× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা ইলেকশন কর্নার
ঢাকা, ২৭ জুন ২০১৯, বৃহস্পতিবার

থানার গাড়িচালকের রহস্যজনক মৃত্যু

শেষের পাতা

জিয়া চৌধুরী | ২২ মে ২০১৯, বুধবার, ৯:৫৫

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পল্লবী থানার এক গাড়িচালকের মৃত্যুকে ঘিরে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। নিহত গাড়িচালক আমিনুল ইসলাম গত রোববার সকালে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হলে হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যান বলে দাবি পুলিশের। তবে, আমিনুলের পরিবারের সদস্যরা পুলিশের এমন বক্তব্য মানতে নারাজ। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে বলে মামলা করতে পুলিশ চাপ দিচ্ছে বলেও অভিযোগ পরিবারের। এদিকে, ঘটনার সূত্র ধরে পল্লবীতে পুলিশের দাবি করা দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে তেমন কোন প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান পাওয়া যায়নি। স্থানীয়রা ওইদিন সকালে একজনকে ধস্তাধস্তি করে হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেখেছেন। ঝুটপল্লী এলাকার ওই ঘটনাস্থলের কাছে থাকা একটি দোকানের সিসিটিভি ফুটেজে একটি প্রাইভেটকার থেমে থাকতে দেখলেও দুর্ঘটনার বিষয়ে স্পষ্ট কোন ছবি বা ভিডিও দেখা যায়নি। নিহত আমিনের খালাতো ভাই আজিজুল ইসলাম রনি সন্দেহ করছেন ঝুটপল্লী এলাকার মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কোন্দলের জেরে মারধরের শিকার হতে পারেন তার ভাই।
আজিজুলের দাবি, সেখানকার মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পূর্বশত্রুতার জেরে খুন হয়ে থাকতে পারেন আমিন। এছাড়া ঘটনার দিন ওই গাড়ি নিয়ে ডিউটিতে থাকা পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক সোহেল রানার গতিবিধি যথেষ্ট সন্দেহজনক ঠেকছে নিহতের পরিবারের কাছে।

পল্লবী থানার কয়েকজন সোর্স দিয়ে নিহতের পরিবারকে অনেকটা নজরবন্দি করে রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের দাবি, আমিনুল ইসলাম রাজধানীর মিরপুরের ঝুটপল্লীর নব্য ক্যাফে নামের একটি রেস্তোরাঁর সামনের সড়কে দুর্ঘটনার শিকার হন। কিন্তু পুলিশের এমন বক্তব্যের সূত্র ধরে ঘটনাস্থলে গিয়ে তেমন কোন প্রত্যক্ষদর্শী ও তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ওদিন সকালে দুর্ঘটনা বিষয়টি কেউ দেখেছেন এমন একজনকেও খুঁজে পাননি এই প্রতিবেদক। তবে একজন লোককে ঘিরে জটলা ও পুলিশ সদস্যরা তাকে অটোরিকশায় করে হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেখেছেন বলে জানান কয়েক দোকানি। এছাড়া নব্য ক্যাফে এবং ফাস্ট লেডি বেনারসি দোকানে ঢুকে সিসিটিভির ফুটেজে সড়কের মাঝখানে শুধু একটি প্রাইভেটকার থেমে থাকতে দেখা যায়। দুর্ঘটনার বিষয়ে স্পষ্ট কোন ভিডিও এই দুই প্রতিষ্ঠানের সিসিটিভিতে দেখা যায়নি। তবে দু-একজনকে দৌঁড়াতে দেখা গেছে। রাজধানীর বাউনিয়া বাঁধের বি ব্লকে পরিবার নিয়ে থাকতেন আমিনুল ইসলাম আমিন। স্ত্রী কল্পনা রহমান, দুই সন্তান ও মাকে নিয়ে ছিল সংসার। গতকাল মঙ্গলবার সকালে ওই বাসায় গেলে এই প্রতিবেদকের সামনে জড়ো হন আশপাশের প্রতিবেশিরা।

এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আমিনের মৃত্যু নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। নিহত আমিনের ছোট ভাই মমিন, মামাতো ভাই আজিজুর এবং শ্বাশুড়ি হাজেরা বেগম পুলিশের বিরুদ্ধে তথ্য আড়ালের অভিযোগ করেন। তারা মানবজমিনকে জানান, ঘটনার পর থেকে পুলিশ একেক বার একেক কথা বলছে। এই নিয়ে পুলিশ তিনটি স্থানে দুর্ঘটনা হয়েছে বলে আমাদের জানায়। কিন্তু তিনটি স্থানের কোথাও এমন ঘটনার প্রমাণ পাইনি আমরা। এমনকি কেউ বলতেও পারছে না কীভাবে কি হয়েছে। এর আগে ঘটনাস্থল দেখতে কয়েকবার পুলিশকে অনুরোধ করলেও তারা নিয়ে যেতে চায়নি। বরং পুলিশ আমাদের সড়ক দুর্ঘটনার মামলা দিতে বলেছে। মামলা দেয়ার আগে পুলিশ ঘটনাস্থল দেখাবে না বলেও কয়েকবার জানায়। আমিনুল ইসলাম আমিনের স্ত্রী কল্পনা রহমান মানবজমিনকে জানান, পুলিশ আমাকে বলেছিল মিরপুরের ঝুটপল্লীর নব্য ক্যাফে নামের একটি রেস্টুরেন্টের সামনে এই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। পরে আমি একা আশপাশের বহু দোকানে গিয়েছি। কেউ জানে না এক্সিডেন্ট হয়েছে। ১২ জন দোকানদারের কথা ভিডিও করেছি। আমার কাছে সব প্রমাণ আছে। এখানে কিছু একটা আছে। মঙ্গলবার পুলিশের সঙ্গে ঝুটপল্লীতে গেলাম, অনেক দোকানে গেলাম। কিন্তু তেমন কোনো প্রমাণ তো পেলাম না। প্রমাণ না পেয়ে কার বিরুদ্ধে মামলা দেবো?

মামলা দেব না। পারলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করুক। আমিনের স্ত্রী আরো বলেন, রোববার আমি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গেলে এসআই সোহেল আমাকে বলেছিলেন আমিনকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে। কিন্তু সেখানে তাকে নেয়া হয়নি। ২টার দিকে আমিনকে মর্গে দেখতে পাই। মর্গে গিয়ে দেখি আমিনের হাত-পা নাড়ছে। কান পেতে দেখি শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে। তখন ডাক্তারদের জানালে তারা কাগজপত্র চান। তখন এসআই সোহেলকে ফোন দিলে তিনি ফোন ধরেননি। কাগজ না দেখানোর ফলে ডাক্তাররা তাকে পুনরায় চিকিৎসাও দিতে চায়নি। তখন আমিনকে মর্গ থেকে আমরা বের করে নিয়ে আসি। হাসপাতালের লোকজন আমাদের মার দিয়ে বের করে দিয়ে আমিনকে আবার মর্গে নিয়ে যায়। এদিকে আমিনের খালাতো ভাই আজিজুল ইসলাম রনি সন্দেহ করছেন ঝুটপল্লী এলাকার মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের কোন্দলের জেরে মারধরের শিকার হতে পারেন তার ভাই। তার দাবি, সেখানকার মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের পূর্বশত্রুতার জেরে খুন হয়ে থাকতে পারেন আমিন। তিনি বলেন, গত রোববার ঘটনার দিন রোজা রেখেছিল আমিন ভাই। এমনকি ফজরের নামাজও পড়েছিল। সকাল আটটার সময় কাজের উদ্দেশ্যে বের হয়ে যায়। তবে, দুর্ঘটনার ঘটনার পর পুলিশ আমাদের খবর জানায়নি।

একজন রিকশাচালক নিজ থেকে এসে আমাদের খবরে দেয়। এসআই সোহেল আমিন ভাইকে মিরপুরের কয়েকটি হাসপাতালে ভর্তি করে বলে আমাদের জানায়, কিন্তু এমন বক্তব্যের বিপরীতে কোন কাগজপত্র দেখাতে পারেনি। এমনকি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে একজন সোর্স আমিন ভাইয়ের ফোন ধরে আমাদের জানায়। পরে, এসআই সোহেল মাঝপথে একবার জানায় যে সে মারা গেছে। এমনকি ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে তাকে অজ্ঞাত বেওয়ারিশ মরদেহ হিসেবে রেজিস্ট্রি করে বলে আমরা জানতে পারি। আমিন ভাইকে হাসপাতালে নেয়ার পর থেকে কয়েক ঘণ্টা লাপাত্তা ছিলো এসআই সোহেল। আমিনকে মর্গ থেকে হাসপাতালে নিয়ে আসার সময় এসআই সোহেল না থাকায় কাগজপত্র দেখাতে পারেনি পরিবারের সদস্যরা। ওই সময় তাকে চিকিৎসা দেয়া গেলে তাকে বাঁচানো সম্ভব হতো বলেও ধারণা। আজিজুল মানবজমিনকে বলেন, আমি লাশ দেখেছি। সড়ক দুর্ঘটনায় আঘাত পাওয়ার মতো কোন চিহ্ন তার শরীরে ছিলো না। বরং তার মুখে, হাতে ও পায়ে আঘাতের চিহ্ন ছিল। শার্ট-প্যান্ট টেনে ছেঁড়ার মতো অবস্থায় দেখেছি। আমরা ধারণা করছি, তাকে ধস্তাধস্তি করে কয়েকজন মিলে মারধর করেছে। এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক এসআই সোহেল রানা মানবজমিনকে বলেন, সিসিটিভির ফুটেজের বাইরে আমার কিছু বলার নেই। এখানে লুকানোর কিছু নেই। আমিন আমাকে বলে ওয়াশরুমে গিয়েছিল। এরপর সে রোড এক্সিডেন্টে মারা যায়। তবে, প্রায় ৪০ মিনিট ধরে একজন গাড়িচালক কি করে পুলিশ ফোর্সের সাথে না থেকে আলাদা ছিলেন এমন প্রশ্নও এড়িয়ে যান এই উপ-পরিদর্শক। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম গতকাল মানবজমিনকে বলেন, আমিনের স্ত্রী তো আমার সামনেই কয়েকবার বললেন, স্যার, আমার স্বামী তো এক্সিডেন্টে মারা গেছে।

যা যা করার দ্রুত করেন। তবে আপনাদের সঙ্গে কি বলেছে তা তো আমি জানি না। পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার এমন বক্তব্য নাকচ করে দেন আমিনের স্ত্রী কল্পনা আক্তার। তিনি বলেন, আমার সঙ্গে ওসি সাহেবের এমন কোন কথা হয়নি। ডিএমপি মিরপুর বিভাগের পল্লবী জোনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার শেখ মোহাম্মদ শামীম বলেন, সিসিটিভির ফুটেজ দেখে এটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, আমিন এক্সিডেন্ট করেছে। সে যেহেতু পুলিশের ড্রাইভার ছিল সেহেতু আমি তাকে সেমি পুলিশই ভাববো। তার জন্য আমারও খারাপ লাগছে। ওই নারী আমার কাছে সগযোগিতাও চেয়েছে। দেখি কিছু করা যায় কি না। কিছু টাকাসহ একটা চাকরির ব্যবস্থা করা যায় কিনা চেষ্টা করবো।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর