× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ঢাকা সিটি নির্বাচন- ২০২০ষোলো আনা মন ভালো করা খবর
ঢাকা, ২৩ জানুয়ারি ২০২০, বৃহস্পতিবার

নারী ও শিশু পাচার প্রতিরোধে আইনি পদক্ষেপ কি পর্যাপ্ত?

দেশ বিদেশ

পারভীন রেজা | ৭ ডিসেম্বর ২০১৯, শনিবার, ৮:৪১

মানব পাচার একটি জঘন্যতম অপরাধ। সম্প্রতি দেশ থেকে বিদেশে এবং দেশের মধ্যে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নারী ও শিশু পাচার বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বাংলাদেশ থেকে এ পর্যন্ত কত লোক পাচার হয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। সিডোর তথ্য মোতাবেক সমগ্র ভারতের ১% যৌনকর্মী এবং কলকাতার ২.৭% যৌনকর্মী বাংলাদেশের পাচারকৃত মেয়ে। যৌনকর্মী ছাড়াও পাচারকৃত নারী ও শিশুদের একাংশকে ভারত ও পাকিস্তানের দুর্গম এলাকায় ভূস্বামীদের উপপত্নী বা রক্ষিতা হিসেবে ব্যবহার করা হয় বলে জানা গেছে। তবে জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির একটি জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশ থেকে এ পর্যন্ত মোট ৬ লাখ নারী ভারত, পাকিন্তান, মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়ায় ২ লাখ পাচার হয়েছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ এর ৬ ধারা অনুযায়ী কোনো শিশুকে যদি কেউ কোনো বেআইনি বা নীতি-বর্হিভূত কাজে ব্যবহারের জন্য বিদেশ থেকে নিয়ে আসেন বা বিদেশে পাঠান বা ক্রয়-বিক্রয় করেন অথবা এরকম কোনো বেআইনি কাজ করার জন্য নিজের দখলে রাখেন, তবে তাকে শিশু পাচার বলে।

পাচারের কারণ: মানব পাচারের একক কোন কারণ নেই।
এর পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে। দারিদ্রতা পাচারের অন্যতম একটি কারণ। এছাড়া অশিক্ষা, সচেতনতার অভাব, যৌতুক প্রথা, বাল্য বিবাহ, জন্ম ও বিবাহ রেজিষ্ট্রেশন না করা, সম্পত্তির অধিকার থেকে মেয়েদের বঞ্চনা, সমাজে এবং পরিবারে মেয়েদের নিরাপত্তার অভাব, প্রেম ও বিয়ের ফাঁদ পেতে আরও ভালো জীবনের প্রলোভন, বেশি রোজগারের হাতছানি, আরো বেশি সুখ এবং আরামে জীবন কাটানোর ইচ্ছা, বিয়ের সময় ভালোভাবে খোঁজখবর না নেওয়া, পাচার প্রতিরোধ বিষয়ক আইন প্রয়োগের অভাব ও পাচারকারীর শাস্তি না হওয়া।

শিশু পাচারের শাস্তি: পাচারকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইনের ৫ ও ৬ ধারায় পাচারকারীদের শাস্তি হিসাবে মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া দণ্ডবিধির ৩৭২, ৩৭৩ এবং ৩৭৪ ধারার মাধ্যমে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা আছে।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ এর ৬(১) ধারা অনুযায়ী শিশু পাচারকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং আর্থিক দণ্ডও হতে পারে। আবার এই আইনেরও ৬(২) ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি যদি নবজাতক শিশুকে হাসপাতাল, শিশু বা মাতৃসদন, নার্সিং হোম, ক্লিনিক ইত্যাদি বা সংশ্লিষ্ট শিশুর অভিভাবকের হেফাজত থেকে চুরি করেন, তবে তিনিও শিশু পাচারের অপরাধে অপরাধী হবেন এবং একইরূপ শাস্তি পাবেন।

অনেক সময় শিশুদেরকে চুরি করে নিয়ে যাওয়ার পর তাদের হাত, পা, চোখ বা অন্যকোনো অঙ্গ নষ্ট করে ফেলা হয় এবং এসব শিশুকে দিয়ে ভিক্ষা করানো হয়। দেশের একটি সংগঠিত কুচক্রী মহল এ কাজ করে থাকে। এই অপরাধ কঠোরভাবে দমন করার জন্য সরকার আইনি ব্যবস্থা নিয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১২ ধারা অনুযায়ী কোনো শিশুর অঙ্গহানি করলে বা অঙ্গ বিনষ্ট করলে যে ব্যক্তি এরকম করেছে তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং জরিমানাও হতে পারে।

নারী বা শিশু অপহরণ বিষয়ে বলা হয়েছে, ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি ৩৬২ ধারা এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২(খ) ধারা মতে, যদি কোনো ব্যক্তি নারী ও শিশু পাচারের উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে কোনো নারী বা শিশুকে জোরপূর্বক কোনো স্থান থেকে গমন করার জন্য বাধ্য করে বা কোনো প্রতারণামূলক উপায়ে ফুসলিয়ে বা ভুল বুঝিয়ে বা ভীতি প্রদর্শন করে প্রলুব্ধ করে, তবে সেই ব্যক্তি উক্ত নারী বা শিশুকে অপহরণ করেছে বলে গণ্য হবে। এই আইনের ধারা ৭ অনুযায়ী যদি কোনো ব্যক্তি কোনো নারী বা শিশুকে অপহরণ করে তবে ওই ব্যক্তির সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা কমপক্ষে চৌদ্দ বছরের জেল এবং জরিমানা। এছাড়া ১৯৭৪ সালের শিশু আইনের ধারা ৩৫ মোতাবেক কোন ব্যক্তি কোনো শিশুকে বলপূর্বক ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত করলে তাকে অর্থদন্ড দিতে  হবে।

