× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা ইলেকশন কর্নার
ঢাকা, ২৪ মার্চ ২০১৯, রবিবার

নিউজিল্যান্ডে মসজিদে হামলা ৩ বাংলাদেশিসহ নিহত ৪৯

প্রথম পাতা

মানবজমিন ডেস্ক | ১৬ মার্চ ২০১৯, শনিবার, ৯:৩২

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ। মসজিদ আল নূর ও লিনউড মসজিদের বাইরে শান্তভাবে গাড়ি পার্কিং করে হামলাকারী ব্রেনটন টেরান্ট। তার গাড়িতে বাজছিল গান। ঠাণ্ডা মাথায় গাড়ি থেকে নেমে যায় সে। গাড়ির পিছন থেকে বের করে অটোমেটিক রাইফেল। সেখানে আরো অস্ত্র ছিল। দেখে মনে হয়েছে আধুনিক কোনো অ্যাসাল্ট রাইফেল। এর ১০ মিনিট আগে জুমার নামাজ শুরু হয়েছে মসজিদে।
তখন মুসল্লিতে ঠাসা ওই মসজিদ দুটি। শান্ত পায়ে অস্ত্র হাতে নিয়ে মসজিদে ঢুকে সে। এরপর  সামনে যাকেই পেয়েছে তাকেই গুলি করেছে। ভেতরে প্রবেশ করে এলোপাতাড়ি গুলি করতে থাকে। গুলি শেষ হয়ে গেলে বারবার ম্যাগাজিন রিলোড করছিল। একপর্যায়ে মসজিদের মধ্যে থাকা আহতদের গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। মসজিদের ভেতরে রক্তের বন্যা বাধিয়ে শান্তভাবে বেরিয়ে আসে হামলাকারী।

তার নৃশংসতার কবল থেকে মাত্র দু’চার মিনিটের জন্য রক্ষা পেয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের তারকারা। শুক্রবার জুমার নামাজ আদায় করতে তারা ওই সময় গিয়েছিলেন মসজিদে। ভিতরে রক্তে তখন সয়লাব। রক্তাক্ত এক নারী মসজিদ থেকে বেরিয়ে আসছিলেন রুদ্ধশ্বাসে। আরেকজন নারী তাদের ভিতরে প্রবেশ করতে বারণ করেন। বলেন মসজিদের ভিতরে গোলাগুলি হচ্ছে। গা শিউরে ওঠে বাংলাদেশ অধিনায়ক মাহমুদুল্লাহ বাহিনীর। তাদের সঙ্গে ছিলেন সাবেক টেস্ট অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম। তিনি লিখেছেন, ক্রাইস্টটার্চ মসজিদে হামলার সময় আল্লাহ আজ আমাদের রক্ষা করেছেন। আমরা অত্যন্ত ভাগ্যবান। সন্ত্রাসী ব্রেনটন টেরান্ট ততক্ষণ মসজিদের ভিতরে এলোপাতাড়ি গুলি করে কমপক্ষে ৪৯ জনকে হত্যা করেছে। তার মধ্যে রয়েছেন তিনজন বাংলাদেশি। নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে দুটি মসজিদে গতকাল এভাবেই সন্ত্রাসী হামলা হয়। এরপর ক্রাইস্টচার্চ কর্তৃপক্ষ ওই শহরের সব মসজিদ পরবর্তী নোটিশ না দেয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে সব স্কুলও।

এ হামলায় বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠেছে। বৃটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্সে নিহতদের স্মরণে পালন করা হয়েছে এক মিনিট নীরবতা। বিশ্বনেতারা নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। তবে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প কোনো নিন্দা জানান নি। এ দিনটিকে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিনদা আর্ডেন অন্ধকারময় দিন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি এ হামলাকে সন্ত্রাসী কার্যক্রম হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বলেছেন, যারা এ হামলার সঙ্গে জড়িত তারা সকলেই সন্ত্রাসী। তবে নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারির তালিকায় তাদের নাম ছিল না। তিনি প্রথমে নিশ্চিত করেন নিহতের সংখ্যা কমপক্ষে ৪০। পরে পুলিশ নিশ্চিত করে নিহতের সংখ্যা কমপক্ষে ৪৯। আহতদের মধ্যে কমপক্ষে ২০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। হামলার পর ৪ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ধারণা করা হয়, এর মধ্যে ৩ জনই হামলার সঙ্গে সমপৃক্ত।

নিউজিল্যান্ডের মসজিদগুলোতে শুক্রবারই সবথেকে বেশি মানুষ নামাজ পড়তে যান। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, হামলাকারী ব্রেনটন টেরান্ট একাই অস্ত্র হাতে নিয়ে গুলি শুরু করে। ইতিমধ্যে পুলিশ তার ছবি ও পরিচয় প্রকাশ করেছে। ব্রেন্টন টেরান্ট নামের এই সন্ত্রাসী অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। হামলার পর এর সমর্থনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ৮৭ পৃষ্ঠার একটি ঘোষণা প্রকাশ করে সন্ত্রাসীরা। পুলিশ বলেছে, ‘ব্রেনটন টেরান্ট ফ্রম’ অ্যাকাউন্টের মালিকও হামলায় যুক্ত ছিল। ঘোষণায় তারা, মুসলিম শরণার্থীবিদ্বেষী বক্তব্য তুলে ধরে। তবে এতে কারো কোনো স্বাক্ষর ছিল না।

পুলিশ কমিশনার মাইক বুশ নিহতের সংখ্যা নিশ্চিত করেছেন। তিনি স্থানীয় সময় শুক্রবার বিকালে সংবাদ সম্মেলন করেন। বলেন, ডিন্স এভিনিউয়ে আল নূর মসজিদে ৪১ জন এবং লিনউড এলাকার অন্য মসজিদে সাত জন নিহত হয়েছেন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন আরো একজন। আহত কমপক্ষে ৪৮ জন ক্রাইস্টচার্চ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। এর মধ্যে রয়েছে শিশুরাও। খুব জরুরি না হলে আহতদের দেখতে হাসপাতালে ভিড় না করতে সবার প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। মাইক বুশ বলেছেন, এ হামলায় আটক করা হয়েছে চারজনকে। এর মধ্যে তিনজন পুরুষ ও একজন নারী। এর মধ্যে ২০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। এ কথা জানিয়ে মাইক বুশ বলেছেন, শনিবার ওই ব্যক্তিকে আদালতে উপস্থাপন করা হবে।

এ হামলাকে ‘নজিরবিহীন’ এবং ‘সন্ত্রাসী হামলা’ বলে বর্ণনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী অর্ডেন। তিনি বলেছেন, নিশ্চিতভাবেই পরিকল্পনা করে এ হামলা চালানো হয়েছে। হামলার পর শোক প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী আর্ডেন বলেন, এটা নিউজিল্যান্ডের অন্ধকারতম দিনগুলোর একটি। এখানে যে ঘটনা ঘটেছে সেটা পরিষ্কারভাবেই অস্বাভাবিক এবং অপ্রত্যাশিত নৃশংসতা।

এ হামলার প্রত্যক্ষদর্শী মোহন ইব্রাহিম বাংলাদেশি। তিনি নিউজিল্যান্ডে গিয়ে থিতু হয়েছেন। যখন আল নূর মসজিদে ওই হামলা হয় তখন এর ভিতরে ছিলেন তিনি। তবে কৌশলে তিনি জীবন বাঁচিয়ে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন। তিনি এখন থেকে ৫ বছর আগে একজন ছাত্র হিসেবে নিউজিল্যান্ডে গিয়েছেন। বলেছেন, ওই এলাকার বহু মানুষকে আমি চিনি, জানি। মসজিদে গেলেই তাদের সঙ্গে নিয়মিত দেখাসাক্ষাৎ হতো। এখন আর এসব মানুষ বেঁচে নেই। এ কথা মেনে নিতে পারছি না। যা দেখেছি, তার জন্য আমার চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না। তিনি বলেন, এমন দৃশ্য কখনোই প্রত্যাশিত ছিল না। আমি তো জানি নিউজিল্যান্ড হলো বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ দেশগুলোর অন্যতম। কিন্তু এখন আমি আতঙ্কিত। আমি নিজের চোখে যা দেখেছি তা আমি কখনো কল্পনাও করতে পারি নি।

নিউজিল্যান্ডে হামলায় নিহতদের মধ্যে তিনজন বাংলাদেশি
নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে দুই মসজিদে হামলায় নিহতদের মধ্যে অন্তত তিনজন বাংলাদেশি রয়েছেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের অনারারি কনসাল ইঞ্জিনিয়ার শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আরো চার বাংলাদেশিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যদিকে এই ঘটনায় একজন নিখোঁজ রয়েছেন বলে স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটির কাছ থেকে খবর পেয়েছেন তিনি। নিহত বাংলাদেশিরা হলেন- লিংকন ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ড. আবদুস সামাদ ও তার স্ত্রী এবং হোসনে আরা ফরিদ নামের এক গৃহবধূ। আবদুস সামাদ এক সময় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। আবদুস সামাদ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে নিউজিল্যান্ডে যান।

সেখানে দীর্ঘদিন ধরে বাস করছেন তিনি। লিংকন ইউনিভার্সিটিতে কৃষি বিষয়ে অধ্যাপনা করতেন। গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজের সময় ক্রাইস্টচার্চের আল নূর ও লিনউড মসজিদে এই হামলার ঘটনায় অন্তত ৪৯ জন নিহত হন। আহত হন আরো ৪৮ জন। শুক্রবার অনেকেই জুমার নামাজ পড়তে আল নূর মসজিদে গিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু না পেয়ে খোঁজ শুরু করেন। পরে হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় কয়েকজনের ভর্তি হওয়ার খবর পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে তিনজন মারা যান। শুক্রবার জুমার নামাজের সময় এই হামলা চালায় মুসলিম বিদ্বেষী অস্ট্রেলিয়ান এক নাগরিক। প্রথমে আল নূর মসজিদে হামলা চালায় সে। পরে পার্শ্ববর্তী লিনউড মসজিদে হামলা চালায়। নৃশংস ওই হত্যাকাণ্ডের পুরো ঘটনা ফেসবুক লাইভে প্রচার করে হামলাকারী।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর