× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা ইলেকশন কর্নার মন ভালো করা খবরসাউথ এশিয়ান গেমস- ২০১৯
ঢাকা, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, বৃহস্পতিবার

প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের পরও অনিশ্চিত ইরাকের ভবিষ্যৎ

বিশ্বজমিন

জাহিদুর রহমান | ২ ডিসেম্বর ২০১৯, সোমবার, ১০:২২

মাত্র এক বছর ক্ষমতায় থাকার পর দুই মাসব্যাপী গণবিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করেছেন ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আদেল আব্দুল মাহদি। একইসঙ্গে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে তার নেতৃত্বাধীন সরকার। আপাতদৃষ্টিতে বিক্ষোভকারীরা তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য অর্জনে সফল হয়েছে। এই অর্জনের জন্য বিসর্জন দিতে হয়েছে চার শতাধিক প্রাণ। আহত হয়েছেন আরো কয়েক হাজার মানুষ। কিন্তু এই ‘দুর্নীতিপরায়ণ সরকার’ এখানেই শেষ হয়ে যায় নি। ইরাকি সংবিধান অনুসারে, আরো অন্তত মাসখানেক অন্তর্বর্তী সরকার হিসেবে ক্ষমতায় থাকবে বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ। এ সময়ের মধ্যে দেশটির প্রেসিডেন্ট বারহাম সালিহ, পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ জোটকে নতুন প্রধানমন্ত্রী মনোনয়নের আহ্বান জানাবেন।
মনোনীত প্রার্থী নতুন জোট সরকার গঠনের জন্য এক মাস সময় পাবেন।

কাগজে-কলমে পুরো প্রক্রিয়াটি খুবই সহজ। কিন্তু ইরাকের অতীত ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় যে, প্রার্থী নির্বাচনে রাজনৈতিক জোটগুলোর দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। সরকার গঠন পিছিয়ে পড়তে পারে কয়েক মাস। কেননা, ইরাকের পার্লামেন্টে কোন জোট সংখ্যাগরিষ্ঠ তা নিশ্চিত নয়। সে হিসেবে মাহদির পদত্যাগ প্রতীকী গুরুত্ব বহন করলেও এতে বিক্ষোভকারীদের মৌলিক দাবি পুরোপুরি পূরণ হয়নি।

নতুন সরকার গঠনের আগ পর্যন্ত বিদ্যমান মন্ত্রিপরিষদ কোনো আইন পাস করতে পারবে না। বাজেট পাস করতে পারবে না। বিক্ষোভকারীদের দাবি মেনে সংস্কার কাজও চালাতে পারবে না। অর্থাৎ, মাহদি সরকার বিক্ষোভকারীদের শান্ত করতে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সেগুলোও নতুন সরকার গঠনের আগে কার্যকর হবে না। এই সময়ের মধ্যে যেকোনো পক্ষ নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারবে। এমন পক্ষগুলোর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, সিরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এদের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ইরান। ইরাকের রাজনীতির শিরায় শিরায় তাদের প্রভাব বিদ্যমান।

সাম্প্রতিক বিক্ষোভে ইরাকি আন্দোলনকারীদের অন্যতম দাবি ছিল, দেশের রাজনীতি থেকে ইরানি প্রভাব দূরীকরণ। বিক্ষোভে একাধিকবার ইরানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানোর অভিযোগ উঠেছে। ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের তৎপর থাকার অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু সবশেষে মাহদি সরকারকে ক্ষমতায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে ইরান। এছাড়া, ইরানেও চলছে সরকার-বিরোধী বিক্ষোভ। ইরাকে বিক্ষোভকারীদের জয়, ইরানে বিক্ষোভ উস্কে দিতে পারে। সকল দিক বিবেচনায়, ইরাকে ইরানের প্রভাব সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে।

ইসরাইলি পত্রিকা দ্য হারেৎস অনুসারে, অদূর ভবিষ্যতে আরো পরাজয় ঠেকাতে ইতিমধ্যে ইরাকে শিয়াদের সমর্থন অর্জনে তৎপর হয়ে উঠেছে ইরান সরকার। বিশেষ করে হাদি আল-আমিরি নেতৃত্বাধীন ফাতাহ জোটকে নিজেদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে তারা। প্রসঙ্গত, ইরাকের জনপ্রিয় শিয়া আধা-সামরিক বাহিনী ‘পপুলার মোবিলাইজেশন ইউনিটে’র রাজনৈতিক নেতা হচ্ছেন আল-আমিরি। এছাড়া, সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রও সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় গভীর নজর রাখবে।  

নতুন সরকার গঠন ও তাতে আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তার অবশ্য বিক্ষোভকারীদের প্রধান উদ্বেগ নয়। তারা মাহদির পদত্যাগের পরপরই রাস্তা ছাড়েনি। তার পদত্যাগ প্রথম ধাপ মাত্র। আন্দোলনকারীরা একবারে গোড়া থেকে সংস্কারের দাবি জানিয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন আয়োজন; সাম্প্রদায়িক, শীর্ষ পদগুলোয় জাতিগত কোটা প্রত্যাহার; সরকারি তহবিলের সমান বন্টন; দুর্নীতি ও বেকারত্ব দূর করার দাবি জানিয়েছে। সরকার নিষ্ক্রিয় হওয়ার পরও বিক্ষোভ জারি রাখার ঘোষণা দিয়েছে আয়োজকরা। এতদিন ধরে বিক্ষোভ থেকে অপেক্ষাকৃত অনেকটা দূরে সরে থাকা সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলোতেও শনিবার বিক্ষোভ হয়েছে। এদিনই, পদত্যাগপত্র জমা দেয়ার ঘোষণা দেন মাহদি।

মাহদি অবশ্য নভেম্বরেও পদত্যাগ করতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে অবস্থান পাল্টে ফেলেন। হাল ছাড়েনি বিক্ষোভকারীরাও। তারা প্রাণের বিনিময়ে লক্ষ্য ছিনিয়ে আনার পথে এগিয়ে গেছে। বাধ্য হয়েছেন মাহদি। গত বুধবার ইরানি কনস্যুলেটে আগুন লাগানোর পর তাদের প্রতি হিংস্র হয়ে ওঠে নিরাপত্তাবাহিনী। দুই দিনে প্রাণ হারান ৫০ জনের বেশি। তখনও নিজের পদ আঁকড়ে ছিলেন মাহদি। অবশেষে শুক্রবার দেশটির প্রভাবশালী শিয়া নেতা আলি আল-সিস্তানি নেতৃত্ব পরিবর্তনের আহ্বান জানালে পদত্যাগ করবেন বলে জানান তিনি। কিন্তু তারপরও থামেনি নিরাপত্তাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞ। শনিবার তাদের গুলিতে মারা যায় আরো তিন জন। তাও রাস্তা ছাড়েনি তারা।

বিক্ষোভকারীদের প্রতি সিস্তানির সমর্থন ইরানের জন্য বড় দুঃসংবাদ ছিল। ইরাকে তাদের নীতিমালা প্রণয়ন দুর্বল হয়ে পড়ার ইঙ্গিত ছিল সেটি। ইরাকে রাজনীতিকদের চেয়ে ধর্মীয় নেতা ও পণ্ডিতরা বেশি প্রভাব রাখে। সিস্তানি ফের তার প্রমাণ দিলেন। সিস্তানি ও ইরানের আদর্শ ও রাজনৈতিক-ধর্মীয় কৌশলের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। দেশে তার অনুসারীর সংখ্যা অগণিত। তিনি ইরানি সরকার, ইরানি পণ্ডিত কাউকেই সমর্থন করে না। ইরাক সরকার তার আহ্বানে সাড়া দেয়া ইরানের বিরোধীতার সমান। এদিকে, অপর এক প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা মুক্তাদা আল-সদরও ইরাক থেকে ইরানের উপস্থিতি দূর করার আহ্বান জানিয়েছেন। সিস্তানির মতো প্রভাবশালী না হলেও, তার অনুসারীর সংখ্যাও বিশাল। দেশটির মুসলিম জনসংখ্যার কাছে তিনি কেবল রাজনৈতিক নেতাই নন, একজন আধ্যাত্মিক নেতাও। অল্প কয়দিন আগেও তিনি মাহদি সরকারের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তবে গত সপ্তাহে ইরানের রেভুলিউশনারি গার্ডের কুর্দস বাহিনীর প্রধান কাসেম সোলায়মানির সঙ্গে এক বৈঠক শেষে তিনি মাহদির পদত্যাগের আহ্বান জানান। অন্যথায় ইরাক ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাবে বলে সতর্ক করেন।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, দেশটির অন্তর্বর্তী সরকার নতুন সরকারের জন্য সুষ্ঠু ভিত্তি গড়ে দিতে পারবে, নাকি তাদের পদক্ষেপ বিক্ষোভকে আরো বড় আকার ধারণ করতে বাধ্য করবে!

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর