ঢাকা, ২৩ জুলাই ২০১৮, সোমবার
উত্তম কুমারের অজানা কথা (৩৫)

‘দর্শকমহলে তখন সুচিত্রা সেন ধরতে গেলে নবাগতা’

| ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, বুধবার, ১২:৩৩

বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি মহানায়ক উত্তম কুমার অনন্য অভিনয় জাদুতে মুগ্ধতা বিলিয়েছেন দুর্নিবার। তার অভিনীত ছবি মানেই ভালোলাগার এক বিশাল প্রাপ্তি। পর্দায় এ নায়ক যেমন উজ্জ্বল তেমনই তার ব্যক্তিজীবনের চলাচলেও ছিল নানান রঙের মিশেল। সেই অজানা জীবনের গল্প তার বয়ান থেকে অনুলিখন করেছেন প্রখ্যাত সাংবাদিক-সাহিত্যিক গৌরাঙ্গপ্রসাদ ঘোষ যা পরবর্তী সময়ে ‘আমার আমি’ নামে বই আকারে প্রকাশ হয়। সে বই থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে উত্তম কুমারের আত্মজীবনী-

বিচিত্র এই ফিল্ম লাইন। বসু পরিবারের আশাতীত সাফল্যেও আমার ছবির সংখ্যা বাড়ল না। কয়েক মাস নিতান্ত বেকার আর অসহায় জীবনের মধ্যে পড়লাম। কিছু কিছু ছবির কথা হয়, তবে কোনো কাজে লাগে না।
নির্মল দের অবস্থা তখন পাল্টে গেছে। যে মানুষটি একদিন এই ফিল্মজগৎ থেকে একরাশ ব্যর্থতা নিয়ে শান্তিনিকেতনে নিতান্ত একক জীবন কাটাচ্ছিলেন, সেই মানুষটিই বসু পরিবারের সাফল্যে মাত্র কিছুদিনের মধ্যে পেলেন প্রতিষ্ঠা। অনেক অফার আসা সত্ত্বেও নির্মলদা কিন্তু নিজেকে সহজ করতে পারলেন না। একটা অফারও তিনি গ্রহণ করলেন না। ঠিক করেছিলেন আর ছবি করবেন না।
কিন্তু সব চিন্তাই ব্যর্থ হয়ে গেল। কিছুদিন পর এমপি প্রোডাকশন আবার ছবি করবে ঠিক করল। এবারও ছবি পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করলেন নির্মলবাবুরই ওপরে। একটা হাসির ছবি তৈরি করার ব্যবস্থা পাকাপাকি হয়ে গেল। ছবির নামকরণ হলো ‘সাড়ে চুয়াত্তর’।
আমি আগের মতোই প্রতীক্ষায় রইলাম। এ ছবির নায়ক হিসাবে নির্মলবাবু যে আমাকেই নির্বাচন করবেন এমন একটা স্থির সিদ্ধান্তে তখন পৌঁছে গেছি। ঠিক সময়মতই নির্মলবাবু আমাকে ডেকে পাঠালেন। যথাসময়ে আমাকেই ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবিতে নির্বাচন করা হলো নায়ক হিসাবে।
যথারীতি ছবির প্রাথমিক কাজও এগিয়ে চলল। নায়িকা হিসাবে স্থির হলো মালা সিনহার নাম। একদিন নির্মলবাবু আমাকে নিয়ে হাজির হলেন মালা সিনহার বাড়িতে। কলকাতার ভবানীপুরের জগুবাবুর বাজারের কাছে তখন থাকতেন মালা সিনহা। তিনি রাজি হলেন না। অনেকগুলি ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হবার জন্যই তিনি এই ছবিতে কাজ করতে পারবেন না বলে জানিয়ে দিলেন। এবার নির্মলবাবুর সামনে নায়িকা বিভ্রাট।
সকলের তখন একই চিন্তা-কাকে নিয়ে কাজ করা হবে! নায়িকা-চিন্তায় সবাই যেন বিব্রত। হঠাৎ একটা নাম মনে পড়ল নির্মলবাবুর। রমা।
সুচিত্রাই রমা। সুচিত্রা সেন। সুচিত্রা সেন ইতিপূর্বে কয়েকটা ছবিতে কাজ করেছেন। দর্শকমহলে তখন সুচিত্রা সেন ধরতে গেলে নবাগতা। সেই সুচিত্রা সেনকে এই ছবিতে নায়িকা-নির্বাচন করা হলো। আমি যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। যথাসময়ে ছবির কাজ শুরু হলো। নিয়মিত শুটিং আরম্ভ হলো ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবির।
ইতিমধ্যে আরো দু’তিনখানা ছবিতে আমি কাজ পেয়েছি। তখন ব্যস্ততাও বেড়েছে খানিকটা। বেশ খুশি খুশি মন নিয়ে আমি শুটিং করি।
তখন আমার দুটো মুখ্য কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাড়ি থেকে স্টুডিও আর স্টুডিও থেকে বাড়ি। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবির পাশাপাশি আরও কয়েকটা ছবির মধ্যে একটির নাম নবীন যাত্রা। ইতিমধ্যে নীরেন লাহিড়ীও আমাকে নায়ক নির্বাচন করেছেন তার হাসির ছবি ‘লাখ টাকা’য়।
নিউ থিয়েটার্সের ‘নবীন যাত্রা’ ছবিরও নায়ক নির্বাচিত হয়েছি আমি। পাশাপাশি তিনটি ছবির কাজ করে চলেছি। ক্লান্তি আমাকে এতটুকুও স্পর্শ করেনি। নিজেকে একটুও ব্যস্ত বলে মনে হয় না। আনন্দে খুশিতে আমি কাজ করে চলেছি। এমন সময় নরেশ মিত্র মহাশয় আমাকে ডেকে পাঠালেন।
নটশেখর নরেশ মিত্র তখন আমার কাছে প্রণম্য। নরেশদা তখন যেমন নাট্যজগতের মধ্যগগণে, তেমনি চিত্রজগতের সুপ্রতিষ্ঠিত। চিত্রপরিচালক হিসাবে একটি সুপ্রসিদ্ধ নাম। তিনি আমাকে ডেকেছেন জেনে নিজেকে গর্বিত মনে করলাম, আমি ছুটে গেলাম। আমাকে বসতে বলরেন নরেশবাবু। শান্ত সাবলীল কণ্ঠে বললেন, আমার ছবিতে অভিনয় করার জন্য তোমাকে ডেকে পাঠিয়েছি, কবিগুরুর গল্প বৌঠাকুরানীর হাট। রোলটা বড় স্টিফ, প্রচুর পরিশ্রম করতে হবে, পারবে তো?
সঙ্গে সঙ্গে আমি উত্তর দিলাম, হ্যাঁ, আপনার ষুযোগ্য শিক্ষা পেলে ভালোই করব।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস- নরেশদা বোধকরি বেশ খুশি হবেন। বললেন, ব্যস তাহলেই হবে।
ছবির নায়ক নির্বাচিত হলাম আমি। ছবির বিষয়ে নানা আলোচনা প্রসঙ্গে বৌঠাকুরানীর হাট ছবি করার কারণ জানালেন তিনি। বললেন, আমি যখন গোরা করেছিলাম সেইসময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাকে কথা প্রসঙ্গে এই গল্পের চিত্ররূপ দিতে বলেছিলেন, আমি কবির সেই নির্দেশ পালন করতে চলেছি।
অবশেষে সেই ছবিতেও কাজ আরম্ভ করে দিলাম।
নরেশ মিত্র আমাকে তার অভিনয় শিক্ষা দিয়ে এমনভাবে সাহায্য করলেন যা কোনোদিন বিস্মৃত হব না।
এল ১৯৫৩ সাল।
এই বছরটি আমার জীবনে স্থিতি এনে দিল। মুক্তি পেল সাড়ে চুয়াত্তর।
তারপর এই একই বছরে পর পর আরও তিনখানা ছবি মুক্তি পেলÑ নবীন যাত্রা, বৌঠাকুরানীর হাট এবং লাখ টাকা।
সাড়ে চুয়াত্তর মুক্তি পেল প্যারাডাইস সিনেমায়।
প্যারাডাইস তখন ছিল অন্যতম প্রথম শ্রেণির চিত্রগৃহ। বাংলা ছবি এই হাউসে মুক্তি পাওয়া যেন একটা বিরাট কৃতিত্বের পরিচয় বহন করা। এমপি-র কর্তৃপক্ষ যেন সেই কৃতিত্বই অর্জন করলেন।
ফলাও করে বিজ্ঞাপন দিলেন। বিজ্ঞাপনে মুখ্য বিষয়বস্তু হলো প্যারাডাইস। আমার মনটা ভীষন দমে গেল। কিছুতেই এমপির প্রচার বিভাগ আমার নামটা বিজ্ঞাপনে দিতে রাজি হলেন না। অবশেষে সে ব্যাপারেও আমার উৎসাহ স্তিমিত হয়ে গেল। অনেক অনুরোধ করা সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষ আমার নামের ব্যাপারে এতটুকুও আমল দিলেন না।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।