× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা ইলেকশন কর্নার
ঢাকা, ২১ জুলাই ২০১৯, রবিবার

হংকং উত্তাল কেন?

বিশ্বজমিন

মানবজমিন ডেস্ক | ১৪ জুন ২০১৯, শুক্রবার, ৯:২০

প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে হংকং। অনানুষ্ঠানিক হিসাবে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমেছেন প্রস্তাবিত আইনের বিরুদ্ধে। এই আইনে বলা হচ্ছে, প্রত্যাবর্তন চুক্তি না থাকলেও কোনো আসামিকে চীনসহ যেকোনো দেশে পাঠানো যাবে। অব্যাহত প্রতিবাদে হংকং-এর সরকার এই আইন পার্লামেন্টে উত্থাপনের তারিখ পিছিয়ে দিয়েছে। তবে একেবারেই বাতিল করেনি। সরকার বলছে, হংকং যেন অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত না হয়, সেজন্যই এই আইন প্রয়োজন। প্রধান নির্বাহী ক্যারি ল্যাম আরো বলেছেন, বাকস্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিতে আইনে বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া রাজনৈতিক মামলা এই আইনের আওতাভুক্ত হবে না।
তিনি আরো যুক্তি দেখিয়ে বলেছেন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে এই প্রস্তাবিত আইন সঙ্গতিপূর্ণ। শুধু গুরুতর অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবিশেষকেই এই আইন প্রয়োগ করে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর কথা বিবেচনা করা হবে।
তবে হংকং-এর বৃহত্তর সামাজিক অংশটিই এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছে। আইনজীবী, প্রভাবশালী আইনি সংস্থা, ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্ব, চেম্বার অব কমার্স, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী ও পশ্চিমা কূটনীতিকরা এই আইনের বিরোধিতা করেছেন। তারা আশঙ্কা করছেন, এই আইনের কারণে স্বায়ত্তশাসিত এই শহরের ৭৩ লাখ বাসিন্দা, এমনকি এই শহরের বিমানবন্দর ব্যবহারকারী ব্যক্তিবিশেষ চীনের সরকার-প্রভাবিত আদালতের নির্দেশের আওতাভুক্ত হয়ে যেতে পারেন।
বুধবার এই আইন উত্থাপনের কথা থাকলেও আইন পরিষদ তা পিছিয়েছে। লাখ লাখ মানুষ হাজির হয়ে আইন পরিষদের ভবন বন্ধ করে দিয়েছে। শহরের প্রাণকেন্দ্র স্থবির করে রেখেছেন প্রতিবাদকারীরা। আশেপাশের সড়কজুড়ে প্রতিবাদকারীদের ব্যাপক ভিড়। এদের মধ্যে তরুণদের আধিক্য চোখে পড়ার মতো। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের আশেপাশে পুলিশের সঙ্গে লড়াইও করেছেন তারা। প্রতিবাদকারীদের থামাতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছুঁড়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে প্রচুর বিক্ষোভ সত্ত্বেও খুব একটা পিছু হটতে রাজি নয় সরকার। এক সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আইন পরিষদের সভা পরবর্তীতে অনুষ্ঠিত হবে। পরিষদ সদস্যদের তা জানিয়ে দেয়া হবে।
প্রতিবাদের পর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন প্রধান সচিব ম্যাথিও চিউং। তিনি প্রতিবাদকারীদের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক উন্মুক্ত করে দেয়া, বিক্ষোভ প্রত্যাহার করার আহ্বান জানিয়েছেন। আইন অমান্য না করতে বলেছেন। তবে এই আইন নিয়ে আইনসভায় অনুষ্ঠেয় বিতর্কের সময় পেছানোর পরও আন্দোলনকারীরা পিছু হটতে রাজি হননি।
শিক্ষার্থী চার্লস লি বলেন, ‘সভা পেছানোই যথেষ্ট নয়। আমরা চাই এই প্রস্তাবিত আইন বাতিলের জন্য বিবেচনা করা হোক। যদি নাগরিকদের প্রতি তাদের আচরণ এই হয়, তাহলে সংঘাত অনিবার্য।’
প্রসঙ্গত, চীনের অংশ হলেও মূল ভূমির চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে হংকং। হংকং-এ রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও আছে, যেটা চীনে সহ্যই করা হয় না। কিন্তু তা সত্ত্বেও অনেক প্রতিবাদকারীই নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি। অনেকে এসেছেন মুখোশ পরে। এর একটি কারণ হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কয়েকবার বড় ধরনের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক বিক্ষোভ হয়েছে হংকং-এ। এরপর থেকে এ ধরনের বিক্ষোভের ব্যাপারে ক্রমশই কড়া অবস্থান নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

এবারের বিক্ষোভে পুলিশ জলকামান ও পেপার সেপ্র ব্যবহার করেছে। এছাড়া পুলিশ সাইনবোর্ড টাঙিয়ে বলেছে, তারা বল প্রয়োগে প্রস্তুত। রোববার অনানুষ্ঠানিক হিসাবে প্রায় ১০ লাখ মানুষ রাজপথে নেমেছে। ১৯৯৭ সালে সাবেক এই বৃটিশ কলোনি চীনের কাছে হস্তান্তরের পর থেকে এটি ছিল এই শহরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভের একটি।
এর সঙ্গে মিল আছে ২০১৪ সালের গণতন্ত্রপন্থি আমব্রেলা আন্দোলনের। ওই আন্দোলনকারীরাও হংকং-এর প্রধান প্রধান সড়ক দখলে নিয়ে যায়। তাদের দাবি ছিল, হংকং-এর নির্বাচনে আগেই প্রার্থী বাছাই করে ফেলার যে পরিকল্পনা বেইজিং নিয়েছিল, তা বাতিল করতে হবে। সেবারের মতো এবারও হংকং রীতিমতো প্যারালাইজড হয়ে গেছে। প্রধান নির্বাহী ক্যারি ল্যামের প্রশাসনের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তার চীনা সরকারি সমর্থকরাও হয়তো কিছুটা বিপাকে।
হংকং-এর চাইনিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক উইলি লাম বলেন, ২০১৪ সালে তরুণরা বেশি জড়িত ছিল এই আন্দোলনে। কিন্তু এবারের প্রত্যাবর্তন আইনের বিরুদ্ধে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সমর্থন আছে। ব্যবসায়ী, আইনজীবী ও পেশাজীবীসহ এনজিও কর্মী ও শিক্ষার্থীরা এতে সমর্থন দিচ্ছেন। এ কারণেই এই আন্দোলন তুঙ্গে উঠেছে।
তিনি আরো বলেন, প্রশাসন এই আইন নিয়ে জনসমর্থন সৃষ্টিতে নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এই আইনের পক্ষে বেইজিং-এর কড়া সমর্থন থাকায় জনসাধারণের মধ্যে এর বিরোধিতা আরো বেড়েছে। হংকং-এর বেশিরভাগ মানুষ চীন সরকারের খবরদারির বিরুদ্ধে। কয়েক বছর ধরে হংকং-এ ব্যাপক প্রভাব বৃদ্ধি হয়েছে চীন সরকারের।
রোববারের বিক্ষোভকে দেখা হচ্ছে চীন সরকারের প্রতি স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই অধিকতর স্বায়ত্তশাসন চান। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিজে সরাসরি বলেছেন, এই দাবি তিনি সহ্য করবেন না।
২০১৭ সালে বর্তমান প্রধান নির্বাহী ক্যারি ল্যাম নির্বাচিত হন। তবে সরাসরি জনগণের ভোটে নয়। তাকে বেছে নেয় বেইজিং-পন্থি অভিজাতদের আধিপত্য আছে এমন একটি কমিটি। তার প্রতি চীনা কম্যুনিস্ট পার্টির সমর্থন আছে এমনটা ভাবা হয়। আইন পরিষদেও রয়েছে প্রচুর বেইজিংপন্থি আইনপ্রণেতা। স্থানীয় যারাই চীনের সমালোচনা করেছেন তারা শি জিনপিং ক্ষমতায় আসার পর থেকে আরো চাপে পড়েছেন। ২০১৫ সালে একজন সুইডিশসহ হংকং-এর কয়েকজন বইবিক্রেতা আটক হন চীনে। এরপর থেকে আর খোঁজ পাওয়া যায়নি তাদের। এপ্রিলে, ২০১৪ সালের আমব্রেলা আন্দোলনের ৯ শীর্ষ স্থানীয় নেতাকে বিভিন্ন অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। মে মাসে ওই আন্দোলনের দুই কর্মীকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয় জার্মানি। সাম্প্রতিক বছরে তারাই ছিলেন হংকং থেকে পশ্চিমা কোনো দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী হওয়া প্রথম দুই ব্যক্তি।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর