× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা ইলেকশন কর্নার
ঢাকা, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, বুধবার

অনিশ্চয়তায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া

এক্সক্লুসিভ

ল্যারি জাগান | ২৩ আগস্ট ২০১৯, শুক্রবার, ৮:৪৫

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ২০১৭ সালের নভেম্বরে দ্বিপক্ষীয় একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। এতে মধ্যস্থতা করেছে চীন। সে অনুযায়ী, ওই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা ছিল ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে। তারপর থেকে আর কিছুই ঘটেনি। এরই মধ্যে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অচল হয়ে পড়ায় দুই দেশের সরকার একে-অন্যকে দোষারোপ করতে থাকে। অব্যাহতভাবে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ার জন্য কে দায়ী এজন্য একে-অন্যকে অভিযুক্ত করতে থাকে, বাঁকা বাক্য প্রয়োগ করতে থাকে। কিন্তু নেপথ্যে চীনের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ এবং জাপানের উৎসাহে সর্বশেষ প্রত্যাবাসন বিষয়ক দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে ভূমিকা রাখে। এ প্রক্রিয়ায় সমর্থন দেয় আঞ্চলিক গ্রুপ আসিয়ানও। এমনকি সর্বশেষ এই অবস্থায় এটা অস্পষ্ট যে, পরিকল্পনা মতো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আদতে শুরু হবে কি না। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আশ্রয় শিবিরের শরণার্থীরা ফিরে যেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সূত্রগুলো অনুযায়ী, দৃশ্যত এতে উদ্যোগটি নেয়া হয়েছে খুব তড়িঘড়ি করে এবং অপরিকল্পিতভাবে। মিয়ানমারে পরিস্থিতির ওপর ঘনিষ্ঠ নজর রাখছেন এমন পশ্চিমা একজন কূটনীতিকের মতে, খুব দ্রুততার সঙ্গে সব আয়োজন করা হয়েছে। তাছাড়া স্বচ্ছতায় যথেষ্ট ঘাটতি আছে। তাই এতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই যে, কেউ তাদের সেই কথায় কান দেবে না। মিয়ানমার যাচাই-বাছাই করে শরণার্থীদের ৩৫৪০ জনের একটি তালিকা দিয়েছে বাংলাদেশ সরকারকে। ঠিক দু’সপ্তাহ আগে বাংলাদেশ সরকার ওই তালিকাটি হস্তান্তর করেছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর’কে। তালিকার কোন কোন মানুষ ফিরে যেতে চায় তা সুনিশ্চিত হতে তাদের সহায়তা চায় বাংলাদেশ। ব্যাংককে ইউএনএইচসিআর’র মুখপাত্র ক্যারোলাইন গ্লুক বলেন, যে কোনো প্রত্যাবর্তন অথবা প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়ায় শরণার্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং তাদের ইচ্ছা হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। শরণার্থীদের ব্যক্তিবিশেষের সিদ্ধান্ত আর বৈধ প্রত্যাবর্তন এক নয়। তিনি ব্যাংকক পোস্টকে আরো বলেছেন, শরণার্থীদের দেশে ফেরার অধিকার আছে। মাঠপর্যায়ে অবস্থার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ওপর ভিত্তি করে যদি তারা ফিরে যাওয়ার জন্য উপযুক্ত সময় মনে করেন, তখনই তাদেরকে ফেরত যাওয়ার স্বাধীনতা অবশ্যই আছে। বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআর’র স্টাফের মতে, মাত্র তিনদিন আগে জাতিসংঘের এ সংস্থা শুরু করে ‘ইনটেনশনস সার্ভে’। এর আওতায় শরণার্থীদের পরিবারের সঙ্গে প্রাইভেটভাবে আলোচনা করা হয় তারা ফেরত যেতে চায় কিনা। এজেন্সির মতে, এই প্রক্রিয়া চলমান এবং অব্যাহত। ব্যাংকক পোস্টকে ই-মেইল মারফতে কক্সবাজার থেকে ইউএনএইচসিআর’র মুখপাত্র লুইস ডনোভান বলেছেন, শরণার্থীর সংখ্যা বিবেচনা করে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে আরো সময় লাগবে। তিনি আরো বলেন, শরণার্থীদের অবাধ ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নিতে দিতে হবে। তার ভাষায়, শরণার্থীদের সঙ্গে আলোচনার সময় মিয়ানমার ও মিয়ানমারের যে এলাকায় তাদের ফিরে যাওয়ার কথা সেখানকার উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর। মারাত্মক সীমাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছে ইউএনএইচসিআর। কারণ, যে রাখাইনে শরণার্থীদের ফেরত যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে, সেখানকার পূর্ণাঙ্গ অবস্থা যাচাই করতে আমাদেরকে বাধা দেয়া হচ্ছে। কয়েকদিনে বহু শরণার্থী ত্রাণকর্মীদের বলেছেন, আমরা সেখানে ফিরে যাবো না। কারণ, আমাদের ভয় রয়েছে এ নিয়ে যে, সেখানে গেলে আমরা অনিরাপদ থাকবো। কারণ রাখাইনের পরিস্থিতি এখনও অস্থিতিশীল। আবারও তাদেরকে জোর করে ফেরত পাঠানো হবে বলেও তারা ভীত। এর আগেও অনেকবার এমন হয়েছে। এমনকি জাতিসংঘের অধীনে যে প্রত্যাবাসন হয়েছিল ১৯৯০ এর দশকে তখনও এমন হয়েছে। আরো সহিংসতার আশঙ্কায় আশ্রয়শিবিরের শরণার্থীরা মিয়ানমারে ফিরে যেতে অব্যাহতভাবে অস্বীকার করে যাচ্ছেন। গত বছর নভেম্বরে প্রত্যাবাসন শুরু করার যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল তাতে শিবিরের ভিতর আরো আতঙ্ক ও সংশয় সৃষ্টি করে। এর ফলে শেষ পর্যন্ত ওই উদ্যোগ ব্যর্থ হয় শরণার্থীদের প্রতিবাদের মুখে। শিবিরের অনেক বাসিন্দাই আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ তাদেরকে জোর করে বের করে দেয়ার চেষ্টা করছে। রাখাইন পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে, এ বিষয়টি শরণার্থীদের বোঝাতে বেগ পাচ্ছে মিয়ানমার সরকার। গত মাসের শেষের দিকে, মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিব মিন থু-এর নেতৃত্বে একদল প্রতিনিধি শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেন এবং মিয়ানমারের ভিতরকার অবস্থা তাদের কাছে ব্যাখ্যা করেন। তাদেরকে নিশ্চয়তা দেন যে, কাউকে জোর করে বের করে দেয়া হবে না। রাখাইনের ভিতরকার অবস্থার উন্নতি হয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি হয়েছে। উন্নত হয়েছে জীবনধারণের ক্ষেত্র। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সামাজিক বন্ধন সৃষ্টি হয়েছে।
রাখাইনের মুসলিম জনগোষ্ঠী দশকের পর দশক নাগরিকত্বহীন অবস্থায় রয়েছেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তারা সেখানে বসবাস করলেও তাদেরকে নাগরিকত্ব দেয়া হয়নি। তাই অবশ্যই তাদের নাগরিকত্বের ইস্যুটি কণ্টকিত এক সমস্যা হয়ে রয়েছে। এ বিষয়টি মিয়ানমার সরকারকে মাথায় নিতে হবে। শরণার্থীদের অনেকেই এ সপ্তাহে ক্যাম্প কর্মকর্তাদের কাছে বলেছেন, তাদেরকে নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা দেয়া না হলে তারা ফিরে যাবেন না। কিন্তু মিয়ানমার সরকার ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন সার্টিফিকেট ইস্যুর বিষয়ে বড় রকম উদ্যোগ নিয়েছে, যেটা তাদেরকে সুনির্দিষ্ট আবাসিক অধিকার দেবে। এবং এর ফলে ১৯৮২ সালের নাগরিকত্বের আইনের অধীনে তাদেরকে ভবিষ্যতে নাগরিকত্বের পথ করে দেবে।
অবশ্যই শরণার্থীদের ‘নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, মর্যাদার সঙ্গে এবং টেকসই প্রত্যাবর্তনের’ বিষয়ে শরণার্থীদের আশ্বস্ত করতে বেশ বেগ পাচ্ছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকার। কিন্তু নিরাপত্তার ব্যবস্থা, ফিরে যাওয়া নিরাপদ কিনা- এ বিষয়টি মূল্যায়ন করতে জাতিসংঘ প্রস্তুত নয়। জাতিসংঘের সূত্রগুলোর মতে, এটা হলো দ্বিপক্ষীয় বিষয়। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া প্রকৃতপক্ষেই স্বেচ্ছায় হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে বাস্তবেই উদ্বিগ্ন ইউএনএইচসিআর’র সবাই। শরণার্থীদের আশ্রয়শিবিরের সূত্রগুলো বলছে, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তায় বহু সংখ্যক শরণার্থীর মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। তাদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে যে, প্রত্যাবাসন বাধ্যতামূলক করা হতে পারে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশি স্থানীয় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তারা এরই মধ্যে অভিযোগ তুলেছে। তাদের কথায়, তারা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য কঠোরতা অবলম্বন করছে। ফলে গত বছর যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল, সেই একই রকম অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার দৃঢ় সম্ভাব্যতা রয়েছে। ওই সময় রাখাইনে ফেরত নিতে শরণার্থী ক্যাম্পে হাজির হয়েছিল বাস। তাতে লাগানো ছিল ব্যানার। তাতে মিয়ানমার বলছিল- ওয়েলকাম। কিন্তু সেই বাসে কেউই ওঠেননি। মিয়ানমার ও বাংলাদেশ দু’পক্ষই আসিয়ান, সেক্রেটারিয়েট ও আসিয়ান কো-অর্ডিনেটিং কমিটি ফর হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাসিসট্যান্সের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক সংস্থার (এএইচএ) দ্বারস্থ হয়েছে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া মনিটরিংয়ে সহায়তার জন্য। সূত্রগুলোর মতে, আসিয়ান এ নিয়ে এখনও সতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে এই বছর থাই চেয়ারম্যানশিপের অধীনে আসিয়ান রাখাইন সঙ্কট সমাধানে মিয়ানমারের প্রচেষ্টাকে সহায়তা করার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন। মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আসিয়ান সেক্রেটারিয়েটের সদস্যরা ও এএইচএ’র প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেছেন। এ বছরের শুরুর দিকে তারা উত্তর রাখাইনে প্রিলিমিনারি নিডস অ্যাসেসমেন্ট সম্পন্ন করে, যেখানে শরণার্থীরা ফিরে যাবেন বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। যখন এ সপ্তাহে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে কিনা দেখার অপেক্ষা, তখন এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, মিয়ানমার ও বাংলাদেশ রয়েছে ক্রমাগত চাপে। সেই চাপটা আসছে চীন থেকে এবং তার চেয়ে একটু কম চাপ আসছে জাপান থেকে। চীনের বিশেষ দূত সান গুয়াওসিয়াং রাখাইন সমস্যা সমাধান ও শরণার্থী প্রত্যাবর্তন শুরু করার ক্ষেত্রে মিয়ানমারকে সহায়তা দিতে নিজের মনোযোগ নিবদ্ধ করেছেন। চীনা কর্মকর্তাদের মতে, এ বছর এ বিষয়টি মাথায় রেখে তিনি বেশ কয়েকবার সফরে এসেছেন। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে সামনে এগিয়ে নিতে পর্দার আড়ালে বাংলাদেশের সঙ্গেও কাজ করছেন চীনা কূটনীতিকরা। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জুলাইয়ে রাষ্ট্রীয় সফরে চীন গিয়েছিলেন। এ সময় বেইজিংয়ে তিনি সাক্ষাৎ করেছেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে। তখন শরণার্থী সংকট সমাধানে তিনি চীনের সমর্থন চেয়েছেন। গত সপ্তাহে চীনা দূত সান গুয়াওসিয়াং আলাদাভাবে সাক্ষাৎ করেছেন মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সুচি ও সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে। তাদের সঙ্গে রাখাইন ইস্যুকে সামনে এগিয়ে নেয়ার উপায় নিয়ে আলোচনা করেছেন। উৎসাহিত করেছেন প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য। জাপানও রাখাইন ইস্যুতে নিজেকে যুক্ত করেছে। শান্তভাবে তারা বেসামরিক ও সামরিক নেতাদের উৎসাহিত করছে শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেয়া শুরু করতে। এ প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় ভূমিকায় আছে জাতিসংঘ, এটা জানে টোকিও। জুলাইয়ের শেষের দিকে ন্যাপি’ড এবং ঢাকা সফর করেছেন জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি উভয় দেশের সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন আরো সহযোগিতার এবং প্রত্যাবাসন শুরু করার উপায় খুঁজে বের করার জন্য। সহায়তা, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যে চীন ও জাপানের ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল বাংলাদেশ ও মিয়ানমার। এতে মনে হচ্ছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে যে অচলাবস্থা রয়েছে তা সফলভাবে ভেঙে দিয়েছে অর্থনীতি। কিন্তু ন্যূনতম পক্ষে এই সপ্তাহে শরণার্থীদের রাখাইনে ফেরত যাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারে না শুধু আঞ্চলিক চাপ। তবে আশা করা যেতে পারে, শরণার্থীদের প্রথম ব্যাচ শিগগিরই ফিরে যাবেন এবং গুরুতর প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে।
(ল্যারি জাগান মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষজ্ঞ। তিনি বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে আঞ্চলিক নিউজ এডিটর ছিলেন। তার এ লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে অনলাইন ব্যাংকক পোস্ট-এ। সেখান থেকে অনুবাদ প্রকাশিত হলো কিছুটা সংক্ষেপিত।)

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর