× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা ইলেকশন কর্নার
ঢাকা, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮, বুধবার

সিরিয়াকে বাঁচাতে হলে আসাদকে জিততে দিতে হবে

বিশ্বজমিন

ম্যাক্স বুট | ১১ মার্চ ২০১৮, রবিবার, ১০:১৫

দামেস্কের উপকণ্ঠে পূর্বাঞ্চলীয় ঘৌটায় বাশার আল আসাদ যে তা-ব চালিয়েছেন, তা যে যুদ্ধাপরাধ, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ইতিমধ্যে সেখানে ৯ শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। এই ‘নিষ্ঠুর অভিযানে’র নিন্দা জানানো সহজ, যেমনটা হোয়াইট হাউজ দায়সারাভাবে করেছেও। কিন্তু এ নিয়ে কী করা যায়, সেটা বের করা কঠিন। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যে অস্ত্রবিরতিতে সম্মত হয়েছিল দুই পক্ষ, সেটি অগ্রাহ্য করা হচ্ছে। এই অস্ত্রবিরতি যে অগ্রাহ্য করা হবে, তা আগে থেকেই অনুমেয় ছিল। শেষপর্যন্ত ছোট আকারে মানবিক ত্রাণ সহায়তা শহরের ভেতরে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এতে আসাদের হত্যাযজ্ঞ থামবে না।

২০১২ সালে অনেকের মতো আমিও আসাদের বর্বর ‘ব্যারেল বোমা’র বর্ষণ থামাতে সিরিয়ায় নো-ফ্লাই জোন প্রতিষ্ঠা করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহবান জানিয়েছিলাম। বলেছিলাম, আসাদকে উৎখাত করতে বিদ্রোহী গোষ্ঠী ফ্রি সিরিয়ান আর্মিকে সহায়তা দেয়া হোক। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যদি ওই আহবান শুনতেন, অনেক মানুষ হয়তো আজও বেঁচে থাকতো। পাশাপাশি, কৌশলগত ও মানবিক বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হতো। ছয় বছর পর আমি এখন মনে করি না যে, নো-ফ্লাই জোন প্রতিষ্ঠার ওই পরামর্শ বাস্তবসম্মত। ২০১৫ সালে সিরিয়ার সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে রাশিয়া। তারপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সমীকরণ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র চাইলেই রাশিয়ার যুদ্ধবিমান আক্রমণ করে বসতে পারে না। সেক্ষেত্রে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ বেঁধে যেতে পারে।
রাশিয়া ও ইরানের সহায়তায় আসাদ আর পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে নেই। বরং, তার অবস্থান এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে সুদৃঢ়। সিরিয়ার বেশিরভাগ অঞ্চল পুনরায় নিজের দখলে নেওয়া তার জন্য এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
মার্কিন বিমান শক্তির সাহায্যে ঘৌটা অঞ্চলের বেসামরিক মানুষের জন্য সহায়তা পাঠালে জাতি হিসেবে আমরা হয়তো ভালো অনুভব করবো। এতে কিন্তু প্রাণ বাঁচবে না। আমরা যদি রাশিয়ার যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করতামও, তাহলেও সরকারের অনুগত বাহিনী স্রেফ কামান ও রকেট ব্যবহার করেও ঘৌটা শহরকে চূর্ণবিচূর্ণ করে ফেলতে সক্ষম। আমেরিকা হস্তক্ষেপ করলে এই শহরবাসীর যন্ত্রণা দীর্ঘমেয়াদী হবে কেবল।
দুঃখিত হয়েই আমি এই অনুসিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে, প্রাণ বাঁচানোর একমাত্র উপায় হচ্ছে আসাদকে যত দ্রুত সম্ভব বিজয় অর্জন করতে দেওয়া। ২০১৬ সালেও আলেপ্পো ছিল সমাধিস্থল। এখন এটি আসাদ বাহিনীর হস্তগত হয়েছে। এখন এই শহরের বিভিন্ন ছবি থেকে দেখা যাচ্ছে, পুনঃনির্মিত একটি সরকারী উদ্যানে বহু মানুষ পায়চারি করছে। আসাদ সরকারের অধীনে তাদেরকে বসবাস করতে হবে, এটি ভাবলেই তিক্ত হয়ে উঠে মন। কিন্তু মানুষজন অন্তত জীবিত তো থাকতে পারবে। অনন্তকাল অনর্থক এক যুদ্ধ চালানোর চেয়ে একনায়কতন্ত্র অনেক ভালো।
আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইন্সটিটিউটের গবেষক কেনেথ পোলকের উপস্থাপিত একটি পরিকল্পনার প্রতি আমার এক সময় সমর্থন ছিল। ওই পরিকল্পনায় বলা হয়েছিল যে, ইরানি ও রুশদের রক্তক্ষরণ ঘটাতে সিরিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়া হোক। কিন্তু এখন আমার এই পরিকল্পনায় সায় নেই। এই ধরণের সহায়তা তখনই কাজে দেয় যখন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর জয়লাভের বাস্তব সম্ভাবনা থাকে। যেমনটি ছিল আশির দশকের আফগান বিদ্রোহীদের ক্ষেত্রে। কিন্তু শক্তিধর দেশের ক্ষমতার লড়াইয়ে সিরিয়ানদেরকে স্রেফ কামানগোলার শিকার হিসেবে ব্যবহার করাটা সঠিক কাজ নয়, যখন তাদের জয় পাওয়ার কোনো আশাই নেই।
আমার কথার মানে এই নয় যে, আমেরিকার করার কিছুই নেই। আমরা মস্কোর সঙ্গে দরকষাকষি করতে পারি যে, আসাদ সরকারের নিষ্ঠুরতা কমানোর বিনিময়ে, যুক্তরাষ্ট্র তার বিরুদ্ধচারণ বন্ধ করবে। গণবিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহার করার ব্যাপারে যে অলিখিত নিষেধাজ্ঞা আছে, সেটিও আমরা বহাল রাখতে পারি। যেমন, আসাদ বাহিনীর সারিন গ্যাস হামলার প্রতিশোধ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ার একটি বিমান ঘাঁটিতে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল। এই বছর আসাদ বাহিনীর দ্বারা ক্লোরিন গ্যাস ব্যবহারের কমপক্ষে ৭টি অভিযোগ রয়েছে। সিরিয়ান বাহিনীর যেসব ইউনিট এই রাসায়নিক গ্যাস হামলা চালানোর দায়িত্বে ছিল, তাদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের উচিত বিমান হামলা চালানো। অবশ্য, এতে এই যুদ্ধের ভয়াবহতার যে ব্যপ্তি, তা কমবে সামান্যই।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটি যুক্তরাষ্ট্র এখন করতে পারে তা হলো সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস-এর কুর্দি ও আরব অংশীদারদের পাশে দাঁড়ানো। এই বাহিনীই উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় সিরিয়াকে ইসলামিক স্টেটের হাত থেকে মুক্ত করেছে। সিরিয়ার প্রায় ২৫ শতাংশ ভূখ- কুর্দিদের দখলে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ২০০০ সেনা রয়েছে।
তুরস্কের সরকার এ নিয়ে খুশি নয়। তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান তার সিরিয়ান মিত্র বাহিনী সহ তুর্কি সেনাবাহিনীকে পাঠিয়েছেন উত্তরপশ্চিমাঞ্চলীয় কুর্দি দখলকৃত আফরিন শহর আক্রমণ করতে। এরদোগান সিরিয়ার কুর্দি তথা ওয়াইপিজি ও তুরস্কের কুর্দি তথা পিকেকে’র মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখেন না। পিকেকে বাহিনীকে বহুদিন ধরে এরদোগান সন্ত্রাসী বাহিনী ও শত্রু জ্ঞান করে আসছেন।
ট্রাম্পের উচিত এক্ষেত্রে এরদোগানের সঙ্গে চুক্তি করা। সিরিয়ার কুর্দিরা (ওয়াইপিজি) তুরস্কের পিকেকে’র প্রতি সব ধরণের সহায়তা বন্ধ করবে। বিনিময়ে তুরস্ক পিছু হটবে। ওয়াইপিজি যদি তাদের অঙ্গীকার অক্ষুণœ রাখে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র সংগঠনটিকে বিমানশক্তি ও পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করবে। এতে করে সিরিয়ান কুর্দি বাহিনী ইউফ্রেটস নদীর পূর্বে তাদের দখলে থাকা ভূখ- সুরক্ষিত রাখতে পারবে। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়ও ইরাকি কুর্দিদের সুরক্ষিত রাখতে যুক্তরাষ্ট্র এভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিল। তুরস্ক তখনও সন্তুষ্ট ছিল না। কিন্তু তারপরও তুরস্ক ইরাকে অবস্থিত কুর্দি আঞ্চলিক সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক অক্ষুণœ রেখেছে।
কুর্দিদের ২৫ শতাংশ ঠিক রেখে, আসাদকে সিরিয়ার তিন-চতুর্থাংশ ছেড়ে দেওয়ার কথা মানতে হয়তো কষ্ট হবে। কিন্তু আসাদকে উৎখাতে আমাদের সেরা সুযোগ আমরা ওবামার আমলে হারিয়ে ফেলেছি। আসাদই এই যুদ্ধে জিততে চলেছেন। এই করুণ বাস্তবতা মেনে নেওয়া ছাড়া এখন আমাদের আর কোনো পথ নেই।
(ম্যাক্স বুট মার্কিন সংবাদপত্র ওয়াশিংটন পোস্টের একজন কলামিস্ট। তিনি মার্কিন থিংকট্যাংক কাউন্সিল অন ফরেইন রিলেশন্সের জাতীয় নিরাপত্তা অধ্যয়নকেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ ফেলো। ওয়াশিংটন পোস্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তার এই কলাম অনুবাদ করেছেন মাহমুদ ফেরদৌস।)

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর