× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা ইলেকশন কর্নার
ঢাকা, ২০ এপ্রিল ২০১৯, শনিবার

আমি মা হবো এটাই কি আমার অপরাধ?

প্রথম পাতা

স্টাফ রিপোর্টার, নারায়ণগঞ্জ থেকে | ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, সোমবার, ১০:২৭

হোসনে আরা বীণা। সদ্য ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করা হয়েছে তাকে। ৬ দিন আগেও তিনি ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা। এরও আগে তিনি নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন। পরপর নারায়ণগঞ্জের দুটি উপজেলায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি অনেকটা পরিচিত মুখ হয়ে উঠেন নারায়ণগঞ্জের উপজেলা প্রশাসনে। তবে ৯ বছরের দাম্পত্য জীবনে বহু   চেষ্টা-চিকিৎসার পরও কোনো সন্তান লাভ করতে পারেননি। কিন্তু ৫ মাস আগে সন্তানসম্ভাবনার সংবাদে আনন্দের বন্যা বইছিল দুই পরিবারে। অসুস্থ শরীর নিয়েই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সহকারী রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেছেন হোসনে আরা বীণা।
কোনো ক্লান্তিই যেন তাকে স্পর্শ করতে পারেনি আগত সন্তানের আগমনী বার্তায়। কিন্তু কে জানতো এই সন্তানসম্ভাবনাই তার জন্য কাল হবে। ৪ঠা ফেব্রুয়ারি তাকে ওএসডি করা হয়। মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে সাড়ে ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বাকালীন সময়েই প্রিমেচিউর সন্তানের জন্ম দিতে হয়েছে তাকে। আকস্মিকভাবে কর্মক্ষেত্রে এমন সংবাদে মানসিকভাবে বিপযস্ত হোসনে আরা বীণা কোন কারণই খুঁজে পাচ্ছেন না কেন তার বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ নেয়া হলো। নিরুপায় হয়ে ৮ই ফেব্রুয়ারি রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তিনি তার আইডিতে হৃদয়স্পর্শী একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি বলেছেন, সদ্য নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার তদবিরে তাকে ওএসডি করা হয়েছে।
এদিকে তার আবেগঘন ওই স্ট্যাটাস নিয়ে তোলপাড় চলছে সর্বত্র। শুধুমাত্র মাতৃত্বজনিত কারণে তাকে ওএসডি করায় উপজেলা প্রশাসনে চাপা ক্ষোভ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া বিরাজ করছে।  
হোসনে আরা বীণার স্ট্যাটাসটি হুবহ তুলে ধরা হলো: ‘আমি ব্যক্তিগত বিষয়গুলো সাধারণত ফেসবুকে খুব একটা শেয়ার করি না। তবে আজ মনে হলো এখন চুপ করে থাকাটাও অন্যায়। তাই আজ আর না, আজ আমি বলবো... আমি হোসনে আরা বেগম, উপজেলা নির্বাহী অফিসার নারায়ণগঞ্জ সদর, মাত্র ৯ মাস পূর্বে আমি এ পদে যোগদান করি। আমার দীর্ঘ ৯ বছরের দাম্পত্য জীবনে বহু চেষ্টা চিকিৎসার পরও আমরা কোনো সন্তান লাভ করতে পারিনি। কিন্তু পাঁচ মাস পূর্বে আমি জানতে পারি আমি দুই মাসের সন্তানসম্ভবা। এ ঘটনা আমার জীবনে সৃষ্টিকর্তার অপার রহমত ছাড়া আর কিছুই নয় এ বিশ্বাস আমি প্রতিনিয়ত বুকে ধারণ করেছি। এ বিশ্বাস ও স্বপ্ন বুকে নিয়ে অনাগত সন্তানের আগমনের অপেক্ষায় দিন গুনছিলাম।’
‘আমি আমার বাবুকে পেটে নিয়েই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে আমি নারায়ণগঞ্জ-৪ ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের আংশিক নির্বাচন অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন করি। একজন নারী কর্মকর্তা হিসেবে অজুহাত ফাকিবাজি এই বিষয়গুলোকে কখনই পুঁজি করিনি। যখন যে পদে কাজ করেছি চেষ্টা করেছি শতভাগ নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে। সন্তানসম্ভবা হয়েও এর কোনো ব্যতিক্রম আমি করিনি। অথচ আমি সন্তানসম্ভবা হয়েছি শোনার পর থেকেই একজন বিশেষ কর্মকর্তা, যার নাম বলতেও আমার রুচি হচ্ছে না, বিভিন্ন মহলে আমাকে অযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করে আমাকে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা থেকে বদলির পাঁয়তারা করেই চলেছিল। আমার সন্তানসম্ভবা হওয়াকেই সে বিভিন্ন মহলে আমার সবচেয়ে বড় অযোগ্যতা হিসেবে উপস্থাপন করেছে। অথচ এই সন্তান পেটে নিয়েই আমি অত্যন্ত সফলভাবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এজন্য আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক এপ্রিসিয়েশনও পেয়েছি।’
বীণা বলেন, ‘আমার সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ ছিল আগামী এপ্রিল। তেমন মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই আমি ছিলাম। কিন্তু গত ৪ঠা ফেব্রুয়ারি বিকালে রেগুলার চেকআপ করতে আমি হাসব্যান্ডসহ স্কয়ার হাসপাতালে আসি, চেকআপ শেষে সন্ধ্যায় আমার হাসপাতালে অপেক্ষা করছি পরবর্তী পরীক্ষার জন্য। এমন সময় আমার একজন ব্যাচমেট ফোন করে জানায় আমার সদাসয় কর্তৃপক্ষ আমাকে ওএসডি করেছে অর্থাৎ আমাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ করেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমার অপরাধ হলো আমি সন্তানসম্ভবা, আর তার চেয়েও বড় কারণ হলো সেই তথাকথিত ক্ষমতাধর কর্মকর্তার উপরের মহল কর্তৃক তদবির। খবরটা শোনার পর আমি প্রচণ্ড মানসিক চাপ সহ্য করতে পারিনি, উল্লেখ্য আমি এজমার রোগী। প্রচণ্ড মানসিক চাপে আমার ফুসফুসে ব্লাড সার্কুলেশন অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়, ফলে আমার পেটের সন্তানের অক্সিজেন সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যায় এবং হঠাৎ করেই আমার পেটের বাবু নড়াচড়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। তাৎক্ষণিক হসপিটালে ভর্তি করা হলে ডক্টর সেদিন রাতেই সিজার করে বাবু বের করে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। পরে আমার পরিবারের সবার সিদ্ধান্তে পরদিন সকালে আমার মাত্র ৩১ সপ্তাহ বয়সী প্রিমেচিউর বেবিকে সিজার করে বের করে ফেলা হয়। এখন সে স্কয়ার হাসপাতালের এনআইসিওতে বেঁচে থাকার জন্য প্রাণপণ যুদ্ধ করে যাচ্ছে!!!’
সদ্য ওএসডি হওয়া এই ইউএনও ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ক্ষোভের সঙ্গে লিখেন, ‘আমার এই নিষ্পাপ সন্তানটার কি অপরাধ ছিল? নাকি মা হতে চাওয়াটাই আমার সবচেয়ে বড় অপরাধ ছিল আমি জানি না!!! তবে জানি একজন সব দেখেন, তিনি আমার নিষ্পাপ মাসুম সন্তানের উপর এই জুলুমের বিচার করবেন। এই নিষ্ঠুর অমানবিকতার পৃথিবীতে কোনো কর্তাব্যক্তিদের কাছে আমি এ অন্যায়ের বিচার চাই না, শুধু আমার সৃষ্টিকর্তাকে বলবো তুমি এর বিচার করো!!! আর যারা আমাকে একটুও ভালোবাসেন আমার নিষ্পাপ সন্তানটার জন্য দোয়া করবেন। ও সুস্থ হয়ে গেলে কোনো কষ্টের কথাই আমার মনে থাকবে না।’
এদিকে ফেসবুকে দেয়া স্ট্যাটাসের সূত্রধরে রোববার সকালে হোসনে আরা বীণার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ওএসডি করার নেপথ্যে কারা কাজ করেছে আমি ভালো বলতে পারবো না। তবে যেই করুক না কেন অর্ডারটা তো হয়েছে। নেপথ্যে কারা কাজ করেছে সেটি নির্দিষ্ট করে বলতে পারবো না, কারণ আমি অসুস্থ। আমি হাসপাতালে, বাচ্চাটাও অসুস্থ। অর্ডারটা কারও না কারও হাত দিয়েই হয়েছে। আমার কষ্টের জায়গা একটাই যে, আমি মা হবো। এটাই কি আমার অপরাধ। আমরা এক সময় বদলি হবো এটাই স্বাভাবিক। একটা নির্দিষ্ট সময় পরে চেয়ারটা অবশ্যই খালি হবে।
আমার ডেলিভারির সম্ভাব্য সময় ছিল আগামী এপ্রিল মাসে। তার মানে নির্দিষ্ট সময়ের আড়াই মাস আগেই আমার ডেলিভারি হয়েছে। কেন এখন আমাকে এই মুহূর্তে ওএসডি করা হলো এবং ওএসডি করার কারণে আমি এতটাই বিপর্যস্ত এবং অসুস্থ হয়ে যাই যে এর প্রভাব আমার গর্ভের সন্তানের উপর পড়ে। এতে আমার সন্তানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণে তড়িঘড়ি সিজার করতে হয়েছে। এই অন্যায়টাই আমি মেনে নিতে পারিনি। এটাই আমার কাছে খারাপ লেগেছে।
তিনি বলেন, আমি অসুস্থ থাকায় আমার বিভাগীয় কমিশনারের সঙ্গে কথা বলতে পারিনি। আর যেদিন আমার অর্ডারটা হলো সেদিনই আমি অসুস্থ হয়ে পড়লে আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং সেই রাতেই আমার সিজারের সিদ্ধান্ত হয়। শেষ পর্যন্ত পরদিন সকালে আমাকে সিজার করা হয়। আমার অসুস্থতার কারণে আমার গর্ভের সন্তানের নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেছিল এবং সে অক্সিজেন কম পাচ্ছিল। বর্তমানে আমার বাচ্চাটা আইসিইউতে এবং আমিও হাসপাতালে ভর্তি। এ মুহূর্তে আমার কোথাও যাওয়া সম্ভব নয়। বিয়ের ৯ বছর পর এটিই আমার প্রথম সন্তান।
উল্লেখ্য, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলায় নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে আসছেন নাহিদা বারিক। তিনি এর আগে ফতুল্লা সার্কেলের এসিল্যান্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গিয়েছিলেন। গত ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিভাগীয় অতিরিক্ত কমিশনার (সার্বিক) তারিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নাহিদা বারিককে নিয়োগের বিষয়টি জানানো হয়।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
পাঠকের মতামত
**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।
Md. Rafiqul Islam
১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, সোমবার, ২:১৪

অমানবিক। ওদের বিবেকবোধ নেই।

md amin uddin
১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, সোমবার, ১১:০৯

মর্মস্পর্সি নিউজ পড়ে অত্যন্ত মর্মাহত হলাম।মানুষ এত নিষ্ঠুর হয় কেমনে।আল্লাহ আপনাকে এবং আপনার সন্তান কে সুস্থ করে দিন। আমীন

জুয়েল
১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, রবিবার, ৯:৫৯

ইনশাআল্লাহ দোয়া করি আপনি ও আপনার সন্তানের জন্য যেন আল্লাহতাআলা তাড়াতাড়ি সুস্থ করে দেন। আর বিচার ওটা ভূলে যান। ভরসা শুধুআল্লাহর উপর করেন এবং বিচার ও তাঁরই নিকট দেন।

বাহাউদ্দিন বাবলু
১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, রবিবার, ৫:৪৮

কার কাছে বিচার চাবেন,যে সমাজে অন্যায় করাটাই ন্যায় মনে করে, সেই সমাজে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নেই। রাষ্ট্র যেখানে নিজেই অন্যায় করে বা অন্যায় করতে উদ্ধুধ করে সে রাষ্টে প্রতিটি অংগে ক্যান্সার হবে এটাই স্বাভাবিক।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক
১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, রবিবার, ১২:১৭

নিশ্চয়ই একজন আছেন।আর তাঁর বিচার এড়িয়ে যাবার ধৄষ্টতা বোধকরি এই দুনিয়ার করোরই নাই।

মোহাম্মদ নোমান
১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, রবিবার, ১১:৫৮

নিউজ পড়ে মর্মাহত হলাম।মানুষ এত নিষ্ঠুর হয় কেমনে।আল্লাহ আপনার সন্তান কে সুস্থ করে দিন।

অন্যান্য খবর