ঢাকা, ১৯ জুন ২০১৮, মঙ্গলবার

ফিরে দেখা

স্পোর্টস ডেস্ক | ৯ জুন ২০১৮, শনিবার, ৯:০৪


১৯০৪ সালের ২১শে মে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে প্রতিষ্ঠিত হয় ফেডারেল ইন্টারন্যাশনাল দে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (ফিফা)। কিন্তু বৈশ্বিক একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে তাদের সময় লাগে ২৬ বছর। ১৯২১ সালে ফ্রান্সের সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলে রিমে ফিফা’র তৃতীয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। অলিম্পিকে বিভিন্ন দেশের ফুটবলের দারুণ সাফল্যে উজ্জীবিত হয়ে ওঠেন জুলে রিমে। দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই তিনি আলাদা একটি বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট আয়োজন করার চিন্তা-ভাবনা করেন। আর এরই ফলস্বরূপ ১৯৩০ সালে ফিফা প্রথম বিশ্বকাপের আয়োজন করে উরুগুয়েতে। সেবার প্রতিবেশী আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে বিশ্বকাপের প্রথম শিরোপা জিতে নেয় স্বাগতিক উরুগুয়ে। এরপর প্রতি ৪ বছর অন্তর এই আসর নিয়মিত বসছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। কখনো আমেরিকায়, কখনো ইউরোপে, কখনো আফ্রিকায় আবার কখনো এশিয়ায়। দরজায় কড়া নাড়ছে বিশ্বকাপের আরেকটি আসর। রাশিয়ায় বসতে যাচ্ছে ফুটবল এই মহাযজ্ঞ। আগের প্রতিযোগিতাগুলো কেমন ছিল- ফুটবল উৎসবের বাণে ভেসে যাওয়ার আগে ইতিহাসের পাতায় একটু চোখ বুলিয়ে নেয়া যাক-
১৯৯৪ বিশ্বকাপ: যুক্তরাষ্ট্র
চ্যাম্পিয়ন: ব্রাজিল, রানার্স আপ: ইতালি
১৯৯৪ বিশ্বকাপের আয়োজক ছিল যুক্তরাষ্ট্র। অনেক ঘটনা, দুর্ঘটনা ও নাটকীয়তার সঙ্গী এ আসর। আর্জেন্টাইন লিজেন্ড দিয়াগো ম্যারাডোনাকে ডোপিংয়ের অভিযোগে বাদ দেয়ায় আরো বেশি আলোচনা-সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপ। ফুটবল মহাযজ্ঞের ১৫তম আসরের শিরোপা জিতেছিল ব্রাজিল। ইতালির বিপক্ষে টাইব্রেকারে ৩-২ গোলের জয়ে চতুর্থ বিশ্বকাপ জেতে সেলেকাওরা। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ে গোলশূন্য ড্রয়ের পর টাইব্রেকারে ইতালিকে হারায় ব্রাজিল। সেবারই প্রথম কোনো ফাইনাল নিষ্পত্তি হয়েছিল পেনাল্টি শুট-আউটে।
গ্রিস, নাইজেরিয়া ও সৌদি আরব প্রথমবার সুযোগ পায় বিশ্বকাপে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর রাশিয়াও প্রথমবার নামে ফুটবল মহাযজ্ঞে।
আগের বিশ্বকাপের ফরম্যাটেই হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আসর। ২৪ দল ছয় গ্রুপে ভাগ হয়ে খেলেছে একে অন্যের বিপক্ষে। প্রত্যেক গ্রুপে থাকা চার দল থেকে সেরা দুই দল নিশ্চিত করে নকআউট রাউন্ড। তাদের সঙ্গে তৃতীয় স্থানে পয়েন্টের দিক থেকে এগিয়ে থাকা চার দল সঙ্গী হয়েছে। ছয় গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন, রানার্স-আপ মিলিয়ে ১২ দল ও সেরা তৃতীয় হিসেবে ৪ দল নিয়ে শুরু হয় শেষ ষোলো।
গ্রুপ পর্বেই নড়েচড়ে বসে ফুটবল বিশ্ব। ডোপ টেস্টে ‘পজিটিভ’ হওয়ায় ‘ডি’ গ্রুপের শেষ ম্যাচের আগে নিষিদ্ধ হন দিয়াগো ম্যারাডোনা। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের ‘হিরো’কে ছাড়া নকআউট পর্বে উঠলেও আলবিসেলেস্তেরা বিদায় নেয় শেষ ষোলো থেকেই। বুলগেরিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচের ছয় ঘণ্টা আগে ম্যারাডোনার নিষেধাজ্ঞার খবর দেয় ফিফা। ওই ম্যাচটি লাতিন দলটি হারে ০-২ গোলে।
‘এ’ গ্রুপ থেকে তিন দল জায়গা পায় শেষ ষোলোতে। রোমানিয়া ও সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে ‘বেস্ট থ্রি’ হিসেবে যায় স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র। ‘বি’ গ্রুপ থেকে পরের রাউন্ডে যায় দুই দল- ব্রাজিল ও সুইডেন। ‘সি’ গ্রুপ থেকেও যায় দুই দল- জার্মানি ও স্পেন। ‘ডি’ গ্রুপ থেকে আসে নাইজেরিয়া, বুলগেরিয়া ও আর্জেন্টিনা। ‘ই’ গ্রুপ থেকে তিন দল- মেক্সিকো ও আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে তৃতীয় দল হিসেবে সুযোগ পায় ইতালি। ‘এফ’ গ্রুপ থেকে শেষ ষোলোতে জায়গা পায় নেদারল্যান্ডস, সৌদি আরব ও বেলজিয়াম। শেষ ষোলোতেই শেষ হয়ে যায় আগের বিশ্বকাপের রানার্স-আপ আর্জেন্টিনার দৌড়। ম্যারাডোনাবিহীন লাতিন দলটি ৩-২ গোলে হারে রোমানিয়ার বিপক্ষে। স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রকে ১-০ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে নাম লেখায় ব্রাজিল। জার্মানি ৩-২ গোলে বেলজিয়ামকে, সুইডেন ৩-১ গোলে সৌদি আরবকে, ইতালি ২-১ গোলে নাইজেরিয়াকে, নেদারল্যান্ডস ২-০ গোলে আয়ারল্যান্ডকে ও স্পেন ৩-০ গোলে হারায় সুইজারল্যান্ডকে। আর বুলগেরিয়ার টাইব্রেকারে ৩-১ (১-১) গোলে হারায় মেক্সিকোকে।
রবার্তো ব্যাজিও’র দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে ইতালি ২-১ গোলে স্পেনকে হারিয়ে সেমিফাইনালে ইতালি। রোমারিও, বেবেতো ও ব্রাঙ্কোর গোলে ব্রাজিল ৩-২ গোলে হারায় নেদারল্যান্ডসকে। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় করে দেয় বুলগেরিয়া ২-১ গোলের জয়ে। লোথার ম্যাথিউসের ৪৭ মিনিটের পেনাল্টি গোলে জার্মানরা এগিয়ে গেলেও ৭৫ মিনিটে স্টইচকভ ও ৭৮ মিনিটে জর্ডান লেচকভের লক্ষ্যভেদে সেমিতে ওঠে বুলগেরিয়া। রোমারিয়া-সুইডেন ম্যাচটি নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ে ২-২ গোলে ড্র থাকায় টাইব্রেকারে ৫-৪ গোলের জয় পায় সুইডেন। সেমিফাইনালেও চলেছে ব্যাজিও-জাদু। ২১ ও ২৫ মিনিটে তার দুর্দান্ত দুই গোলে ইতালি ২-১ ব্যবধানে হারায় যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে আলো ছড়ানো বুলগেরিয়াকে। অন্য সেমিফাইনালে ব্রাজিলের জয়ের নায়ক রোমারিও। রোজ বোল স্টেডিয়ামে ৯৪ হাজার দর্শকের সামনে চতুর্থ বিশ্বকাপ উদযাপন করে ব্রাজিল। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত ব্রাজিল ও ইতালি কোনো দলই গোল করতে পারেনি। ফল নিষ্পত্তির জন্য ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে, সেখানে ৩-২ গোলের জয়ে বিশ্ব জয়ের উল্লাসে মাতে সাম্বার দেশ।
১৯৯৮ বিশ্বকাপ: ফ্রান্স
চাম্পিয়ন: ফ্রান্স, রানার্স আপ: ব্রাজিল
ফিফা’র প্রতিষ্ঠাতা ফ্রান্স। ফিফা বিশ্বকাপের স্বপ্নদ্রষ্টা জুলেরিমে ছিলেন এই ফ্রান্সের অধিবাসী। কিন্তু যাদের হাতে বিশ্বকাপ সৃষ্টি তারাই এতোদিন ছিল ট্রফিশূন্য। অবশেষে বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার ৬৮ বছর পর অধরা শিরোপা ছুঁয়ে দেখে তারা। ফাইনালে হারায় বিশ্বের সবচেয়ে প্রতাপশালী ফুটবল দল ব্রাজিলকে। ১৯৩৮ সালের আয়োজনের ৬০ বছর পর ১৯৯৮ সালে আবারো বিশ্বকাপের আয়োজক ফ্রান্স। জিনেদিন জিদানের হাত ধরে আয়োজক হয়েই প্রথম শিরোপা জিতে ফরাসিরা।
১৯৯৮ সালেই প্রথম বিশ্বকাপের দল ২৪ থেকে বাড়িয়ে করা হয় ৩২টি। আট দল বাড়িয়ে ১৯৯৮ থেকেই বিশ্বকাপকে আরো বড় আসরে রূপান্তর করলো ফিফা। এশিয়া, আফ্রিকা এবং ওশেনিয়া অঞ্চল থেকে আরো বেশি দেশ বিশ্বকাপে অংশ নেয়ার সুযোগ পেলো। এবারই প্রথম বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেলো ক্রোয়েশিয়া, জ্যামাইকা, জাপান এবং দক্ষিণ আফ্রিকা।
বিশ্বকাপে গোল্ডেন গোলেরও সূচনা এই বিশ্বকাপ থেকে। বিশ্বকাপে প্রথম গোল্ডেন গোল করেন লরাঁ ব্লাঁ। দ্বিতীয় রাউন্ডে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ১১৩ মিনিটে গোল্ডেন গোল করে জেতান ফ্রান্সকে। এই বিশ্বকাপেই প্রথম ড্র অনুষ্ঠিত হয় কোনো স্টেডিয়ামে। ফ্রান্সের স্টেডে ডি মার্সেইয়ে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্বকাপের ড্র।
আবার কোনো কারণে মোট কত মিনিট খেলা বন্ধ থাকলো, তা ইলেকট্রনিক বোর্ডে দেখানোর নিয়ম করা হয় এ বিশ্বকাপ থেকেই। ফাইনালের আগে সামান্য বিতর্কও সৃষ্টি হয়েছিল। ফাইনালের সেরা একাদশে কে কে খেলবেন, সে তালিকা মিডিয়াকে একদিন আগে দিয়েছিল ব্রাজিল। ওই তালিকায় নাম ছিল না রোনালদোর; কিন্তু ফাইনালে খেলানো হয় তাকে। তবে শেষ পর্যন্ত জিনেদিন জিদানের অসাধারণ নৈপুণ্যে ব্রাজিলকে ৩-০ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি জয় করে নেয় ফ্রান্স। সে সঙ্গে ৭ম দেশ হিসেবে ট্রফি জিতলো তারা।
অংশগ্রহণকারী ৩২ দলকে ভাগ করা হয় ৮ গ্রুপে। প্রতি গ্রুপ থেকে সেরা দুটি দল নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়, ১৬ দলের দ্বিতীয় রাউন্ড। বিশ্বকাপে সবচেয়ে চমক সৃষ্টিকারী দল ছিল ক্রোয়েশিয়া। যুগোস্লাভিয়া ভেঙে বিশ্বকাপে প্রথমবার খেলতে এসেই সেমিফাইনালে চলে যায় দলটি।
ক্রোয়েশিয়ার স্ট্রাইকার ডেভর সুকার সর্বোচ্চ ৬ গোল করে জেতেন গোল্ডেন বুটের পুরস্কার। ফাইনালে একেবারে ফ্লপ হলেও টুর্নামেন্টসেরা গোল্ডেন বলের পুরস্কার জেতেন ব্রাজিলের রোনালদো। ফেভারিট হয়ে বিশ্বকাপে এসে আবারো ব্যর্থ স্পেন। নাইজেরিয়ার কাছে প্রথম ম্যাচেই ৩-২ গোলে হেরে স্পেনের বিশ্বকাপ যাত্রায় বাধা শুরু। এরপর প্যারাগুয়ের সঙ্গে ড্র এবং বুলগেরিয়াকে ৬-১ গোলে হারালেও প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায় নিতে হয় তাদের।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।