ঢাকা, ২১ জুলাই ২০১৮, শনিবার

বিশ্বকাপবিহীন কিংবদন্তীরা

পিয়াস সরকার | ৪ জুলাই ২০১৮, বুধবার, ১০:১৪

চায়ের দোকান থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম -- সর্বত্র এখন আলোচনার প্রসঙ্গ একটাই। বিশ্বকাপ ফুটবল। এই মহাযজ্ঞের পর্দা উঠেছে ১৪ই জুন, রাশিয়ায়। প্রথম রাউন্ডে বিদায় নিয়েছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন জার্মানি। আবার দ্বিতীয় রাউন্ডে ফ্রান্সের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছে মেসির আর্জেন্টিনা ও রোনালদোর পর্তুগাল। সবমিলিয়ে জমজমাট ফুটবল যজ্ঞে মজে আছে বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবল প্রেমী। কোন দল হাসবে শেষ হাসি? কার ঘরে উঠবে শিরোপা? তা নিয়ে জল্পনা কল্পনার শেষ নেই। আবার এবারের আসরে জ্বলে উঠেছেন সমসাময়িক আরও ক’জন প্রতিভাবান। ইংল্যান্ড ক্যাপ্টেন হ্যারি কেইন, বেলজিয়াম রমেলু লুকাকু, ফ্রান্সের এমবাপ্পে বিশ্বকাপের মঞ্চে আলো ছড়াচ্ছেন। ইতিহাসের অংশ হওয়ার এই স্বপ্নযাত্রায় সব তারকারই স্বপ্ন একটাই। বিশ্বকাপটা উঁচিয়ে ধরা। কিন্তু তাদের সবার হাতে বিশ্বকাপ উঠবে না। ফুটবল মাঠে কারিশমা ছড়ানো মেসি, রোনালদো কিংবা নেইমারের ক্যারিয়ার বিশ্বকাপবিহীন থাকলে যেমন হবে বেমানান, ঠিক তেমনি ফুটবল ইতিহাসের পাতায় অনেক কিংবদন্তী তারকা আছেন, যাদের ক্যারিয়ার অপূর্ণ থেকেছে বিশ্বকাপ না ছুঁতে পারার বেদনায়।


ফেরেন্স পুসকাস (হাঙ্গেরি)


১৯৪৫ সালে জাতীয় দলে অভিষেক মেজর ফেরেন্স পুুসকাসের। ১৯৫৪’র পঞ্চম বিশ্বকাপে পশ্চিম জার্মানির কাছে হারাতে হয় বিশ্বসেরার খেতাব। অধরা স্বপ্নের বিশ্বকাপে সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন তিনি। হাঙ্গেরির হয়ে ৮৫ টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ৮৪ গোল করে অমর হয়ে রয়েছেন হাঙ্গেরির সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে। ফিফা ২০০৯ সাল থেকে চালু করে ফিফা পুসকাস অ্যাওয়ার্ড। এই পুরস্কার দেয়া হয় ফিফা বর্ষসেরা গোলের জন্য।
 



ইউসেবিও (পর্তুগাল)

ইউসেবিও ফেরেইরাকে বলা হয় গত শতাব্দীর সেরাদের মাঝে একজন। পেলের তালিকাকৃত একশো জীবন্ত কিংবদন্তীর তালিকায় ঠায় পেয়েছেন তিনি। ১৯৬৬, বিশ্বকাপের অষ্টম আসর। পর্তুগীজরা শুভ সূচনা করে হাঙ্গেরিকে ৩-০ গোলে হারিয়ে। পরের খেলায় ব্রাজিলকে ৩-১ গোলে হারানোর ম্যাচে করেন দুই গোল। সেমিফাইনালে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পরে তারা। তার খেলা একমাত্র বিশ্বকাপে ৬ ম্যাচে করেন ৯ গোল।




আলফ্রেড ডি স্টিফানো (আর্জেন্টিনা, স্পেন)

আলফ্রেড ডি স্টিফানোকে ধরা হয় সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে। এই রিয়াল মাদ্রিদ তারকা ফরোয়ার্ডের খেলা হয়নি কোন বিশ্বকাপ। ১৯৫৩ থেকে ১৯৬৪ পর্যন্ত রিয়ালের হয়ে খেলা ২৮২টি ম্যাচে করেন ২১৯টি গোল। ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা খেলেনি বিশ্বকাপে। ১৯৫৪’র বিশ্বকাপে স্কোয়াডে দলভুক্ত হতে ব্যর্থ হন তিনি। ১৯৫৬ সালে ডি স্টিফানো স্পেনের নাগরিকত্ব লাভ করেন। অভাগা যেদিকে যায় সাগর শুকিয়ে যায়। ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হয় স্পেন। ১৯৬২’র বিশ্বকাপে ভাগ্যদেবী মুখ ফিরিয়ে নেন তার উপর থেকে, ইনজুরি ছিটকে দেয় তাকে।
 


লেভ ইয়াসিন (রাশিয়া)
 

বিশ্বকাপের সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কারের নাম একটা সময় ছিল ‘লেভ ইয়াসিন ট্রফি’। সোভিয়েত ইউনিয়নের হয়ে তিনি খেলেন ৭৪টি ম্যাচ। এই সময় তিনি ঠেকান প্রায় দেড় শতাধিক পেনাল্টি ও ২৭০টি ক্লিনশীট। ১৯৫৮, ৬২, ৬৬ ও ৭০ এই চার বিশ্বকাপেই খেলেন ইয়াসিন। অলিম্পিক স্বর্ণ, ইউরো জিতেছেন তিনি। কিন্তু হায় বিশ্বকাপটাই অধরা রয়ে গেল তার ক্যারিয়ারে।







সান্দোর ককসিস (হাঙ্গেরি)
 

গোল ম্যাশিন, সান্দোর ককসিস ৬৮ ম্যাচ খেলে করেছেন ৭৫ গোল। তার সৌভাগ্য হয়েছিল একবারই বিশ্বকাপে খেলার। ১৯৫৪ সালে পঞ্চম বিশ্বকাপে ৫ ম্যাচে ১১ গোল করে করেন বিশ্বকাপের তৎকালীন সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড। ককসিস হাতে নিতে পারেননি বিশ্বকাপ ট্রফি। ১৯৭৯ সালে স্পেনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ককসিস।







ইয়োহান ক্রুইফ  (নেদারল্যান্ড)  
 

টোটাল ফুটবলের জনক নেদারল্যান্ডের ফুটবলার ইয়োহান ক্রুইফ। এই মিডফিল্ডার আয়াক্স অ্যামস্টারডাম ও বার্সেলোনা সহ বেশ কিছু স্বনামধন্য ক্লাবে সফলতার সঙ্গে পার করেছেন ২০ বছরের ফুটবল ক্যারিয়ার। ১৯৬৬-৭৭ সাল পর্যন্ত নেদারল্যান্ডের জার্সিতে ৪৮ ম্যাচে করেন ৩৩ গোল। তার মুকুটে পালক হিসাবে শোভা পাচ্ছে তিনটি ১৯৭১,৭৩ ও ৭৪’র ব্যালন ডি অর, ইউরোপিয়ান গোল্ডেন সুসহ বেশ কিছু অ্যাওয়ার্ড। তিনি খেলেন ১৯৭৪ ও ১৯৭৮’র বিশ্বকাপ। এই দুই বিশ্বকাপেই নেদারল্যান্ড অর্জন করে দ্বিতীয় স্থান, এটিই তাদের সর্ব্বোচ্চ সফলতা। দুই বিশ্বকাপ নিয়ে যায় পশ্চিম জার্মানি ও আর্জেন্টিনা।

জর্জ বেস্ট (নর্দান আয়ারল্যান্ড)

‘ব্যাড বয়’ খ্যাত নর্দান আয়ারল্যান্ডের ফুটবলার জর্জ বেস্ট। খোলোয়াড়ি জীবনে বেশ কিছু উক্তির জন্যও তিনি বিখ্যাত। ‘১৯৬৯ সালে আমি ২০ মিনিটের জন্য নারী ও অ্যালকোহল ছেড়ে দেবার সিধান্ত নিয়েছিলাম। এটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ ২০ মিনিট।’ এছাড়াও আরেক মন্তব্য করে তিনি সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন, ‘আমি ইদানীং অনেক কিছু মিস করতে শুরু করেছি; মিস কানাডা, মিস ইউনাইটেড কিংডম, মিস ইউনিভার্স।’ এই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড তারকার খেলা হয়নি কোন বিশ্বকাপ কারণ তার সময় নর্দান আয়ারল্যান্ড ১৯৬৬,৭০,৭৪ বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়।
 
এরিক ক্যানটোনা (ফ্রান্স)

ফ্রান্সের এই ফরোয়ার্ডের ক্লাবের হয়ে খেলা ৩৬৯ ম্যাচে আছে ১৩১ টি গোল। আবার ফ্রান্সের জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন ৪৫ ম্যাচ, বিপক্ষ দলের জালে বল জড়িয়েছেন ২০ বার। তিনি ছয় বছর সফলতার সঙ্গে খেলেছেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে। এই ইংলিশ ক্লাবের হয়ে ১৪৩ ম্যচে করেছেন ৬৪ গোল। ১৯৯০ বিশ্বকাপের আগে ক্যানটোনা টেলিভিশন সাক্ষাতকারে ম্যানেজারকে ‘ব্যাগ অব শিট’ বলে মন্তব্য করেন। ফলে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে জাতীয় দলের বাহিরে থাকতে হয়। যদিও সে বিশ্বকাপে ফ্রান্স মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হয়। আবার জাতীয় দলে ফিরলেও ১৯৯৪ যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপেও ফ্রান্স মূল পর্বে খেলার টিকিট কাটতে ব্যর্থ হয়। ১৯৯৫ সালে ক্যানটোনা অবসরে যান। আর ১৯৯৮ সালে ঘরের মাঠের বিশ্বকাপ জিতে নিতে সক্ষম হয় ফ্রান্স। তিনি ২০০৪ সালে ইউরো এবং ২০০৬ বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে সমর্থন না যুগিয়ে ইংল্যান্ডকে সমর্থন যুগিয়েও পড়েছিলেন সমালোচনার মুখে।

মিশেল প্লাতিনি (ফ্রান্স)

ইউএফএ’র বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিশেল প্লাতিনি। এই রেকর্ড বয়ের হাত পড়েনি বিশ্বকাপ ট্রফিতে। ১৯৮৪ সালের ইউরো কাপে করেন সর্বাধিক গোল (৯ গোল)। প্লাতিনি এখন পর্যন্ত ধরে রেখেছেন মিডফিল্ডারদের সর্বাধিক গোলের রেকর্ড। ক্লাবের হয়ে খেলা ৫৮০ ম্যাচে জালে বল জড়ান ৩১২ বার। এর মধ্যে ৪৩২ লীগের ম্যাচে করেছেন ২২৪ গোল। ৭৯ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে প্লাতিনি করেন ৪১ গোল। যা ২০ বছর রেকর্ডবুকে অক্ষত ছিল। তবে বর্তমান রেকর্ডধারী সর্বাধিক গোলদাতা থিয়েরি অরি ৫১ গোল করতে খেলেন ১২৩ ম্যাচ। এই রেকর্ডবয় খেলেন ১৯৮২ ও ৮৬’র বিশ্বকাপ। দুই বিশ্বকাপ মঞ্চে প্লাতিনির দলকে সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নিতে হয়।

জিকো (ব্রাজিল)
হলুদ জার্সিতে ৭১ ম্যাচে ৪৮ গোল। ব্রাজিলের হয়ে চতুর্থ সর্বোচ্চ গোলদাতা জিকো যার পুরা নাম আর্থার আন্তুনেস কোইমব্রা। পেলের দেশের আরেক যাদুকর জিকোকে সাদা পেলে বলেও ডাকা হত। ব্রাজিলের হয়ে ক্ষুরধার এই মিডফিল্ডার খেলেন ১৯৭৮, ৮২, ও ৮৬’র বিশ্বকাপ। ব্রাজিল এই তিন বিশ্বমঞ্চে ১৯৭৮ সালে তৃতীয়, ৮২ ও ৮৬ সালে হয় পঞ্চম। এই তিন আসরে শিরোপার শিরোমণি ওয়ার্ল্ড কাপ উইনার হয় ১৯৭৮ ও ৮৬ সালে আর্জেন্টিনা এবং ১৯৮২ সালে ইতালি। সেলেকাওদের স্বর্ণালী দিনের টগবগে এই ফুটবলারের হাতে নেবার সৌভাগ্য হয়নি বিশ্বমঞ্চের শ্রেষ্ঠত্বের ট্রফি। জিকো বর্তমানে পা দিয়েছেন ৬৫ বছরে। তিনি ২০১৪ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ভারতের এফসি গোয়া ফুটবল দলের ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেন।

                                                                                                                       সক্রেটিস (ব্রাজিল)
সক্রেটিস খেলেছেন ১৯৮২ ও ৮৬’র
বিশ্বকাপ। এই দুই বিশ্বকাপ নিয়ে যায় ইতালি ও আর্জেন্টিনা। তিনি এই দুই আসরে ১০ ম্যাচ খেলে করেছেন ৪ গোল। ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত হলুদ জার্সিতে খেলেছেন ৬০ ম্যাচ, করেছেন ২২ গোল। তার ক্লাব ক্যারিয়ারে রয়েছে ২৯২ গোল; ৬৪০ ম্যাচে। ৬.৩ ফুট উচ্চতার এই তুখোড় মিডফিল্ডারের হাতে নেয়া হয়নি বিশ্বসেরার ট্রফি। এই অপূর্ণতা নিয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ২০১১ সালে।  

মার্কো ফন বাস্তেন (নেদারল্যান্ড)

নেদারল্যান্ড দলের সাবেক কুশলী স্ট্রাইকার বাস্তেনের রয়েছে ক্লাব ও জাতীয় দলের জার্সিতে  ২৫৫ গোল, ৩৫৩ ম্যাচে। তার মুকুটে রয়েছে ১৯৮৮, ৮৯ এবং ৯২’র ইউরোপিয়াান ফুটবলার অফ দ্যা ইয়ার অ্যাওয়ার্ড। ১৯৯২ সালে ওয়ার্ল্ড ফুটবলার অব দ্যা ইয়ার এবং ফ্রান্স ফুটবল ম্যাগাজিনের জরিপে শতাব্দীর সেরা ফুটবলারের তালিকায় স্থান করে নেন অষ্টম স্থানে। এই রেকর্ড বয় বাস্তেনের বিশ্বমঞ্চের এক আসরে খেলার সুযোগ হয়েছিল। ১৯৯০ বিশ্বকাপে গোলের দেখা পাননি তিনি। এই মিলান তারকা ২০০৪ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত নেদারল্যান্ড দলের ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেন আবার ওলন্দাজদেরই সহকারী ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেন ২০১৫-১৬ সালে।
 
                                                                                                                      পাওলো মালদিনি (ইতালি)
ইতালি ১৯৮২ সালের তৃতীয় বিশ্বকাপ
অর্জনের পর দীর্ঘ ২৪ বছর পর চতুর্থ বিশ্বকাপ জেতে ২০০৬ সালে। ইতালির এই দুঃসময়ের তারকা খেলোয়াড় মালদিনি। তিনি সকলের থেকে আলাদা কারণ তার ডিফেন্ডিং কৌশল। এই ডিফেন্ডার সবসময় প্রতিপক্ষের মন পড়ার চেষ্টা করতেন। তিনি সরাসরি ডিফেন্স না করে দক্ষতার সঙ্গে প্রতিহত করতেন আক্রমণ। ১৯৮৫ সাল থেকে ২০০৯ পর্যন্ত খেলা এই এসি মিলান তারকার গড় ট্যাকেল দুই ম্যাচে মাত্র একটি। এই তারকা ফুটবলার নীল জার্সিতে বিশ্বমঞ্চে খেলেন ১৯৯০, ১৯৯৪, ১৯৯৮ ও ২০০২ সালের চারটি বিশ্বকাপ।

রবার্তো ব্যাজ্জিও (ইতালি)

১৯৯৪ সালের ইউএসএ বিশ্বকাপ, সেবার ফুটবল বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথমবার ফাইনালে টাইব্রেকারে খেলা গড়ায়। ৩-২ ব্যবধানে ব্রাজিল অর্জন করে চতুর্থ বারের মত বিশ্ব সেরার মুকুট। ইতালির স্ট্রাইকার রবার্তো ব্যাজ্জিওর পুরো আসর জুড়ে দুর্দান্ত খেলে ৭ ম্যাচে করেন ৫ গোল। পুরো উপন্যাসের নায়ক এক শটে হয়ে গেলেন খল নায়ক, ট্রাইব্রেকে মিস করলেন পেনাল্টি। ইতালি বিশ্বকাপ ১৯৯০। স্বাগতিক এই তারকা করেন ৫ ম্যাচে ২ গোল, সেবার ইতালিকে তৃতীয় স্থান নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। ১৯৯৮ সালে ফ্রান্স ওয়ার্ল্ড কাপে কোয়ার্টার ফাইনালে শেষ হয়ে যায় ইতালির সেরা হবার মিশন। তার খেলা তৃতীয় এবং শেষ বিশ্বকাপে করেন ৪ ম্যাচে ২ গোল। এই তারকা দেশের হয়ে ৫৬ ম্যাচে করেছেন ২৭ গোল। আবার নিজ দেশের ক্লাব জুভেন্টাসের হয়ে খেলেন দীর্ঘদিন। আজ্জুরিরা চারবার বিশ্বকাপ জিতলেও ব্যাজ্জিও হাতে তুলতে পারেননি বিশ্বসেরার ট্রফি। নীল শিবিরের হয়ে কাপ জয় না হলেও তার ব্যক্তিগত ডায়েরী কানায় কানায় পূর্ণ। ১৯৯৩ সালে ব্যালন ডি’অর এবং ১৯৯৪ সালে অর্জন করেন সিলভার বুট। তবে নীল শিবিরের সমর্থকদের এবারের বিশ্বকাপ নীল বিষের মতই কাটবে তা বলা বাহুল্য। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালি কাটতে ব্যর্থ হয়েছে রাশিয়ার টিকিট।

                                                                                                                    

  ডেভিড বেকহাম (ইংল্যান্ড)

ইংলিশ তারকা ফুটবলার ডেভিড বেকহাম। তা
র ক্যারিয়ার কাণায় কাণায় পূর্ণ। সব ধরণের অর্জন আছে তার ঝুলিতে। তবে নেই শুধু বিশ্বচ্যাম্পিয়নের খেতাব। পেলের সেরা ১০০ খেলোয়াড়ের তালিকায় রয়েছে তার নাম। এছাড়াও ইংলিশ ফুটবল হল অফ ফ্রেম (২০০৮), ইএসপিওয়াই সেরা পুরুষ ফুটবল খেলোয়াড় (২০০৪), বিবিসি সেরা ক্রীড়া ব্যাক্তিত্ব (২০০১), ফিফার বর্ষসেরা খেলোয়াড় (১৯৯৯ ও ২০০১)-২য় স্থান, ইউরোপের বর্ষসেরা খেলোয়াড় (১৯৯৯)-২য় স্থান, উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লীগ সেরা খেলোয়াড় (১৯৯৮-১৯৯৯), পিএফএ সেরা তরুণ খেলোয়াড় (১৯৯৭) ইত্যাদি খেতাব আছে তার ঝুলিতে। ১৯৯২ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত খেলেছেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, রিয়াল মাদ্রিদ, এসি মিলান, পিএসজিসহ বেশ কিছু ক্লাবে। ক্লাবে খেলা ৫২৩ ম্যাচে করেছেন ৯৭ গোল। এই মিডফিল্ডার জাতীয় দলের জার্সিতে খেলেছেন ১১৫ ম্যাচ করেছেন ১৭ গোল। তিনি খেলেছেন ১৯৯৮, ২০০২ ও ০৬ বিশ্বকাপ কিন্তু ছুঁয়ে দেখতে পারেননি বিশ্বসেরার ট্রফি।

  জর্জ উইয়া (লাইবেরিয়া)

বর্তমান লাইবেরিয়ার প্রেসিডেন্ট জর্জ উইয়া। বহুমূখী প্রতিভার অধিকারী এই ব্যক্তিটি একসময় ফুটবল মাঠেও ছড়ি ঘুরিয়েছেন। ১৯৯৫ সালে জিতেছেন ব্যালন ডি অর অ্যাওয়ার্ড। ১৯৯৮, ৯৪ ও ৯৫ সালে ছিলেন আফ্রিকান ফুটবলার অব দ্যা ইয়ার এবং ১৯৯৬ সালে খেতাব পান আফ্রিকান প্লেয়ার অব দ্যা সেঞ্চুরি হিসেবে। তিনি স্থান করে নেন ২০০৪ সালে পেলের ঘোষিত সর্বকালের সেরা ১০০ খেলোয়াড়ের তালিকাতেও। উইয়া লাইবেরিয়ার হয়ে ৬০ ম্যাচে করেছেন ২২ গোল। আবার খেলেছেন ম্যানচেস্টার সিটি, এসি মিলান, চেলসি, পিএসজি সহ বেশ কিছু স্বনামধন্য ক্লাবে। এই লাইবেরিয়ান স্ট্রাইকার বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে ১৯৮৫ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ৪১১ ম্যাচে করেছেন ১৯৩ গোল। উইয়ার খেলার সৌভাগ্য হয়নি কোন বিশ্বকাপে, কারণ লাইবেরিয়া এখন পর্যন্ত কোন বিশ্বকাপে খেলতে পারেনি।

                                                                                                                      

   পিটার স্মাইকেল  (ডেনমার্ক)

একটি ফুটবল দলের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থা
কেন একজন গোলরক্ষক। ডাস গোলরক্ষক পিটার স্মাইকেল তার দক্ষতা ও ৬.৩ ফুট উচ্চতাকে কাজে লাগিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করতেন বিপক্ষ দলের বুকে। এই ডাস ত্রাস খেলেছেন শুধুমাত্র ১৯৯৮ এর ফ্রান্স বিশ্বকাপ। ডেনমার্ক ১৯৯২ সালে ইউরো চ্যাম্পিয়ন হলেও অংশ গ্রহণ করার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি ১৯৯০ ও ৯৪ বিশ্বকাপে। পিটার ১৯৯১-৯৯ সাল পর্যন্ত সফলতার সঙ্গে ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে খেলেন। স্মাইকেল ১২৯ ম্যাচ খেলে জাতীয় দল ছাড়েন ২০০১ সালে এবং ফুটবলকে বিদায় বলেন ২০০৩ সালে।

 

লুইস ফিগো (পর্তুগাল)

পর্তুগীজদের বিশ্বকাপের সেরা সফলতা ২০০৬ সালের জার্মান বিশ্বকাপে। সেবার সেমিফাইনাল খেলেছিল পর্তুগীজরা, আর এই সফলতার নায়ক ছিলেন লুইস ফিগো। তার ঝুলিতে রয়েছে ব্যালন ডি অর ও ফিফা প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার অ্যাওয়ার্ড। এই মিডফিল্ডার পর্তুগালের জার্সিতে ১২৭ ম্যাচে করেন ৩২ গোল। ২০০৬ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতি টানেন এই জনপ্রিয় সাবেক বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদ তারকা।


    পল স্কোলাস (ইংল্যান্ড)

ম্যানচেস্টারে জন্ম নেয়া তারকা পল স্কোলাস। মাত্র ১৭ বছর বয়সে নাম লেখান ওল্ড ট্র্যাফোর্ড ক্লাবে। তিন বছর যুবদলে কাটিয়ে ১৯৯৪ সালে অভিষেক ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে। এই ক্লাবে টানা ১৭ বছর কাটান ইংলিশ ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার। ম্যানইউর হয়ে ৬৭৬ ম্যাচে জালে বল জড়ান ১৫০ বার। ১৯৯৮ ও ২০০২ বিশ্ব আসরে খেললেও বিশ্বকাপ জেতার সুখ স্মৃতিতে নিজের এবং দলের নাম লেখাতে ব্যর্থ হন পল স্কোলাস।


জো লুইস চিলাভার্ট (প্যারাগুয়ে)
 

জো লুইস চিলাভার্ট, প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক। এই অতন্দ্র প্রহরী গোলরক্ষক হয়েও করেছেন ৬২টি আন্তর্জাতিক গোল। ১৯৯৮ ও ২০০২ সালে বিশ্বকাপ খেলেন তিনি। অসম্ভব ক্ষিপ্রতা এবং কৌশলের কারণে স্মরণীয় হয়ে রইবেন আজীবন।








  অলিভার কান (জার্মানি)

ইতিহাসের একমাত্র গোলরক্ষক যিনি বিশ্বকাপে অর্জন করেছেন গোল্ডেন বল অ্যাওয়ার্ড, ২০০২ বিশ্বকাপে। ১৯৮৭ সালে শুরু করা ক্যারিয়ার শেষ করেন ২০০৮ সালে। বায়ার্ন মিউনিখ তারকা খেলেন ২০০২ ও ২০০৬ সালের বিশ্বকাপ। ২০০২ জাপানে দ্বিতীয় স্থান দখল করে সন্তুষ্ট থাকতে হয় এই তারকা গোলরক্ষকের দল জার্মানিকে।



রায়ান গিগস (ওয়েলস)

ওয়েলস ফুটবল তারকা রায়ান জোসেফ গিগস। ওয়েলস ফুটবল দলের বর্তমান কোচ এবং তিনি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড দলের সহকারী কোচ হিসাবে দায়িত্বরত ছিলেন। তিনি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডেই কাটিয়েছেন তার পুরো ক্যারিয়ার ১৯৯০ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত। রেড ডেভিলের হয়ে ৬৭২ ম্যাচ খেলে করেন ১১৪ গোল। যা প্রিমিয়ার লীগে নন স্ট্রাইকার হিসেবে বিশ্ব রেকর্ড। তিনি ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৩টি দলগত ট্রফির অধিকারী। তিনি স্বাক্ষী হয়েছেন দশটি প্রিমিয়ার লীগ, চারটি এফএ কাপ, দুটি লীগ কাপ এবং দুটি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ শিরোপার। ওয়েলসের হয়ে সর্বকনিষ্ঠ (১৭ বছর) খেলোয়াড় হিসেবে গিগসের অভিষেক হয় ১৯৯১ সালে। গিগস ১৯৯২ ও ১৯৯৩ সালে দুবার পিএফএ বর্ষসেরা তরুণ খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। মাত্র ১৫ সেকেন্ডে গোল করে রেকর্ডবুকে অক্ষত রয়েছেন গিগস। জাতীয় দলের হয়ে ৬৪ ম্যাচ খেললেও স্পর্শ করা হয়নি সোনার হরিণ সমতুল্য বিশ্বকাপ।

মাইকেল বালাক (জার্মানি)

মাইকেল বালাকের অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, স্বতন্ত্র আড়ম্বরপূর্ণ জীবন এবং নীলাভ চোখে নিশ্চই মন খুইয়েছেন অনেক তরুণী। বিশ্বজুড়ে সমাদৃত জার্মান ফুটবলার মাইকেল বালাক। তিনি অধিনায়ক হিসাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন দলকে। সাদা কালো শিবিরের মধ্যমাঠের মধ্যমণির পাসিং, বল নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ছিল চোখে পড়বার মত। তিনি যেমন পারতেন গোল করতে আবার তার সামর্থ ছিল গোল করানোর। তার সবথেকে সেরা গুণ বিপক্ষ দলের ডিফেন্সকে বোকা বানিয়ে আক্রমণ করা। এসব আকর্ষিক আক্রমণে প্রায়শই পরাস্ত হতে হত বিপক্ষ দলকে। এই পরিপূর্ণ প্যাকেজ ফুটবলারের বিশ্বকাপ অভিষেক হয় ২০০২ সালে। সেবার বিশ্বকাপের আয়োজক ছিল যৌথভাবে জাপান ও কোরিয়া। পরাশক্তি জার্মানরা খেলে ফাইনাল। ছয় ম্যাচ খেলে বালাক নকআউটে যুক্তরাষ্ট্র, সেমিতে কোরিয়ার বিপক্ষে মোট তিনটি গোল করেন। কিন্তু ভাগ্যদেবী মুখ ফিরিয়ে নেয়ায় ফাইনালে তার দল হারে ২-০ ব্যবধানে। পরের বিশ্বকাপ ২০০৬ সালে ঘরের মাঠে। স্বাগতিকদের অধিনায়ক করা হয় বালাককে। গোলের দেখা না পেলেও, সামন থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন দলকে কিন্তু সেবার যাত্রা সেমিফাইনাল পর্যন্তই। জাতীয় দলে এবং চেলসির হয়ে খেলবার সময় তিনি তার পছন্দের জার্সি ১৩ পড়ে খেলতেন। এই সংখ্যাটিকে মানা হয় দুর্ভাগ্যের সংখ্যা। ৬.২ ফুট উচ্চতার এই খেলোয়াড়টি ইনজুরির কবলে আর নামা হয়নি ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে। এভাবেই বিশ্বকাপের স্বাদ না নিয়েই ডাই ম্যানশ্যাফটের অন্যতম পোস্টার বয়ের দুই বিশ্বকাপ খেলেই ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘটে।

ইব্রাহিমোভিচ (সুইডেন)

ইব্রাহিমোভিচ সুইডিশ স্ট্রাইকার। তার মুকুটে রয়েছে অনেক দামী পালক, অস্কার দেল ক্যালসিও। এসি মিলান তারকা হিসেবে তিনি ২০০৮ এবং ২০০৯ সালে লীগের সর্বাধিক গোলদাতার খেতাব অর্জন করেন। এসি মিলানের পাশাপাশি নাম লিখিয়েছেন বার্সেলোনা, পিএসজিতেও। তার বর্তমান দল আমেরিকান ক্লাব লা গ্যালাক্সি। বাই সাইকেল কিকের জন্য তিনি পেয়েছেন ফিফা পুসকাস খেতাব। ২০১৩ সারে দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা তাকে পৃথিবীর তৃতীয় সেরা খোলোয়াড় হিসাবে ঘোষণা দেয়। ২০০৬ সালে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করলেও ছুঁয়ে দেখা হয়নি সেরার খেতাবের স্বাদ।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।