× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা ইলেকশন কর্নার মন ভালো করা খবর
ঢাকা, ১৯ নভেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার

টিলায় টিলায় দোল খাচ্ছে ‘কমলা’

বাংলারজমিন

ইমাদ উদ দীন, মৌলভীবাজার থেকে | ৯ নভেম্বর ২০১৯, শনিবার, ৬:৪৮

এখন চলছে কমলার ভর মৌসুম। তাই চোখজুড়ে শুধু কমলার রাজত্ব। গাছে গাছে দোল খাচ্ছে পাকা আধাপাকা কমলা। এখন নানা কারণে এ অঞ্চলে কমলা চাষের জৌলুস হারালেও হারায়নি ঐতিহ্য। জেলার জুড়ী, বড়লেখা ও কুলাউড়াসহ পাহাড়ি টিলাগুলোর পরতে পরতে কমলার বিমোহিত মৌ মৌ ঘ্রাণ। আর ধুম পড়েছে কমলা ক্রয়- বিক্রয়ের। তাই চাষিরা রাত-দিন ব্যস্ত ফল আর গাছ পরিচর্যায়। এ বছর বাম্পার ফলন না হলেও হয়েছে অন্য বছরের চাইতে অনেকটা ভালো।
দামও পাচ্ছেন ভালো। এমন তথ্য চাষিদের। তারা জানালেন নানা রোগবালাইর সঙ্গে যুদ্ধ করে কোনোরকম টিকিয়ে রাখছেন কমলার বাগান। জানালেন প্রতিবছরই দেখা দেয় নতুন নতুন রোগবালাই। চেনা-অচেনা এসব রোগবালাইয়ে তাদেরকে গাছ বাঁচিয়ে রাখা নিয়ে অন্তহীন দুশ্চিন্তায় ফেলে। তারপরও কাঙ্ক্ষিত ফসলের আসায় পরম মমতায় রাতদিন পরিচর্যায় লড়াই চালান বাগান টিকিয়ে রাখার। পাহাড়ি টিলায় সম্ভাবনাময়ী ফসল ‘কমলা’। সুমিষ্ট রসের এ ফসলের চাহিদাও সর্বত্রই। জানা গেল আগে থেকেই এ অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে কমলা চাষ হলেও ২০০১ সালে কৃষি বিভাগের পরামর্শে  জেলার জুড়ী উপজেলার পাহাড়ি টিলাগুলোতে বাণিজ্যিক সম্ভাবনায় সৃজন করা হয়েছিল বাগান। তখন চাষিদের ব্যাপক আগ্রহ আর কৃষিবিভাগের সার্বিক তত্তাবধায়নে ওখানে গড়ে ওঠে কমলার রাজত্ব। প্রথম দিকে সৃজিত বাগানগুলোতে বাম্পার ফলন হলেও এখন ভিন্ন দৃশ্য। এখন ধীরে ধীরে যেমন কমছে বাগানের আয়তন। তেমনি সংকুচিত হচ্ছে কমলা গাছের পরিধি ও পরিসংখ্যান। সম্ভাবনাময়ী এ ফসলটির চাষাবাদ নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। প্রতিবছরই একের পর এক কমলা বাগান রোগাক্রান্ত হচ্ছে। চাষিরা জানান, এ বছর প্রথমদিকে কমলার ফুল ও ফল ভালো এলেও খরা (অনাবৃষ্টি) আর পোকা মাকড়ের আক্রমণে খুব একট ভালো ফলন হয়নি। আর কুয়াশা বা শীত দেরিতে আসায় কমলা পুষ্ট হয়েছে কম। তবে গেল বছরের চাইতে ফলন অনেকটা ভালো হয়েছে। আর দামও পাচ্ছেন ভালো। প্রতি কেজি কমলা (মাঝারি ও বড়) পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ৮০-১২০ টাকা। চাষিরা জানালেন গেল কয়েক বছর থেকে একধরনের পোকার (কমলার গাছগুলোর মূল ও কাণ্ডে সরাসরি) আক্রমণে গাছগুলো আক্রান্ত হচ্ছে। এই বিশেষ গাছখেকো পোকা বছরজুড়ে গাছের মারাত্মক ক্ষতি করলেও ফুল ও ফল আসার পর থেকে তাদের আক্রমণের মাত্রা বেড়ে যায়। একদিকে গান্ধীপোকার আক্রমণে ছোট থেকে আধাপাকা পর্যন্ত কমলাগুলো গাছ থেকে ঝরে পড়ছে। কিংবা আকার আকৃতি ও রং আশানুরূপ হচ্ছে না। অপরদিকে সারা বছরজুড়ে কমলা গাছখেকো পোকার আক্রমণে গাছের পাতার রং বিবর্ণ ও দুর্বল হচ্ছে। এ বছর নতুন করে প্রজাপতি পোকার আক্রমণে আধাপাকা কমলাগুলো গাছ থেকে ঝরে পড়ছে। ওই পোকাগুলো রাতের বেলায় আক্রমণ করে। বিশেষ পদ্ধতিতে ওই পোকা দমনে তারা চেষ্ঠা চালাচ্ছেন। জুড়ী উপজেলার অধিকাংশ পাহাড়ি টিলাগুলোয় কমবেশি চাষ হচ্ছে কমলা। গতকাল লালছড়া, লাঠিটিলা,
কচুরগুল শুকনা ছড়া, রূপা ছড়া এলাকার কমলাচাষি মুর্শেদ মিয়া, জয়নুল ইসলাম, লোকমান মিয়া, অজু মিয়া, কাওছার আহমেদ, মামুন আহমদসহ অনেকেরই সঙ্গে কথা হলে তারা জানালেন রোগবালাই, সেচ সুবিধা না থাকাসহ নানা সমস্যার মধ্যেই চলছে কমলা চাষ। তাদের দাবি কমলা ও আনারসের জন্য আলাদা প্রকল্প চালু করার। এতে করে তারা নতুন করে ভালো জাতের কমলার চারা সৃজন ও কৃষি বিভাগের সার্বক্ষণিক পরামর্শ ও সহযোগিতা পাবেন। তারা জানালেন আগে মৌসুমের শুরুতেই কমলা বাগান পাইকারদের কাছে বিক্রি করে দিতেন। এখন তারা নিজে বাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করছেন। ভৈরব ও সিলেটের বাজারে স্থানীয় কমলার চাহিদা থাকায় ওখানেই তা বিক্রি করছেন। এ কারণে বাগানের প্রতি যত্নও হচ্ছে বেশি। দেশীয় উন্নত প্রজাতির নাগপুরী ও খাসি কমলা ওখানে চাষ হয় বেশি। কমলাচাষিদের তথ্য মতে চৈত্র ও বৈশাখ মাসে কমলা গাছে ফুল ও ফল আসে। আর আশ্বিন ও কার্তিক মাসে ফল পাকা শুরু হয়। একটি গাছে ৩শ’ থেকে ২ হাজার পর্যন্ত কমলা ফল দেয়। কমলা গাছ রোপণের ৩-৪ বছরের মাথায় ফল আসতে শুরু করে। একটি কমলা গাছ রোগ বালাইয়ে আক্রান্ত না হলে ২৫-৩০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে এবং ফল দেয়। পাহাড় টিলাবেষ্টিত এ অঞ্চলের অন্যতম অর্থকরী ফসল এটি। মৌসুমী এই ফসলটি বিক্রি করে পাহাড়ি এ জনপদের লোকজন বছরজুড়ে চালান তাদের জীবন-জীবিকা। চাষিরা জানালেন মৌসুমে প্রতিদিনই ওখানকার কমলা পাইকারদের হাত হয়ে যাচ্ছে দেশের নানা প্রান্তে। কমলাচাষিদের দাবি- ২০০১ সালে কৃষি সমপ্রাসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে ‘বৃহত্তর সিলেট জেলা সমন্বিত কমলা ও আনারস চাষ উন্নয়ন প্রকল্প’- নামে যে প্রকল্প নেয়া হয়েছিল বর্তমানেও এ রকম একটি প্রকল্পের উদ্যোগ নেয়ার। জেলা কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায় জেলাজুড়ে ১৭৮ হেক্টর জমিতে কমলার চাষ হয়েছে। তার মধ্যে জুড়ী উপজেলায় ৯২ হেক্টর, বড়লেখায় ৬০ হেক্টর, কুলাউড়ায় ২০ হেক্টর। গতবছর প্রতি হেক্টরে কমলার উৎপাদন ছিল চার থেকে সাড়ে চার মেট্রিক টন। এ বছর প্রতি হেক্টরে উৎপাদন ৬ মেট্টিক টন। মৌসুমের শুরুতে ভারতীয় কমলা বাজারে চলে আসায় অনেক চাষি আগাম কমলা বাজারে তোলেন। যার জন্য কমলা টক হয়। বিষয়টি মাথায় রেখে কীভাবে আগাম কমলা চাষ করা যায় সেটি দেখা হচ্ছে। কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর মৌলভীবাজার কার্যালয়ের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ কাজী লুৎফুল বারী জানান আগে চাষিরা বাগান বিক্রি করে দিত পাইকারের কাছে। যার ফলে চাষি ও পাইকার সঠিকভাবে বাগানের পরিচর্যা করতো না। আমরা চাষিদের বিষয়টি বুঝিয়েছি যে এভাবে বাগান বিক্রি করে দিলে তাদের লোকসান হবে। আর রোগবালাই ও পোকামাকড় দমনে তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। যাতে কমলার ফলন বাড়ানো যায়। কমলার উৎপাদন নিশ্চিত করতে বর্ষার পর পর গাছের ডাল ছাঁটাই এবং খরার সময় সেচ দেয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, ২০০১ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত যে প্রকল্পটি চালু ছিল সেটি শেষ হয়ে গেছে। নতুন করে লেবু জাতীয় ফসলের সমপ্রসারণে ৫ (২০১৯-২০২৪) বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প চালু হবে। এটি চালু হলে কমলা, জাড়া, সাতকরাসহ এ জাতীয় ফসলগুলোর উৎপাদনও বাড়বে।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর