× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা ইলেকশন কর্নার মন ভালো করা খবরসাউথ এশিয়ান গেমস- ২০১৯
ঢাকা, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, শুক্রবার
৯৯৯ এর ব্যাপ্তি বাড়ছে

২৩ মাসে ১,৭০,০০০ জরুরি সেবা

বাংলারজমিন

শুভ্র দেব | ৩ ডিসেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার, ৭:৪৮

সেন্টমার্টিন দ্বীপের কাছাকাছি উত্তাল বঙ্গোপসাগরে হঠাৎ একটি স্পিড বোট বিকল। বোটে করে আটজন যাত্রী টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিন যাচ্ছিলেন। দ্বীপ থেকে অন্তত দুই কিলোমিটার দুরে বোটটি বিকল হয়। উত্তাল সাগরে বিকল বোটটি দিকবিদিক ভাসছিলো। যেকোনো সময় ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা। বোটে থাকা আটজন ভাবছেন তাদের হয়তো আর বাঁচার আশা নাই। বঙ্গোপসাগরেই ডুবে মরতে হবে। তখন কেউ নিচ্ছেন সৃষ্টিকর্তার নাম আবার কেউ তাদের পরিবারের সঙ্গে শেষ কথা বলে নিচ্ছেন।
আশেপাশে উদ্ধার করার মত কেউ নেই। তখন তাদেরই একজন আতিকুর রহমান কল দেন জাতীয় জরুরি সেবা হেল্প ডেস্ক ৯৯৯ এ। ভীত, উৎকন্ঠিত গলায় তাদের বিপদের কথা খুলে বলেন এবং সহযোগিতা চান। ‘৯৯৯’ কল টেকার সঙ্গে সঙ্গে ওই ব্যক্তিকে সেন্টমার্টিনের কোস্ট গার্ড কমান্ডারের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেন। পরে কোস্ট গার্ডের লে. কমান্ডার সোহেল রানার নেতৃত্বে একটি উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের উদ্ধার করেন। ঘটনাটি ১৯শে অক্টোবরের।

বাংলাদেশ পুলিশ পরিচালিত জাতীয় জরুরি সেবা-৯৯৯ এর ব্যাপ্তি বাড়ছে। শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষেরা এখন এর সুফল ভোগ করছে। গত ২৩ মাসে ‘৯৯৯’ থেকে জরুরি সেবা দেয়া হয়েছে ১ লাখ ৭১ হাজার ৬৬২ টি। এর মধ্যে পুলিশি সেবা দেয়া হয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ৫০৭টি (৭২ শতাংশ। ফায়ার সার্ভিসের সেবা দেয়া হয়েছে ২৬ হাজার ২৯৯ টি (১৬ শতাংশ) আর এম্বুলেন্স সেবা দেয়া হয়েছে ১৯ হাজার ৮৫৬ টি (১২শতাংশ)।

জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ১২ই ডিসেম্বর যাত্রা শুরু পর থেকে ৩০শে নভেম্বর পর্যন্ত মোট কল এসেছে ১ কোটি ৪৭ লাখ ৪৩ হাজার ৯৬২। এরমধ্যে সিএফএস (কল ফর সার্ভিস) বা জরুরি কল এসেছে ১ লাখ ৫৬ হাজার ২১১টি। ইনকুয়ারি কল এসেছে ২৪ লাখ ৫৫ হাজার ১৮৩টি। ডিপার্টমেন্টাল কল ৩৬ হাজার ৬২২টি, চাইল্ড ইনকুয়ারি কল ২৭ লাখ ৬ হাজার ৬২৯টি, ওমেন ইনকুয়ারি কল ৯৯ হাজার ৪৯১টি, ব্ল্যাঙ্ক কল ৭৭ লাখ ৭০ হাজার ৬৮৬টি, ক্র্যাঙ্ক বা প্রাঙ্ক কল ১৫ লাখ ৫৯ হাজার ৫০৭টি। এছাড়া অন্যান্য ক্যাটাগরির কল এসেছে ২৩ লাখ ৮৬ হাজার ৪৩১টি। সব মিলিয়ে  সেবা দেয়া গেছে এমন কলের সংখ্যা ৩০ লাখ ৩৯ হাজার ৫৮৭টি। আর কোনো সেবা দেয়া যায়নি এমন কলের সংখ্যা ১ কোটি ১৭ লাখ ১৬ হাজার ৬২৪টি। এই হিসাবে শতকরা ২১ শতাংশ কলারকে সেবা দেয়া গেছে আর ৭৯ শতাংশ কল সেবা দেয়ার উপযোগী ছিল না।

জাতীয় জরুরি সেবা কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, পুলিশের বিভিন্ন পদ মর্যাদার প্রায় ৪৫০ জনবল নিয়ে ‘৯৯৯’ কার্যক্রম চলছে। মূল ১জন অতিরিক্ত ডিআইজি সব বিষয়ে তদারকি করেন। এছাড়া ১জন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, ৪ জন সহকারি পুলিশ সুপার, ২২ জন পরিদর্শকও তদারকির কাজ করছেন। এছাড়া  উপপরিদর্শক, সহকারি উপ পরিদর্শক, কনস্টেবল পদমর্যাদার আরও ৪২২ জন পুলিশ সদস্য কাজ করছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সেবার মান আরও বাড়ানো জন্য বেশ কিছু পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। শিগগির এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। কলার কোন স্থান থেকে কল করছেন সেটি এখনও শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। ম্যানুয়্যালি কলারের নাম, ঠিকানা জিজ্ঞাসা করতে হয়। বিটিসিএলের মাধ্যমে টেলিকমিনিউকেশন কোম্পানির সঙ্গে এবিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। সিস্টেম রেডি আছে শুধু তারা ডাটা দিলে কলারের তথ্য পাওয়া যাবে। এছাড়া মোবাইল ডাটা টার্মিনালের (এমডিটি) পাইলট প্রজেক্ট হাতে নেয়া হয়েছে। এই সেবা দেয়ার জন্য প্রতিটি থানায় ডেসপাস সিস্টেম চালু হবে। কম্পিউটার নিয়ে একজন পুলিশ সদস্য সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি শুধু ‘৯৯৯’ কাজ করবেন। এছাড়া পুলিশের প্রতিটি প্রেট্রোল গাড়িতে এমডিটি লাগানো থাকবে। জরুরি প্রয়োজনে ভুক্তভোগী ‘৯৯৯’ এ কল করার পর দেখা হবে ঘটনাস্থলের আশেপাশে পুলিশের কোন গাড়িটি আছে। পরে কল সেন্টার থেকে সেখানে তথ্য দেয়া হবে। গাড়িতে থাকা কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন।

জরুরি সেবার সংশ্লিস্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ‘৯৯৯’ থেকে কি ধরনের সেবা দেয়া হয় সেটা মানুষ এখনও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারে নাই। তাই মানুষ জরুরি সেবার বাইরেও অনেক বিষয়ে ফোন দিয়ে কথা বলত। হয়রানির উদ্দেশে অনেকেই ফোন দিত। আবার অনেকে মজা করার উদ্দেশে কল করে। এধরনের কলকে প্রাঙ্ক কল হিসাবে ধরা হয়।  যাত্রা শুরুর পর থেকে এ ধরনের কল এসেছে ১৫ লাখ ৫৯ হাজার ৫০৭টি। এর বাইরে ব্ল্যাঙ্ক কলের সংখ্যা অধিক। একই সময়ে এ ধরনের কল এসেছে ৭৭ লাখ ৭০ হাজার ৬৮৬টি।
জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’ এর সব বিষয়ে তদারকি করছেন পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. তবারক উল্লাহ। তিনি মানবজমিনকে বলেন, কলারের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দিনে গড়ে ৩০ থেকে ৩২ হাজার কল আসে। বর্তমানে একই সময়ে কল রিসিভ করার জন্য আমাদের ১০০টি ডেস্ক রয়েছে। আমরা সেবা দিচ্ছি তাই মানুষ কল করছে। যারা এই মাধ্যমে নিম্নতম সেবা পেয়েছে তারাই অন্যদের কাছে প্রচার করছে। আমরা যেমন সেবা দিয়ে সন্তুষ্ট ঠিক তেমনি সেবা গ্রহিতারাও সন্তুষ্ট। আমরা চাচ্ছি সেবার পরিধি আরও বাড়াতে। বাজেট না থাকার কারনে সেটা সম্ভব হচ্ছে না। সরকার যদি বাজেট দেয় তবে আমরা টেকনোলজিকে আরও আপডেট করবো। কল টেকার বাড়ানো হবে। এছাড়া আমাদের জনবল সংকট ও নিজস্ব স্থান সংকট আছে। বর্তমানে ডিএমপির দুটি ফ্লোরে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

যেভাবে সেবা দিচ্ছে ‘৯৯৯’: শনিবার সকাল ১১টা। ঢাকার বেইলি রোড থেকে ডা. ফাতিহা কল করে জানান তার স্বামী জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জাকির হোসেন তাকে মারধর করে রক্তাক্ত করেছেন। এখন তার বাইরে যাওয়ার মত অবস্থা নাই। তাই তিনি পুলিশের সহযোগিতা চান। কল টেকার সঙ্গে সঙ্গে তাকে রমনা থানার ডিউটি অফিসারের সঙ্গে কথা বলান। তাৎক্ষণিক রমনা থানার উপপরিদর্শক মফিজুল একটি টিম নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে ডা. ফাতিহাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।  সুস্থ হয়ে ওই দিনই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে রমনা থানায় তার স্বামীর বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। পরে পুলিশ তার স্বামী জাকির হোসেনকে আটক করে। এ্যাম্বুলেন্সে মূমুর্ষ রোগীকে নিয়ে মুন্সীগঞ্জের কাঠাল বাড়ী ফেরির লম্বা লাইনে আটকে আছেন এক ব্যক্তি। রোগীকে জরুরি হাসপাতালে নেয়া দরকার। কিন্তু লম্বা লাইনের পেছনে থাকায় এম্বুলেন্সটি ফেরিতে উঠতে পারছিলো না। উপায়ন্তর না পেয়ে রোগীর সঙ্গে থাকা শাহাবুদ্দিন ‘৯৯৯’ এ কল দিয়ে অনুরোধ করেন ফেরি পারাপারের ব্যবস্থা করার জন্য। কল টেকার তখন ফেরির পাশ্ববর্তী লৌহজং থানার ডিউটি অফিসারের সঙ্গে ভুক্তভোগী শাহাবুদ্দিনকে কথা বলান। একই সঙ্গে কাঠালবাড়ী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির আই সি কে বিষয়টি জানানো হয়। পরে নৌ পুলিশ ফাঁড়ির আই সি উপপরিদর্শক রমজান আলী দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে এম্বুলেন্সটি ফেরিতে তুলে দেন।

১২ই সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত ১২ টা। শান্তি নামের এক ব্যক্তি ‘৯৯৯’ এ কল করে বলেন মালিবাগ এলাকায় ১টি ট্রাক ছিনতাই হচ্ছে। ছিনতাইকারীরা ১টি প্রাইভেট কার দিয়ে ব্যারিকেড দিয়ে চালক ও তার সহকারীকে নামিয়ে ট্রাক নিয়ে মুগদা বিশ্বরোডের দিকে পালাচ্ছে। কল টেকারকে তিনি জানান ট্রাকে জিপিএস ট্র্যাকার লাগানো আছে। ‘৯৯৯’ তাৎক্ষনিকভাবে শান্তি নামের ওই কলারকে সবুজবাগ থানার ডিউটি অফিসারের সঙ্গে কথা বলান। পরে সবুজবাগ থানার এসআই হেদায়েত হোসেন জিপিএস লোকেশন অনুযায়ী বৌদ্ধমন্দিরের কাছে চেকপোষ্ট বসিয়ে ব্যারিকেড দিয়ে ট্রাকটি আটক করেন। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ছিনতাইকারী চালক রাজু আহমেদ সোহাগ পালানো চেষ্টা করে। এসময় ধাওয়া করে পুলিশ তাকেও আটক করে।  ‘৯৯৯’ সহযোগিতায় মাত্র ১৯ মিনিটেই সফল এই অভিযানটি শেষ হয়।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর