× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা ইলেকশন কর্নার মন ভালো করা খবরসাউথ এশিয়ান গেমস- ২০১৯
ঢাকা, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, রবিবার

‘সেই’ মুশতাক আলীর সন্ধানে

খেলা

ইশতিয়াক পারভেজ, ইন্দোর (ভারত) থেকে | ১৯ নভেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার, ৮:৪৪
পিতার ট্রফির সামনে গুলরেজ আলী, ইনসেটে মুশতাক আলী

সৈয়দ মুশতাক আলীকে ৮০ বছর আগের ক্রিস গেইল বললে কি ভুল হবে! যার নামে এখন আইপিএলের পর ভারতের সবচেয়ে বড় টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট আয়োজন করছে ভারতীয় বোর্ড (বিসিসিআই)। ভারতের হয়ে বিদেশের মাটিতে প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি হাঁকান সৈয়দ মুশতাক আলী। তার জন্ম ইন্দোরে। তিনি পৃথিবী ছেড়েছেন ২০০৫এ, তার চলে যাওয়ার পর নেই ইন্দোরে তার পুরানো বাড়িটিও। তবে পিতার স্মৃতি নিয়ে নতুন বাড়িতে আছেন তার ৭১ বছর বয়সী পুত্র গুলরেজ আলী। পিতার পথ ধরে তিনিও হয়েছিলেন ক্রিকেটার। এমনকি তার ছেলে আব্বাস আলীও। সেই বাড়িতে হাজির হয়েছিল দৈনিক মানবজমিন মুশতাক আলীর সেই স্মৃতির সন্ধানে।
একান্ত সাক্ষাৎকারে তার পুত্র তুলে ধরেন তিন পুরুষের ক্রিকেট গল্প।

পৈতৃক বাড়ি
এটি আমাদের পৈতৃক বাড়ি নয়। পুরানো বাড়ি ছিল নেহেরু স্টেডিয়ামের কাছে। ৮০ বছর আগের বাড়ি ছিল সেটি। আমরা ৭ বছর হলো নতুন বাড়িতে এসেছি বাবা মারা যাওয়ার পর।

গর্ব
আইপিএলের পর বিসিসিআই ঘরোয়া টি-টোয়েন্টির সবচেয়ে বড় আসরটির নাম দিয়েছে ‘সৈয়দ মুশতাক আলী ট্রফি’। এই আয়োজনে আমরা গর্বিত। তিনি পেয়েছেন বিসিসিআই-এর আজীবন সম্মাননা ‘সিকে নাইডু পদক’। আসলে এখনকার টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটাররা যেভাবে খেলে তিনি সেই সময় টেস্টে সেই শটসগুলোই খেলতেন।

তখন ওয়ানডেও ছিল না। শুধু টেস্ট, যেখানে উইকেট ছিল ভয়ঙ্কর। উইকেটই কভার করা থাকতো না। বল মাটিতে পড়ে লাফিয়ে মুখ বা বুকের ওপর চলে আসতো। এমন উইকেটেই আমার বাবা খেলতেন এখনকার সব টি-টোয়েন্টির শট। শুধুকি তাই তখন ক্রিকেটের ব্যাট, প্যাড, গ্লাভস এত বাজে ছিল যে বলার মতো না। যা পরে ব্যাথা এড়ানো যেত না।

যেভাবে ক্রিকেটে
১৯২৬’র কথা। এখানকার রাজা হোলকার ক্রিকেট ভালোবাসতেন। তখন তিনি কর্নেল সিকে নাইডুকে অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে নিয়ে আসেন। তিনি আমাদের বাসার কাছেই থাকতে শুরু করেন। আমার বাবার বয়স ১৪ হবে। তিনি বাসার পাশে মাঠে খেলতে যেতেন। আর নাইডু সাহেবের একটি মটর বাইক ছিল। তিনি বাইকে যাওয়ার সময় যেখানেই বাচ্চাদের ক্রিকেট খেলতে দেখতেন সেখানেই থামতেন। তখনই তার চোখে পড়ে আমার বাবা। তিনি (নাইডু) একদিন আমার দাদা, খান সাহেবের কাছে অনুরোধ করেন বাবাকে হায়দরাবাদে ক্রিকেট খেলতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। তিনিও রাজি হন। হায়দরাবাদে তিনি লেফট আর্ম স্পিনার হিসেবে শুরুতেই হ্যাটট্রিক করেন এমসিসির বিরুদ্ধে। সেই শুরু তার।

জাহাজে চেপে ইংল্যান্ডে
১৯৩৪এ বাবা ভারতের জাতীয় দলে সুযোগ পান প্রথমবার । কিন্তু সেবার তিনি একাদশে খেলতে পারেননি। এরপর ১৯৩৬এ ইংল্যান্ড সফরে যায় ভারত। তখন তারা এক মাস জাহাজে করে গিয়েছিল ইংল্যান্ড। যতটা বাবার মুখে শুনেছি তারা এক মাস জাহাজের ডকেই ক্রিকেট অনুশীলন করতে করতে গেছেন।

প্রথম সেঞ্চুরি
ইংল্যান্ডে প্রথম প্রস্তুতি ম্যাচ ছিল সাসেক্সের বিপক্ষে। বাবাকে অধিনায়ক বলেন তুমি কি ওপেন করতে পারবে! তিনি রাজি হয়ে যান। নেমেই ৭০ রানের ইনিংস খেলেন। দ্বিতীয় প্রস্তুতি ম্যাচে সেঞ্চুরি। তাই টেস্ট যখন শুরু হয় তখন বাবাকে ওপেন করতে পাঠানো হয়েছিল। প্রথম ইনিংসে ভারত দল খুব দ্রুত আউট হয়ে যায়। আমার বাবাও তেমন অবদান রাখতে পারেননি। তবে দ্বিতীয় ইনিংনে বিজয় মার্চেন্ট ও আমার বাবা ব্যাট করতে নামেন। সেখানেই তিনি ১১২ রানের দারুণ এক ইনিংস খেলেন। সেটিই ছিল বিদেশের মাটিতে ভারতের কোনো ব্যাটসম্যানের প্রথম সেঞ্চুরি। বিজয় মার্চেন্ট ৮৭ রান করে অপরাজিত ছিলেন। তারা ২৩১ রানের জুটি গড়েছিলেন ২০৩ মিনিটে।

উল্টো ব্যাটে খেলা
আমরা বাবাকে প্রশ্ন করতাম আপনার এমন আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের রহস্য কি! তিনি বলতেন প্রথম হলো আমার ফুটওয়ার্ক, দ্বিতীয় হলো আমার দৃষ্টি ও তৃতীয় হলো বোলার বল ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে যেতাম মারার জন্য। এখন তো বল মাটিতে পড়ার পর ব্যাটসম্যান হিট করতে বের হন। কিন্তু আমার বাবা বোলারের হাত থেকে বল ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রিজ ছেড়ে বের হয়ে যেতেন। এতে বোলাররা তখন রেগে তার গায়ে বল দিয়ে আঘাত করার চেষ্টা করলেও তিনি ভয় পেতেন না। হয় হুক করে দিতেন, বা পুল-লেগ কাট করে দিতেন। প্রিয় শট ছিল গ্লান্স ও লেগ কাট। এমনকি বোলার স্লেজিং করলে ব্যাট উল্টো করে খেলতেন। ব্যাট নিতেন উপরের হাতে (বটম হ্যান্ড)। এমন আক্রমণাত্মক ব্যাটিং উপভোগ করতো দর্শকরা। সবসময় তিনি বলতেন, মাঠে আমাদের খেলা দেখতে আসে দর্শকরা তাদের যদি আনন্দই দিতে না পারি তাহলে কেন আসবে। সেই সময় কিন্তু মাঠে অনেক দর্শক হতো। বাবা তাদের দিকেই চার-ছক্কা হাঁকিয়ে আনন্দ দিতেন।

‘নো মোস্তাক নো ক্রিকেট’
বাবা অনেকটা সময় কলকাতায় খেলেছেন। তাকে বাংলার মানুষ অসম্ভব রকম ভালোবাসতো। একবার কি হলো তখন ভারত দলের নির্বাচক দুলীপ সিং (যার নামে এখন দুলিপ ট্রফি) বাবাকে দলে রাখেননি। কলকাতায় যখন সবাই জানলো যে বাবা দলে নেই তখন সব মানুষ এক হয়ে গেলো। তারা স্লোগান তুললেন- ‘নো মোস্তাক নো ক্রিকেট।’

বন্ধু ভুট্টোর প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন-
আমার বাবার ছোট বেলার বন্ধু ছিলেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো। তিনি যখন প্রধানমন্ত্রী হন তখন প্রস্তাব দিয়েছিলেন সব ছেড়ে পাকিস্তান চলে যাওয়ার জন্য। কিন্তু আমার বাবা তাতে রাজি হননি। তিনি বলেছেন- ‘দেখ জুলফি, আমি ভারতে যে সম্মান পেয়েছি তা পাকিস্তানে গেলে কোন দিনও পাবো না। আমি তোমার এখানে বেড়াতে আসতে পারি কিন্তু ভারত ছাড়ার কথা আমাকে আর কোনো দিন বলবে না।’ আমার বাবার প্রিয় বন্ধু ছিলেন তিনি। আমার ছেলে আব্বাস আলীর ডাকনামও তিনি রেখেছেন জুলফি।



 

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর