ঢাকা, ১৮ আগস্ট ২০১৮, শনিবার
সামাজিক মাধ্যমে যৌন হয়রানি

রেহাই পাননি কোটা আন্দোলনকারী ছাত্রীরাও

মারুফ কিবরিয়া | ১০ আগস্ট ২০১৮, শুক্রবার, ৮:৩১

বাংলাদেশে সরকারি হিসেবে যে আট কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছেন তার বড় অংশই নারী। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে পুরুষদের তুলনায় নারীদের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য। অনেক নারী বলছেন, তারা যেকোনো মতামত প্রকাশে কিংবা পাবলিক পোস্টে কমেন্টের ক্ষেত্রে নানা বাজে মন্তব্যের শিকার হন। এর ভয়াবহ রূপ লক্ষ্য করা গেছে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও। এমনকি তাদের ছবি শেয়ার করে ইঙ্গিতপূর্ণ স্ট্যাটাস দেয়া হচ্ছে হরহামেশা।

৬ই জুলাই সিলেটের সাব্বির খান নামের এক আওয়ামী লীগ নেতা তার ফেসুবক স্ট্যাটাসে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি উম্মে হাবিবা বেনজির ও সাংবাদিক শামীমা বিনতে রহমানের ছবি পোস্ট করে অশ্লীল মন্তব্য করেন। এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। বিষয়টি নিয়ে পরবর্তীতে অবশ্য মুখ খুললেও তার অবস্থান থেকে সরে আসেননি। দিয়েছেন ভিন্ন ব্যাখ্যা। সাব্বির খান লেখেন, ‘নিউজফিডে উম্মে হাবিবা বেনজির আর শামীমা বিনতে রহমান নামের এই দুই বেবুশ্যের চেহারা দেখতে দেখতে মাথায় রক্ত চড়ে যাচ্ছে; ইচ্ছে হচ্ছে, ফিরে যাই ৮০র দশকের ছাত্রলীগের সেই জীবনে। প্রিয় বর্তমান প্রজন্মের উত্তরাধিকার, তোমাদের দায়িত্ব তোমরা পালন কর প্লিজ! পেন্ডিং কাজটা দু’এক দিনের ভেতর শেষ কর!! হাফ সেঞ্চুরিয়ান আমাদের মাঠে নামতে বাধ্য করো না!’

শুধু উম্মে হাবিবা বেনজির নন, কোটা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন অনেক নারী শিক্ষার্থীকে প্রতিনিয়ত নামের পাশে ‘পতিতা’ তকমা দেয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, সামাজিক মাধ্যমে বারবার তাদের ধর্ষণের হুমকিও দিচ্ছে একটি গোষ্ঠী। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে পড়ুয়া অনেক ছাত্রীর ফেসবুক স্ট্যাটাস, ছবিতে অশ্লীল মন্তব্যসহ ইনবক্সে আপত্তিকর কথা লিখে মেসেজ পাঠিয়েছে তারা। ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থীরা মানবজমিনকে জানান, স্ট্যাটাস, ছবি এমনকি মেসেজ বক্সে বাজে কথা লিখে পাঠায়। সে সঙ্গে ধর্ষণের হুমকি তো রয়েছেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী সায়মা কানিজ বলেন, কোটা আন্দোলনের সেই শুরু থেকেই প্রতিনিয়ত ফেসবুকে নানা হুমকির শিকার হচ্ছি। ধর্ষণ করবে, এটা করবে, ওটা করবে। এমন মন্তব্য নিয়মিত শুনতে হচ্ছে। একটা স্ট্যাটাস বা ভিডিও শেয়ার করলেই অনেক বাজে কথা লিখে ভরিয়ে দিচ্ছে। এও বলা হয়েছে, তোর মা মনে হয় পাকিস্তানে জন্মাইছে তাই তুই শিবিরের বাচ্চা। এখনও এসব শুনতে হয়। কয়দিন আগে শহীদ মিনারে গিয়েছিলাম সেখানে তো সরাসরি হুমকি দিয়েছে। বলেছে, আসছিস ক্যান, বলছি না আসলে রেপ করবো? আয় রেপ করি। এসব কথা কে বলেছেন তা জানতে চাইলে সায়মা বলেন, এগুলো ছাত্রলীগের ছেলেরাই করে যাচ্ছে। তার মধ্যে আমি ক্যাম্পাসের ছাত্রলীগ নেতা আল আমিনকে চিনি। সেও জড়িত ছিল। এ সময় আমাদের ব্যাচে পড়া ছাত্রলীগ কর্মীরাও উপস্থিত ছিল। কিন্তু এসব দেখে তারা নীরব ভূমিকা পালন করেছে। সায়মা আরো বলেন, ফেসবুকে এসব হুমকির ব্যাপারে কোনো স্টেপ নিতে পারিনি। কাদের কাছে যাবো বিচার নিয়ে! সবাই তো আমাদের বিপক্ষে।

কোটা আন্দোলনের সময় ফেসবুকে যৌন হয়রানির শিকার হন মৌসুমী নামের আরেক ছাত্রী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী। মৌসুমী বলেন, ওই সময়ে আমাদের ছাত্রীদের প্রত্যেককেই ফেসবুকে নানাভাবে হয়রানি করা হয়েছে। খুব অশ্লীল ভাষায় আমাদের ছবি, স্ট্যাটাসে কমেন্ট করা হয়েছে। যেগুলো মোটেও ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমরা বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানিয়েছি। বলেছে, তদন্ত করবে। সেটা নিয়ে উদাসীনতা দেখিয়েছে প্রশাসন। এ ছাড়া আমরা এরমধ্যে স্মারকলিপিও জমা দিয়েছি। কোনো ছাত্রী এসব নিয়ে মামলা করেছে কি না জানতে চাইলে মৌসুমী বলেন, ভয়ের কারণে কেউ মামলা করেনি। কেউ সাহস পায় না। এমনিতে ক্যাম্পাসে থাকাটা কষ্টের হয়ে যাচ্ছে। তার ওপর এসব নিয়ে বলতে গেলে তো আরো আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হবে।

ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি উম্মে হাবিবা বেনজিরের ফেসবুক প্রোফাইলে গিয়ে দেখা যায় তার করা সাম্প্রতিক সব পোস্টেই একটি মহলের নেতাকর্মীরা অশ্লীল মন্তব্য করেছে। তিনি জানান, গত কিছুদিন আগে আমাকে ফেসবুকে প্রতিনিয়ত ধর্ষণের হুমকি দেয়া হয়েছে। একটা গ্রুপ আমার ফেসবুক আইডি হ্যাক করেছে। উম্মে হাবিবা বেনজির বলেন, আমাদের ছাত্রীদের ওপর যেসব হুমকি দেয়া হয়েছে এগুলো মনোবল ভেঙে দেয়ার জন্যই করেছে। আর এসব করেছে ছাত্রলীগের লোকজন। তাদের ফেসবুক প্রোফাইল থেকে জেনেছি। আমরা আইনি কোনো পদক্ষেপ নিলে- আমাদের পক্ষে কেউ অবস্থান নেবে না। এসব তদন্ত করেও কোনো লাভ হবে না। সে জায়গা থেকে আমরা নিজেরাই লড়াই চালিয়ে যাবো। কোনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করবো না।

এদিকে কোটা আন্দোলনরত ছাত্রীরা ছাড়াও সামাজিক মাধ্যমে হয়রানির শিকার হচ্ছেন অনেকেই। তাদের মধ্যে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভয়ে ফেসবুকে এখন কিছুই লেখেন না। কোনো বিষয়ে স্ট্যাটাসও দেন না। কারো পোস্টে কমেন্টও করেন না। বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অরণী আক্তার জানান, তিনি ফেসবুকে প্রায়ই বিভিন্ন বিষয়ে লিখতেন কিন্তু এখন আর সহজ বোধ করেন না, তার ব্যক্তিগত মতামত সামাজিক মাধ্যমে তুলে ধরতে। কারণ ট্রল করা হয়, বাজে মন্তব্য করা হয়। তিনি বলেন, দেখা গেল ফেসবুকে কিছু লিখেছি পোস্ট করেছি সেখানে পরিচিত অপরিচিত বিভিন্ন লোকজন বাজে কমেন্ট করে। ট্রলও করা হয়। একবার আমার একটি পোস্ট পরিচিত একজন কপি করে সেটি শেয়ার দিয়েছে এবং সঙ্গে বাজে কিছু কথা যোগ করেছে। পরে সেখানে আরো অনেকে বাজে কমেন্ট করেছে যা খুব অপমানজনক। এটা কিন্তু মেয়েদের ক্ষেত্রেই বেশি হয়, ছেলেদের ক্ষেত্রে হয় না।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট বলছে, এসব অভিযোগ এলে তথ্য প্রযুক্তি আইন, কিংবা পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন এবং দণ্ডবিধি আইন, নারী নির্যাতন দমন আইন অনুসারে ব্যবস্থা নিতে পারেন তারা। এবং বিভিন্ন ধরনের সাজার বিধান রয়েছে। জানা যায়, সাইবার ক্রাইম ইউনিটে যেসব অভিযোগ জমা পড়ে তার ৭০ ভাগই আসে মেয়েদের কাছ থেকে।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।