× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা ইলেকশন কর্নার
ঢাকা, ২১ জুলাই ২০১৯, রবিবার

১৮ মাইল জাতপুর অভিযান

দেশ বিদেশ

সৈয়দ দিদার বখ্‌ত | ১৫ জুন ২০১৯, শনিবার, ৯:৫০

মুক্তিযুদ্ধ অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছে। একের পর এক যুদ্ধে আমরা লক্ষ্য করছি পাক হানাদার বাহিনী শুধুমাত্র ক্যান্টনমেন্ট সীমানার মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে। দিন দিন মুক্তিযোদ্ধারা  তাদের বিচরণ এলাকা বৃদ্ধি করে চলেছে। সম্প্রসারিত এলাকায় মুক্তিযোদ্ধারা চলাফেরা করছে অবাধে। তবে রাজাকার বা পাক সেনাবাহিনী মাঝে মধ্যে তাদের সম্মিলিত সশস্ত্র বহর নিয়ে চলাফেরা করছে। মুক্তিযোদ্ধারা “হিট অ্যান্ড রান” পদ্ধতিতে ওদের ওপর হামলা করছে। উদ্দেশ্য তাদের অবস্থান থেকে যেন বাইরে বেরুতে না পারে। এভাবেই তাদের ঘরের মধ্যে আটকে রাখার জন্য কৌশল যুদ্ধে “গেরিলা যুদ্ধে” মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।
এ সময়ে সমন্বয় কমিটি বামপন্থি দলগুলোকে একত্রে যুদ্ধে লিপ্ত করার তাগিদ অনুভব করায় আমাকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বললো। খুলনা জেলার ডুমুরিয়াতে ইপিসিপি (এমএল) দলের অন্যতম ঘাঁটি বলে পরিচিত ছিল। আমি নদীপথে একটি জেলে নৌকায় মাঝি সেজে তাদের ঘাঁটিতে পৌঁছালাম। ঐ ঘাঁটির নেতা মজিদ মাস্টার ও আব্দুর রউফ। দুজনেই আমার বিএল কলেজের সহপাঠী। সালতা নদী পার হয়ে তাদের ঘাঁটিতে পৌঁছালাম। আমার নৌকার মাঝি হিসেবে আমার সঙ্গে ছিল কামরুল ইসলাম। যুদ্ধ পরবর্তী কামরুল তালা কলেজের ফিজিক্সের প্রফেসর হিসেবে যোগদান করে। ডুমুরিয়াতে মজিদ রউফদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা খুব একটা ফলপ্রসূ না হলেও মোটামুটি আক্রমণাত্মক মনোভাব দূর করতে সক্ষম হয়েছিল। সমন্বয় কমিটির বক্তব্য ছিল যেসব দল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে লড়ছে তাদের যৌথভাবে যুদ্ধ করা উচিত। প্রধান শত্রু পাক হানাদার বাহিনী এবং পাক শাসক অপসারিত হলে পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা স্ব স্ব অবস্থানে থেকে সর্বদলীয় শাসন ব্যবস্থা স্থাপন করতে সক্ষম হবো। সেটা আলাপ- আলোচনা করে ঠিক করা যাবে বলে আমি প্রস্তাব রাখলাম। ওদের বক্তব্য আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হচ্ছে- তা নিছক ভারতের অধীনস্থ- ভারতে প্রশিক্ষিত ভারতের অগ্রগামী সশস্ত্র বাহিনী। এদের সঙ্গে এক সাথে যুদ্ধ করলে তাদের অবস্থানও ভারতীয় বাহিনীর অধীনস্থ একটি বাহিনীতে রূপান্তরিত হবে। এতে ভবিষ্যতে দেশ স্বাধীন হলে ভারতীয় খবরদারি অব্যাহত থাকবে এবং বামপন্থি দলগুলোকে কোণঠাসা করে নিশ্চিহ্ন করে ফেলবে। আলাপ-আলোচনা ফলপ্রসূ না হলেও একটি বিষয়ে আমরা একমত পোষণ করলাম। বিষয়টি হচ্ছে দেশ স্বাধীন করার লক্ষ্যে যেসব দল (বামপন্থি-ডানপন্থি) অংশগ্রহণ করেছে তারা যেন একে অপরের ওপর আঘাত না হানে। এ ধরনের আক্রমণাত্মক ঘটনা ঘটলে মুক্তিযুদ্ধ দুর্বল হয়ে পড়বে এবং আমাদের কমন শত্রু পাক হানাদার বাহিনী শক্তিশালী হয়ে পড়বে। তালাতে ফেরার জন্য নৌকাতে ওঠার পূর্বেই পাকিস্তানি হানাদারদের একটি সশস্ত্র বহর আমাদের পথ আটকায়। আমার আসা হলো না। প্রচুর গোলাগুলি হলো। তিনদিন অবরুদ্ধ হয়ে ছিলাম আমরা। খাবার ফুরিয়ে গেলে ক্ষুধায় সবাই অতিষ্ঠ। ভীষণ কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে। ভাতের অভাবে জীবন ওষ্ঠাগত। একদিন ঘাসের গোড়া সিদ্ধ করে তাই খেয়ে কাটালাম। এরপর নদীর অপর পাড় থেকে আমাদের একটি বাহিনী হানাদারদের ওপর আঘাত হানে। ফলে তারা পিছু হঠতে বাধ্য হয়। আমরা নদী পার হয়ে জেয়ালা নলতা গ্রামে জেলেপাড়ায় নিজেদের ঘাঁটিতে ফিরে আসতে সক্ষম হই। এরপর মুজিব বাহিনীর অন্যতম সংগঠক কামরুজ্জামান টুকু বর্তমানে বাগেরহাট জেলার জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান- আমার সঙ্গে এসে দেখা করেন। তার সঙ্গে যুদ্ধের কৌশল নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। এরপর বিএল কলেজের এক সময়ের ছাত্রলীগ নেতা দৌলতপুরের ইউনুছ আমার সঙ্গে দেখা করেন। ইউনুছ মুজিব বাহিনীর সংগঠক। আমরা একসঙ্গে যৌথভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেই। এর কয়েকদিন পর খবর পেলাম পাকিস্তানি সাঁজোয়া বাহিনী তালাতে আক্রমণ পরিচালনা করে মুক্তিযোদ্ধাদের নির্মূল করার জন্য পরিকল্পনা করছে। সংবাদ পেয়ে সাতক্ষীরা-খুলনা মহাসড়কের মাঝে আঠারো মাইল নামে পরিচিত জায়গায় আমরা রাস্তা কেটে দিলাম যাতে গাড়িবহর নিয়ে আর্মির সাঁজোয়া বাহিনী আমাদের আক্রমণ করতে না পারে। ১৮ মাইল রাস্তা দিয়ে তালা, কপিলমুনি হয়ে পাইকগাছা ৩৩ কি.মি. পর্যন্ত চলাচলের রাস্তা। আমাদের পরিকল্পনা এই রাস্তা বন্ধ করে দিলে পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল পাকিস্তানি বাহিনীর খবরদারির আওতামুক্ত হবে। আমরা মুক্ত এলাকায় অবাধে চলাচল করতে সক্ষম হবো। পাকিস্তানি বাহিনী ১৮ মাইল দিয়ে ঢুকতে চেষ্টা করে রাস্তা কাটা দেখে থমকে দাঁড়ায়। আমাদের গার্ডপোস্ট তাদের ওপর গুলি করে। সকালে খবর পেয়ে কামেল ৮/১০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে জাতপুর এলাকায় পজিশন নেয় এবং আর্মির ওপর গুলিবর্ষণ করে। দুপুর ২/৩টা পর্যন্ত গোলাগুলি অব্যাহত থাকে। এই এলাকার যুদ্ধে শোনা যায় ২-৩ জন পাকসেনা  নিহত হয়েছিল। ওরা তালাতে ঢুকতে না পারায় গ্রামবাসীর ওপর রাজাকার ও শান্তি কমিটির অত্যাচার সকল মাত্রা অতিক্রম করলো। ফলে দেশবাসী পাক হানাদার বাহিনীর ওপর আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সকল সাহায্য-সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে শুরু করলো। এভাবেই দিনের পর দিন দেশে মুক্তাঞ্চল তৈরি হতে থাকলো। বিশেষ করে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল পাক হানাদার বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ মুক্ত হয়ে পড়ছিল এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণের আওতায় চলে আসছিল। এভাবেই যতদিন যাচ্ছে ধীরে ধীরে বাংলাদেশ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হচ্ছিল। (চলবে)

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর