× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা ইলেকশন কর্নার
ঢাকা, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, বুধবার
ক্রাইম জোন বাড্ডা

গ্রুপ দ্বন্দ্বে ১১ বছরে ২০ খুন

প্রথম পাতা

আল আমিন | ২৫ আগস্ট ২০১৯, রবিবার, ৯:১০

ক্রাইম জোন বাড্ডা। আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির টাকা ভাগবাটোয়ারা নিয়ে সেখানে প্রায়ই হচ্ছে সংঘর্ষ, খুনোখুনি। শুধু তাই নয়, এক সময়ের শান্ত এ বাড্ডায় রাজনৈতিক বিরোধ, ডিশ ব্যবসা, জুট ব্যবসা, ফুটপাথ ও বাসস্ট্যান্ডের চাঁদাবাজি এবং গরুর হাটের ইজারা- বছরের পর বছর ধরে ঝরছে রক্ত। চলছে এক সময়ের দাপুটে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম ভাঙিয়ে চাঁদা আদায়। গোয়েন্দাদের ধারণা, ওই টাকা দেশে নয়, বিদেশেও যাচ্ছে। বাস-সিএনজি-লেগুনা স্ট্যান্ড, নির্মিত নতুন বাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনা, ফুটপাথ, বাজারসহ আরো কিছু ক্ষেত্র থেকে চাঁদাবাজি করছে দুর্বৃত্তরা। গোয়েন্দাদের ধারণা চাঁদাবাজির টাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী আমেরিকায় অবস্থানরত রবিন ও মালয়েশিয়ায় থাকা ডালিমের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। তাদের সাঙ্গপাঙ্গরা এলাকায় ডিশ ব্যবসা ও ক্যাবল নেটওয়ার্ক ব্যবসাসহ অন্যান্য ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে।

বাড্ডায় দিন দিন মাদকের বিস্তার বাড়ছে। এসব কারণে গ্রুপ দ্বন্দ্বে সেখানে গত ১১ বছরে খুন হয়েছে ২০ জন। এরমধ্যে ১০ জনই হচ্ছে এলাকার রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, ডিশ ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও গরুর হাটের ইজারাদার। এলাকায় নিজস্ব আধিপত্য বজায় রাখতে গড়ে উঠেছে একাধিক গ্রুপ। এ বিষয়ে বাড্ডা জোনের পুলিশের সহকারী কমিশনার এলিশ চৌধুরী মানবজমিনকে জানান, পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে। পুলিশ অপরাধী ও আশ্রয়দাতা কাউকে ছাড় দিবে না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৯৮ সালের পর থেকে বাড্ডা এলাকার অবকাঠামো নির্মাণ হওয়া শুরু হয়। বাড্ডার এখনো কিছু এলাকা ইউনিয়ন হিসাবে পরিচিত। বর্তমানে এলাকায় শিক্ষিত ও নিম্নবিত্ত মানুষ বসবাস করে। যেসব সন্ত্রাসী আগে মিরপুর এলাকায় থাকতো তারা এ এলাকায় গা-ঢাকা দেয়া শুরু করে। এতে ওই এলাকায় তাদের বিচরণ বেড়ে যায়। ওই টপটেরররা কৌশলে এলাকার বখাটে ও অর্ধশিক্ষিত ছেলেদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করে আসছে।

বাড্ডার পুলিশের সহকারী কমিশনারের অফিসের এক কর্মকর্তা জানান, বাড্ডা এলাকায় বেশির ভাগ খুনাখুনির ঘটনা ঘটছে চাঁদাবাজির টাকা ভাগবাটোয়ারা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। এ ছাড়াও খাল ভরাট, বালুমহাল দখল, অন্যের জমিতে মাছের ঘের নির্মাণ করে দখলে রাখা, মাদক ব্যবসা, ডিশ ব্যবসা ও জুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণসহ আরো অনেক ঘটনার কারণে ওই এলাকায় অপরাধ বাড়ছে। মূলত দুইটি গ্রুপ এলাকায় সক্রিয় রয়েছে। একটি ডালিম গ্রুপ ও রবিন গ্রুপ। তারা দুইজন পুলিশের খাতায় শীর্ষ টপটেরর। বাড্ডা থানায় দুইজনের নামে প্রায় ৪০টি মামলা রয়েছে। অধিকাংশ খুন ও চাঁদাবাজির। তারা দুইজনই বিদেশে অবস্থান করছে। এ ছাড়াও ওই এলাকায় চাঁদাবাজির জন্য গড়ে উঠেছে ভাগ্নে ফারুক গ্রুপ, মেহেদী গ্রুপ, রায়হান গ্রুপ, জাহাঙ্গীর গ্রুপ ও আলমগীর গ্রুপ। এসব গ্রুপের সদস্যরা অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে নিরীহ মানুষদের কাছ থেকে চাঁদা দাবি করছে। চাঁদা না দিলে তাদের ওই অস্ত্র দিয়ে গুলি করে হত্যা করছে।

এলাকাবাসী জানায়, ২০০০ সালে রাজধানীর তিতুমীর কলেজের ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের নেতা ছিলেন ডালিম। ওই নাম ভাঙ্গিয়ে বাড্ডা এলাকায় নিজের আধিপত্য গড়ে তোলে। এ ছাড়াও সন্ত্রাসী রবিন ওই এলাকার নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলে। রবিন পরিবারের অভাব অনটনের কারণে বেশি  পড়ালেখা করেনি। ছোট বেলায় সে এলাকায় ছিঁচকে চোর হিসেবে পরিচিত ছিল। পরে জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ডালিম ও রবিন  বিদেশে পাড়ি জমায়।
থানা পুলিশ জানায়, তারা বিদেশে চলে গেলেও তাদের সাঙ্গপাঙ্গরা এলাকায় তাদের নাম ভাঙ্গিয়ে চাঁদাবাজি করছে। বিদেশে থেকে তারা দুইজন এলাকার উঠতি সন্ত্রাসীসহ অন্যদের মদত যোগাচ্ছে। ডিশ ব্যবসা, জুট ব্যবসা, ফুটপাথ ও বাসস্ট্যান্ডের চাঁদাবাজি ও গরুর হাটের ইজারা থেকে প্রতি মাসে প্রায় ২ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করছে। তার অধিকাংশ চলে যাচ্ছে বিদেশে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতা জানান, শীর্ষ দুই সন্ত্রাসী গা-ঢাকা দিলেও তাদের নির্দেশে চলছে এলাকায় অপরাধ কর্মকাণ্ড। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আবার এলাকায় দুইটি গ্রুপ সক্রিয় হয়েছে। একটি ভাগ্নে ফারুক গ্রুপ। আরেকটি জাহাঙ্গীর গ্রুপ। তারা দুইজনই একটি রাজনৈতিক দলের বাড্ডা এলাকার প্রভাবশালী নেতা। টেন্ডার, হাটের ইজারা, নতুন ভবন নির্মাণে তাদের চাঁদা না দিলে ওই কাজ হবে না। বাড্ডা জাগরণী সংসদের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান জানান, বাড্ডা এলাকায় গত ১৫ বছরে নানা কারণে অশান্তি বিরাজ করছে। চাঁদাবাজি, খুনাখুনি হচ্ছে। এতে এলাকার লোকজন আতঙ্কে থাকে।

জানা গেছে, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে  কেন্দ্র করে ২০০৯ সালে স্বেচ্ছাসেবক লীগ কর্মী নাজিমকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ২০১২ সালের ২৯শে ডিসেম্বর দক্ষিণ বাড্ডায় দিনদুপুরে গুলি ও বোমা ছুড়ে হত্যা করা হয় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মামুনুর রশীদ মামুনকে।

২০১৩ সালের ৩০শে নভেম্বরে বাড্ডার হোসেন মার্কেটের পিছনে একটি নির্মাণাধীন বাড়ির চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসীরা ২ নির্মাণ শ্রমিককে গুলি করে হত্যা করে। ২০১৪ সালের ৩রা মে বাড্ডা জাগরণী ক্লাবের ভিতর বাড্ডা থানা ছাত্রলীগের সহসভাপতি মোফাজ্জল হোসেন রাহিনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ২০১৫ সালের ১৬ই জানুয়ারি বাড্ডায় দুলাল হোসেন নামের এক পুলিশ সোর্সকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ২০১৫ সালের ১৩ আগস্ট রাতে বাড্ডার আদর্শনগর পানির পাম্পের একটি কক্ষে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন বাড্ডার ছয় নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শামসুদ্দিন মোল্লা, ব্যবসায়ী ফিরোজ আহমেদ মানিক, ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান গামা এবং যুবলীগ নেতা আব্দুস সালাম।

২০১৫ সালের ৮ই জানুয়ারি আনন্দনগরে দুই গ্রুপের গোলাগুলির সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান আমির হোসেন (৩৫) নামের এক যুবক।  ২০১৮ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি দিনেদুপুরে মেরুল বাড্ডার মাছের আড়তে ঢুকে রবিন গ্রুপের নির্দেশনায় আবুল বাশার নামে আরেক সন্ত্রাসীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ২০১৮ সালের ২২শে এপ্রিল বাড্ডার বেরাইদ ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের জাহাঙ্গীর আলমের ছোট ভাই কামরুজ্জামান দুখু প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হয়। ২০১৮ সালের ৯ই মে জাগরণী ক্লাবের মধ্যে সন্ত্রাসীরা ঢুকে ডিশ ব্যবসায়ী বাবুকে গুলি করে হত্যা করে। ২০১৮ সালের ১৫ই জুন উত্তর বাড্ডা আলীর মোড় সংলগ্ন বাইতুশ সালাম জামে মসজিদ থেকে জুমার নামাজ পড়ে বের হওয়ার পর প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় আওয়ামী লীগ নেতা ফরহাদ আলীকে। এ ছাড়াও এর আগের ৩ বছরে সাইদুর, মাসুম, আলাউল ইসলাম, রুবেল ও তাইজুল ইসলামকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর