× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা ইলেকশন কর্নার মন ভালো করা খবর
ঢাকা, ১৫ অক্টোবর ২০১৯, মঙ্গলবার

‘রোবট শ্রমিক’ নিয়ে সামনে বড় শঙ্কা

এক্সক্লুসিভ

অর্থনৈতিক রিপোর্টার | ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, বুধবার, ৭:৪০

দেশের পোশাক খাতে ইতিমধ্যেই বেশকিছু কারখানায় অটোমেশন চালু আছে। তাতে কিছুটা হলেও শ্রমিকদের বেকারত্বে প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু আসছে রোবট শ্রমিক বা প্রযুক্তি পোশাক শিল্পে যুক্ত হলে উৎপাদন বাড়বে, তবে লাখ লাখ শ্রমিক জবলেস বা চাকরিচ্যুত হতে পারেন বলে মন্তব্য করেছেন এ শিল্পের সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি সৃষ্টি হতে পারে সামাজিক বিশৃঙ্খলা।

বর্তমানে দেশের কারখানার চিত্র হচ্ছে- এক ছাদের নিচে লাইন ধরে বসানো সারি সারি সেলাই মেশিন। এতে কাজ করছেন শত শত নারী শ্রমিক। কিন্তু যেভাবে প্রযুক্তির পরিবর্তন আসছে। দশবছর পর বাংলাদেশের পোশাক কারখানার এই চিত্র নাও থাকতে পারে।


এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি ও বাংলাদেশ রপ্তানিকারক এসোসিয়েশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, আমাদের দেশে এখনো রোবটিক প্রযুক্তি চালু হয়নি। তবে বর্তমানে বেশকিছু নামিদামি কারখানায় অটোমেশন চালু আছে। এই অটোমেশন চালু হওয়াতেই একটা লেভেলে কিছু শ্রমিক চাকরি হারিয়েছে। রোবটিক প্রযুক্তি নিয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি চালু হলে আমাদের হয়তো উৎপাদন বাড়বে। কিন্তু লাখ লাখ শ্রমিক জবলেস হয়ে পড়বে। এর ফলে তখন সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। বলেন, ইতিমধ্যেই যেসব দেশে রোবট শ্রমিক চালু হয়েছে, তাতে দেখা গেছে একজন শ্রমিক একাই ১০টি মেশিন চালাচ্ছেন। যেখানে একই কাজ আগে প্রায় ১০-১২ জন শ্রমিক করতেন। তিনি বলেন, এই প্রযুক্তি বর্তমানে খুবই ব্যয়বহুল। আমাদের উদ্যোক্তাদের কতজনের এই সক্ষমতা আছে তা ভেবে দেখতে হবে। কারণ এমনিতেই ক্রেতারা আমাদের পোশাকের দাম কম দিচ্ছেন। দাম বাড়াচ্ছেন না। এই অবস্থায় রোবটিক প্রযুক্তির দিকে যাওয়া কঠিন হবে। তবে সময়ই বলে দেবে কখন কি করতে হবে।

এদিকে বিবিসি’র এক খবরে নিউ ইয়র্কের শিমি টেকনোলজি নামের একটি প্রযুক্তি কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সারাহ ক্রেসলি বলেন, ১০ বছর পরের পোশাক কারখানায় খুব অল্প শ্রমিকই আসলে কাজ করবে। রোবটিক যন্ত্রপাতির পাশাপাশি তখনো আমরা হয়তো কিছু কর্মীকে কাজ করতে দেখবো। কারখানাজুড়ে তখন বেশি থাকবে নানা ধরনের স্বয়ংক্রিয় রোবটিক যন্ত্রপাতি। থাকবে অনেক কম্পিউটার। কারখানার বড় অংশ জুড়ে থাকবে ডিজাইন রুম। বেশির ভাগ কর্মী কাজ করবে এই ডিজিটাল প্রযুক্তি নিয়ে। তার মতে, যেভাবে অটোমেশন গাড়ি নির্মাণ শিল্পকে পাল্টে দিয়েছে, এবার পোশাক শিল্পে তারই পুনরাবৃত্তি দেখা যাবে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার হিসাব দিয়ে সারাহ ক্রেসলি জানান, বর্তমানে পোশাক শিল্পে কাজ করে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক। এদের ৬০ হতে ৮৮ শতাংশ তাদের কাজ হারাবে অটোমেশনের কারণে। তার মতে, বাংলাদেশের সামনে বিপদ অনেক রকমের। প্রথমটা হচ্ছে এই অটোমেশন, যেটা ইতিমধ্যে ঘটতে শুরু করেছে। দ্বিতীয় হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবে বদলে যাওয়া ফ্যাশন ট্রেন্ড, যেটা বিরাট প্রভাব ফেলছে পোশাকের ব্র্যান্ডগুলোর উপর।

বিকেএমইএ’র সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, অটোমেশন এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। একটা মাঝারি আকারের কারখানার কাটিং সেকশনে দেড়-দুইশ’ লোক লাগতো। সেখানে এখন অটোমেটিক কাটিং মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে, যেখানে শ্রমিক লাগে ১০ থেকে ১২ জন। অর্থাৎ ১০ ভাগের এক ভাগ লোক লাগে। এ রকম অটোমেশন কিন্তু চলছেই। আগামী ১০ বছরে এই শিল্পে যে বিরাট পরিবর্তন ঘটবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

ফজলুল হক বলেন, দেশের প্রতিটি কারখানাই এখন কম-বেশি এ রকম অটোমেশনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে।
গার্মেন্ট শ্রমিক নেত্রী নাজমা আক্তার বলেন, অটোমেশন শ্রমিকদের কাজ কেড়ে নিচ্ছে, সেটা তিনি নিজ চোখেই দেখতে পাচ্ছেন প্রতিদিন। তিনি বলেন, সুতা কাটা, আযরন করা, কাটিং, ড্রয়িং, লে-আউট, লোডিং-আনলোডিং কোনো কাজই এখন মেশিন করছে না। বিভিন্ন ধরনের মেশিন চলে আসছে, যেখানে আর আগের মতো শ্রমিকের দরকার হচ্ছে না। তার মতে, কয়েক বছর আগেও প্রতিটি কারখানায বেশির ভাগ মেশিনে দু’জন করে লোক লাগতো। একজন মেশিনটি চালাতেন, আরেকজন উল্টোদিকে বসে সাহায্য করতেন। গত তিন-চার বছরে পর্যায়ক্রমে হেল্পারের পদ খালি হয়ে গেছে। মেশিন ওই জায়গা দখল করে নিয়েছে।

নাজমা আক্তার বলেন, মালিকরা নতুন প্রযুক্তির ব্যাপারে এত আগ্রহী হওয়ার কারণ, এটি তাদের আরো বেশি মুনাফার সুযোগ করে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, গার্মেন্টস মালিকদের সঙ্গে যখন আমরা কথা বলি, তারা বলে চারটা লোক যে কাজ করে, একটা মেশিনেই এখন সেই কাজ হয়। একজন শ্রমিককে ন্যূনতম আট হাজার টাকা মজুরি দিতে হয়। চারজন শ্রমিকের পেছনে যায় প্রায় ৩২ হাজার টাকা। কিন্তু এখন নাকি আট হাজার টাকাতেই একটি মেশিন পাওয়া যায়। কাজেই মালিকরা সেই পথেই যাচ্ছেন। তার মতে, অটোমেশনের প্রথম শিকার হচ্ছেন কারখানার নারী শ্রমিকরা।

পোশাক শিল্প উদ্যোক্তা ফজলুল হক মনে করেন, যেটা বলা হচ্ছে রোবট এসে সব দখল করে নেবে এবং এর ফলে এই শিল্প আর বাংলাদেশে থাকবে না, ইউরোপ-আমেরিকাতেই ফিরে যাবে। কিন্তু এই কথার মধ্যে আমি একটা ফাঁক দেখছি। মানুষের জায়গায় রোবট বসালে তার খরচ কী দাঁড়াবে এবং সেই বিনিয়োগ সবাই করতে পারবে কি-না বা এই রোবটের অপারেশনাল খরচ কী হবে, এগুলোর কোনো পরিষ্কার জবাব কিন্তু এখনো আমি কোনো স্টাডিতে দেখিনি।
জানা গেছে, বিশ্ববাজারে পোশাক সরবরাহকারী হিসেবে চীন আছে শীর্ষস্থানে। তারা মোট চাহিদার ৩০ শতাংশ সরবরাহ করে। আর এরপর দ্বিতীয় স্থানে থাকা বাংলাদেশ সরবরাহ করে মাত্র ছয় শতাংশ। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ব্যবসা বাড়ানোর অনেক সুযোগ এখনো রয়ে গেছে। ঠিক কৌশল নিতে পারলে বাংলাদেশের সুযোগের সীমা কিন্তু এখনো অনেক দূর বিস্তৃত করা সম্ভব।

প্রযুক্তিভিত্তিক যে নতুন শিল্পবিপ্লবের ঢেউ এসে লেগেছে বাংলাদেশে, তার ধাক্কায় গার্মেন্টস শিল্প যে আমূল বদলে যেতে চলেছে, তা নিয়ে এই খাতের কারও মনেই কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু রোবটিক প্রযুক্তি যে লাখ লাখ কর্মীর কাজ নিয়ে নেবে, তার কর্মসংস্থান কোথায় হবে, সেটি এখনো স্পষ্ট নয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর