× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা ইলেকশন কর্নার
ঢাকা, ১৭ জুন ২০১৯, সোমবার

ফিল্মি কায়দা, ছিনতাইয়ে বেপরোয়া শতাধিক চক্র

এক্সক্লুসিভ

শুভ্র দেব | ১৩ মার্চ ২০১৯, বুধবার, ৫:৩৮

রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্পটে ওঁৎ পেতে বসে থাকে তারা। পরিকল্পনা মাফিক চক্রের সদস্যরা নিজ নিজ অবস্থানে থাকে। সঙ্গে থাকে পিস্তল, ছুরি, চাপাতি। সুযোগ পেলেই ফিল্মি কায়দায় পথচারীদের ওপর আক্রমণ করে। আশেপাশের লোকজন কোনো কিছু বুঝে উঠার আগে কিছু নিয়ে উধাও। অসহায় ভুক্তভোগীরা কোনো উপায়ন্তর না পেয়ে সর্বস্ব হারিয়ে ঘরে ফিরেন। ইদানীং ঢাকায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ছিনতাইকারী চক্র। সংশ্লিষ্টরা বলছেন ঢাকায় অন্তত অর্ধশতাধিক স্পটে ছিনতাইকারীরা সক্রিয় থাকে।
দিনদুপুরে জনসমাগম এলাকায় ফিল্মি কায়দায় লুটে নিয়ে যায় মূল্যবান জিনিসপত্র। বেশিরভাগ সময় ছিনতাইকারীরা অস্ত্র ব্যবহার করছে। এতে করে ভুক্তভোগীরা ছিনতাইয়ের সময় নড়াচড়া চিৎকার চেঁচামেচি করার উপায় থাকে না। প্রাণের ভয়ে নিজেই তুলে দিচ্ছেন টাকা, স্বর্ণালঙ্কার, মোবাইল ও প্রয়োজনীয় আরো অনেক কিছু।
শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টা। মগবাজারের এক বন্ধুর বাসায় দাওয়াত খেয়ে কমলাপুর এলাকার বাসায় ফিরছিলেন বেসরকারি অফিসের কর্মী আলী মোহাম্মদ।  রিকশা নিয়ে রাজারবাগ পুলিশ লাইন পার হয়ে কমলাপুর যাওয়ার পথে তিনি ছিনতাইয়ের শিকার হোন। আলী  মোহাম্মদ বলেন, ফাঁকা রাস্তায় আমাকে বহনকারী রিকশাটি অনেক দ্রুত যাচ্ছিল। রাস্তার দুই পাশে বেশ কিছু বাস পার্কিং করা ছিল। হঠাৎ করে বাসের আড়াল থেকে কয়েকজন লোক বাসের সামনে এসে দাঁড়িয়ে রিকশার গতিরোধ করে। সঙ্গে সঙ্গে তারা আমার মাথায় একটি পিস্তল ঠেকিয়ে বলে যা আছে দিতে হবে। তিনি বলেন, ভয়ে আমি তাদেরকে দুটো দামি মোবাইল ফোন, ৭ হাজার টাকা, একটি আঙুলের রিং দিয়ে দিই। এসময় আমার পাশ দিয়ে আরো কয়েকটি রিকশা যাচ্ছিল। কিন্তু আমি কারো সাহায্য নিতে পারি নাই।
পহেলা মার্চ দিনদুপুরে রাজধানীর মালিবাগে ফিল্মি কায়দায় ছিনতাইয়ের একটি ঘটনা ঘটেছে। মালিবাগের ১ম লেন দিয়ে বাসায় ফিরছিলেন রিকশা আরোহী মনির উদ্দিন। ওই লেনের ১৭৩ ও ১৭৪ নম্বর বাড়ির মাঝামাঝি স্থানে তাকে বহনকারী রিকশাটি পৌঁছালে কয়েকজন ছিনতাইকারী তার গতিরোধ করে। তখন কোনো কিছু বুঝে উঠার আগেই তারা মনির উদ্দিনের গলায় চাপাতি ঠেকিয়ে তার কাছ থেকে নগদ টাকা, মানিব্যাগ, মোবাইল ফোন ও বিভিন্ন ব্যাংকের কার্ড ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারী। ছিনতাইয়ের দৃশ্যটি ঘটনার পার্শ্ববর্তী একটি সিসি ক্যামেরায় ধারণ হয়। পরবর্তীতে সেই ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। এরই সূত্র ধরে শাহজাহানপুর থানা পুলিশ তদন্তে নামে। পরে ৯ই মার্চ রাতে ওই তিন ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা হলেন- মো. ইউসুফ আলী (২৮), ফরহাদ ফকির (২৯) ও মো. জসিম মাতব্বর (৩৪)। এ সময় তাদের হেফাজত থেকে নগদ টাকা, চাপাতি, ছুরি উদ্ধার করা হয়। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে দীর্ঘদিন ধরে তারা মালিবাগ, রমনা, রামপুরা, খিলগাঁও, মতিঝিল এলাকাসহ আরো কিছু এলাকায় ছিনতাই-ডাকাতি করে আসছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রাজধানীর মতিঝিল, দৈনিক বাংলা, ফকিরাপুল, পল্টন, গুলিস্তান, টিকাটুলি, দয়াগঞ্জ, কমলাপুর, শাহজাহানপুর, মালিবাগ, রামপুরা, শাহজাদপুর, বাড্ডা, নতুন বাজার, খিলক্ষেত, বিমানবন্দর এলাকা, টঙ্গী, আব্দুল্লাপুর, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, দারুসসালাম, গাবতলী, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, মহাখালি, তেজগাঁও, ধানমন্ডি, সদরঘাট, ডেমরা, ওয়ারী, শ্যামপুর, কদমতলী, জুরাইন, পোস্তগোলা, শ্যামলী, ফার্মগেট, কাওরান বাজার, কালসী এলাকায় এখন প্রতিদিনই দুই চারটা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। তবে ভুক্তভোগীরা ছিনতাইয়ের স্বীকার হয়ে সংশ্লিষ্ট থানায় গিয়ে কোনো লিখিত অভিযোগ করছে না। তাই আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বিষয়টিকে এত গুরুত্ব দিচ্ছেন না। ভুক্তভোগীরা বলছেন, থানায় অভিযোগ দিয়ে নানা হয়রানির মধ্যে পড়তে হয়। তদন্তের স্বার্থে পুলিশ যখন তখন ডাকাডাকি করে। একই বিষয়ে বারবার জানতে চায়। একজন আসামি গ্রেপ্তার করলেই আসামি শনাক্তের জন্য থানা থেকে খবর দেয়। তাই এসব ঝামেলা পোহাতেই থানায় অভিযোগ করা হয় না।
মিরপুর ও তার আশেপাশের এলাকায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি ছিনতাই চক্র। তারা মিরপুর মাজার রোড, মিরপুর-১ মিরপুর-২, সিনেমা হল, আনসার ক্যাম্প, মিরপুর-১০, টেকনিক্যাল রোড, গাবতলী, দারুস সালাম এলাকায় ছিনতাই করে। বিশেষ করে ভোর বেলা দূরপাল্লার বাসে গাবতলীতে আসা যাত্রীদের টার্গেট করে তারা। ভোরে সড়কে জনসমাগম কম থাকায় ওই যাত্রীদের অস্ত্রের ভয়ভীতি দেখিয়ে ছিনতাই করে নেয়। অনেক সময় জনসম্মুখে তারা ছিনতাই করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে এসব এলাকায় অন্তত ২০ থেকে ২৫টি চক্র ছিনতাই করে। আর এসব চক্রে শতাধিক সদস্য জড়িত রয়েছে। গত কয়েকদিনে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের একটি টিম অভিযান চালিয়ে এসব চক্রের ত্রিশ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, রাজধানীতে শতাধিক ছিনতাইকারী চক্র আছে। যাদেরকে বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু জামিনে মুক্ত হয়ে ফের তারা একই কাজে জড়িত হয়ে যায়। নিত্যনতুন কৌশলে তারা ছিনতাই করে। একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেছেন ঢাকায় প্রাইভেট কার দিয়ে ছিনতাই বাড়ছে। কিছু চক্রের সদস্যরা নিজেদেরকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা করতে এই কৌশল বেছে নিয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সময় ছিনতাই চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হলেও মূল হোতারা অধরা থেকে যাচ্ছে। সূত্রমতে, ছিনতাইকারী শুধু পথচারীদের কাছ থেকে টাকা, মোবাইল, স্বর্ণালঙ্কার রুট করে না তারা সিএনজি চালিত অটো রিকশাও ছিনতাই করে নিয়ে যায়। ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে সারা দেশে প্রাণ গেছে এমন ভুক্তভোগীর সংখ্যাও নেহাত কম না।
বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ইদানীং আশঙ্কাজনকভাবে ছিনতাই বেড়ে গেছে। আগে রাতের বেলা হলেও এখন প্রকাশ্যে দিবালোকে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। কমলাপুর এলাকার বাসিন্দা শরীফ বলেন, চায়ের দোকানে বসলেই ছিনতাইয়ের কাহিনী শোনা যায়। রাত ১২টার পর বাইরে বের হলেই ছিনতাইকারীর কবলে পড়তে হয়। গত দুই মাসে আমার পরিচিত তিনজন ছিনতাইকারীর কবলে পড়েছেন। বলতে গেলে রাতের বেলা এখন বের হওয়াটাই বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। দারুসালাম এলাকায় বাসিন্দা মোহন আলী বলেন, আমি রাতের বেলা গাবতলি, টেকনিক্যাল, মিরপুর, এলাকায় রিকশা চালাই। আমাদের চোখের সামনে অনেক সময় ছিনতাই হয়। কিন্তু আমরা কিছুই করতে পারি না। একবার আমার এক যাত্রীকে ছিনতাই করার সময় প্রতিবাদ করেছিলাম। ছিনতাইকারীরা আমাকে ছুরি দিয়ে হাতে আঘাত করে। ১৫ দিন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছি। এখন আর কোনো প্রতিবাদ করি না। গরিব মানুষ আমি। আমার আয়ের উপর ৫ জনের সংসার চলে। আমার কিছু হলে তারা না খেয়ে মরবে। মিরপুর এলাকার বাসিন্দা মনির হোসেন বলেন, গত মাসে বাড়ি থেকে এসে ভোরে গাবতলী নেমেছিলাম। একটি রিকশা নিয়ে মিরপুরের ২ নম্বরের বাসায় যাওয়ার পথে ছিনতাইকারীর কবলে পড়ি। ব্যবসার কাজে বাড়ি থেকে আনা ৫০ হাজার টাকা, মোবাইল ফোন সবকিছু ছিনিয়ে নিয়ে গেছে।
তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দাবি করছেন, ছিনতাইকারীরা যেমন তৎপর তেমনি তাদেরকে আটক করার জন্য ব্যাপক অভিযান চলছে। ছিনতাইপ্রবণ এলাকায় সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হচ্ছে। রাতের বেলা পুলিশ, র‌্যাবের টহল বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এ ছাড়া ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যদের ধরে তাদের মূলহোতা পর্যন্ত যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার শেখ নাজমুল আলম মানবজমিনকে বলেন, ছিনতাই হয় এটা অস্বীকার করার কিছু নাই। আমরা এখন ছিনতাই ও মাদকের ওপর জোর দিয়েছি। ইতিমধ্যে বেশ কিছু গ্রুপের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরো কিছু চক্রকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছি। যারা রাতের বেলা প্রাইভেট কার নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। তাদেরকে আটক করতে পারলে ছিনতাই কমবে। তিনি বলেন, পুরো ঢাকাকে এখনও সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। গুলশান সোসাইটির সহযোগিতায় শুধুমাত্র ওই এলাকাকে পুরোপুরি সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। আমরা অন্যান্য এলাকার ব্যবসায়ী, স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলছি যাতে সব এলাকা পুরোপুরি সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা যায়। তাহলে ছিনতাই হলে ছিনতাইকারীদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে। ভুক্তভোগীদের উদ্দেশ্যে ডিএমপির এই যুগ্ম কমিশনার বলেন, যারা ছিনতাইয়ের স্বীকার হবেন তারা অবশ্যই থানায় গিয়ে অভিযোগ করবেন। কারণ অভিযোগ না করলে পুলিশ সেটা জানবে না। পুলিশ জানলে ব্যবস্থা নিতে পারবে।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর