× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা ইলেকশন কর্নার
ঢাকা, ১৬ জুলাই ২০১৯, মঙ্গলবার

ইরানে হামলার নির্দেশ দিয়েও কেন প্রত্যাহার করলেন ট্রাম্প?

বিশ্বজমিন

নিউ ইয়র্ক টাইমস | ২৩ জুন ২০১৯, রবিবার, ১০:৪৩

তিনি জেনারেলদের কথা শুনলেন। তিনি কূটনীতিকদের কথা শুনলেন। এগিয়ে এলেন কংগ্রেস নেতারা। উপদেষ্টারাও পরামর্শ দিলেন। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যার পরামর্শ শেষতক কানে নিলেন, তিনি আর কেউ নন, প্রেসিডেন্টের অন্যতম প্রিয় টিভি উপস্থাপক ফক্স নিউজের টাকার কার্লসন। ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের মত ছিল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা চালানো হোক। কিন্তু কার্লসন তার আগেই ট্রাম্পকে বলে রেখেছেন, তেহরানের উস্কানির বিপরীতে শক্তি প্রয়োগ পাগলামো বৈ কিছু হবে না। তিনি প্রেসিডেন্টকে আরও বলেছেন, যেই উগ্রপন্থীরা তাকে ইরানের ওপর হামলা করতে বলছে, তারা প্রেসিডেন্টের স্বার্থ দেখছে না।
কার্লসন ট্রাম্পকে এমনও বলেছেন যে, যদি সত্যি সত্যি তিনি ইরানের ওপর হামলা চালান, তাহলে নিজের পুনঃনির্বাচনের স্বপ্ন দেখা বাদ দিতে পারেন।

কার্লসনের উপদেশ কতটা কাজে লেগেছে বলা কঠিন। তবে ইরানে হামলা করা নিয়ে ট্রাম্পের নিজের মধ্যেও সংশয় ছিল। প্রেসিডেন্টের নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, মাত্র ১০ মিনিট বাদেই তারই নির্দেশে ইরানে হামলা চালাতে প্রস্তুত হয়ে ছিল সব কিছু। কিন্তু শেষ অবদি এই হামলায় প্রায় ১৫০ জন মানুষ নিহত হতে পারে জেনে তিনি এই হামলা না করার নির্দেশ দেন।
ব্যক্তি হিসেবে ট্রাম্পকে যতটাই আক্রমণাত্মক দেখাক, ট্রাম্প বেশ কয়েকবারই শক্তি প্রয়োগ করা থেকে বিরত থেকেছেন। তিনি মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যে উদ্দেশ্যহীন যুদ্ধে প্রচুর অর্থ আর মানুষের জীবন হারিয়েছে আমেরিকা। নিজের পূর্বসূরিদের ভুল আর পুনরাবৃত্তি করতে চান না তিনি।

টাকার কার্লসন সহ ইরান যুদ্ধ নিয়ে সংশয়বাদীরা মনে করেন, ইরানে হামলা চালানো হলে তাতে কোনো সহজ বিজয় তো আসবেই না, বরং এটি দ্রুতই একটি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। নিজের নির্বাচনী প্রচারাভিযানে যুদ্ধের বিরুদ্ধে এত প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফের নয়া এক যুদ্ধে লিপ্ত হওয়াটা হবে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ। সুতরাং, সন্ধ্যা নাগাদ যদিও দেশের শক্তিমত্তার জানান দিতে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে অঙ্গীকার করেছিলেন ট্রাম্প, শেষ অবদি তিনি সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চারকে নিষ্ক্রিয় করার নির্দেশ দেন।

মার্কিন সিনেটের ফরেইন রিলেশন্স কমিটির চেয়ারম্যান সিনেটর জিম রিশ বলেন, ‘যারা সামরিক পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসায় প্রেসিডেন্টের সমালোচনা করতে চান, আমি তাদের বলতে চাই, নিজেদের ভাগ্যবান ভাবুন, কেননা আপনাকে সেই সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে না। আমি তাকে দেখেছি, তিনি এ নিয়ে কতটা ভয়াবহ অবস্থায় ছিলেন।’

কীভাবে ট্রাম্প একটি বিদেশী রাষ্ট্রে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিলেন এবং পরবর্তীতে তা বাতিল করলেন, তার পূর্ন কাহিনীর অনেকটাই রহস্যে ঘেরা। যারা সিদ্ধান্তপ্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট ছিলেন, তারাও এমনকি জানেন না কী হয়েছে। হামলার সিদ্ধান্ত যেদিন নেওয়া হচ্ছিল, সেদিন শাসক দল ও সরকারের পক্ষ থেকে হামলা নিয়ে সাংঘর্ষিক বক্তব্য আসছিল। কিন্তু হোয়াইট হাউজ থেকে কারও বক্তব্যের পক্ষে-বিপক্ষে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট। আর তা হলো, পূর্বসূরি প্রেসিডেন্টদের চেয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অনেকটাই আলাদা। এমনকি দেশের সর্বাধিনায়ক হিসেবে সবচেয়ে কঠিনতম সিদ্ধান্তটি গ্রহণের ক্ষেত্রেও তিনি ব্যতিক্রমী।
সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার চেয়ে তিনি নিজের মনের সবজাত প্রবৃত্তির ওপরই বেশি জোর দেন। পুরো কক্ষভর্তি উপদেষ্টাদের বক্তব্য আমলে না নিয়ে একেবারেই ভিন্নজগতের মানুষের কাছে পরামর্শ চান। প্রায় ছয় মাস ধরে স্থায়ী কোনো প্রতিরক্ষামন্ত্রী নেই তার। ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রীও এই সপ্তাহে পদত্যাগ করেছেন। আর তার যেসব উপদেষ্টারা আছেন, তারা একে অপরকে টেক্কা দিতেই বেশি ব্যস্ত।

ইরানের কাছ থেকে বেশ কয়েকবার উস্কানি এলেও ট্রাম্প সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখানোর ব্যাপারে নিরুতসাহী ছিলেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার সকালে তার ঘুম ভাঙলো ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে আমেরিকান গোয়েন্দা ড্রোন বিধ্বংসের খবরে। সকাল ৭টা বাজেই হোয়াইট হাউজে সকালের নাস্তা করতে উপস্থিত ট্রাম্পের উগ্রপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বল্টোন। সঙ্গে ছিলেন ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্যাট্রিক শানাহান, যিনি তিন দিন আগে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন। আরও ছিলেন সেনা সচিব মার্ক টি এসপার যিনি শানাহানের স্থলে বসতে যাচ্ছেন। পাশাপাশি ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং জয়েন্ট চীফস অব স্টাফসের চেয়ারম্যান জেনারেল জোসেফ এফ ডানফোর্ড জুনিয়র। তারা নিজেরা নিজেরাও ড্রোন কান্ড নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রেসিডেন্টকে সম্ভাব্য সামরিক হামলার নির্দেশ দেওয়ার সুপারিশ করবেন। সকাল ১১টায় প্রেসিডেন্টের সামনে হামলার বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে হাজির হন তারা। সঙ্গে ছিলেন অন্যান্য জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। সেই সভাতেই সম্ভাব্য হতাহতের সংখ্যা নিয়েও আলোচনা হয়। কিন্তু আগের মতোই, তখনও ট্রাম্প নিজের দলের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হননি। এর বাইরে তিনি নিজের ঘনিষ্ঠ মিত্র সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের সঙ্গে আলোচনা করেন। গ্রাহামও তাকে সামরিক প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি বিবেচনার পরামর্শ দেন।

বিকেল ৩টায় হোয়াইট হাউজের সিচুয়েশন কক্ষে উভয় দলীয় কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে ট্রাম্প আলোচনা করেন এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের অবহিত করেন। সেই বৈঠকে উপস্থিত কয়েকজন বলেছেন যে, তাদের মনে হয়েছিল প্রেসিডেন্ট হামলার নির্দেশ দেবেন।
উপসাগরীয় অঞ্চলে ট্যাংকারে হামলার পর থেকেই এই মাস জুড়ে ইরানের ওপর হামলার বিভিন্ন পন্থা নিয়ে কমপক্ষে এক ডজন বিকল্প প্রস্তুত রাখা হয়। সেখান থেকে আলোচনা করে দুইটি বিকল্প বিবেচনা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী, টার্গেটের মধ্যে ছিল ইরানের রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

শুক্রবার প্রেসিডেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা দল সর্বসম্মতিক্রমে হামলার পক্ষে ছিল। তারা সকলেই চূড়ান্ত বিকল্প প্রেসিডেন্টের কাছে সুপারিশ করার সিদ্ধান্ত নেন। তবে জয়েন্ট চীফস অব স্টাফসের চেয়ারম্যান জেনারেল ডানফোর্ডই প্রথম সতর্কতা উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, হামলার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকান বাহিনী ও মিত্রদের ওপর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সন্ধ্যা ৬টায় পেন্টাগনে শানাহানের কার্যালয়ের বৈঠকে, যেখানে জেনারেল ডানফোর্ডও উপস্থিত ছিলেন, সেখানে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেও নিজের বক্তব্যে বলেন, ইরানের ওপর  মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে সেখানে তীব্র প্রভাব পড়ছে। তিনি সুনির্দিষ্ট সামরিক হামলার পক্ষে থাকলেও, তার মতে, নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়ছে, যেমনটা মার্কিন প্রশাসন প্রত্যাশা করেছিল। ট্রাম্পের সহযোগীদের কেউ কেউ উদ্বিগ্ন ছিলেন, যেই কৌশল কাজ করছে, সেটি আবার হামলার কারণে অকার্যকর হয়ে যায় কিনা।

সন্ধ্যা ৭টায় সামরিক কর্মকর্তাদের জানানো হয়, হামলা চালানো হবে রাত ৯টা-১০টার মধ্যে। অথবা ইরানে সুর্যোদয়ের একটু আগে। কিন্তু আর এক ঘন্টার মধ্যেই সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়। টুইটার মন্তব্যে ও এনবিসি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাতকারে ট্রাম্প অবশ্য সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণ হিসেবে মানুষের প্রাণহানি এড়ানোর ইচ্ছাকেই তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, আমি জেনারেলদের বললাম, হামলার আগে আমি কিছু বিষয় জানতে চাই। এই হামলায় কয়জন মারা যাবে? জেনারেলরা জবাব দেন প্রায় ১৫০ জন মারা যাবে। ট্রাম্পের ভাষ্য, ‘আমি বিষয়টা নিয়ে এক সেকেন্ড ভাবলাম। তারপর বললাম, তারা একটি মনুষ্যবিহীন ড্রোন ভূপাতিত করেছে। কিন্তু আর মাত্র আধা ঘন্টা পর ১৫০ জন মানুষ সে কারণে মারা যাবে। আমার এটা পছন্দ হয়নি। আমার মনে হয়নি, এটি আনুপাতিক প্রতিক্রিয়া হবে।’

তবে একজন কর্মকর্তা অবশ্য বলেছেন, ১৫০ জন মারা যাওয়ার বিষয়টি কোনো জেনারেল দেননি, দিয়েছেন একজন আইনজীবী। ওই কর্মকর্তা বলেন, সবচেয়ে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে হতাহত কেমন হবে তার খসড়া করেছিলেন পেন্টাগনের আইনজীবীরা। হামলা দিনে হবে নাকি সুর্যোদয়ের আগে হবে, তা এখানে আমলে নেওয়া হয়নি। দিনে হলে মানুষ মারা যাবে বেশি, কিন্তু গভীর রাতে বা সুর্যোদয়ের আগে কম মারা যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এই হতাহতের সম্ভাব্য সংখ্যা ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী বা জেনারেল ডানফোর্ডের সঙ্গে আলোচনা না করেই প্রেসিডেন্টকে দেওয়া হয়। আর তখনই তিনি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন।

ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত সাবেক সেনা ভাইস চেয়ারম্যান জেনারেল জ্যাক কিয়েন বলেন, আরেকটি প্রসঙ্গও এখানে এসেছিল। প্রেসিডেন্টকে বলা হয়েছিল, ড্রোন হামলা আসলে ইরান ভুল করে চালিয়েছিল। ট্রাম্প নিজেও প্রকাশ্যে এমনটা হওয়ার কথা বলেছেন সেদিন। জেনারেল কিয়েন বলেন, প্রেসিডেন্ট কিছু তথ্য পেয়েছেন যে, ইরানের যেই কমান্ডার ওই ড্রোন ভূপাতিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তার ওপর জাতীয় নেতারা অনেকেই হতাশ ও ক্ষুদ্ধ ছিলেন। বিশেষ করে ইরানের অভিজাত কুদস ফোর্সের ক্ষমতাবান কমান্ডার কুদস ফোর্সের কমান্ডার কাশিম সোলেমানিও ক্ষুদ্ধ হন।

জেনারেল কিয়েনের মতে, ইরান ভুল করেছে, তা জেনে প্রেসিডেন্ট হামলার সিদ্ধান্ত বাতিল করেছেন, তা নয়। তবে এটি তার সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলেছে। প্রেসিডেন্ট বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন হতাহতের সংখ্যা নিয়ে।

(নিউ ইয়র্ক টাইমসে ‘আর্জড টু লঞ্চ অ্যান অ্যাটাক, ট্রাম্প লিসেনড টু দ্য স্কেপটিকস হু সেইড ইট উড বি অ্যা কস্টলি মিসটেইক’ শীর্ষক প্রতিবেদনের সংক্ষিপ্ত অনুবাদ।)

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর