× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা ইলেকশন কর্নার
ঢাকা, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮, বুধবার

হাই অ্যালার্ট, ২১শে আগস্টের রায় আজ

প্রথম পাতা

স্টাফ রিপোর্টার | ১০ অক্টোবর ২০১৮, বুধবার, ১০:০৭

দীর্ঘ ১৪ বছর পর আজ রায় দেয়া হবে নারকীয় ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার। ২০০৪ সালের এই দিনে সন্ত্রাসীদের গ্রেনেড আর গুলিতে রক্তাক্ত হয়েছিল আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশ। হামলায় আওয়ামী লীগ সভাপতি ও তৎকালীন বিরোধী দলের নেতা  শেখ হাসিনা প্রাণে রক্ষা পেলেও মারা যান দলের ২৪ নেতাকর্মী।

আহত হন পাঁচ শতাধিক। এ বর্বর হামলার ১৪ বছর পর নানা বহুল আলোচিত এ মামলার রায়কে ঘিরে সারা দেশে উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। সম্ভাব্য যেকোনো নাশকতা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। সতর্ক অবস্থানে থাকবে আওয়ামী লীগও। রায় ঘিরে কেউ যাতে বিশৃঙ্খলা করতে না পারে সেজন্য দলের নেতাকর্মীদের মাঠে সতর্ক অবস্থানে থাকতে কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। দলীয় নেতাদের অন্যায়ভাবে সাজা দেয়া হতে পারে- এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে বিএনপি দলের নেতাকর্মীদের কোনো ফাঁদে পা না দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং ধৈর্য্যের সঙ্গে তা মোকাবিলার নির্দেশ দিয়েছে।
তবে রায়কে সামনে রেখে দলটির পক্ষ থেকে কোনো কর্মসূচি দেয়া হয়নি।

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনের মামলার রায় ঘোষণার জন্য গত ১৮ই সেপ্টেম্বর তারিখ ধার্য করা হয়। ওই দিন মামলার সবশেষ ধাপ যুক্তিতর্কের শুনানি শেষ হয়। শুনানি নিয়ে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক শাহেদ নুর উদ্দিন রায়ের জন্য দিন ধার্য করেন।

এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে মোট ২২৫ জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দেন। গত বছরের ৩০শে মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি’র বিশেষ পুলিশ সুপার আব্দুল কাহার আকন্দকে জেরা শেষের মধ্য দিয়ে সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। মামলায় মোট ৫২ আসামির নাম থাকলেও অন্য মামলায় জামায়াতের সাবেক নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নান ও শরীফ শাহেদুল বিপুলের ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ায় মামলার আসামি সংখ্যা এখন ৪৯ জন। এর মধ্যে বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের মামলায় ৩৮ জন আসামির নাম রয়েছে। যারা হত্যা মামলারও আসামি। আসামিদের মধ্যে ৮ জন জামিনে রয়েছেন, ১৮ জন পলাতক ও ২৩ জন কারাগারে রয়েছেন। আইন অনুযায়ী পলাতকদের অনুপস্থিতিতেই বিচারকাজ সম্পন্ন হচ্ছে। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন। অন্যদিকে আসামি পক্ষের আইনজীবী ও তাদের স্বজনরা মামলায় ন্যায়বিচার পাবেন বলে জানিয়েছেন।

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে করা দুই মামলায় সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিলের পর ২০১২ সালের মার্চে দ্বিতীয় দফায় অভিযোগ গঠন করেন আদালত। এরপর সাড়ে ছয় বছর ধরে বিচারকাজ চলছে। চাঞ্চল্যকর এ মামলায় উল্লেখযোগ্য আসামি হিসেবে রয়েছেন, বিএনপি’র সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, চারদলীয় জোট সরকারের তখনকার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক ভূমি উপ-মন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু, বিএনপি’র সাবেক যুগ্ম মহাসচিব হারিছ চৌধুরী। এই মামলায় প্রথম দফা অভিযোগপত্রে ২২ জন আসামি থাকলেও অধিকতর তদন্তে বিএনপি নেতা তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ আরো ৩০ জনকে আসামি করা হয়।

২০১২ সালের ১৮ই মার্চ দ্বিতীয় দফায় অভিযোগ গঠন করেন সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারক। এর আগে ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নতুন করে তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়। তদন্ত শেষে ২০০৮ সালের ১১ই জুন আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। অভিযোগপত্রে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের উপ-মন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, তার ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন, হুজি নেতা মুফতি হান্নান (অন্য মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর) সহ ২২ জনকে আসামি করা হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর মামলার অধিকতর তদন্ত শুরুর উদ্যোগ নেয়া হয়। তদন্ত শেষে ২০১১ সালের ২রা জুলাই সিআইডি’র বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুল কাহার আকন্দ সম্পূরক অভিযোগপত্র দেন।

পলাতক ৮ জনের অবস্থান জানা গেছে: গ্রেনেড হামলার মামলায় অভিযুক্ত পলাতক ১৮ আসামির মধ্যে ৮ জনের অবস্থান জানতে পেরেছে পুলিশ। অপরাধ তদন্ত বিভাগের অতিরিক্ত ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল (এডিডিআই ডিআইজি) এবং ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) আবদুল কাহার আকন্দ বাসসকে জানিয়েছেন, ইন্টারপুল ও বিদেশে মিশনগুলোর সহায়তায় ইতিমধ্যে ৮ পলাতক আসামির অবস্থান শনাক্ত করা হয়েছে। অপর ১০ পলাতক আসামির অবস্থান জানার চেষ্টা চলছে। সিআইডি ও পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র অনুযায়ী, মাওলানা তাজুদ্দিন ও তার ভাই রাতুল আহমেদ ওরফে রাতুল বাবু রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকায়, বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে, সাবেক এমপি মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ সৌদি আরবে, সাবেক মেজর জেনারেল এটিএম আমিন ও লে. কর্নেল সাইফুল ইসলাম জোয়ারদার দুবাইতে, দু’ভাই- হরকাতুল জিহাদ নেতা মহিবুল মত্তাকিন ও আনিসুল মোরছালিন রয়েছেন ভারতের তিহার জেলে।

ওই সূত্রের দাবি, বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক রাজনৈতিক উপদেষ্টা হারিস চৌধুরী মালয়েশিয়ায় অবস্থান করলেও তিনি লন্ডন, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতে যাতায়াতের মধ্যে রয়েছেন। তবে তৎকালীন উপ-পুলিশ কমিশনার খান সায়ীদ হাসান ও ওবায়দুর রহমান খান, হুজি নেতা মোহাম্মদ খলিল, জাহাঙ্গীর আলম বাদল, লিটন ওরফে মাওলানা লিটন, মো. ইকবাল, মুফতি শফিউর রহমান (ভৈরব) ও মুফতি আবদুল হাই এবং হানিফ পরিবহনের মালিক মোহাম্মদ হানিফের অবস্থান এখনো শনাক্ত করা যায়নি।

রায়কে ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা: রায়কে ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মেট্রোপলিটন পুলিশ, রেঞ্জ পুলিশ, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব), গোয়েন্দা সংস্থা (ডিবি) ছাড়াও সাদা পোশাকের অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে সারা দেশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। তবে বিশেষ করে রাজধানীতে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, সুনির্দিষ্ট কোনো হুমকি না থাকলেও সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রায়কে ঘিরে নাজিম উদ্দিন রোডে সর্বোচ্চ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নাজিম উদ্দিন রোডের পুরনো কারাগারের পাশে অবস্থিত বিশেষ আদালত, আশেপাশের এলাকার সড়ক ও বিভিন্ন ভবন থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন।

পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব, গোয়েন্দা ও সাদা পোশাকের পুলিশও কাজ করবে। সকাল থেকেই নাজিম উদ্দিন সড়কে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে। র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান মানবজমিনকে বলেছেন, রায়কে ঘিরে জনসাধারণের নিরাপত্তার জন্য সারা দেশে অসংখ্য র‌্যাব সদস্য কাজ করবেন। যাতে করে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয়। রায় ঘিরে কোনো ধরনের হুমকি আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনো ধরনের হুমকি নাই। তবে সারা দেশেই র‌্যাবের বিভিন্ন ব্যাটালিয়নকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য্য করার পর থেকেই গোয়েন্দারা কাজ শুরু করেছেন। রায়কে ঘিরে বিশৃঙ্খলার পরিকল্পনা করতে পারে এমন সন্দেহভাজনদের গতিবিধি নজরদারিতে রাখা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তাদের কার্যক্রম মনিটরিং করছে সাইবার ক্রাইম ইউনিট। তবে গোয়েন্দাদের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, গোয়েন্দা তথ্য এখন পর্যন্ত বিশৃঙ্খলা হতে পারে এমন কোনো আলামত পায়নি। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সবসময়ই সজাগ থাকে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার বিষয়টি মাথায় রাখতে হয়। এদিকে ২১শে গ্রেনেড হামলায় গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের গাজীপুরের হাই সিকিউরিটি ও কাশিমপুরের কারাগারে রাখা হয়েছে। রায়কে সামনে রেখে এসব কারাগারে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। কারা সূত্র জানিয়েছে, আজ তাদেরকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আদালতে হাজির করা হবে। ডিএমপি’র অতিরিক্ত কমিশনার কৃষ্ণ পদ রায় মানবজমিনকে বলেন, কোনো হুমকি নেই। তবে অন্যান্য সময়ের চেয়ে একটু বাড়তি নিরাপত্তা থাকবে। আমরা কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা হতে দেব না।

এদিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া গতকাল বলেছেন, ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার রায়কে ঘিরে কোনো ধরনের নৈরাজ্য বরদাশত করা হবে না। পুলিশের কঠোর নজরদারি রয়েছে। আমরা সতর্ক রয়েছি। প্রস্তুত আছি যাতে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল জনগণের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে না পারে বা কোনো রকম অপচেষ্টা চালাতে না পারে। তিনি বলেন, এটি আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রমের একটি অংশ। তবে এখন পর্যন্ত এ রায়কে ঘিরে কোনো নিরাপত্তা হুমকি নেই।

ন্যায় বিচার চান আহতরা: এদিকে হামলায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া আহত নেতাকর্মীরা প্রত্যাশা করছেন তারা ন্যায় বিচার পাবেন। ঘটনায় যারা জড়িত তাদের উপযুক্ত শাস্তি হবে। গ্রেনেড হামলায় আহত রাশিদা আক্তার রুমা মানবজমিনকে বলেন, প্রথমত আমি এই হামলার ঘটনার রায় এত দ্রুত হওয়াতে সরকারকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এখন আদালতের কাছে একটাই চাওয়া এই নারকীয় হামলায় যেন পরিকল্পনাকারী ও হামলাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া হয়।

অপরাধী যেই হোক তার হাত যত শক্তিশালী হোক আমি তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। যাতে করে এমন হামলা যেন আর কেউ ঘটানোর সাহস না পায়। নাজিম উদ্দিন নাজমুল মানবজমিনকে বলেন, দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে এই রায়ের জন্য অপেক্ষা করছি। আমার খুব ভালো লাগছে আজ সেই রায় হবে। রক্তাক্ত সেই হামলার পর থেকে শরীরের যন্ত্রণা নিয়ে দিন-রাত পার করছি। কত নেতাকর্মী আমাদের চোখের সামনে মারা গেছেন। স্প্লিন্টারের যন্ত্রণা নিয়ে কষ্টের দিন পার করছেন অনেকে। আমি চাই সুষ্ঠু বিচারের মধ্যে দিয়ে নিহতদের আত্মার শান্তি পাক এবং আমরা যারা এখনো বেঁচে আছি তাদের যেন প্রত্যাশা পূরণ হয়।

আহত বাহার মিয়া মানবজমিনকে বলেন, এই একটি ঘটনা আমাদের চোখের ঘুম নষ্ট করে দিয়েছে। শরীরে কত অস্ত্রোপচার হয়েছে। যন্ত্রণা নিয়ে এখন বেঁচে আছি শুধু বিচারের আশায়। আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি হবে এই প্রত্যাশাই আমি করছি।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর