× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা ইলেকশন কর্নার
ঢাকা, ২৩ আগস্ট ২০১৯, শুক্রবার

গুজবে খুন, আতঙ্ক

প্রথম পাতা

স্টাফ রিপোর্টার | ২৩ জুলাই ২০১৯, মঙ্গলবার, ১০:০২

ছেলেধরার গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনির ঘটনা থামছে না। গতকালও এরকম বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। পিটুনিতে একজনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন। এসব ঘটনায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিকার হয়েছেন নিরপরাধ মানুষ। গুজব আর গণপিটুনিতে মৃত্যুর ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় গতকাল সারা দেশে বিশেষ বার্তা পাঠিয়েছে পুলিশ সদরদপ্তর।
সম্প্রতি ‘পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগবে’ এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই বিভিন্ন এলাকায় গণপিটুনির ঘটনা বেড়েছে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, গুজবে কান না দিয়ে সন্দেহজনক কোন তথ্য পেলে তা পুলিশকে জানাতে হবে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুতই ব্যবস্থা নেবে। গুজবে কান দিয়ে যারা হত্যা বা নির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে তাদের শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনাকে অনেকে আবার ‘পাবলিক ক্রসফায়ার’ বলে বর্ণনা করছেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এসব হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানাচ্ছে মানুষ। সমাজ বিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তথ্যের ঘাটতি আর বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতার কারণে এমন ঘটনা ঘটে থাকে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের এখনই উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। গত দুই সপ্তাহে অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে গণপিটুনিতে। আহতের সংখ্যা আরও বেশি। এসব ঘটনার শিকার হয়েছেন নিরীহ নিরপরাধ মানুষ। দেশের বিভিন্ন জেলায় ‘ছেলেধরা’ গুজবে গণপিটুনির শিকার হয়েছেন অন্তত ১৫ জন। ধামরাইয়ে ওমান প্রবাসী যুবক গণপিটুনিতে মারা গেছেন। এছাড়া জনতার গণপিটুনির শিকার হয়েছেন রাজশাহীতে ৫ এনজিও কর্মী, সাভারে স্বামী-স্ত্রী, চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে ৩ যুবক, পাবনার ভাঙ্গুরায় কলেজছাত্র, কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে মানসিক ভারসাম্যহীন একজন নারী, মাদারীপুরে মারধর করা হয়েছে আরেক নারীকে, নাটোরের সিংড়ায় এক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে পিটুনি দিয়েছে স্থানীয়রা।

সকল ইউনিটকে পুলিশ সদরদপ্তরের নির্দেশনা: পদ্মাসেতু নির্মাণে মানুষের মাথা লাগবে এমন গুজব  কেন্দ্র করে দেশজুড়ে গণপিটুনিতে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ব্যবস্থা  নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছে পুলিশ সদরদপ্তর। গুজব প্রতিরোধে পুলিশের সব ইউনিট প্রধান ও জেলা পুলিশ সুপারদের কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলা হয়েছে নির্দেশনায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেলেধরা সংক্রান্ত পোস্ট বা মন্তব্য ছড়ানোদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এছাড়া, গুজব ঠেকাতে প্রতিটি এলাকায় মাইকিং, লিফলেট বিতরণ ও  পোস্টারিং করার কথাও বলা হয়েছে। গতকাল পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (অপারেশন্স) সাঈদ তারিকুল হাসান স্বাক্ষরিত একটি নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে, দেশব্যাপী পুলিশের সব ইউনিটকে। সেই নির্দেশনাগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য তাগিদ দেয়া হয়।  
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সমপ্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে ছেলেধরা গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনিতে হত্যার মাধ্যমে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে। গণপিটুনি দিয়ে হত্যা ও গুজব ছড়িয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করা  ফৌজদারি অপরাধ। গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা বন্ধে সংশ্লিষ্ট ইউনিট ও  জেলা পুলিশ সুপারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। পাঠানো সেই নির্দেশনায় গুজব ও গণপিটুনি প্রতিরোধে পুলিশের ইউনিটগুলোকে ৪ টি নিদের্শনা দেয়া হয়েছে।  

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক নির্দেশনায় বলা হয়েছে- দেশের সব শিক্ষা প্রতিতিষ্ঠানকেন্দ্রিক টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো, স্কুলে অভিভাবক ও গভর্নিং বডির সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময়, ছুটির পর অভিভাবকদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের স্কুল ত্যাগের বিষয়টি শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের মাধ্যমে নিশ্চিত করা এবং শিক্ষা  প্রতিষ্ঠান ও তৎসংলগ্ন এলাকায় সিসিটিভি স্থাপন করা।

জনসচেতনতা বাড়াতে প্রতিটি এলাকায় ছেলেধরার গুজবে কান না দিতে এবং পুলিশকে তাৎক্ষণিক তথ্য জানানোর জন্য মাইকিং করা, লিফলেট বিতরণ ও  পোস্টারিং করতে বলা হয়েছে। এছাড়া এলাকার জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, জনসাধারণদের নিয়ে উঠান বৈঠকের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো, আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের পুলিশের হাতে ?তুলে দেয়ার বিষয়ে জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করা, প্রতিদিন মসজিদে এ সংক্রান্ত বক্তব্য দেয়ার ব্যবস্থা এবং মেট্রোপলিটন ও জেলা শহরের বস্তিতে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মনিটরিংয়ের বিষয়ে-ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার, ব্লগসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেলেধরা সংক্রান্ত বিভ্রান্তিমূলক  পোস্ট, মন্তব্য বা গুজব ছড়ানোদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এছাড়াও গুজবে কান দিয়ে ছেলেধরা বিষয়ে আতঙ্কিত না হয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় প্রচারের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ইউনিট প্রধান নিজ নিজ এলাকায় গৃহীত আইনানুগ ব্যবস্থা সংক্রান্ত প্রতিবেদন আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে দিতে নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানিয়েছে পুলিশ সদরদপ্তর।
‘ছেলেধরা’ গুজব ছড়িয়ে ১৫ জনকে গণপিটুনি, নিহত ১

ধামরাই (ঢাকা) প্রতিনিধি জানান, ঢাকার ধামরাইয়ের রোয়াইল ইউনিয়নের কৃষ্ণনগর গ্রামের ওমান প্রবাসী যুবককে পরকীয়ার জেরে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। গত রোববার  রাতে তাকে বাড়ি থেকে ডেকে প্রেমিকার বাড়িতে নিয়ে বর্তমান চলমান গুজব ছেলেধরা ও ডাকাত অপবাদ দিয়ে স্বামী-স্ত্রীসহ কয়েকজন মিলে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় গতকাল সকাল থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত পরকীয়া প্রেমিকা রোজিনা, তার স্বামী সাইফুল ইসলামসহ ৬ জনকে আটক করেছে ধামরাই থানা পুলিশ। এদিকে ওই ইউনিয়নের আটি মাইটান গ্রাম থেকে গতকাল সকালে শরিফুল ইসলাম ও ফড়িংগা গ্রাম থেকে এক কলেজ ছাত্রীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। একদিনে একই ইউনিয়ন থেকে তিনটি লাশ উদ্ধারের খবরে পুরো ধামরাই জুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। জানা গেছে, ধামরাইয়ের কৃষ্ণনগর গ্রামের ফজল হকের ছেলে ওমান প্রবাসী আবুল কালাম (২৭) ৬ মাস আগে দেশে আসে। এরপর থেকে একই গ্রামের সাইফুল ইসলামের সুন্দরী স্ত্রী রোজিনার  প্রেমে পড়ে এবং ধীরে ধীরে পরকীয়ার সম্পর্ক গড়ে উঠে। বিষয়টি টের পেয়ে সাইফুল ইসলাম ও তোফাজ্জল নামে দুই যুবক গত রোববার রাত ১১টার দিকে আবুল কালামকে ডেকে নেয়। বাড়িতে নেয়ার পরই ছেলেধরা ও ডাকাত বলে তাকে কয়েকজন মিলে বেধড়ক  পেটায়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নিহত আবুল কালামের বাবা ফজর আলী বাদী হয়ে ৯ জনকে আসামি করে ধামরাই থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছে। গতকাল পুলিশ  রোজিনা, সাইফুল ইসলাম, ফরহাদ, শহিদ, জিয়া ও সজীবকে আটক করে।

স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী থেকে জানান, রাজশাহীতে ‘ছেলেধরা গুজবে’ গণপিটুনির শিকার হয়েছেন পাঁচ এনজিও কর্মী। গতকাল সোমবার দুপুরে উপজেলার রাওথা এলাকা থেকে পুলিশ তাদের উদ্ধার করে থানা হেফাজতে নিয়েছে। আটককৃতরা হলো- গোপালগঞ্জ জেলার মকসুদপুর উপজেলার ঝাকরপুর গ্রামের মসলেম উদ্দিনের ছেলে হাফিজুর রহমান (৪২), একই এলাকার আখতারুজ্জামানের ছেলে আবুল হোসেন (৪০), একই এলাকার লুৎফর রহমানের ছেলে রেজাউল করিম (৩৮), ঢাকা দক্ষিণের লালবাগ থানার আব্দুল মজিদের ছেলে কাইয়ুম আলী (৩৯) ও একই এলাকার আবুল কালাম (৩৬)। তারা নিজেদের আদ-দ্বীন ওয়েলফেয়ার সেন্টার নামের একটি এনজিও কর্মী দাবি করেছেন।
চারঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম জানান, চারঘাট উপজেলার সদর ইউনিয়নের রাওথা এলাকায় অপরিচিত পাঁচজন ব্যক্তি সমিতির নাম করে সদস্য সংগ্রহ করছিল। এ সময় সন্দেহ হলে স্থানীয় লোকজন তাদের সমিতির নাম জানতে চেয়ে কাগজপত্র ও পরিচয়পত্র দেখতে চায়। তবে তারা কোনো কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হলে ছেলেধরা সন্দেহে পাঁচজনকে ধরে পিটুনি দিয়ে আটকে রেখে থানায় খবর দেয় স্থানীয় লোকজন। পরে পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। তিনি আরো বলেন, আটককৃতরা নিজেদের আদ-দ্বীন ওয়েলফেয়ার সেন্টার নামে একটি এনজিওর মাঠ কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়েছে। রোববার তারা রাওথা গ্রামে গিয়ে একটি এনজিওর কার্যালয় করার কথা বলে আব্দুল মজিদের বাড়ি ভাড়া নেয়। রাতে তারা সেখানেই ছিলেন। সোমবার তারা ওই এনজিওর নামে সদস্য সংগ্রহের কাজে বের হয়। এ সময় তারা এলাকাবাসীর রোষানলে পড়েন।

স্টাফ রিপোর্টার, সাভার থেকে জানান, সাভারে  কোমলপানীয়র সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে এক তরুণীকে অজ্ঞান করার চেষ্টা করে প্রতিবেশী ভাড়াটিয়া এক দম্পতি। তাদেরকে ছেলেধরা সন্দেহে গণধোলাই দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেছে এলাকাবাসী। গতকাল দুপুরে পৌর এলাকার রাজাবাড়ী মহল্লায় এ ঘটনা ঘটেছে। গণধোলাইয়ের শিকার ওই দম্পতি হলো- রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ি থানার নালিগ্রাম এলাকার রফিকুল ইসলামের ছেলে মো. মামুন (২২) ও তার স্ত্রী বিলকিস বেগম। ভুক্তভোগী কিশোরীর নাম রুমি আক্তার (১৭)। সে ঢাকার ধামরাই উপজেলার ফুটনগর গ্রামের মো. রমজান মিয়ার মেয়ে। রুমি বাবা-মায়ের সঙ্গে রাজাবাড়ি এলাকায় ভাড়া থাকতো। মেয়ের বরাত দিয়ে তার বাবা মো. রমজান মিয়া বলেন, ঘটনার সময় আমরা কেউ বাসায় ছিলাম না। মেয়েটি বাসায় একা থাকার সুবাদে এক মাস আগে আসা প্রতিবেশী ভাড়াটিয়া দম্পতি রুমিকে কোমলপানীয়র সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করার চেষ্টা করে। মেয়ে না ঘুমিয়ে পাশের একটি বিউটি পার্লারে যাওয়ার চেষ্টা করে তখন মামুন ও বিলকিস দম্পতি রুমিকে আটকের চেষ্টা করে। বিষয়টি বাড়ির সামনে এক দোকানি দেখে লোকজন নিয়ে বাসার  ভেতরে ঢুকে আমার মেয়েকে উদ্ধার করে। এ সময় উত্তেজিত জনতা তাদেরকে গণধোলাই দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেন।

স্টাফ রিপোর্টার, চট্টগ্রাম থেকে জানান, ছাগল কিনতে গিয়ে ছেলেধরা সন্দেহে তিনজন গণপিটুনির শিকার হয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন। সোমবার দুপুরে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের ইলশা গ্রামে গণপিটুনির শিকার হন তারা।

আহতরা হলেন-জনি, সোহেল ও হৃদয়। তাদের বয়স ৩০ থেকে ৩৫-এর মধ্যে বলে জানান বাঁশখালী থানার ওসি রেজাউল করিম মজুমদার।

ওসি জানান, সোমবার দুপুরে তিন যুবক ইলশা গ্রামে ছাগল কিনতে যায়। এসময় স্থানীয় লোকজন তাদের ছেলেধরা সন্দেহে মারধর শুরু করে। খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনজনকে উদ্ধার করে নিয়ে আসি। এ সময় গুরুতর আহত ছিল তারা।

এদিকে ছেলেধরা সন্দেহে কাউকে পিটুনি দিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে না নেয়ার জন্য সবার প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন বাঁশখালী থানার ওসি রেজাউল করিম মজুমদার।
ভাঙ্গুড়া (পাবনা) প্রতিনিধি জানান, পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলায় ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন সোহাগ (১৮) নামের এক শিক্ষার্থী। সে স্থানীয় সরকারি হাজী জামাল উদ্দিন ডিগ্রি অনার্স কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ও উপজেলার টলটলিয়াপাড়া গ্রামের রঞ্জু প্রামাণিকের ছেলে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রোববার রাত আটটার সময় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে তাকে এলোমেলোভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখে এলাকাবাসীর সন্দেহ হয়। তারা তার সঙ্গে কথা বলার জন্য ডাক দিলে সে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। তখন এলাকাবাসী তাকে ধাওয়া করে ভাঙ্গুড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় যায়। সোহাগ সেখানে পৌঁছে তার পরিচিত এক ব্যক্তিকে জড়িয়ে ধরে বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার করতে থাকে। সাবেক কাউন্সিলর বাচ্চুর নেতৃত্বে উত্তেজিত জনতা তাকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। পরবর্তীতে ভাঙ্গুড়া উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মারুফ হাসনাত নটু সেখানে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেন।

দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি জানান, কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ছেলেধরা সন্দেহে হাসিনা বেগম (৬০) নামে মানসিক ভারসাম্যহীন এক নারীকে গণপিটুনি দিয়ে আহত করেছে এলাকাবাসী। পুলিশ তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসা দিয়ে পরিবারের নিকট হস্তান্তর করেছেন। গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে দৌলতপুর থানার পার্শ্ববর্তী শিতলাইপাড়া গ্রামে নির্মম ও অমানবিক এ ঘটনা ঘটেছে।

মাদারীপুর প্রতিনিধি জানান, মাদারীপুর সদর উপজেলার ধুরাইল ইউনিয়নের বৈরাগীর বাজার এলাকায় মানসিক ভারসাম্যহীন এক নারীকে  ছেলেধরা সন্দেহে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মাদারীপুর সদর উপজেলার ধুরাইল ইউনিয়নের বৈরাগীর বাজারে সোমবার সকালে এক মানসিক ভারসাম্যহীন নারীকে বাজারে ঘুরতে দেখে ছেলেধরা সন্দেহে আটক করে। পরে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। পুলিশে খবর দিলে পুলিশ গিয়ে ওই নারীকে উদ্ধার করে।

সিংড়া (নাটোর) প্রতিনিধি জানান, নাটোরের সিংড়ায় ছেলেধরা সন্দেহে আলী আহমেদ (৪০) নামে এক মানসিক ভারসাম্যহীন প্রতিবন্ধীকে মারপিট করে পুলিশে সোপর্দ করেছে স্থানীয়রা। গত রোববার রাত ৮টার দিকে উপজেলার মহেশচন্দ্রপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।  আটককৃত আলী ফেনী জেলার সদর থানার আবুল খায়েরের পুত্র। পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, সন্ধ্যায় মহেশচন্দ্রপুর গ্রামে ঐ ব্যক্তিকে ঘোরাঘুরি করতে দেখে সন্দেহ হয় এলাকাবাসীর। পরে তাকে আটক করে উত্তম মাধ্যম দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে।  

স্টাফ রিপোর্টার, নারায়ণগঞ্জ থেকে জানান, নারায়ণগঞ্জে গত ১১ দিনে ছেলেধরা সন্দেহে ৭টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। যার মধ্যে এক বাকপ্রতিবন্ধী যুবক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্যরা। এদের ৫ জনই প্রতিবন্ধী। ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি থেকে বাদ পড়েনি এক পিতা।  

ঘটনাগুলোর মধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জে ২জন, ফতুল্লায় ২ জন, সোনারগাঁয় ১ জন, সদরে একজন এবং আড়াইহাজারে একজন গণপিটুনির শিকার হন। তবে পুলিশের তদন্তে ঘটনার শিকার কেউই ছেলেধরা বলে শনাক্ত হয়নি। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছেলেধরা আতঙ্ক বিরাজ করছে।

ছেলেধরা সন্দেহে গত ২০শে জুলাই সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি পূর্বপাড়া আলামিন নগর এলাকায় বাকপ্রতিবন্ধী সিরাজ (৩১)কে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করে স্থানীয় লোকজন। এরমাত্র দুই ঘণ্টার ব্যবধানে সিদ্ধিরগঞ্জের ১ নম্বর ওয়ার্ডের পাইনাদী নতুন মহল্লার শাপলা চত্বর এলাকায় শারমিন (২০) নামে এক নারীকে একই অভিযোগে গণপিটুনি দেয়া হয়। পরে জানা গেছে, ওই নারী মানসিক রোগী ছিলেন।

একই দিন রাত সাড়ে ৯টার দিকে ফতুল্লার লালখা এলাকায় রাসেল মিয়া (৪৫) নামে এক ফুল ব্যবসায়ীকে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি দিয়ে মারাত্মক আহত করা হয়। রাসেল মিয়া ঢাকার জুরাইন দারোগা বাড়ি রোডের নূর হোসেনের ছেলে।
রাসেলের স্ত্রী নাসিমা রাতেই ফতুল্লা মডেল থানায় এসে স্বামীকে শনাক্ত করেন। তিনি জানান, তার স্বামী বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে ফুল বিক্রি করেন। সে ছেলেধরা নয়।

২১শে জুলাই সকালে ফতুল্লার তক্কারমাঠ এলাকায় ছেলেধরা সন্দেহে শেফালী বেগম (২৩) নামে এক নারীকে গণপিটুনি দেয় স্থানীয়রা। শেফালী বেগম কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ি থানার মো. আশরাফ চৌধুরীর স্ত্রী। কুড়িগ্রাম থেকে টেলিফোনে তার পরিবারের সদস্যরা পুলিশকে জানিয়েছে, শেফালীর মাথায় সমস্যা আছে।
একইদিন আড়াইহাজারে পৌরসভার মসজিদের সামনে ছেলেধরা সন্দেহে রাবেয়া বেগম (৬৫) নামে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী নারীকে পিটুনি দেয় স্থানীয় জনতা। পরে পুলিশ জানতে পেরেছে সেই বৃদ্ধা মানসিক প্রতিবন্ধী। সে ওই এলাকায় ভিক্ষা করতো। 

এর আগে গত ১১ই জুলাই সোনারগাঁয়ের শম্ভুপুরা এলাকায় ছেলেধরা সন্দেহে এক মানসিক ভারসাম্যহীন নারীকে গণপিটুনি দেয়া হয়।

১০ই জুলাই নারায়ণগঞ্জ নগরের ২ নম্বর রেলগেট এলাকায় বকাঝকা করতে করতে নিজের বাচ্চাদের নিয়ে রিকশায় যাওয়ার পথে ছেলেধরা সন্দেহে এক ব্যক্তিকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করে জনতা। পরে পুলিশ বিষয়টি যাচাই বাছাই করে ওই ব্যক্তিকে ছেড়ে দেয়।  

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ বলেন, একটি গোষ্ঠী এই ছেলেধরা গুজবকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ‘গুজবে কান দেবেন না। কেউ নিজ হাতে আইন তুলে  নেবেন না। যদি কাউকে ছেলেধরা সন্দেহ হয় তাহলে পুলিশকে খবর দিন। পুলিশ যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেবে। এজন্য সচেতনতা সৃষ্টিতে পুলিশের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
তিনি আরো বলেন, সিদ্ধিরগঞ্জের দু’টি ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় ইতিমধ্যেই ২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরো যারা জড়িত তাদেরও আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি জানান,  শ্রীমঙ্গলে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিকালে পুলিশের ভুমিকায় মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেলো কামাল মিয়া (২৫) নামে সিএনজি অটোরিকশা চালক। থানা পুলিশ জানায়, গত ২১শে জুলাই রোববার রাত অনুমান ৮টার দিকে র‌্যাব-৯ শ্রীমঙ্গল ক্যাম্পের একটি অভিযানিক দল উপজেলার কাকিয়াছড়া চা বাগান এলাকায় মাদক দ্রব্য উদ্ধার অভিযানে নামে। অভিযানকালে র‌্যাব ৩০ পিস  ইয়াবা ও প্রাইভেটকারসহ সিরাজ নগর গ্রামের আজাদ মিয়ার ছেলে  মো. আশাদ মিয়া (১৮), একই গ্রামের শেখ আব্দুল  করিমের ছেলে শেখ আহম্মদ রেজা (২৪)কে আটক করে। এসময় তাদের সঙ্গে থাকা সিএনজি অটোরিকশা চালক কামাল মিয়া গাড়ি ফেলে পালিয়ে কাকিয়া ছড়া চা বাগানে আশ্রয় নিলে স্থানীয় জনগণ তাকে ছেলেধরা সন্দেহে আটক করে গণপিটুনি দেয়।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর