× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা ইলেকশন কর্নার
ঢাকা, ২৭ জুন ২০১৯, বৃহস্পতিবার

এক বাঙালি মুক্তিযোদ্ধার ভয়ে ভীত ছিল শত পাকসেনা

এক্সক্লুসিভ

জাভেদ ইকবাল, রংপুর থেকে | ১৩ মার্চ ২০১৯, বুধবার, ৫:৩২

মৃত্যু কত ভয়ংকর। না মরলেও তা উপলব্ধি করেছেন মুক্তিযোদ্ধা মোসাদ্দেক নন্তু। বাংলা ভাষার মাস এলেই স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠে। সে সময় খান সেনাদের নির্যাতন ও বর্বরতা আজও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। রংপুর মুন্সিপাড়ার মোবাশ্বেরের পুত্র মুক্তিযোদ্ধা মোসাদ্দেক নন্তু বলেন, ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে দেশে তখন পাক সেনাদের সাথে বাঙালির তুমুল যুদ্ধ চলছে। খান সেনারা তরুন, যুবকদেরকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্বিচারে হত্যা করতো। অবস্থা বেগতিক দেখে তার পিতা-মাতা পাক সেনাদের হাত থেকে বাঁচার জন্য নন্তুকে পালিয়ে যেতে বলে। এ সময় নন্তু, জবা, লাইজুসহ ডাঃ পিন্নুর সাথে তার নানার বাড়ি বর্ধমান জেলায় চলে যান।
সেখানে ২০ দিন অবস্থান করার পর আর মন টেকে না। বাবা-মা ও দেশের জন্য সব সময় মন কাঁদে। তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে তারা সিতাই ক্যাম্পে ফিরে আসেন। এরপর সাহেবগঞ্জ সাব সেক্টর কমান্ডার নওয়াজেশ ও মঞ্জুর এলাহীর কাছ থেকে অস্ত্র চালনা, চোরাগুপ্তা হামলাসহ বিভিন্ন বিষয়ে মাসখানেক ট্রেনিংয়ে অংশ নিয়ে হেডকোয়াটার বুড়িমারী ৬নং সেক্টর উইং কমান্ডার খাদেমুল বাশারের অধীনে প্রথম যুদ্ধ শুরু করেন। সে সময়ের স্মৃতি তুলে ধরে বলেন, সহযোদ্ধা বাদশাসহ তাকে নেভাল অফিসার মঞ্জুর এলাহী রংপুর শহরে আতংঙ্ক সৃষ্টি করার জন্য ডিসির বাড়ির সামনে গ্রেনেড নিক্ষেপের প্রস্তুতি নিয়ে যেতে বলেন। কোন কিছু না বুঝে নন্তু ও বাদশা এ প্রস্তাবে রাজি হয়ে গ্রেনেড নিয়ে লালমনিরহাট ভেলাবাড়ি রেলস্টেশনে আসতেই সন্ধ্যা ও অন্ধকার হয়ে যায়। এ সময় রুটি ও খাবারও শেষ হয়ে পড়ে। রাস্তা ছেড়ে জমি দিয়ে রেল লাইনে এক মাইলের মত এলাকায় হেটে আসছেন। এরই মধ্যে পাক হানাদার বাহিনী জানতে পারে দু’মুক্তিযোদ্ধা এই পথ বেয়ে আসছে। মুর্হুতের মধ্যে শতাধিক আর্মি রাজাকার বাহিনী এলাকার চারপাশ ঘিরে ফেলে। অবস্থা বেগতিক দেখে তারা গ্রেনেড পিন খুলে ওদের উপর নিক্ষেপ করে শুয়ে পড়ে। কিন্তু সময় পেরিয়ে গেলেও গ্রেনেড বিস্ফোরন না হওয়ায় তারা বিপাকে পড়েন। দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে পাক সেনারা বন্দুকের বাট দিয়ে মেরে বাদশার বুকে চাইনিজ রাইফেল ঠেকিয়ে গুলি করে। ঘটনাস্থলেই বাদশার মৃত্যু হয়। এ সময় পাক বাহিনীরা মোছাদ্দেক নন্তুকে মারতে মারতে ভেলাবাড়ি রেলস্টেশনে পাক ক্যাম্পে নিয়ে এসে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় রাখে। সে কোনক্রমে পালিয়ে যেতে না পারে সেজন্য ৫০ পাকসেনা তাকে পাহাড়া দেয়।
এরপর নন্তুকে ১১ বগির একটি ট্রেনে উঠিয়ে অস্ত্র-শস্ত্র সজ্জিত আর্মিরা অন্যত্র নিয়ে যাচ্ছিলো। সে দৃশ্যের কথা আজও তার মনে আছে যে, ১৬ বছর বয়সের এক মুক্তিযোদ্ধার ভয়ে পাকসেনারা এতই ভিত ছিল যে, তাকে নিয়ে যেতে সামনে ও পিছনে ইঞ্জিনযুক্ত ট্রেনে শত-শত সেনা অস্ত্র উচিয়ে সতর্ক ছিল। পাকসেনাদের মুখে বাঙালি ভীতি দেখে নন্তুর মনে হয়েছিল পাকসেনারা এতই ঘাবড়ে গিয়েছিল যে তৎকালীন সময় ভারতের মিত্র বাহিনী না এলেও বাঙালি জাতির কাছে তারা আত্মসর্ম্পন করতোই। ট্রেনটি মাইলখানেক আসার পর রেললাইনের উপরে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা বাদশার লাশ ফেলে দিয়ে লালমনিরহাটে ট্রেন থামায়। এরপর পাক আর্মির জীপে নন্তুকে তুলে সামনে ও পিছনে দুই ট্রাক আর্মি জীপটিকে পাহাড়া দিয়ে সরাসরি আর্মিদের ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়। সেখানে নামার সাথে সাথে ৪ জন পাঞ্জাবী আর্মি নন্তুকে চারদিকে থেকে ঘুসি, লাথি, বন্দুকের বাট দিয়ে মারতে শুরু করে। এভাবে প্রায় ৩০ মিনিটের মত তাদের প্রহার চলতে থাকে। এক পর্যায়ে পাক আর্মির মেজর মোস্তফা তার সামনে এসে মুখের দিকে তাকিয়ে বলে হাতে গ্রেনেড নিয়ে ডেটোনেটরটা বের করে উর্দূতে বলে তোকে শেষ করার জন্য এটাই যথেষ্ট। কিন্তু তোকে এভাবে মারবো না। এরপর প্রতিদিন আধাঘন্টা করে পা উপরে ও মাথা নিচের দিকে ঝুঁলিয়ে গরুর দড়ি দিয়ে হান্টারের মত বানিয়ে প্রহার করে। এভাবে ২৯ দিন তার উপর নির্যাতন চলতে থাকে। পাকসেনাদের নির্যাতনে সে অতিষ্ঠ হয়ে উঠে বলে আমাকে বাদশার মত মেরে ফেলো।
নন্তুকে পাক সেনারা দু’বেলা বড় চাপাতি রুটি ও পাকিস্তানী মাসকালাইয়ের ডাল খাবার দিত। ভোরে টয়লেট নিয়ে যেত, সেখান থেকে নিয়ে এসে শুরু হত নির্যাতন। এরই মধ্যে কমান্ডিং অফিসার মেজর মোস্তফা একদিন একাই এসে তাকে বলে তুমি দেখতে আমার ছোট ভাইয়ের মত। সে এখন পাঞ্জাবে পড়াশুনা করছে। আমি তোমার মধ্যে আমার ছোট ভাইকে দেখতে পাই। তাই তোমাকে ছেড়ে দেব, তুমি তোমার বাবা-মাকে চিঠি লিখে এখানে আসতে বলো। তার কথায় নন্তু বললো আমি মরে গেলেও আমার বাবা-মাকে এখানে ডাকবো না। কারণ তোমরা নিষ্ঠুর জাতি। তখন সে বললো আমি মুসলমান, আমি কসম করে বলছি তোমার বাবা-মা এলে তোমায় ছেড়ে দেব। এতটুকু ক্ষতি করবো না। আমি তোমাকে মারতে চাইলে এতদিনে মেরে ফেলতে পারতাম। কিন্তু আমি কৌশলে তোমাকে বাঁচিয়ে রেখেছি। তার কথায় সে বিশ্বাস পেয়ে বাবা-মাকে চিঠি লেখে লালমনিরহাট ক্যান্টনমেন্টে আসার জন্য। সন্তানের চিঠি পেয়ে বাবা-মা আর কোন কিছু না ভেবে পাগলের মত ছুটে আসে। মেজর তাকে তার বাবা-মার হাতে তুলে দিলে সে মুন্সিপাড়া বাসায় ফিরে আসে। এরপর যুদ্ধ চলাকালীন সময় রংপুর ক্যান্টনমেন্টের পাকসেনারা তাকে কয়েক দফা হাজিরা দিতে ক্যান্টনমেন্টে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর কেটে গেছে ৪৮ বছর। কিন্তু যুদ্ধকালীন প্রাণ যাবার আতংঙ্ক নিয়ে আজও বেঁচে আছে নন্তু। দিন যায়, মাস যায়, বছর আসে। যখনই ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারী, মার্চ মাস এলে মনে পড়ে যায় বাঙালি জাতির রক্ত ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে এ স্বাধীন বাংলাদেশের কথা। নন্তুর চাচাতো ভাই ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধ সংগঠক সাবেক পৌরসভার চেয়ারম্যান অ্যাড. মোহাম্মদ আফজাল ও রংপুর জেলা গণতন্ত্রী পার্টির সভাপতি আরশাদ হারুন বলেন, পাক সেনাদের নির্যাতনের ব্যাথায় শেষ জীবনে কাবু হয়ে পড়েছে নন্তু।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর