× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতা
ঢাকা, ৩০ অক্টোবর ২০২০, শুক্রবার

আকাশ ছোঁয়ার এক অভিযাত্রী

মন ভালো করা খবর

কাজল ঘোষ | ২৫ নভেম্বর ২০১৯, সোমবার, ৯:৪৬

১৯৯৯ সালের মে মাস। বৃটিশ মিডিয়ায় হইচই। একটি ঘটনা সবাইকে নাড়া দিল। তিব্বতে হিমালয়ের এভারেস্ট চূড়ায় ডেথ জোনে নিখোঁজ জর্জ ম্যালরির মরদেহ উদ্ধার। তা-ও পঁচাত্তর বছর পর। জর্জ ম্যালরি ১৯২৪ সালে হিমালয় পর্বতে শিখরে নিখোঁজ হন। তথ্য প্রমাণ বলে, পর্বত শীর্ষে ওঠার সর্বশেষ চেষ্টায় লিপ্ত ছিলেন তিনি। সঙ্গী ছিলেন অপর অভিযাত্রী অ্যান্ড্রু আরভিন।
দু’জন একসঙ্গে হারিয়ে যান। তারপর কেটে গেছে পঁচাত্তর বছর। আর এভারেস্ট চূড়ায় সর্বোচ্চ শৃঙ্গের স্বাদ নেন তেনজিং হিলারি সর্বপ্রথম ১৯৫৩ সালে। ম্যালরি আর হিলারি দু’জনই প্রেরণা হয়ে আছেন অভিযান কিংবদন্তি নিয়ে।

কিন্তু বাংলাদেশে কি ঘটছে? ২০০৩ সালে হিলারির হিমালয় জয়ের পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হয়েছে। এরও আট বছর পর হিমালয়ের সর্বোচ্চ চূড়ায় পা রাখে বাংলাদেশ। কিন্তু সেখানেই শেষ নয়। সকল ভয় আর বাধা ডিঙিয়ে এগিয়ে চলেছেন একজনই। জয় করে চলেছেন একের পর এক চূড়া। তিনি এম এ মুহিত। মুহিত নামেই সমধিক পরিচয়। দুবার হিমালয়ের সর্বোচ্চ চূড়া জয়ের রেকর্ড একমাত্র তারই।

২০০৯ সালে প্রথম চো ইয়ো চূড়া জয় করে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে আট হাজারি ক্লাবে প্রবেশ করার রেকর্ডও মুহিতেরই। চো ইয়োর উচ্চতা ছিল ৮,২০১ মিটার। তারপর আর থামেননি। প্রতিবছর দু’টি মৌসুমে হিমালয়ে অভিযানে যাচ্ছেন তিনি। এর আগে ১৯৯৭ সাল থেকে দেশের ভেতর ছোট ছোট অসংখ্য ট্র্যাকিং সম্পন্ন করেন। নেন নানান প্রশিক্ষণও। আর ২০১১ সালে পা রাখেন পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূড়া এভারেস্টে। দিনটি ছিল ২১শে মে। দিনটির উজ্জ্বল আলোয় প্রভাতে ঠিক সাতটায় তিনি পা রাখেন এভারেস্টের শীর্ষ শিখরে। বিস্ময়ের সীমা ছাড়িয়েছিল সেদিন। চূড়ায় ওঠে মিংমা শেরপা ও দা কিপা শেরপাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলেন। সেই কান্না ছিল আনন্দের; গৌরবের; জয়ের। এভারেস্ট চূড়ায় ছিলেন ৩০ মিনিট। এই তিরিশ মিনিট মুহিতের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। অনুভূতি ছিল অনন্য। প্রথম ১০ মিনিট অক্সিজেন মাক্স পরে আর পরবর্তী ২০ মিনিট ছিলেন অক্সিজেন মাক্স ছাড়া। মৃত্যুকে জয় করে, পৃথিবীর সেরা বিস্ময়কে জয় করেও মুহিত থামেননি। ২০১১ সালে তিনি চীনের তিব্বত দিয়ে এভারেস্ট জয় করেন। আর ২০১২ সালে নেপাল দিয়ে হিমালয়ের সর্বোচ্চ চূড়ায় দ্বিতীয়বার পা রাখেন। গড়েন অনন্য রেকর্ড। হিমালয়ের সর্বোচ্চ চূড়ায় দ্বিতীয়বার পা রাখার রেকর্ড বাংলাদেশে একমাত্র তারই। ২০০৭ দিয়ে শুরু। এরপর থেকে প্রতিবছর দু’বার তিনি হিমালয়ে যান। এ যেন পুরনো সেই কাব্যকথা। হিমালয়ের বিস্ময় পুরনো হয় না। হিমালয় যেন অনন্ত এক শিলাময় মহাকাব্য। কাহিনীর পুনরাবৃত্তি নেই। তাই তার আকর্ষণ এতো দুর্বার।

পৃথিবীতে এভারেস্টের সমকক্ষ ৮,০০০ মিটারের (২৬,২৫০ ফুট) অধিক উচ্চতার পর্বতশৃঙ্গ আছে ১৪টি। মুহিত একমাত্র বাংলাদেশি যিনি চার বার জয় করেছেন ৮,০০০ মিটারের চেয়ে উঁচু তিনটি পর্বতশৃঙ্গ: এভারেস্ট (উত্তর ও দক্ষিণ দিক দিয়ে দু’বার আরোহন করেছেন), চো-ইয়ো (পৃথিবীর ৬ষ্ঠ উচ্চতম পর্বত) এবং মানাসলু (পৃথিবীর ৮ম উচ্চতম পর্বত)। এছাড়াও তিনি হিমালয়ের একটি ৭,০০০ মিটার উচ্চতার পর্বতশৃঙ্গ: লাকপা রি এবং ছয়টি ৬,০০০ মিটার উচ্চতার পর্বতশৃঙ্গ: মেরা পর্বতশৃঙ্গ (দু’বার), সিংগু চুলি, লবুজে, ইমজাৎসে, কেয়াজো-রি ও নেপাল-বাংলাদেশ মৈত্রী শিখর (অবিজিত এই শিখরে প্রথম সফল আরোহনের সম্মানে ‘নেপাল মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশন’ এই নামকরনের ব্যবস্থা করে) সাতবার আরোহন করেছেন।

দ্বীপ-জেলা ভোলার সন্তান মুহিত বোরহানউদ্দিন থানার গঙ্গাপুর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করলেও বড় হয়েছেন পুরোনো ঢাকায়। মাতা আনোয়ারা বেগম, পিতা মনোয়ার হোসেন। শিক্ষাজীবনে পোগোজ স্কুল থেকে মাধ্যমিক, নটরডেম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ঢাকা সিটি কলেজ থেকে বি. কম পাস করেন। হিমালয় এবং বাংলাদেশের পাহাড় ও উপকূলের প্রকৃতি ও জীবন নিয়ে এ পর্যন্ত তার ছয়টি একক ও আটটি যৌথ আলোকচিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। হিমালয় অভিযানের বাইরে মুহিত একজন সৌখিন পাখি দর্শক এবং বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সদস্য।

নিজের কথায় মুহিত: সেই ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতি আমাকে টানে। দিগন্তজোড়া সবুজ ফসলের মাঠ, বন-জঙ্গল, গাছ, পাখি, নদী, নদীতে বয়ে চলা পাল তোলা নৌকা ইত্যাদির সৌন্দর্য তখন থেকেই উপভোগ করি এবং এখনও করছি। প্রকৃতির কোন এক অমোঘ আকর্ষণে বার বার ছুটে গেছি এবং এখনো যাচ্ছি। আমি আমার ভাল লাগার বিষয়গুলোকে যথেষ্ট প্রাধান্য দেই। ইচ্ছাগুলো পূরন করার জন্য যথা সাধ্য চেষ্টা করি। যখন কোন মানুষ তার ভাল লাগা বা ইচ্ছাগুলো পূরন করতে পারে তখন তার আত্মবিশ্বাস বাড়ে। ছেলেবেলা থেকেই বিভিন্ন খেলাধূলা করতাম। মাঠের সাথে যোগাযোগ ছিল সবসময় এবং এখনো আছে। শরীরটা ছিল রবীন্দ্রনাথের ‘আমার ছেলেবেলা’ গল্পের মত খুব বাজে রকমের ভাল।
১৯৯৭ সালের এপ্রিল মাসে পরিচয় হয় সদ্য অ্যান্টার্কটিকা ফেরত অভিযাত্রী ইনাম আল হকের সঙ্গে। তার সাথে পরিচয়ের পর থেকে বদলে যায় আমার জীবন সম্পর্কে ধারনা। তিনি আমাকে কাছে টেনে নেন এবং ধৈর্য নিয়ে পাখি, প্রকৃতি, এ্যাডভেঞ্চার, ফটোগ্রাফি ছাড়াও সততা, ভদ্রতা, মানুষের সাথে ব্যবহার ইত্যাদি জীবনের নানা বিষয়ে জ্ঞান দিতে থাকেন। আমিও মন্ত্র-মুগ্ধের মত তার কথা শুনতে থাকি এবং অনুগত ছাত্রের মত তার শিক্ষা আত্মস্থ করার চেষ্টা করি। ইনাম আল হক তার দূরদৃষ্টি দিয়ে আমার মধ্যে দেখতে পান বড় কিছু করার ক্ষমতা এবং তিনি তা বের করে আনতে সক্ষম হন। তিনি একজন মেনটর। তিনি আমাদের স্বপ্ন দেখিয়েছেন এবং স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে হাত ধরে এগিয়েনিয়ে গেছেন।

১৯৯৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে রোজার ঈদের ছুটিতে আমরা ১২ বন্ধু যাই সিলেটে। তখন মৌলভীবাজার জেলার মাধবকুন্ড ঝর্ণার ২০০ফুট উপরে যেখান থেকে পানি নিচে গড়িয়ে পরে সেখানে উঠে আমরা সবাই বেশ রোমাঞ্চিত হই। সেটি ছিল আমার জীবনে প্রথম কোন পাহাড় বেয়ে উঠা। এর পর একই বছরের অক্টোবর মাসে দূর্গা পূজার ছুটিতে ১০ বন্ধু মিলে যাই বান্দরবান-রাঙ্গামাটি-কক্সবাজার-চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে অবস্থিত চন্দ্রনাথ পাহাড়ে (প্রায় ১,২০০ ফুট) সবার আগে এক ঘন্টায় উঠে বেশ গর্ব হচ্ছিল। তার পর থেকে পেয়ে বসে পাহাড়ে চড়ার নেশা। ২০০১ সালে পাখি দেখতে ইনাম আল হকের সাথে বান্দরবানের এক পাহাড়ে ট্রেকিং করি। এর পর থেকে প্রতি বছরে ২/৩ বার করে বান্দরবান ও রাঙ্গামাটি যেতে থাকি এবং আমাদের দেশের উচুঁ উচুঁ পাহাড় চূড়াগুলোতে চড়তে লাগলাম। আমাদের দেশের সর্বোচ্চ চূড়ায় যখন ওঠা হয়ে গেল, তখন আমাদের ইচ্ছা জাগল আরও উচুঁতে ওঠার। আমাদের পাশের দেশগুলোতেই পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু উঁচু বিখ্যাত সব পর্বতগুলোর অবস্থান। আর পর্বতেই যদি উঠতে হয়, তা হলে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এভারেস্ট নয় কেন? এই লক্ষ্য সামনে রেখে অ্যান্টার্কটিকা ও উত্তর মেরু অভিযাত্রী একমাত্র বাংলাদেশি ইনাম আল হকের নেতৃত্বে ২০০৩ সালে গঠন করা হয় বাংলাদেশ এভারেস্ট টীম-১ এবং পরবর্তিতে বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাব (বিএমটিসি)। এই ক্লাব গঠনের প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্য এভারেস্ট শৃঙ্গে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানো। শুধু দল গঠন করলেই তো আর হলো না, পর্বতারোহনের জন্য এর অ-আ, ক-খ শিখতে হয়, কলাকৌশলগুলো রপ্ত করতে হয়। সেই প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবেই ২০০৪ সালের মে মাসে অভিযাত্রী ইনাম আল হকের নেতৃত্বে এভারেস্টের প্রবেশদ্বার বেসক্যাম্পে গিয়েছিলাম আমরা ৬ বাংলাদেশী। নেপালের লুকলা থেকে ট্রেইলে আমাদের পথ চলা শুরু হয়। ১০ দিনে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ হেঁটে আমরা প্রায় ১৭,৬০০ ফুট উচ্চতায় বেসক্যাম্প পৌঁছি। অবশ্য আমাদের আগে ২০০৩ সালের মে মাসে এভারেস্ট বিজয়ের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে ইমরান ও রিফাত বেসক্যাম্পে ঘুরে আসে। তখন ইমরানের ছবি দেখে রোমাঞ্চিত হই। সেই সময়ে ইনাম আল হক আমাদের সংগঠিত করেন এবং বাংলাদেশের সব পর্বতারোহী একই জায়গা থেকে পর্বতারোহনের সূচনা করি। তখন ইমরান, রিফাত, সাগর, বাবু, সাদিয়া’র মত দক্ষ সব পর্বতারোহীরা ছিলেন। পরে অবশ্য তাদের কেউ কেউ এড্যাভেঞ্চারের অন্য ক্ষেত্রে চলে যায়। আবার নূর মোহাম্মদ, নিশাত মজুমদার ও বিপ্লবের মত নিবেদিত প্রাণ পর্বতারোহীরা যোগ দেয়।        

এভারেস্টকে কাছ থেকে দেখার পর তাতে চড়ার ইচ্ছা আরও প্রবল হল। এখন প্রয়োজন পর্বতারোহনের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে কিভাবে বরফে ও পাথরের ঢালে আরোহন করতে হয় তার প্রশিক্ষন। ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর সেশনে আমি মৌলিক পবর্তারোহন প্রশিক্ষন নিতে ভারতের দার্জিলিং-এ অবস্থিত হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনিষ্টিটিউট (HMI)-এ যাওয়ার জন্য তৈরি হতে থাকি। কিন্তু কোর্সের পুরো ফি (২০০ ডলার) জোগাড় না হওয়ায় অনিশ্চয়তায় পরে যাই। আমার সঞ্চয়ে ছিল অর্ধেক। বাকি অর্ধেক নিয়েই চিন্তা। যাওয়ার আগে তারও সমাধান হয়ে গেল। প্রতি মাসের তৃতীয় বুধবার ইনাম আল হকের বাসায় যারা ট্রেকিং করতে পছন্দ করে তাদের একটা আড্ডা হয়। সেদিনের সেই আড্ডায় যারা এসেছিলেন তারা সবাই মিলে সাত হাজার টাকা তুলে আমাকে দিলেন। আর তাতেই আমার ট্রেনিং-এ যাওয়া চুড়ান্ত হয়ে যায়। সফলতার সাথে মৌলিক পবর্তারোহন প্রশিক্ষন শেষ করে একই প্রতিষ্ঠান থেকে ২০০৫ সালের মার্চ মাসে উচ্চতর পবর্তারোহন প্রশিক্ষন গ্রহন করি। এর পর থেকে পর্বতারোহন আমার কাছে শুধু শখ বা নেশা নয়, তার চেয়েও বড় কিছু।

অভিযানের আদ্যপান্ত: ২০০৭ সালের মে মাসে নেপালের অন্নপূর্ণা হিমালয় অঞ্চলের চুলু ওয়েস্ট পর্বতশৃঙ্গ (২১,০৫৯ফুট / ৬,৪১৯মি.) অভিযানে অংশগ্রহণ এবং ২০,৯০০ ফুট পর্যন্ত আরোহণ। একই বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে দলনেতা হিসেবে মহালনগর হিমালয় অঞ্চলের মেরা পর্বতশৃঙ্গ (২১,২২৭ফুট / ৬,৪৭০মি.) জয়। ২০০৮ সালের মে-জুন মাসে অন্নপূর্ণা হিমালয় অঞ্চলের সিংগু চুলি পর্বতশৃঙ্গ (২১,৩২৮ফুট / ৬,৫০১মি.) জয়। একই বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে বিশ্বের অষ্টম উচ্চতম পবর্তশৃঙ্গ মানাসলু (২৬,৭৮০ফুট / ৮,১৬৩মি.) অভিযানে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে সাত হাজার মিটার (প্রায় ২৩,০০০ ফুট) উচ্চতায় আরোহন। ২০০৯ সালের মে মাসে খুম্বু হিমালয় অঞ্চলের লবুজে পর্বতশৃঙ্গ (২০,০৭৫ফুট / ৬,১১৯মি.) এবং ঐ বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর দলনেতা হিসেবে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে অবস্থিত বিশ্বের ষষ্ঠ উচ্চতম পবর্তশৃঙ্গ চো ইয়ো (২৬,৯০৬ফুট / ৮,২০১মি.) জয়। যা ছিল কোন বাংলাদেশি পর্বতারোহীর প্রথম আট হাজার মিটারের কোন পর্বতশৃঙ্গ জয়। চো ইয়ো পর্বতশৃঙ্গ জয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ৮,০০০ মিটার পর্বতারোহীদের সম্মানজনক এলিট ক্লাবে প্রবেশ করেন মুহিত। ২০১০ সালের এপ্রিল-মে মাসে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এভারেস্ট অভিযানে অংশগ্রহণ করে ২৩,০০০ ফুট পর্যন্ত আরোহন করলেও বিরূপ আবহাওয়ার জন্য অভিযান সফল হয়নি। কিন্তু মুহিত দমে যাননি, হতাশ হননি। ২০১০ সালের অক্টোবর মাসে হিমালয়ের একটি অবিজিত শিখরে বাংলাদেশ-নেপাল যৌথ পর্বতাভিযানে বংলাদেশ দলের নেতা হিসেবে নেপাল-বাংলাদেশ মৈত্রী শিখর (২০,৫২৮ফুট / ৬,২৫৭ মি.) জয় করেন। ২০১১ সালের ২১ মে নর্থফেস (তিব্বত) দিয়ে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্ট (২৯,০২৯ফুট / ৮,৮৪৮মি.) জয় করি। একই বছর ১২ অক্টোবর দলনেতা হিসেবে বিশ্বের অষ্টম উচ্চতম পবর্তশৃঙ্গ মানাসলু (২৬,৭৮০ ফুট / ৮,১৬৩মি.) জয় করেন। ২০১২ সালের ১৯ মে নেপাল (সাউথ ফেস) দিয়ে দ্বিতীয়বারের মত এভারেস্ট এবং একই বছরের অক্টোবর মাসে দলনেতা হিসেবে খুম্বু হিমালয়ের ইমজাৎসে পর্বতশৃঙ্গ (২০,২১০ফুট/ ৬,১৬০মি.) জয় করেন। ২০১৩ সালের এপ্রিল-মে মাসে পৃথিবীর ৩য় উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজংঘা (২৮,১৬৯ফুট / ৮,৫৮৬মি.) অভিযানে অংশগ্রহণ করে ২৫,০০০ ফুট পর্যন্ত আরোহণ; বিরূপ আবহাওয়ার জন্য অভিযান সফল হয়নি এবং একই বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে পৃথিবীর ১৪তম পর্বতশৃঙ্গ শিশাপাংমা (২৬,২৮৯ফুট / ৮,০১৩মি.) অভিযানে অংশগ্রহণ করে ২১,০০০ ফুট পর্যন্ত আরোহণ; বিরূপ আবহাওয়ার জন্য অভিযান সফল হয়নি। ২০১৪ সালের অক্টোবর মাসে খুম্বু হিমালয়ের কেয়াজো-রি পর্বতশৃঙ্গ (২০,২৯৫ফুট / ৬,১৮৬মি.) অভিযানে অংশগ্রহণ করে ২০,০০০ ফুট পর্যন্ত আরোহণ; বিরূপ আবহাওয়ার জন্য অভিযান সফল হয়নি। ২০১৫ সালের অক্টোবর-নভেম্বর মাসে দলনেতা হিসেবে খুম্বু হিমালয়ের কেয়াজো-রি পর্বতশৃঙ্গ (২০,২৯৫ফুট / ৬,১৮৬মি.) জয় এবং একই বছরের নভেম্বর মাসে আমা-দাব্‌লাম পর্বতশৃঙ্গ (৬,৮১২মি. / ২২,৩৫০ফুট) অভিযানে অংশগ্রহণ করে ১৮,৩৭৫ ফুট পর্যন্ত আরোহন।

২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে দলনেতা হিসেবে মহালনগর হিমালয় অঞ্চলের মেরা পর্বতশৃঙ্গ (২১,২২৭ফুট / ৬,৪৭০মি.) জয়। ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে মানাসলু হিমালয়ের লারকে পর্বতশৃঙ্গ (২০,৫০০ফুট / ৬,২৪৯মি.) অভিযানে অংশগ্রহণ করে ১৮,৩৭২ ফুট পর্যন্ত আরোহন; বিরূপ আবহাওয়ার জন্য অভিযান সফল হয়নি। ২০১৮ সালের মে মাসে দলনেতা হিসেবে মহালনগর হিমালয় অঞ্চলের লাকপা রি পর্বতশৃঙ্গ (২৩,১১৩ফুট / ৭,০৪৫মি.) জয় করি এবং একই বছরের নভেম্বর মাসে আমা-দাব্‌লাম পর্বতশৃঙ্গ (৬,৮১২মি. / ২২,৩৫০ফুট) অভিযানে অংশগ্রহন করে ১৮,৩৭৫ ফুট পর্যন্ত আরোহন করি; বিরূপ আবহাওয়ার জন্য অভিযান সফল হয়নি। ২০১৯ সালের মে-জুন মাসে দলনেতা হিসেবে রোলওয়ালিং হিমালয় অঞ্চলের ফার্চামো পর্বতশৃঙ্গ (২০,৩০০ফুট / ৬,১৮৭মি.) অভিযানে অংশগ্রহন করে ১৮,৮৮১ ফুট পর্যন্ত আরোহণ; বিরূপ আবহাওয়ার জন্য অভিযান সফল হয়নি এবং একই বছরের অক্টোবর মাসে অন্নপূর্ণা ও মানাসলু অঞ্চলের মাঝের হিমলুং পর্বতশৃঙ্গ (৭,১২৬মি. / ২৩,৩৮০ফুট) অভিযানে অংশগ্রহন করে ২২,৩১০ ফুট পর্যন্ত আরোহন করেন।

শেষ কথা: মুহিত বিশ্বাস করেন, সততার সঙ্গে, ধৈর্য ধারণ করে, একাগ্রচিত্তে কাজ করলে সাফল্য আসবেই। নিজের কাজের প্রতি ভালবাসা থাকতে হবে এবং তা উপভোগ করতে হবে। সাফল্যের পিছে না ছুটে যোগ্য হতে হবে। যোগ্য হলে সফলতা একদিন ধরা দেবেই।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর