× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা ইলেকশন কর্নার
ঢাকা, ১৯ জুন ২০১৯, বুধবার
ভূমধ্যসাগর ট্রাজেডি

স্বজনের মৃত্যু দেখে কাঁদছেন সিলেটের বিলাল

বিশ্বজমিন

মানবজমিন ডেস্ক | ১২ মে ২০১৯, রবিবার, ১০:৪৭

ভূমধ্যসাগরে বড় বোট থেকে ছোট একটি প্লাস্টিকের বোটে তোলা হলো প্রায় ৭৫ জন অভিবাসীকে। তাতে স্থান সংকুলান হচ্ছিল না। গাদাগাদি করে তাতেই উঠতে হয় তাদের। এর ১০ মিনিটের মধ্যে প্রচণ্ড ঢেউয়ের আঘাতে ডুবে যায় বোটটি। আর চোখের সামনে একে একে মানুষ নির্মমভাবে মরতে থাকেন। সাহায্যের জন্য করুণ আকুতি তখন সমুদ্রপৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড়ে। দূরে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এসেছে সেই আহাজারি। কিন্তু শূণ্য সমুদ্রে তাকিয়ে তাকিয়ে স্বজনের মৃত্যু দেখা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না বাংলাদেশী অভিবাসী আহমেদ বিলালের (৩০)।
তার বাড়ি সিলেট অঞ্চলে। এমন মৃত্যু আর ভয়াবহতা দেখে তিনি চিৎকার শুরু করেছিলেন। বলেছেন, বয়সে ছোট আমার দুই নিকট আত্মীয় পানিতে হারিয়ে গেলো। তাকিয়ে দেখলাম আর চিৎকার করলাম। কান্না থামাতে পারছিলাম না কোনোভাবে। সেই ভয়াবহ দৃশ্যকে কোনোভাবেই ভুলতে পারছেন না বিলাল। এখনও হাউমাউ করে কাঁদছেন তিনি। মৃত্যুবীভিষিকা তার বুকে সৃষ্টি করেছে এক আতঙ্ক। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টিআরটি ওয়ার্ল্ড।

তিউনিশিয়া উপকূলে নৌডুবিতে মারা গেছেন কমপক্ষে ৬০ অভিবাসী। এর বেশির ভাগই বাংলাদেশী। জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ১৬ জনকে। তার মধ্যে ১৪ জনই বাংলাদেশী বলে জানাচ্ছে রেড ক্রিসেন্ট। তাদের অন্যতম আহমেদ বিলাল। তিনি বলেছেন, ৬ মাস আগে থেকে তার ইউরোপ যাত্রার মিশন শুরু হয়েছিল। অন্য তিনজনকে সঙ্গে নিয়ে তিনি চলে যান দুবাইয়ে। সেখান থেকে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে। ইস্তাম্বুল থেকে তারা একটি ফ্লাইটে করে চলে যান লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি। বিলাল বলেন, সেখানে আরো প্রায় ৮০ জন বাংলাদেশীর সঙ্গে যোগ দিই আমরা। আমাদেরকে তিন মাস লিবিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে একটি রুমে আটকে রাখা হয়েছিল। এ অবস্থায় মনে হয়েছিল, ওই লিবিয়াতেই বুঝি মারা যাবো। দিনে মাত্র একবার আমাদেরকে খাবার দেয়া হতো। তাও পরিমাণে কম। এই ৮০ জন মানুষের ব্যবহারের জন্য ছিল মাত্র একটি টয়লেট। আমরা গোসল করতে পারতাম না। পারতাম শুধু মুখ ধুতে। দিনরাত শুধু কাঁদতাম আমরা। খাবার চেয়ে কান্নাকাটি করতাম।

আহমেদ বিলালের যখন বাড়ি ছাড়েন তখন আন্দাজ করতে পারেন নি এই সফরের পরিণতি কি হতে পারে। সিলেটে থাকা অবস্থায় তিনি দেখেছেন বহু মানুষ ইউরোপে বসবাস করছেন। তারা উন্নত জীবন যাপন করছেন। তা দেখে তিনি প্রলুব্ধ হয়েছিলেন। তাই জমি বিক্রি করেছেন। ‘গুড লাক’ ডাকনামের এক বাংলাদেশী পাচারকারীর হাতে এই সফরের জন্য দুই সন্তানের জনক বিলাল তুলে দিয়েছেন প্রায় ৭ হাজার ডলার। তিনি বলেন, ওই পাচারকারী বলেছিল, আমার জীবন উন্নত হবে। সব পাল্টে যাবে। আমরা তাই বিশ্বাস করেছিলাম। আমি নিশ্চিত তিনি এই পথে যত মানুষ পাঠিয়েছেন তার বেশির ভাগই মারা গেছেন।

ডুবে যাওয়া ওই বোটে ছিলেন মিশরের নাগরিক মানজুর মোহাম্মদ মেটওয়েল্লা (২১)। তিনি বলেন, আমাদেরকে বড় বোট থেকে ছোট বোটে নামানো হলো। এর পর পরই তা ডুবে যেতে শুরু করে। আমরা সারারাত সাঁতার কাটতে থাকি হিম ঠাণ্ডা পানিতে। এ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছেন সিলেটের বিলালও। তিনি বলেছেন, এক পর্যায়ে বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু আল্লাহর তরফ থেকে আমাদের কাছে পাঠানো হয়েছে ওই জেলেদের। তাদের বদৌলতে আমরা জীবন ফিরে পেয়েছি। জেলেরা উদ্ধার করেছেন ১৪ জন বাংলাদেশী, মরক্কোর একজন নাগরিক ও মিশরের মেটওয়েল্লাকে। এ জীবনকে তারা দ্বিতীয় জীবন বলে আখ্যায়িত করছেন। এ জীবনেও এক অন্ধকার ভবিষ্যত বিলালের সামনে। তিনি বলেন, আমি সবকিছু হারিয়েছি। এখন আমার আর সম্বল বলতে কিছুই নেই। তাই জীবন বাঁচাতে, পরিবারকে বাঁচাতে এখনও আমি অর্থ উপার্জনের জন্য ইউরোপে যেতে যাই। যে ঝুঁকি নিয়েছি, সেভাবে আর যেতে চাই না।
দাতব্য সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (এমএসএফ)-এর হিসাবে লিবিয়ায় ৬০০০ অভিবাসীকে আটক করে রাখা হয়েছে এমন এক অবস্থায় যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড থেকে অনেক নিচে। পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার খলিফা হাফতার গত মাসে ত্রিপোলিকে দখলে নেয়ার অভিযান শুরু করেন। এতে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সেনা বাহিনীর সঙ্গে এ লড়াইয়ে কমপক্ষে ৪৫০ জন মানুষ নিহত হয়েছেন।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর