ঢাকা, ২৩ জুলাই ২০১৮, সোমবার

রনির পক্ষে সাফাই ভিডিও, রাশেদ বলেছেন জোরপূর্বক

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি | ১২ জুলাই ২০১৮, বৃহস্পতিবার, ১:৪৮

আড়াই মাস আগে ইউনিএইড কোচিং সেন্টারের মালিক মো. রাশেদ মিয়াকে চড়-থাপ্পড় মারার ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার পর সংগঠন থেকে অব্যাহতি নেন চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ স¤পাদক নুরুল আজিম রনি। ওই ঘটনায় দায়ের হওয়া চাঁদাবাজির মামলায় আসামি করা হয় রনিকে।
কিন্তু ১১ জুলাই বুধবার বিকেলে নুরুল আজিম রনির ফেসবুক টাইমলাইনে আপলোড করা হয় এমন এক ভিডিও যেখানে রনির পক্ষে সাফাই স্বীকারোক্তি দিয়েছেন রাশেদ নিজেই। আর এই ভিডিওটিও ভাইরাল হয়ে উঠছে ক্রমেই।
ভিডিও বার্তায় রাশেদ নিজের মুখে স্বীকার করেছেন যে, রনি তার ব্যবসায়িক পার্টনার ছিলেন। রনি তাকে সাড়ে ৯ লাখ টাকা ধার দিয়েছিলেন। এতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পাঁচলাইশ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর কফিল উদ্দিনও রাশেদের সঙ্গে এ বিষয়ে সমঝোতামূলক কথা বলছেন।
তবে এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে রাশেদ মিয়া বলেন, রনির অনুসারিরা এক ছাত্রসহ তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে এই স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য প্রদানে বাধ্য করেছেন। এমনকি রনির বিরুদ্ধে দায়ের করা তার মামলাটি তুলে নেয়া হবে মর্মে তিনটি স্ট্যা¤েপ স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেছেন।
রাশেদ মিয়া বলেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে নগরীর বায়েজিদ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলের সামনে থেকে রনির ৮ থেকে ১০ জন ছেলে চারটি মোটর সাইকেলে এসে এক ছাত্রসহ আমাকে তুলে নিয়ে যায়। প্রথমে মুরাদপুর বাদশাহ কমিউনিটি সেন্টারে পরে সেখান থেকে পাঁচলাইশ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর কফিল উদ্দিনের বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে আমাকে চাপ প্রয়োগ করে ১০০ টাকার তিনটি স্ট্যা¤েপ মামলা প্রত্যাহারের কথা লিখে দিতে বাধ্য করেন। এ সময় আমি ভয়ে কিছু কথা বলি, যেগুলো ভিডিও করে তারা ফেসবুকে প্রচার করছে।
তুলে নেয়া ছেলেদের মধ্যে চারজনকে চিনতে পারার কথা জানান রাশেদ মিয়া। এরা হলেন, নুরুন্নবী সাহেদ, সেলিম, খোরশেদ ও মামুন। ওই সময় রনি না থাকলেও অনুসারিরা কাউন্সিলরের বাসায় তার সঙ্গে রনির মোবাইল ফোনে কথা বলার ব্যবস্থা করে দেন। এ সময় রনি তাকে গালাগাল করে মামলা তুলে নেওয়ার হুমকি দেন।
জোরপূর্বক তুলে নেওয়া, স্ট্যা¤েপ স্বাক্ষর নেওয়া এবং হুমকির বিষয়ে তিনি থানায় কোন ডায়রী বা অভিযোগ করেছেন কি না জানতে চাইলে বুধবার রাতে রাশেদ মিয়া বলেন, এই ব্যাপারে এখনো কোনো আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।
এদিকে কাউন্সিলর কফিল উদ্দিন, রনি ও তার অনুসারীরা বলেছেন, রাশেদ মিয়া স্বেচ্ছায় মামলা তুলে নেয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। তার উপর কেউ চাপ প্রয়োগ করেননি।
অভিযুক্ত নূরুন্নবী সাহেদ বলেন, রাশেদ মিয়া নিজেই আমাদের কাছে সমঝোতার প্রস্তাব দেন। তিনি বলেছিলেন-রনি ভাইয়ের সঙ্গে তিনি আর কোন ঝামেলা চান না। তিনি নিজেই মামলা প্রত্যাহার করে নেবেন। সেই অনুযায়ী তিনি নিজেই আমাদের সঙ্গে প্রথমে বাদশাহ মিয়া কমিউনিটি সেন্টারে এবং পরে কাউন্সিলর কফিল ভাইয়ের বাসায় যান। তাকে তুলে নেওয়ার কথা ডাহা মিথ্যা।
রাশেদের সঙ্গে যাওয়া ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজের বিবিএ প্রথম বর্ষের ছাত্র সোহান বলেন, উনি (রাশেদ মিয়া) আমার শিক্ষক। আমার কাছে সম্মানিত। উনার বিষয়ে আমি কিছু বলব না। তবে এতটুকু বলতে পারি-আমি স্বেচ্ছায় গিয়েছিলাম। কেউ তুলে নিয়ে যায়নি।
কাউন্সিলর কফিল উদ্দিন বলেন- রনির সঙ্গে মামলাসহ সামগ্রিক বিরোধ নিয়ে মধ্যস্থতার জন্য রাশেদ মিয়া নিজেই একজন বিশ্বস্ত কাউকে খুঁজছিলেন। শেষ পর্যন্ত উভয়পক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারা আমার কাছে আসেন। আমি উভয়পক্ষের সঙ্গে কথা বলি। রনির বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার এবং তার সাড়ে নয় লাখ টাকা ফেরত দেয়ার ব্যাপারে রাশেদ সম্মত হন। আমি উভয়পক্ষকে মিলিয়ে দিলে তারা খুশি হয়ে চলে যায়। তবে রনি আমার বাসায় আসেনি।
কাউন্সিলর কফিল উদ্দিন বলেন, রাশেদ আমার বাসায় আসার পর আমি তাকে একান্তে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে তাকে কেউ তুলে এনেছে কি-না? তাকে অভয় দিয়েছিলাম। সে বলেছে-স্বেচ্ছায় এসেছে। আর আমার বাসায় বসে তার কাছ থেকে জোর করে স্ট্যা¤েপ স্বাক্ষর নেয়ার মানুষ আমি কফিল উদ্দিন না।
নূরুল আজিম রনি বলেন, রাশেদ আমার কয়েকজন ঘনিষ্ঠজনকে ফোন করে মামলা তুলে নেবেন বলেছিলেন। সেই ঘনিষ্ঠজনেরাই তাকে তার পছন্দ অনুযায়ী কাউন্সিলর কফিল ভাইয়ের বাসায় নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে যাবার পর আমি বিষয়টি জানতে পারি। সেখান থেকে ফোনে রাশেদ আমাকে নিজেও বলেছেন যে তিনি বিরোধের অবসান চান এবং মামলা প্রত্যাহার করতে চান। এখন আরেক ধরনের কথা বলছেন সম্ভবত যারা তাকে দিয়ে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক মামলা করতে বাধ্য করেছিলেন তাদের ভয়ে।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি ইউনিএইড কোচিং সেন্টারের মালিক রাশেদ মিয়াকে নগরীর জিইসি মোড়ে তার অফিসে নুরুল আজিম রনির চড়-থাপ্পড় মারার একটি ভিডিও ১৯ এপ্রিল ফেসবুকে ভাইরাল হয়। এ ঘটনায় রাশেদ মিয়া নগরীর পাঁচলাইশ থানায় নুরুল আজিম রনির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা করেন। তবে নুরুল আজিম রনি ওই সময় ব্যবসার জন্য ধার দেওয়া টাকা ফেরত না দেওয়ায় মারধরের কথা সাংবাদিকদের বলেন।
ঠিক আড়াই মাস পর নিজের ফেসবুক টাইমলাইনে রনির আপলোড করা ভিডিও বার্তায় রাশেদের সঙ্গে কথোপকথনে শোনা যায়, রনি রাশেদ মিয়ার ব্যবসায়ীক পার্টনার ছিল। রাশেদ রনির কাছ থেকে নগদ সাড়ে নয় লাখ টাকা নিয়েছিল। তবে সেই টাকা দিয়ে ব্যবসা করতে পারেননি রাশেদ। পরে রনি কিছু টাকা ফেরত চান। রাশেদ টাকা দিতে না পারলে পুরো টাকাই ফেরত চান রনি।
কাউন্সিলর কফিল উদ্দিনের বাসায়ও রাশেদের সঙ্গে রনির বিষয়ে কথোপকথনের ভিডিও পাওয়া গেছে রনির টাইমালাইনে।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।