ঢাকা, ২৮ মে ২০১৮, সোমবার
উত্তম কুমারের অজানা কথা (৩৬)

‘নায়ক হিসাবে আমার কোনো হদিসই রইল না বিজ্ঞাপনের কোথাও’

| ৩ মার্চ ২০১৮, শনিবার, ১২:২৩

বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি মহানায়ক উত্তম কুমার অনন্য অভিনয় জাদুতে মুগ্ধতা বিলিয়েছেন দুর্নিবার। তার অভিনীত ছবি মানেই ভালোলাগার এক বিশাল প্রাপ্তি। পর্দায় এ নায়ক যেমন উজ্জ্বল তেমনই তার ব্যক্তিজীবনের চলাচলেও ছিল নানান রঙের মিশেল। সেই অজানা জীবনের গল্প তার বয়ান থেকে অনুলিখন করেছেন প্রখ্যাত সাংবাদিক-সাহিত্যিক গৌরাঙ্গপ্রসাদ ঘোষ যা পরবর্তী সময়ে ‘আমার আমি’ নামে বই আকারে প্রকাশ হয়। সে বই থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে উত্তম কুমারের আত্মজীবনী-

ছবি মুক্তি পেল।
যথারীতি সাংবাদিকরাও ছবির সমালোচনা করলেন। আমি আবার আগের মতোই ছবির সমালোচনার স্তম্ভ হাতড়ে বেড়াতে লাগলাম।
আনন্দবাজার আবার লিখল- রামপ্রীতির ভূমিকায় উত্তমকুমারকে বেশ স্মার্ট দেখা গেল, অভিনয়ও স্বচ্ছন্দ। সত্যি কথা বলতে কি এতেই আমার মন ভরে গেল। কিন্তু বিজ্ঞাপনে নজর পড়লেই আমি ভীষণ দুঃখ পেতাম। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবির বিজ্ঞাপনে প্রথম যে কথা ফলাও করে প্রচার করা হয়েছিল তা ছিল এইরকমÑ প্যারাডাইস চিত্রগৃহে বাংলা ছবিÑ
বিজ্ঞাপনে তারপরই দ্বিতীয় অ্যাট্রাকশন ছিল, তুলসী চক্রবর্তী অভিনীতি একটা ছবি। নায়ক হিসাবে আমার কোনো হদিসই রইল না বিজ্ঞাপনের কোথাও। আমি নগণ্যÑ আমি সামান্য। বিজ্ঞাপনে নাম পাবার অধিকার তখনও আমি পাইনি। মনকে নানাভাবে সংযত করলাম।
একমাত্র ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ জনসমাদর পেল। বাকি ছবিগুলি একই বছরের মধ্যে মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে আবার আমাকে ভারাক্রান্ত করে দিয়ে গেল। চারখানা ছবির মধ্যে তিনখানাই ফ্লপ। এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কী থাকতে পারে? তবুও আমি ভাঙিনি। নিজেকে এতটুকুও দুর্বল ভাবিনি।
চেনা-অচেনা অনেকেই আমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। ‘বৌঠাকুরাণীর হাট’ ছবিতে আমার অভিনয় নাকি সকলেরই ভালো লেগেছিল। সেই প্রশংসায় নিজেকে অনেকটা শক্ত করে রেখেছিলাম। খুশি দিয়ে নিজেকে ভরিয়ে রাখতে চেয়েছিলাম।
বেশ মনে পড়ে। মনে পড়ে স্বয়ং নরেশদা একবার স্বতঃস্ফূর্তভাবে অনেকের কাছেই আমার প্রশংসা করেছিলেন তখন। তিনি বেশ গর্বের সঙ্গেই বলেছিলেন, উত্তম যে একদিন অসাধারণ অভিনেতা হবে তা আমি ‘বৌঠাকুরাণীর হাট’ ছবি তৈরি করার সময় ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিলাম। একজন বাধ্য ছাত্রের মতো ও আমার কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেছিল। যেখানে বুঝতে পারেনি বার বার আমাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞাসা করেছে। ওর ধৈর্য দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। খুশি হয়েছি অভিনয়ের প্রতি ওর আন্তরিক শ্রদ্ধা দেখে।
অনেকবার অনেকজনের কাছেই আমার অসাক্ষাতে নরেশ মিত্র মশাই আমার এই প্রশংসার মানপত্র ছড়িয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন, যা ভাবলে আজও আমি গর্ববোধ করি।
সেদিনের কথা আজ মনে পড়ে।
‘বৌঠাকুরাণীর হাট’ এর নায়ককে ঘোড়ায় চড়তে হবে। অথচ আমি তখন ঘোড়ায় চড়া প্রসঙ্গে নিতান্তই অনভিজ্ঞ। নরেশদা তো ভীষণ চিন্তায় পড়লেন। আমাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি ঘোড়ায় চড়তে পারবে তো? কথাটা আমাকে খুব ভীত করে তুলল। মনে মনে ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়লাম।
মনে হলো, যদি বলি ঘোড়ায় চড়তে পারি না তাহলে নরেশদা হয়তো আমাকে বাতিল করে দেবেন। সুতরাং সত্যকে স্বীকার করে নেবার মতো মন তখন আমার নেই। কী উত্তর দেব ভাবছি।
নরেশদা আমার পিঠ চাপড়ে সস্নেহে বললেন, বুঝেছি, তা এতে ঘাবড়াবার কী আছে? ঘোড়ায় চড়াটা তো তোমাকে একেবারে আয়ত্তে আনতে হবে না, মোটামুটি যদি একটু ওঠা-নামাটা শিখে নিতে পার তা হলেই চলবেÑ ভালোই হবে।
আমার মনে তখন আবার প্রশ্ন, চলবে কেমন করে? অথচ সরাসরি জিজ্ঞাসা করতেও সাহস হচ্ছে না।
নরেশদা আবার বললেন, ভাবছ কী করে চলবে, তাই না? তুমি ঘোড়ায় ওঠা আর নামাটা আয়ত্তে আনতে পারলে বাকিটুকু আমি ডামি দিয়েই চালিয়ে নেব।
কথাটা শুনলাম বটে, তবে মন ভরল না। আমার তখন ঘোড়ায় চড়া  শেখার প্রবল ঝোঁক চেপে গেল। নরেশদাকে ব্যাপারটা সেই মুহূর্তে খুলে বললাম না। ভাবলাম ঘোড়ায় চড়া পুরোপুরি আয়ত্বে আনতে পারলে সবাইকে অবাক করে দেওয়া যাবে।
অবশেষে ভাবনাকে বাস্তবে রূপায়িত করে তোলার কাজ শুরু করে দিলাম এবং মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই আমি সেই কাজটা আয়ত্তে আনলাম।
সেই দৃশ্যের শুটিং-এর দিন সত্যিই অবাক করে দিলাম সবাইকে। নরেশদা আমার এই ব্যাপারে অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন। সবাইকে ডেকে ডেকে বলেছিলেন, যেদিন ঘোড়ায় চড়ার সিনটা টেক করলাম সেদিন আর ডামির প্রয়োজন হলো না। পুরোপুরি উত্তমকে দিয়েই দৃশ্যটা গ্রহণ করেছিলাম। আর তা থেকেই মনে হয়েছিলÑ
আমি আজ খুব বড় অভিনেতা হয়েছি কি না জানি না, তবে সেদিন নরেশদাকে আমি খুশি করতে পেরেছিলাম। নরেশদার সেদিনের ভবিষ্যদ্বাণী আমার জীবনে যে কী মূল্য এনে দিয়েছে তা ঠিক বোঝাতে পারব না।
পর-পর তিনটি ছবি ব্যবসার দিক থেকে ব্যর্থ হলেও অনেকগুলো ছবিতেই আমি তখন নির্বাচিত হয়ে আছি। মোটামুটিভাবে তখন ছবির জগতে নিজেকে বেশ খানিকটা ব্যস্ত করে ফেলেছি আমি। দু’চারখানা ছবির কাজ চলছে। বাকি ছবিগুলি শুটিং-এ জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমন সময় পাবলিক স্টেজে অভিনয় করার জন্যে আমাকে আহ্বান জানানো হলো।
স্টেজে অভিনয় করতে হবে জেনে আমি আনন্দিতই হয়েছিলাম। আনন্দিত হয়েছিলাম এই কারণে যে, বাংলাদেশের মঞ্চকে আমি ছোটবেলা থেকেই মনে-প্রাণে শ্রদ্ধা করতাম। স্টেজের সঙ্গে আমার ছিল রক্তের সম্বন্ধ। একেবারে স্টার থেকে অফার এল অভিনয় করার।
১৯৫৩ সাল।
এই সালটি আমার শুধু নয়, ভারতীয় চলচ্চিত্রেরও এক স্মরণীয় সাল। এই সালে ভারত সরকার গর্বের সঙ্গে ঘোষণা করলেন যে, শ্রেষ্ঠ ভারতীয়-রাষ্ট্রীয় ছবির জন্যে পুরস্কার দেওয়া হবে। রাষ্ট্রীয় পুরস্কারের প্রবর্তন হলো।
সেবার স্টার থিয়েটারকে নতুন করে সাজানো হয়েছে। স্টার থিয়েটারের মালিক সলিল মিত্র পুরোনো স্টারকে ভেঙে একেবারে আনকোরা নতুনভাবে তৈরি করলেন। চারিদিকে প্রচার ছড়িয়ে পড়ল বঙ্গরঙ্গমঞ্চের উন্নতিসাধনকল্পে দীক্ষিত রঙ্গালয়। এই সময়ে এই থিয়েটারে যুগ্ম পরিচালক হিসেবে যুক্ত হলেন শিশির মল্লিক আর যামিনী মিত্র। ওরা ঠিক করলেন স্বর্গীয়া সাহিত্যিক নিরুপমা দেবীর সুবৃহৎ উপন্যাস শ্যামলীকে নাটকাকারে স্টারের পাপপ্রদীপে উপস্থিত করবেন। নাট্যরূপ দেবার জন্য দেবুবাবুকে ওরা আহ্বান জানালেন। দেবুদা অর্থাৎ দেবনারায়ণ গুপ্তকে নাট্যকার ও চিত্রপরিচালক হিসেবে আমি তখন বেশ ভালো করেই জানি।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।