× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা রম্য অদম্য
ঢাকা, ২১ অক্টোবর ২০১৮, রবিবার
নির্যাতনের অভিযোগ

রিমান্ডের পর কারাগারে ছাত্রদল নেতার মৃত্যু

শেষের পাতা

স্টাফ রিপোর্টার | ১৩ মার্চ ২০১৮, মঙ্গলবার, ৯:২০

রিমান্ড শেষে কারাগারে নেয়ার পর মৃত্যুবরণ করেছেন ছাত্রদল নেতা জাকির হোসেন মিলন। তিনি তেজগাঁও ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও ঢাকা মহানগর উত্তরের সহ-সভাপতি ছিলেন। গত ৬ই মার্চ প্রেস ক্লাবের সামনে বিএনপি আয়োজিত মানববন্ধন থেকে রমনা থানা পুলিশ তাকে আটক করে। পরে শাহবাগ থানায় হস্তান্তর করে পুলিশি কাজে বাধা দেয়ার অপরাধে তার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করা হয়। ৭ই মার্চ তাকে আদালতে হাজির করে ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার বাদী শাহবাগ থানার উপ-পরিদর্শক অমলেশ কৃষ্ণ দে। আদালত তার জামিন আবেদন মঞ্জুর না করে তিন দিনের রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর করেন। রিমান্ডে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে মহানগর গোয়েন্দা সংস্থার দক্ষিণের একটি টিম। রিমান্ড শেষে রোববার তাকে আদালতে হাজির করা হয়।
এদিন আসামিপক্ষের আইনজীবী ফের তার জামিন আবেদন করেন। কিন্তু আদালত তার জামিন  নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। রিমান্ডের পর থেকেই তিনি প্রচণ্ড অসুস্থতাবোধ করছিলেন। কারা কর্তৃপক্ষ তাকে কারা হাসপাতালে পাঠায়। সেখানে একজন সহকারী চিকিৎসক তার শারীরিক পরীক্ষা করে অবস্থা খারাপ থাকায় তাকে ভালো চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) পাঠান। ঢামেকে আনার পরপরই তার মৃত্যু হয়। নিহত মিলনের চাচা অলিউল্লাহ মানবজমিনকে বলেন, আমার ভাতিজাকে রিমান্ডে টর্চার করে মেরে ফেলা হয়েছে। সে আমাকে আদালতে বলেছিলো- আমার জন্য দোয়া কর, আমি মনে হয় আর বাঁচবো না। এই ছিল তার সঙ্গে আমার শেষ কথা। সেদিন তার চোখ-মুখ দেখে মনে হয়েছিল তাকে খুব বেশি নির্যাতন করা হয়েছে। তিনি বলেন, মিলনকে কোথায় রাখা হয়েছে খোঁজার জন্য আমি শাহবাগ থানায় গিয়েছি। সেখানে ডিউটি অফিসার ও এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আমাকে বলেছিলেন মিলনের বিষয়ে তার কিছু জানা নেই। থানায় এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য নেই। তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর মিলনের সঙ্গে দেখা করতে না পেরে আমি ডিবি কার্যালয়ে যাই। সেখান থেকে আমাকে বলা হয় তাদের ৫০টির বেশি টিম আছে। কোন টিম মিলনকে আটক করেছে তারা সেটি জানেন না। ছাত্রদল নেতা মিলন ১৯৯০ সাল থেকে ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ১৯৯৩ সালে তিনি বিজ্ঞান কলেজ থেকে এসএসসি ও ১৯৯৫ সালে এইচএসসি পাস করেন। ছোটখাটো ব্যবসার সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। ২ ভাই ও ২ বোনের মধ্যে মিলন সবার বড় ছিলেন। মিলনের স্ত্রী ও দুটি কন্যা সন্তান রয়েছে। নিহতের চাচাত ভাই মো. মাসুম মিয়া মানবজমিনকে বলেন, রোববার আদালতপাড়ায় আমি তার সঙ্গে শেষ কথা বলেছি। সেদিন আমাকে এক জোড়া জুতা, লুঙ্গি ও গামছা দেয়ার কথা বলেন। আমি তখন তাকে ৫০০ টাকা দেই। কিন্তু তার চোখে-মুখে রক্তের দাগ দেখেছিলাম। বিমর্ষ চেহারা দেখে জিজ্ঞাসা করেছিলাম রিমান্ডে মারধর করা হয়েছে কিনা। তখন সে আমাকে বলেছিল রিমান্ডে তাকে টর্চার করা হয়েছে, এসব কথা যেন তার স্ত্রীকে না জানাই। তাকে দেখলে ও মারধরের কথা জানলে অযথাই কষ্ট পাবে। মাসুম বলেন, গতকাল আমি তার জন্য জুতা, লুঙ্গি ও গামছাসহ আরো কিছু জিনিস কিনে কারাগারে যাওয়ার জন্য রওয়ানা হয়েছিলাম। হঠাৎ করে আমার মোবাইলে মিলনের এক বন্ধু ফোন দিয়ে বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মিলন কান্নাকাটি করছে। হঠাৎ করে সে অনেক অসুস্থ হয়ে পড়েছে। মেডিকেলে গিয়ে দেখি তার আগেই সে মারা গেছে। মিলনের ছোট বোন সুলতানা রাজিয়া মানবজমিনকে বলেন, আমার ভাইকে দেখার জন্য অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু দেখা করতে পারিনি। তাকে কোথায় রাখা হয়েছে আমরা জানতাম না। কেউ বলে শাহবাগ থানায় আবার কেউ বলে মিন্টো রোডের ডিবিতে রাখা হয়েছে। ছাত্রদল নেতা জাকির হোসেন মিলনের আইনজীবী মেহেদি হাসান নয়ন মানবজমিনকে বলেন, আটকের পর প্রথম দিন যখন তাকে আদালতে হাজির করা হয় ওইদিন সে সুস্থ ছিল। আমার সঙ্গে কথাও হয়েছে। তবে রোববার তাকে আদালতে নেয়া হলেও তাকে গারদখানায় রাখা হয়েছিল। তাই তার সঙ্গে কথা হয়নি। আমরা তার জামিন আবেদন করেছিলাম। আদালত সেটা নামঞ্জুর করেন।

নিষ্ঠুর শাসনের ধারাবাহিকতা মিলনের মৃত্যু: বিএনপি  
রিমান্ড থেকে কারাগারে পাঠানোর পর ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের সহ-সভাপতি ও তেজগাঁও থানা শাখার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জাকির হোসেন মিলনের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদল। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এক শোকবার্তায় বলেন, এটি সন্দেহাতীতভাবে বলা যায় যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঘৃণ্য বর্বরতার শিকার জাকির হোসেন মিলন। বিএনপিসহ বিরোধী স্বর বন্ধ করতেই সরকার এখন তারুণ্যের শক্তিকে ধ্বংস করতে উঠেপড়ে লেগেছে। এ জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আইনবহির্ভূত আচরণ করতে সরকার উৎসাহিত করছে। এ কারণেই জাতীয়তাবাদী শক্তির তরুণ নেতাদের বেছে বেছে নির্যাতনে পিষ্ট ও জীবনহানি ঘটানো হচ্ছে। তিনি বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের মধ্যদিয়ে সরকার গণতান্ত্রিক শক্তির প্রতি এক অশুভ বার্তা পৌঁছে দিলো, তা হচ্ছে সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে কেউ যেন আওয়াজ না তোলে। কিন্তু জুলুমশাহীকে পরাজিত করতে ঐক্যবদ্ধ জনগণ এখন অঙ্গীকারবদ্ধ। জনগণের প্রবল স্রোতের কাছে স্বৈরশাসককে মাথানত করতে হবে। নিহত জাকির হোসেন মিলনের আত্মার মাগফিরাত কামনা, শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। শোকবার্তায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ৬ই মার্চ গ্রেপ্তারের পরদিন আদালতে হাজির করে রিমান্ডে নেয় রমনা থানা পুলিশ। পরে তাকে ডিবি কার্যালয়ে রিমান্ডে নেয়া হয়। টানা তিনদিন রিমান্ড শেষে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারেই আজ (গতকাল সোমবার) ভোরে তার মর্মান্তিক মৃত্যু হয় (ইন্নালিল্লাহি...রাজিউন)। বিএনপি মহাসচিব বলেন, রিমান্ডে থাকা অবস্থায় পুলিশি নির্মম নির্যাতনে গুরুতর আহত জাকির হোসেন মিলনকে কারাগারে চিকিৎসা না দিয়ে এভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া অমানবিক। তিনি এ ঘটনায় নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। মির্জা আলমগীর বলেন, শাসকগোষ্ঠী প্রতিহিংসার রাজনীতিতে এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে, ন্যূনতম মানবিক বোধটুকুও তারা বিসর্জন দিয়ে দিয়েছে। গণধিকৃত সরকারের চরম রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার জাকির হোসেন মিলনের মৃত্যু বর্তমান নিষ্ঠুর শাসনের ধারাবাহিকতা। তিনি মিলনের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা, শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। বিকালে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ বলেন, রিমান্ডে পুলিশি নির্যাতনেই মিলনকে মৃত্যুর দরজায় পৌঁছে দেয়া হয়েছে। বিএনপিসহ বিরোধী দলের নেতৃস্থানীয় নেতাদের টার্গেট করে এভাবে হত্যা, নির্যাতন ও নিপীড়নে মেতে উঠেছে সরকার। সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে মৃত্যু পরোয়ানার হুকুম দিয়ে মাঠে নামিয়ে দিয়েছে। বেছে বেছে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের তরুণ নেতাদের গ্রেপ্তার করে রিমান্ডের নামে নির্যাতন চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, গণতন্ত্রের জন্য তারুণ্যের দ্রোহকে মাটিচাপা দিতেই ক্রসফায়ারের পাশাপাশি এখন রিমান্ডের নামে মেরে ফেলার সিরিয়াল শুরু হলো। স্বেচ্ছাসেবক দল সভাপতি শফিউল বারী বাবু, ছাত্রদল সভাপতি রাজিব আহসান, ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদল সভাপতি মিজানুর রহমান রাজসহ তরুণ নেতাদেরকে রিমান্ডের পর রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন চালানো হচ্ছে। এখন তাদের শারীরিক অবস্থা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। আলাদা শোকবার্তায় ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মামুনুর রশিদ মামুন ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকার এখন জেলেও ছাত্রদল নেতাকর্মীদেরকে হত্যার উল্লাসে মেতে উঠেছে। রিমান্ডে নিয়ে মিলনকে যেভাবে মেরে ফেলা হলো তা কোনো সভ্য দেশের মানুষের কাজ হতে পারে না। আইনকে এখন বিরোধী নেতাকর্মীদেরকে হত্যার জন্য ব?্যবহার করা হচ্ছে। এসব বর্বরোচিত ঘটনার বিচার একদিন নিশ্চয়ই হবে। যারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। এই দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে অপরাধের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হবে। যুবদল সভাপতি সাইফুল আলম নীরব ও সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এক বিবৃতিতে গোয়েন্দা পুলিশ কর্তৃক রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনের মাধ্যমে জাকির হোসেন মিলন হত্যার বিচার চেয়েছেন। তারা বলেছেন, যারা আজ এসব অবৈধ কাজের নির্দেশ দিচ্ছে আর যারা অতি উৎসাহে এ  দায়িত্ব পালন করছেন মানবতাবিরোধী অপরাধী কর্মকাণ্ডের জন্য অচিরেই তাদের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর