× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা ইলেকশন কর্নার
ঢাকা, ২২ আগস্ট ২০১৯, বৃহস্পতিবার
নেপথ্যে সওজের খাল দখল

সরাইলে বধ্যভূমি থেকে ৪৬ শহীদের নামফলক উধাও

এক্সক্লুসিভ

স্টাফ রিপোর্টার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও সরাইল প্রতিনিধি | ২০ জুলাই ২০১৯, শনিবার, ৮:৩১

সরাইলে ঐতিহাসিক বধ্যভূমি থেকে রাতের অন্ধকারে ৪৬ জন শহীদের তালিকাযুক্ত নামফলক উধাও করে ফেলেছে দুর্বৃত্তরা। সড়ক ও জনপথের খাল দখল করাই হচ্ছে মূল টার্গেট। গত ১০ই জুলাই বুধবার রাতে সরাইল-নাসিরনগর-লাখাই আঞ্চলিক সড়কের পাশে সরাইলের ধর্মতীর্থ বধ্যভূমিতে এ ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। প্রতিবাদে কর্মসূচি দেয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছে তারা। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে ১৮ই অক্টোবর একই পরিবারের ২২ সদস্যসহ শতাধিক নিরীহ লোক ও মুক্তিযোদ্ধাকে এ জায়গাটিতে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল পাকবাহিনী। গত ১৮ই জুন ওই জায়গায় ‘এম আবদুল্লাহ ফরহাদ ফিলিং স্টেশন’ নামে একটি পেট্রোল পাম্প করার অনুমতি চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে অনাপত্তির আবেদন করেছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ফরহাদ রহমান মাক্কি মিয়ার ছেলে আবদুল্লাহ ফরহাদ। ৪ঠা জুলাই জেলা প্রশাসক ২০৪ নং স্মারকে তদন্ত করে অনাপত্তি প্রতিবেদন চেয়ে সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে প্রেরণ করেন।
ইউএনও এটি পাঠান সহকারি কমিশনার (ভূমি) ফারজানা প্রিয়াংকাকে। সহকারী কমিশনারের মৌখিক নির্দেশে তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করেন সার্ভেয়ার ও কানুনগো মো. ইব্রাহিম খান। সহকারী কমিশনার প্রতিবেদনটি ৯ই জুলাই প্রেরণ করেন ইউএনও’র কাছে। ইউএনও ওই প্রতিবেদনটি গত ১০ই জুলাই প্রেরণ করেছেন জেলা প্রশাসকের দপ্তরে। আর ১০ই জুলাই রাতেই বধ্যভূমি থেকে উধাও হয়ে যায় শহীদদের নামফলকটি। উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ধর্মতীর্থ এলাকার সড়কের পাশের সওজের খালটি দিয়ে স্বাধীনতার পূর্ব থেকেই কালিকচ্ছ ইউনিয়ন ও আশপাশের ইউনিয়নের গ্রামগুলোর পানি নিষ্কাশন হয়ে আসছিল। এখানে ছিল ধর্মতীর্র্থ নৌকা ঘাট। বর্ষায় তেলিকান্দি, জয়ধরকান্দি ও নাসিরনগর উপজেলার লোকজন নৌকায় করে দেশের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতো। আর বর্তমান কালিকচ্ছ বিজিবি ক্যাম্পটি ছিল ঘাঁটিবাড়ি রাজাকার ও পাকসেনাদের ক্যাম্প। তারা নিয়মিত ধর্মতীর্থ নৌ ঘাটে যাত্রীদের চেক করত। অনেককে ঘাটেই গুলি করে হত্যা করতো। চুন্টা সেনবাড়ির ২২ জনসহ সরাইল থানায় ও কালিকচ্ছ ক্যাম্পে আটক শতাধিক লোককে ১৮ই অক্টোবর ধর্মতীর্থ নৌ ঘাটে লাইনে দাঁড় করিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল বর্বর পাকবাহিনী। এদের মধ্যে ৪৯ জনের পরিচয় মিলেছিল। বাকি লাশগুলো এখানে পচে-গলে শেষ হয়। পরবর্তীতে ধর্মতীর্থ বধ্যভূমি ও গণহত্যা ভূমি নামে পরিচিতি পায় জায়গাটি। গণহত্যা নির্যাতন ও মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র কর্তৃক প্রকাশিত কবি জয়দুল হোসেনের লেখা ‘ধর্মতীর্থ গণহত্যা’ নামে একটি বইও প্রকাশিত হয়েছে। বইটিতে ধর্মতীর্থ নৌঘাটে পাকবাহিনী রাজাকারদের তাণ্ডব ও হত্যাযজ্ঞের করুন ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। সওজের খালসংলগ্ন পশ্চিম পাশে কালিকচ্ছ ইউনিয়নের ধর্মতীর্থ মৌজার ৪৭৩৬ দাগের ২২ শতাংশ ভূমির মালিক ছিলেন চাকসার গ্রামের আবদুস সাত্তার ও তার ভাতিজা আবদুল আহাদ ছিলেন ৮৮৩১ দাগের ১২ শতক জায়গার মালিক। জায়গাটির ৪০-৫০ গজের মধ্যে রয়েছে একাধিক বসতবাড়ি। ১০ বছর আগে ওই দুই দাগের ৩৪ শতাংশ জায়গা ক্রয় করেন ফরহাদ রহমান মাক্কি। ২০১৭ সালের মার্চ মাসে স্থানীয় সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধার সহায়তায় ওই বধ্যভূমিতে ১২ ফুট উচ্চতা ও ৪ ফুট প্রস্থের লোহার তৈরি একটি ফলক স্থাপন করা হয়। ফলকে ৪৬ জন শহিদ মুক্তিযোদ্ধার তালিকাযুক্ত ফেনা লাগানো হয়। এক বছর পরই ফলক থেকে ফেনাটি চুরি হয়ে যায়। ২০১৮ সালের ৪ঠা নভেম্বর জেলা প্রশাসক হায়াত-উদ-দৌলা খান বধ্যভূমিটি সরজমিনে পরিদর্শনও করেছেন। প্রত্যক্ষদর্শী আবদুর রশিদ (৫৫), আবদুল মতালিব মিয়া (৫৩) ও জনাব আলী (৫৬) বলেন, এখানে একটি নৌঘাট ছিল। ৭১ সালে পাঞ্জাবিরা এ ঘাটে মানুষকে হত্যা করেছে। এটা বধ্যভূমি। নামফলকও ছিল। গত বুধবার রাতে রাসেল ও নোয়াগাঁওয়ের বাবু মুন্সিসহ বেশ কয়েকজন লোক মিলে ফলকটি ভেঙে নিয়ে গেছে। মো. খাদেম হোসেন (৪৮) বলেন, আমাদের চাকরি দেয়ার কথা বলে সরকারি খালটি ভরাট করেছেন। আমরা এখন ওই জায়গায় যেতেই পারি না। সরাইল উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, জায়গাটি বধ্যভূমি হিসেবে অনেক আগেই চিহ্নিত হয়েছে। অতীতেও এমন ঘটনা সেখানে ঘটেছে। বুধবারের ঘটনা ঘটিয়েছে মুসা চেয়ারম্যানের ছেলে রাসেল ও বাবু মুন্সি নামের একটি ছেলে। এরা মাক্কি মিয়ার সহচর। আমরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই।
অনাপত্তি প্রতিবেদনে যা আছে: দুই দাগে মোট জায়গা ৩৪ শতাংশ। প্রস্থ ৪৮-৭০ ফুট পর্যন্ত। জায়গার ২ শত গজের মধ্যে কোনো বসতবাড়ি নেই। এ কথাটি মিথ্যা। কারণ বাস্তবে জায়গাটির ৫০-৮০ গজের মধ্যে রয়েছে একাধিক বসতঘর। পূর্ব পাশে ৪৮৩৩ দাগের ৭০ ফুট প্রস্থের নয়নজুলিকে ও (খাল) দেখানো হয়েছে নালভূমি হিসেবে। এটি সরাইল থেকে নাসিরনগর পর্যন্ত গিয়েছে। অথচ খালটির মালিক সওজ। যা ইতিমধ্যে ভরাট করা হয়ে গেছে। উপজেলা ভূমি অফিসের নথিপত্রে ওই জায়গাটি এখনো ‘নয়নজুলি’ হিসেবেই উল্লেখ রয়েছে। নয়নজুলির পরই রয়েছে ১০০ ফুট প্রস্থের সরাইল-নাসিরনগর-লাখাই আঞ্চলিক সড়ক। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গত ১০ই জুলাই জেলা প্রশাসকের কাছে অনাপত্তিপত্র প্রেরণ করে দিয়েছেন। আর ওইদিন রাতেই বধ্যভূমি থেকে শহীদদের নামফলকটি ভেঙে নিয়ে যায়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ভারপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এএসএম মোসা সেখানে পেট্রোল পাম্প করার অনাপত্তিপত্র প্রেরণ করার কথা স্বীকার করে বলেন, আমি ফলক ভাঙার বিষয়টি শুনেছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো। এ বিষয়ে জানতে চাইলে (মুঠোফোনে) ফরহাদ রহমান বলেন, কে করছে অভিযোগটা। এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। দ্বিতীয়ত আমি ও আমার বড় ছেলে পেট্রোল পাম্প করার জন্য এই জায়গাটা কিনেছি। সড়ক ও জনপথের সংযোগ সড়ক সংলগ্ন ওই জায়গায় নিয়ম মোতাবেক অনুমতি নিয়ে সওজের কথামতো ১৪ লাখ টাকা খরচ করে কালভার্ট নির্মাণ করা হয়। এখানে সরকারের পক্ষ থেকে বধ্যভূমি করা হয়েছে এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। আমরা একশবার এই জায়গার মালিক। সরকারের এক ছটাক জায়গাও নেই। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসককে জিজ্ঞেস করবেন এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যার বিষয়ে কিছু বলতে পারবেন না। নামফলক বসানো ও ভাঙ্গা প্রসঙ্গে আমি কিছু জানি না। জায়গার মালিক না হলে সরকার আমাকে বাধা দিত।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর