোলনে রূপ নিতে শুরু করেছে। গত রোববার [৮ এপ্রিল] আন্দোলনকারীদের দিনভর শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি রাতে হঠাৎ সহিংস হয়ে উঠে। এ সময় রাজধানীর শাহবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অবস্থান নেয়া শিক্ষার্থীদের পুলিশ ও ছাত্রলীগ তুলে দিতে চাইলে দু’পক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এতে শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। কিছু বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ভবনে ভাংচুর করে এবং গাড়ি ও আসবাবপত্রে আগুন লাগিয়ে দেয়। পুলিশ এ ঘটনায় অনেককে আটক করেছে। মঙ্গলবার রাত্রে বেগম সুফিয়া কামাল হলের একছাত্রীর পায়ের রগ কেটে ফেলা হয়েছে মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। কোটা সংস্কারের দাবি জোরদার হয়ে ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার [৯ এপ্রিল] মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করেন। বৈঠকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর আগামী ৭ মের মধ্যে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের আশ্বাস দেন। এরই প্রেক্ষিতে আন্দোলনকারীরা ৭ মে পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করেন। কিন্তু সরকারের কয়েক মন্ত্রীর অপরিণামদর্শী মন্তব্যে শিক্ষার্থীরা আবারও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে গোটা পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে সহজে অনুমেয়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে বেড়ে উঠা তীব্র আন্দোলন সরকার বা কোনো দলের বিরুদ্ধে নয়। বিশেষকরে, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে তো নয়ই। বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি অবিচল আস্থা এর প্রমাণ বহন করে। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন চাকুরির ক্ষেত্রে বৈষম্য অবসান ও অধিকার আদায়ের প্রশ্নে ন্যায্যতার দাবিদার। সরকারের উচিত ছিল আন্দোলন দানা বেধে উঠার আগেই দেশের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীদের দাবি সহানুভূতি ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে বিবেচনা করা। তদুপরি, তাঁদের ওপর লাঠি, কাঁদানে গ্যাস, জলকামান নিয়ে পুলিশের চড়াও হওয়া এবং ছাত্রলীগের নগ্ন হামলা নিন্দনীয় ও অনাকাঙ্ক্ষিত। একইভাবে নিন্দনীয় ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঢাবি উপাচার্যের ভবনে ভাংচুরের ঘটনাও। আন্দোলনের নামে নৈরাজ্যের অপসংস্কৃতি যেমন বন্ধ হওয়া উচিত, ঠিক তেমন অযাচিতভাবে পুলিশের হামলা, মামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনা বন্ধ হওয়া উচিত। সমঝোতার মাধ্যমেই সার্বিক পরিস্থিতির সমাধা করা দরকার। তজ্জন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। প্রয়োজনে সরকার কোটা সংস্কারে মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতামত নিতে পারে। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় কোটা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত, নারী, প্রতিবন্ধী ও দেশের পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নিতে হলে কোটা ব্যবস্থার বিকল্প নেই। তবে বিপিএসির অধীনে ১ম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকুরির ক্ষেত্রে সর্বোচ্ছ ১০ শতাংশ কোটা রাখা যেতে পারে। অন্যান্য সরকারি ও আধাসরকারি চাকুরিতে অন্তত ২০ শতাংশ কোটা রাখা দরকার। মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন, নির্যাতিত হয়েছেন, সম্ভ্রম হারিয়েছেন, ত্যাগ-তিতিক্ষা স্বীকার করেছেন এবং শ্বাপদসঙ্কুল পরিবেশে দেশপ্রেমের দীপশিখা প্রজ্জ্বলিত রেখেছেন; তাঁরা সর্বকালে, সর্বাবস্থায় জাতির শ্রেষ্ঠতর সন্তান। লাল সবুজের পতাকা যতদিন থাকবে, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র পৃথিবীর মানচিত্রে যতদিন থাকবে; ততদিন তাঁরা আমাদের অহংকার, গর্ব, চেতনা ও প্রেরণার বাতিঘর হয়ে হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। বিধায় মুক্তিযোদ্ধাদের মান-সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখতে প্রচলিত কোটা ব্যবস্থার সংস্কার করা জরুরি মনেকরি। পরিশেষে, ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের সাথে সুর মিলিয়ে বলবো, শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার দাবি যৌক্তিক কোটা বাতিল নয়; কোটা সংস্কার চাই মো. এবাদুর রহমান শামীম লেকচারার ও কলামিস্ট মৌলভীবাজার, সিলেট।

অন্যান্য খবর