পাচার প্রতিরোধে আদালতের ভূমিকা: ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল’ নামক আদালতে নারী এবং শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত সকল অপরাধের বিচার কাজ সম্পন্ন করা হয়। এই আদালত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন- ২০০০ এর ২৫ ধারা অনুযায়ী গঠিত একটি বিশেষ আদালত। একে সংক্ষেপে ‘ট্রাইব্যুনাল’ বলা হয়। এই আইনে ‘রুদ্ধদ্বার কক্ষে বিচার’-এর সুবিধা রয়েছে। কোনো ব্যক্তির আবেদনের প্রেক্ষিতে স্বীয় বিবেচনায় উপযুক্ত মনে করলে বিচারক শুধু মামলার দুই পক্ষকে এবং তাদের নিয়োজিত আইনজীবীদের নিয়ে বিচার পরিচালনা করতে পারেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কে বলা হয়েছে- প্রত্যেক জেলায় একটি করে ট্রাইব্যুনাল থাকবে। ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইন অনুযায়ী ধর্ষণের মামলা পরিচালিত হবে। মামলার শুনানি শুরু হলে সেটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি কর্মদিবসে একটানা চলবে। বিচারের জন্য মামলা প্রাপ্তির তারিখ হতে ১৮০ দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল বিচারের কাজ শেষ করবে। যে কোনো রায়ের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ঊর্ধ্বতন আদালতে আপিল করতে পারেন। তবে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ২৮ ধারা অনুযায়ী, রায় ঘোষণার ৬০ দিনের মধ্যে এই আপিল করতে হবে।

ট্রাইবুনাল যদি ১৮০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করতে ব্যর্থ হয় তবে ট্রাইবুনাল কারণ উলেখপূর্বক একটি প্রতিবেদন ৩০ দিনের মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট বরাবর দাখিল করবে যার একটি অনুলিপি সরকারকেও দিতে হবে। তাছাড়া এরূপক্ষেত্রে পাবলিক প্রসিকিউটর ও সংশিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা ৩০ দিনের মধ্যে সরকারের নিকট কারণ উল্লেখপূর্বক প্রতিবেদন দাখিল করবে। এরূপ দাখিলকৃত প্রতিবেদনসমূহ যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বিবেচিত হওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ার জন্য দায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। উল্লেখ্য, এই আইন অনুযায়ী, পুলিশ যদি অভিযোগ গ্রহণ না করে সেক্ষেত্রে ট্রাইবুনাল সরাসরি বিচারের জন্য অভিযোগ নিতে পারেন। এই বিধানটি যদি বাস্তবে প্রয়োগ করা হয়, তবে জনগণের অভিযোগ করা অনেক সহজ হবে।

এই আইনের অধীন কোনো বিচার চলাকালে যদি ট্রাইব্যুনাল মনে করে যে, কোনো নারী বা শিশুকে নিরাপত্তামূলক হেফাজতে রাখা প্রয়োজন, তাহলে ট্রাইব্যুনাল উক্ত নারী বা শিশুকে কারাগারের বাইরে ও সরকার কর্তৃক নির্ধারিত স্থানে বা যথাযথ অন্যকোনো ব্যক্তি বা সংস্থার হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিতে পারেন। বিচার চলাকালে যদি অপরাধী মহল নির্যাতিত নারী বা শিশুকে পুনরায় কোনো ধরনের আঘাত করে বা করতে চায়, তা থেকে রক্ষা করার জন্য এই বিধান করা হয়েছে। তবে কোনো নারী বা শিশুকে নিরাপত্তা হেফাজতে রাখার আদেশ প্রদানের ক্ষেত্রে ট্রাইবুনাল উক্ত নারী বা শিশুর মতামত গ্রহণ ও বিবেচনা করবে।

সঠিক ও ন্যায় বিচারে ক্ষেত্রে আদালতের ভূমিকা সবার আগে। অপরাধ প্রমাণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন তথ্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ, যেমন এজাহার, পুলিশ কর্তৃক গৃহীত বক্তব্য, ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক গৃহীত বক্তব্য, ডাক্তারের সার্টিফিকেট, অভিযোগপত্র ইত্যাদি। মামলার বিচারকার্যে এসব প্রমাণের মধ্যে অসামঞ্জস্য দেখা দিলে অপরাধ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাছাড়া সাক্ষ্যপ্রমাণ সরবরাহকারী সংস্থাসমূহের যোগ্যতা নয় বলেই মামলার সুষ্ঠু বিচার অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যাহত হচ্ছে এবং অপরাধী খালাস পেয়ে যাচ্ছে। সুতরাং অপরাধ দমন করতে হলে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার একান্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরাধ প্রমাণিত হয় আইনের বিধান যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে। নিত্যনতুন আইন প্রণয়নের চেয়ে আইনের প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আরো প্রয়োজন আইন বিষয়ে জনগণের সচেতনতা যা আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারে।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর