× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা ইলেকশন কর্নার মন ভালো করা খবর
ঢাকা, ১২ নভেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার
কৃষক লীগের সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী

কৃষি জমির ওপর শিল্প প্রতিষ্ঠান নয়

প্রথম পাতা

স্টাফ রিপোর্টার | ৭ নভেম্বর ২০১৯, বৃহস্পতিবার, ৯:৩৬

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমাদের কৃষি জমিকে বাঁচাতে হবে। ১৬ কোটি মানুষকে খাওয়াতে হবে। তাই কৃষি জমিকে নষ্ট করা যাবে না। বিএনপি’র সময় সারের জন্য কৃষককে জীবন দিতে হয়েছে। এখন আর কৃষককে জীবন দিতে হয় না। এখন সার কৃষকের হাতে পৌঁছে যায়। রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ কৃষক লীগের দশম জাতীয় সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। দিনব্যাপি এ সম্মেলনের দ্বিতীয় পর্বের অনুষ্ঠান হয় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে।
সেখানে সমির চন্দ্র চন্দকে সভাপতি ও উম্মে কুলসুম স্মৃতিকে সাধারণ সম্পাদক করে নতুন কমিটি গঠন করা হয়।

কৃষক লীগের সম্মেলন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কাউন্সিলর ও ডেলিগেটরা এসেছেন। তারা তাদের অধিবেশনে নেতা নির্বাচন করবেন। আমি কৃষক লীগের এই সম্মেলনের সফলতা কামনা করছি। এর আগে সকাল ১১টা ১০ মিনিটের দিকে সম্মেলনে উপস্থিত হন প্রধানমন্ত্রী।

এরপর জাতীয় সংগীত পরিবেশনের পর জাতীয় পতাকা ও কৃষক লীগের দলীয় পতাকা উত্তোলন করেন। পরে শান্তির প্রতীক পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে সম্মেলনের উদ্বোধন ঘোষণা করেন তিনি। সোয়া ১১টার দিকে মূল মঞ্চে উঠে হাত নেড়ে সবাইকে অভিবাদন জানিয়ে প্রধান অতিথির আসন গ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানের শুরুতেই পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ পাঠ করা হয়। তারপর সংগঠনের সাময়িকী ‘কৃষকের কণ্ঠ’-এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়। সংগঠনের সাংস্কৃতিক সম্পাদকের তত্ত্বাবধানে‘যদি রাত পোহালে শোনা যেতো বঙ্গবন্ধু মরে নাই’ গানটি পরিবেশন করা হয়। এরপর ‘কৃষক বাঁচাও, দেশ বাঁচাও, হাসিনার নির্দেশে’ এই দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করেন শিল্পীরা। সম্মেলন মঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর দুই পাশে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলী, সর্বভারতীয় কৃষাণ সভার সাধারণ সম্পাদক অতুল কুমার রঞ্জন উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেন, যেখানে-সেখানে শিল্প-কারখানা করতে দেয়া হবে না। আমরা ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল করে দিচ্ছি। কারও শিল্প-কারখানা করার দরকার হলে সেখানে আমরা প্লট দিয়ে দেব। কৃষকের জন্য বঙ্গবন্ধুর গৃহীত পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৭২ সালের ২৯ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু কৃষক লীগ প্রতিষ্ঠা করেন। যেন কৃষক লীগের নেতারা কৃষকের কথা বলতে পারেন। কৃষি কাজে যারা ভালো ফলাফল দেবেন, তাদের গবেষণা, কৃষি উৎপাদন ও উৎসাহ দেয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু তহবিল গঠন করেছিলেন। এই তহবিল থেকে কৃষিক্ষেত্রে অবদানের জন্য পুরস্কার দেয়ার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় ৭৫-এ জাতির পিতাকে হত্যার পর এই পুরস্কার বন্ধ করে দেয়া হয়। পরে আমরা ক্ষমতায় এসে আইন করে কৃষকদের জন্য পুরস্কার ও প্রণোদনা দিয়ে যাচ্ছি। বিএনপি এসে বিএডিসি বন্ধ করে দিয়েছিল।

বিএনপির যুক্তি হলো বিএডিসি নাকি লাভজনক না। সবসময় সবকিছুতে লাভ-লোকসান দেখলে চলে না। দেশের মানুষ কীভাবে উপকৃত হবে সেটিই আমাদের দেখতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা বর্গাচাষি এরা অন্যের জমি চাষ করেন। নিজেদের কোনো জমি নেই। তারা ব্যাংক থেকে কোনো ঋণ নিতে পারত না। আমি কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে বর্গাচাষিদের জন্য বিনা জামানতে স্বল্পসুদে কৃষি ঋণ দিতে শুরু করি। আমরা কৃষিতে ভর্তুকি দিই। আপনারা জানেন ৯৮ সালে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। বাংলাদেশের প্রায় ৭০ ভাগ অঞ্চল পানির নিচে ছিল। বিদেশিরা বলেছিল, দুই কোটি মানুষ না খেয়ে মারা যাবে। আমরা বলেছি, একটি মানুষও না খেয়ে মারা যাবে না। আমরা হাতে রুটি বানিয়েছি এবং হেলিকপ্টারে তা বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া এয়ারফোর্সের হেলিকপ্টারের মাধ্যমে সার, চারা পৌঁছে দিয়েছি। যাতে কৃষক উৎপাদনে যেতে পারে। কৃষক লীগের সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি। বাংলাদেশ আজ থেকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। আমরা যেদিন পার্লামেন্টে এই ঘোষণা দিয়েছিলাম সেদিন খালেদা জিয়া ও সাইফুর রহমান বলেছিলেন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া ভালো না। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলে বিদেশ থেকে সাহায্য পাওয়া যাবে না। জবাবে আমরা বলেছিলাম, ভিক্ষুক জাতির ইজ্জত থাকে না। আমরা ভিক্ষুক হতে চাই না। আমাদের মাটি ও মানুষ আছে। এই মাটি ও মানুষ দিয়েই আমরা দেশকে গড়ে তুলব। শেখ হাসিনা বলেন, আমরা কৃষকদের ভর্তুকি দেয়া শুরু করি। ওই সময় বিশ্ব ব্যাংকের একজন প্রতিনিধি এসেছিলেন। তিনি বললেন, কৃষকদের ভর্তুকি দেয়া যাবে না। ভর্তুকি দিলে আমরা টাকা দেব না। আমি বলেছিলাম, আপনাদের টাকা লাগবে না। আমরা আমাদের টাকা দিয়ে কৃষকদের ভর্তুকি দেব। গত ১০ বছরে আমরা ৬৫ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছি। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে কৃষিতে বাজেট ছিল ৭ হাজার কোটি টাকা।

আমরা ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১৪ হাজার ৫৩ কোটি টাকা বাজেট দিয়েছি। এছাড়া ২ কোটি ১৩ লাখ কৃষককে উপকরণ কার্ড দিয়েছি। আমরা যে প্রণোদনা দিচ্ছি তা তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়ে যায়। এছাড়া তারা ওই কার্ড দেখালে সেখান থেকে স্বল্পমূল্যে কৃষি উপকরণ কিনতে পারবে আমরা সেই ব্যবস্থা করে দিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আমাদের এক ফোটা জমিও অনাবাদী থাকে না। এমনকি ছাদেও যেন চাষ হয়। যাদের ভিটা মাটি আছে সেই ভিটার পাশে যেন চাষাবাদ হয় সেই লক্ষ্যে আমার বাড়ি, আমার খামার প্রকল্প করে যাচ্ছি। আমরা কৃষকদের জন্য পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক করে দিয়েছি। কৃষকরা সমবায়ের মাধ্যমে যেন তাদের পণ্য বাজারজাত করতে পারে আমরা সেই ব্যবস্থা করে দিয়েছি। কৃষক লীগের সম্মেলনের প্রধান অতিথি আরও বলেন, আমরা ফসলকে বহুমুখী করতে চাই। এ পর্যন্ত ১০৮টি ধানের জাত আবিষ্কার করতে পেরেছি। আয়রন ও জিংকসমৃদ্ধ চাল উৎপাদন করতে পেরেছি। আমি নিজেও সেই চাল খেয়ে দেখেছি। এছাড়া ৪৪২টি উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে পেরেছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরও বলেন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি আমরা এবার পুষ্টির দিকে নজর দিচ্ছি। আমরা মাছ ও খাদ্য উৎপাদনে বিশ্বের মধ্যে চতুর্থ অবস্থানে আছি। এছাড়া তরি-তরকারি উৎপাদনে তৃতীয় অবস্থানে আছি। রপ্তানি বাণিজ্যে কৃষিপণ্য যেন প্রাধান্য পায় সেদিকে লক্ষ্য রেখে আমরা প্রণোদনা দিয়ে যাচ্ছি। আমরা ভূমিহীনদের ভূমি দিচ্ছি। গৃহহীন-ভূমিহীনদের জন্য গুচ্ছগ্রাম করে দিচ্ছি। যার কিছুই নেই অন্তত আশ্রয়ন প্রকল্পে থাকার জায়গা দিচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য কেউ গৃহহারা থাকবে না। অন্তত তার যেন মাথা গোঁজার ঠাঁই থাকে। আমাদের অর্থনীতিতে কৃষির অবদান সবচেয়ে বেশি। এর ফলে আমরা প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৩ ভাগ অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি।

ধানের বীজতলা রোপণ বা কাটার সময় আমাকে ডাকতে বলেছি: কৃষিকাজ বা নিজের কাজ নিজে করাকে গর্বের বিষয় বলে মনে করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। লেখাপড়া শেখার পর কেউ আর মাঠে যেতে চায় না। তবে কৃষি সংক্রান্ত কোনো কাজে গ্রামের মানুষকে তাকে ডাকতে বলে রেখেছেন বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, গতবার ধান কাটার সময় শ্রমিক সংকটের কারণে আমাদের ছাত্রলীগকেও বলেছিলাম, তোমরা এখন মাঠে চলে যাও, সবাই ধান কাটায় কৃষকদের হাত বাড়াও, তাদের সাথে হাত লাগাও। এটা লজ্জার কিছু না। নিজের কাজ নিজে করায় লজ্জার কিছু থাকে না। নিজের ফসল নিজে উৎপাদন করব, নিজের খাবার নিজে খাব, তাতে লজ্জার কি আছে। কোনো কাজে লজ্জার কিছু নেই। সব কাজ করার মত ক্ষমতা রাখি, প্রয়োজনে আমিও বলেছি, আমিও যাব। আমি আমার গ্রামে বলে রেখেছি, তোমরা যখন ধানের বীজতলা রোপণ করবা বা ধান কাটবা আমাকে খবর দেবেন, দরকার হলে আমিও যাব। কারণ আমার এতে কোনো লজ্জা নেই। তিনি বলেন, আমাদের যারা লেখাপড়া শেখে তারা আর কৃষিকাজে মাঠে যেতে চায় না। কৃষকের ছেলে, বাবা কৃষিকাজ করে লেখাপড়া শিখিয়েছে কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের। তারা দুই পাতা (লেখাপড়া) পড়েই মনে করে, আমি কেন মাঠের কাজে যাব। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সমস্ত পরিকল্পনা গ্রামকে ঘিরে। আমরা ব্যাপকভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি করে দিচ্ছি। কৃষি পণ্য বাজারজাত করণের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। এজন্য সমবায়কে আরও গুরুত্ব দিতে চাই। কৃষকদের জন্য কৃষিবীমা কিভাবে করে দেয়া যায় তার চিন্তা করা হচ্ছে। যাতে তারা ফসল হারালে তার ক্ষতিপূরণ পায়, সেই পদক্ষেপ নিচ্ছি। জাতির পিতা স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন। তার স্বপ্ন ছিল দেশকে নিয়ে। দেশের মানুষকে নিয়ে।

আজকে আওয়ামী লীগ একটানা তৃতীয় বার সরকারে আছে। এজন্য বাংলার জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতার অসমাপ্ত স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন বলেও জানান। জাতির পিতার চীন ভ্রমণসহ বিভিন্ন বইয়ের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার যে লেখাগুলি তার মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের রাজনৈতিক জীবনের অনেক কিছু শিখতে পারি। কিভাবে দেশের জন্য ত্যাগ করা যায়? কিভাবে মানুষের কল্যাণে ত্যাগ করা যায়? শুধু কিছু পাওয়ার জন্য না, মানুষের দেবার জন্য যে রাজনীতি, রাজনীতি মানে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন, নিজের ভাগ্য নয়। এই আদর্শের শিক্ষা নেয়া যায় তার লেখাগুলি পড়লে। কৃষকলীগের সাবেক সভাপতি মোতাহার হোসেন মোল্লা এবং সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক রেজার অনুমতিতে সভা পরিচালনা করেন সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সমীর দে। সম্মেলনে শোক প্রস্তাব পাঠ করেন দপ্তর সম্পাদক নাজমুল ইসলাম পানু। এরপর শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। অভ্যর্থনা উপ-কমিটির আহ্বায়ক ও সংগঠনের সহ-সভাপতি শরীফ আশরাফ স্বাগত বক্তব্য রাখেন। তিনি স্বাগত বক্তব্যে আগামী দিনে দুর্নীতিবাজদের কৃষক লীগে স্থান না দেয়ার আহ্বান জানান এবং ত্রিবার্ষিক সম্মেলন নিয়মিত করার ব্যাপারে আহ্বান জানান। এরপর সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ করেন সাধারণ সম্পাদক খন্দকার শামসুল হক রেজা। এছাড়াও বিশেষ অতিথির মধ্যে বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং সর্বভারতীয় কৃষাণ সভার সাধারণ সম্পাদক অতুল কুমার রঞ্জন।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর