ঢাকা, ১৬ জুলাই ২০১৮, সোমবার

থাই গুহায় উদ্ধারাভিযান: নায়কের মর্যাদায় অস্ট্রেলিয়ান ডাক্তার

মানবজমিন ডেস্ক | ১২ জুলাই ২০১৮, বৃহস্পতিবার, ১০:১৪

প্রতিভার এক বিরল সমাহার অস্ট্রেলিয়ান ডাক্তার রিচার্ড হ্যারিস। থাইল্যান্ডের থাম লুয়াং গুহায় আটকে পড়া একদল বালককে উদ্ধারে অসাধারণ ভূমিকা রেখে তার কপালে জুটেছে নায়কোচিত অভিবাদন। বিশাল দীর্ঘ গুহার প্রায় মাঝে আটকে পড়া ওয়াইল্ড বোয়ার্স দলের ওই ক্ষুদে ফুটবলারদের নিয়ে কয়েকদিন যেন বুঁদ হয়ে ছিল বিশ্ব। প্রায় এক সপ্তাহ নিখোঁজ থাকার পর তাদের অবস্থান যখন শনাক্ত করা সম্ভব হলো, তখন অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডের বাসিন্দা এই ডাক্তার থাইল্যান্ডে ছুটি কাটাতে অবস্থান করছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি দেখে নিজের ছুটি বাদ দিয়ে স্বেচ্ছায় সহায়তার প্রস্তাব দিলেন।
বিবিসি জানিয়েছে, বন্যার পানি ঢুকে ও পাথর পড়ে গুহা প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পানির নিচ দিয়ে সরু পথ দিয়ে সাঁতরে অন্যদের সঙ্গে ডাক্তার হ্যারিসও ঢুকে পড়েন। আটকে পড়া বালকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন তিনি। পাশাপাশি তাদের সঙ্গে কাটান তিন দিন। এমনকি তার নেতৃত্বেই সবচেয়ে দুর্বল বালকদেরকে সবার প্রথমে গুহা থেকে বের করা হয়। এরপর বাকিদেরও সফলভাবে বের করে আনা সম্ভব হয়।
বালকদের বের করার সময় রিচার্ড ছিলেন সবার শেষে। এমনকি গুহা থেকে সবার পরে বের হওয়া দলের মধ্যে ছিলেন তিনি। কিন্তু এত সফল অভিযানের পর যখন সারাবিশ্ব উচ্ছ্বাসে মাতোয়ারা, তখন এক ব্যক্তিগত ট্রাজেডিতে শোকাচ্ছন্ন হতে হয় রিচার্ডকে। উদ্ধারাভিযান শেষের কিছুকাল পরই জানা যায় রিচার্ডের পিতা মারা গেছেন।
রিচার্ড কাজ করেন দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসে। অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা ড. অ্যান্ড্রু পিয়ার্স বলেন, ‘এই পুরো সপ্তাহ ছিল তাদের পরিবারের জন্য ভীষণ উদ্বেগ উৎকণ্ঠার সময়।’ তিনি রিচার্ডের পরিবারের প্রাইভেসির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সকলের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, ‘হ্যারি (রিচার্ডের ডাক নাম) খুব নিভৃতচারী ও দয়াশীল একজন মানুষ। এই উদ্ধারাভিযানে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে তিনি দু’বার ভাবেন নি।’
এই ভীষণ জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধারাভিযানের নেতৃত্বে ছিল বৃটিশ ডুবুরিরা। তারাই ডা. রিচার্ডের বিশেষ দক্ষতার বিষয়টি অনুধাবন করতে পারে। তিনি শুধু ডাক্তারই নন। একজন অভিজ্ঞ ডুবুরী, যিনি এর আগেও পানির নিচে অবস্থিত গুহা থেকে এমন উদ্ধারাভিযানে অংশ নিয়েছেন একাধিকবার।
উদ্ধারাভিযানে সহায়তা করতে তাকে থাই সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে অনুরোধ করা হয় বলে জানিয়েছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলি বিশপ বলেন, ‘তিনি পুরো উদ্ধার প্রচেষ্টার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন।’ তিনি আরও বলেন, গুহায় আটকে পড়াদের উদ্ধারে আগে থেকেই ডাক্তার রিচার্ডের বিশ্বজুড়ে খ্যাতি আছে।
উদ্ধারাভিযানের নেতা স্থানীয় প্রদেশের ভারপ্রাপ্ত গভর্নর নারংসাক অসতানাকর্ন অস্ট্রেলিয়ার নাইন নিউজকে বলেন, ‘অস্ট্রেলিয় সহায়তাকারীরা ভীষণ উপকার করেছে, বিশেষ করে ওই ডাক্তার।’ ডা. হ্যারিস সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘তিনি খুবই দক্ষ। সেরাদের সেরা।’
রিচার্ডের বন্ধু সু ক্রোয়ে বলেন, তিনি খুবই সাদাসিধে ও নিঃস্বার্থ মানুষ। সারাদিন পরিবার নিয়ে থাকেন। ফলে তার শান্ত অবস্থান নিশ্চিতভাবে গুহার ভেতরের শিশুদের স্বস্তি জুগিয়েছে। তিনি বলেন, ‘রিচার্ড শিশুদের সঙ্গে দারুণভাবে খাপ খাইয়ে নেন। শিশুরা সেরা উপায়ে গুহা থেকে প্রস্থানের জন্য প্রস্তুত হওয়ার জন্য যা যা করা দরকার সেটা তিনি করেছেনই। তাদেরকে সহায়তা দেওয়ার জন্য তিনিই ছিলেন সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি।’
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও রিচার্ডের প্রতি মানুষের প্রশংসার ফুলঝুরি। অনেকেই তাকে বর্ষসেরা অস্ট্রেলিয়ান পদকে ভূষিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। এটি হলো অস্ট্রেলিয়ার সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা। সরকারও জানিয়েছে, তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
প্রসঙ্গত, ডাক্তার হলেও রিচার্ড খুব অভিজ্ঞ একজন ডুবুরি। এছাড়া ডুবো চিত্রগ্রাহক। এর আগে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ক্রিসমাস আইল্যান্ড ও চীনে তিনি বেশ কয়েকটি ডুবো অভিযানে অংশ নিয়েছেন। ২০১১ সালে একটি মর্মান্তিক ঘটনায় তাকে নিজের বন্ধু আগনেস মিলোকার মৃতদেহ উদ্ধার করতে হয়েছিল। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার একটি পানির নিচে গুহা ঘুরে দেখার সময় অক্সিজেন শেষ হয়ে যায় তার।
অস্ট্রেলিয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, এছাড়াও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে স্বাস্থ্য সহায়তাকারী দলের সদস্য হিসেবে কাজ করেছিলেন তিনি। এ কারণেও তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে আগে থেকেই ছিলেন পরিচিত মুখ। ভানুয়াতুতে অস্ট্রেলিয়ান ত্রাণ মিশনেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন। জুলি বিশপ বলেন, ‘তিনি অসাধারণ একজন অস্ট্রেলিয়ান। থাইল্যান্ডের উদ্ধারাভিযানে তিনি নিশ্চিতভাবেই বড় পার্থক্য গড়ে দিয়েছিলেন।’ রিচার্ডের সঙ্গে ডুবুরি হিসেবে এই উদ্ধারাভিযানে কাজ করা পার্থের বাসিন্দা ক্রেইগ চ্যালেনেরও প্রশংসা করেন বিশপ। পুরো অভিযানে এই দুইজন ছাড়াও পুলিশ ও নৌ ডুবুরি সহ মোট ২০ জন অস্ট্রেলিয়ানের একটি দল অংশ নেয়।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।


Kamruzzamab

১১ জুলাই ২০১৮, বুধবার, ১০:৫১

Excellent job.

kazi

১১ জুলাই ২০১৮, বুধবার, ১১:২৩

এই ডাক্তার প্রমাণ করলেন মানুষ মানুষের জন্য। পক্ষান্তরে আমাদের দেশের অনেক ডাক্তারের অবহেলায় মানুষ মরে।