× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা ইলেকশন কর্নার
ঢাকা, ২৬ আগস্ট ২০১৯, সোমবার

মারাও যেতে পারতেন নিল আর্মস্ট্রং

বিশ্বজমিন

মোহাম্মদ আবুল হোসেন | ২০ জুলাই ২০১৯, শনিবার, ৮:১৪

যেন কল্পবিজ্ঞান বা সায়েন্স ফিকশনকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন নিল আর্মস্ট্রং, এডউইন বাজ অলড্রিন ও মাইকেল কলিন্স। জীবনকে তুচ্ছ করে তারা যাত্রা করেছিলেন চাঁদের দেশে। তারা জানতেন আর কোনোদিন ফিরে নাও আসতে পারেন। তারা জানতেন মহাশূন্যে আটকা পড়ে জীবনের সব কিছু হারিয়ে যেতে পারে। বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারেন পৃথিবী থেকে। আর কোনোদিন প্রিয়জনের মুখও হয়তো আর দেখতে পাবেন না। কিন্তু এতসব মনের ভিতর বাসা বাঁধতে দেন নি তারা। চাঁদে অ্যাপোলো-১১ মিশন হলো মানব জাতির জীবনে সবচেয়ে অবিশ্বাস্য এক বাস্তবতা।
আজ থেকে ৫০ বছর আগে আজকের এই দিনে ২০ শে জুলাই প্রথম মানুষ হিসেবে চাঁদে পা রাখেন নিল আর্মস্ট্রং। তবে এই বিস্ময়কর সত্য এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণে ভ-ুল হয়ে যেতে পারতো। এমনটা হয়েও ছিল কয়েকবার। হৃদয়ে কম্পন সৃষ্টি করেছিল সেইসব ঘটনা। এ ছাড়া ১৯৬৯ সালের মিশন পূর্ববর্তী ও মিশন চলাকালে ঘটেছিল আরো কিছু দুর্ঘটনা, যার ফলে অ্যাপোলো-১১ মিশন শেষ হয়ে যেতে পারতো। যদি তেমনটাই হতো তাহলে তার জন্য প্রস্তুত ছিলেন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন। তিনি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতেও প্রস্তুত ছিলেন।
এমন ৬টি দুর্ঘটনার তথ্য এখানে তুলে ধরা হলো, যার ফলে অ্যাপোলো ১১ মিশন ডিসমিশ হয়ে যেতে পারতো। কিন্তু নাসার পরিচালনা, পরিকল্পনার ফলে এসব দুর্যোগ থেকে রক্ষা পেয়েছেন নভোচারীরা। কি ছিল সেইসব দুর্ভোগ? আসুন এক এক করে জেনে নেয়া যাক।

১. অ্যাপোলো-১ এ আগুন
১৯৬৭ সালের ২৭ শে জানুয়ারি। এদিন রিহার্সেল চলছিল অ্যাপোলো ১ মিশনের রিহার্সেল। এর মধ্যপথে অ্যাপোলো ১ এর কমান্ড মডিউলে আগুন ধরে যায়। তখন এই মডিউলের ভিতরে ছিলেন তিন নভোচারী রজার চ্যাফি, এড হোয়াইট ও ভারগিল গাস গ্রিসোম। ওই আগুনে তারা তিনজনই পুড়ে মারা যান। পরে এক অনুসন্ধানে দেখা যায়, স্পার্কিং থেকে আগুনের সূত্রপাত। হতে পারে তা ক্ষতিগ্রস্ত তারের কারণে। মডিউলে তখন ছিল পিওর-অক্সিজেন। এতে অ্যাপোলো ১ এর মডিউল আগুনের গোলা হয়ে ওঠে। মডিউলের ভিতর থেকে বের হওয়ার জন্য যে দরজা ছিল, তা ছিল ভিতরদিক থেকে বন্ধ। ফলে আগুনের কারণে মডিউলের ভিতরে অসীম চাপ সৃষ্টি হয়েছিল। এ কারণে তারা মডিউলের ভিতর থেকে বের হতে পারেন নি। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ বিষয়ক ইতিহাসবিদ, কালেক্টস্পেস-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক রবার্চ পার্লম্যান বলেন, এই অগ্নিকা-ে অ্যাপোলো ১১ মিশনকে হুমকিতে ফেলেছিল। আর এর ফলেই সতর্কতা অবলম্¦ন করে এই মিশন পরিচালনা সম্ভব করেছিল। এই ঘটনা এই কর্মসূচিকে এক বছর পিছিয়ে দেয়। ১৯৬৮ সালের আগে আর কোন ফ্লাইট পরিচালনা করা হয় নি। নাসাকে ভুলত্রুটিগুলো বাছাই করে, কোনটি অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত তা নির্ধারণের জন্য নানা যথেষ্ট সময় পায় এতে। ফলে নাসা নতুন করে ডিজাইন করে এবং তাদের অন্যান্য নিরাপত্তামুলক বিষয়গুলো খুটিয়ে দেখে নেয়। এতে তারা নিশ্চিত হয় যে, অ্যাপোলো ১১ মিশন মহাকাশে যেন একই রকম প্রতিবন্ধকতার মুখে না পড়ে।

২. নিল আর্মস্ট্রং তো প্রায় মারাই গিয়েছিলেন
১৯৬৯ সালের ২০ শে জুলাই প্রথম চাঁদে পা রাখেন নিল আর্মস্ট্রং। এর মধ্য দিয়ে তিনি মহাকাশ বিজ্ঞানে, সারা বিশে^র কাছে এক বিস্ময় হয়ে রইলেন। কিন্তু এর প্রায় এক বছর আগে তিনি মৃত্যুর হাত থেকে ফিরেছেন। তিনি কি অসুস্থ হয়েছিলেন? না। তাহলে কেন তিনি মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরলেন? হ্যাঁ, বলছি সেকথাই।
১৯৬৮ সালের ৬ই মে। তিনি চাঁদে অবতরণ করবে এমন একটি গবেষণামুলক যানে করে রিহার্সেল করছিলেন। ওই রিহার্সেলকালে তিনি যখন যুক্তরাষ্ট্রের হিউজটনের আকাশে তখন ওই যানে একটি লিক দেখা দেয়। এর ফলে পুরো ফ্লাইটের কন্ট্রোল সিস্টেম একেবারে বিকল হয়ে যায়। এর ফলে যেটা ঘটে তা হলো, তাকে বহনকারী যানটি সোজা পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসতে থাকে প্রচ- গতিতে। কিন্তু মাটিকে আঘাত করার মাত্র ৩০ ফুট উপরে থাকতে এর ভিতর থেকে নিজেকে মুক্ত করতে সক্ষম হন নিল আর্মস্ট্রং। তিনি ওই যান থেকে বেরিয়ে প্যারাসুট ব্যবহার করে নিরাপদে মাটিতে অবতরণ করেন। অন্রদিকে তাকে বহনকারী যানটি মাটিতে একটি আগুনের বলের মতো এসে আঘাত করে। এর ভিতর থেকে যদি বের হতে না পারতেন তাহলে এদিন নিল আর্মস্ট্রংয়ের মৃত্যু অবধারিত ছিল। মাত্র কয়েকটি সেকেন্ডের জন্য তিনি বেঁচে গেছেন।

৩. অপ্রত্যাশিত এলার্ম
অ্যাপোলো ১১ মিশন তখন চাঁদে অবতরণের জন্য প্রস্তুত। এর ভিতরে তখন তিনজন নভোচারী- নিল আর্মস্ট্রং, এডউইন বাজ অলড্রিন ও মাইকেল কলিন্স। এ সময়ে তারা দেখলেন তাদের অবতরণ বিষয়ক কমপিউটারে ভেসে উঠছে ১২০২ এলার্ম। এর অর্থ হলো, কিছু ত্রুটি দেখা দিয়েছে। সব ধরনের এলার্ম কোড স্মরণে রাখাটা নভোচারীদের দায়িত্বের মধ্যে ছিল না। তাই তারা পৃথিবীতে মিশন কন্ট্রোল রুমে রেডিও ম্যাসেজ পাঠালেন। জানতে চাইলেন, তাদেরকে কি তখন অবতরণ বাতিল করতে হবে কিনা।
সৌভাগ্য!
মিশন কন্ট্রোল থেকে সব রকম কোড পরীক্ষা করো হলো। একটি বিশেষ এলার্ম সিগন্যাল দিল একটি কমপিউার ওভারলোড হয়ে গেছে। ফলে ওই এলার্ম ক্লিয়ার করা হলো। আর নভোচারীরা তাদের কাজ অব্যাহত রাখতে থাকেন। একই রকম এলার্ম আবারও পাওয়া গেল। কিন্তু তাতে মিশন বন্ধ হয় নি।
এ বিষয়ে লাইভ সায়েন্সকে পার্লম্যান বলেছেন, একই সঙ্গে অনেক বেশি কমান্ড যাচ্ছিল। তাই ওই কমপিউটারটি ওভারলোড হয়ে গিয়েছিল। তার মেমোরি শেষ হয়ে যাচ্ছিল। সে জানান দিচ্ছিল, সব কিছু সে আমলে নিতে পারছে না। ওই কমপিউারকে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছিল যে, প্রয়োজনে তাকে কার্যক্রম থেকে স্থগিত রাখা যেতে পারে।

৪. স্বল্প পরিমাণের জ্বালানি
অ্যাপোলো ১১ এর নভোচারীরা যখন চাঁদের একেবারে কাছে চলে গেলেন, তখন তাদেরকে সামান্য বিলম্ব করতে হয়। এর ফলে তাদেরকে ‘সি অব ট্রানকুইলিটি’তে যেখানে অবতরণ করার ডিজাইন করে দেয়া হয়েছিল, তারা তা মিস করেন। মিশনের কমান্ডার ছিলেন নিল আর্মস্ট্রং। তিনি বুঝতে পারলেন, তাদের নভোযান এমন একটি এলাকায় অবতরণ করতে যাচ্ছে, যেখানে রয়েছে বিশাল বড় সব খাঁজ ও পাথরের সমাহার। পার্লম্যান বলেন, তাই তিনি ম্যানুয়াল কন্ট্রোল ব্যবহার করলেন এবং বিশাল এক পাথরকে অতিক্রম করলেন। পাথরময় এলাকা অতিক্রম করলেন। চেষ্টা করলেন একটি পরিষ্কার এলাকা খুঁজে পেতে, যেখানে তারা নিরাপদে অবতরণ করতে পারেন।
ততক্ষণে তাদেরকে বহনকারী মডিউলের জ্বালানি একেবারে ফুরিয়ে এসেছে। এতে এমন একটি আশঙ্কা দেখা দেয় যে, তাদেরকে মিশন বাতিল করতে হতে পারে। পার্লম্যান বলেন, এটা গাড়ি চালানোর মতো অবস্থা। যখন আপনার গাড়ি রেড লাইন দেখায়, তখন আপনি আরো প্রায় ২০ মাইল চালিয়ে যেতে পারেন। তেমনি আশা জেগেছিল নিল আর্মস্ট্রংয়ের মধ্যে। তিনি ভেবেছিলেন জ¦ালানির যেটুকু অবশেষ আছে তা দিয়ে তিনি অবতরণ করতে পারবেন।

৫. ভাঙা সুইচ
অবশেষে চাঁদে অবতরণ করলেন নিল আর্মস্ট্রং। তাকে অনুসরণ করলেন অলড্রিন। তারা প্রথম মুনওয়াক বা চাঁদের মাটিতে হাঁটলেন। এ সময় তাদের পিছে ছিল জীবনরক্ষাকারী বিশাল বড় ব্যাকপ্যাক। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তারা একটি সার্কিট ব্রেকার নষ্ট করে ফেললেন। এটা তাদের সঙ্গে ইঞ্জিনের যুক্ত থাকাকে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা রক্ষা করে। এই ইঞ্জিন তাদেরকে চাঁদ থেকে ছিটকে দূরে ফেলে দিতে পারে।
যখন তারা এই ড্যামেজ দেখতে পেলেন সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর কন্ট্রোল সেন্টারকে অবহিত করলেন। আর্মস্ট্রং ও অলড্রিন যখন চাঁদের বুকে হাঁটছেন তখন পৃথিবীর কন্ট্রোল সেন্টার থেকে তাদের সমস্যা সমাধান করে দেয়ার জন্য কাজ করা হলো। তবে আর্মস্ট্রং নিজেই তার সমস্যার সমাধান করে নিতে পেরেছিলেন।

৬. ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ আবহাওয়া
চন্দ্র অভিযান শেষ করে পৃথিবীতে ফিরছিলেন নিল আর্মস্ট্রংরা। তাদের অবতরণ করার কথা প্রশান্ত মহাসাগরের একটি বিশেষ এলাকায়। এমনটা ডিজাইন করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রচ- ঝড় দেখা দেয় সেখানে। তাই অ্যাপোলো ১১ এর ক্রুরা নির্ধারিত স্থানে অবতরণ করতে পারলেন না। তাদেরকে প্রশান্ত মহাসাগরের অন্য একটি স্থানে অবতরণের নির্দেশনা দেয়া হলো। তাদেরকে উদ্ধার করার জন্য প্রশান্ত মহাসাগরে মোতায়েন করা হয়েছিল জাহাজ ইউএসএস হর্নেট। জাহাজটি যেখানে রাখা ছিল তা থেকে অনেক দূরে তাদেরকে অবতরণ করতে বলা হলো। ফলে সেখানে অবতরণ করে তাদেরকে অপেক্ষা করতে হয়। এই কারণে অ্যাপোলো ১১ অবতরণের সরাসরি কোনো টিভি বা ফুটেজ পাওয়া যায় নি। কারণ, বিষয়টি ক্যামেরায় ধারণ করার মতো কেউ সেখানে ছিলেন না।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর