× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ঢাকা সিটি নির্বাচন- ২০২০ষোলো আনা মন ভালো করা খবর
ঢাকা, ২৩ জানুয়ারি ২০২০, বৃহস্পতিবার
বিদ্যুতের দাম নিয়ে গণশুনানি শেষ

চলছে দাম বাড়ানোর ঘষামাজা

শেষের পাতা

ফরিদ উদ্দিন আহমেদ | ৭ ডিসেম্বর ২০১৯, শনিবার, ৯:২০

বিদ্যুতের মূল্যহার পরিবর্তনের ওপর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গণশুনানি শেষ করেছে। চলছে দাম বাড়ানোর ঘষামাজা বা চুলচেরা বিশ্লেষণ। ভোক্তারা দাবি করেছেন, সবসময়ই তাদের চাওয়া উপেক্ষিত হয় শুনানিতে। বিইআরসি’র গণশুনানিকে তামাশা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন তারা। এবার শুনানিতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) পাইকারি বিদ্যুতের দাম ২৩ দশমিক ২৭ ভাগ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। এতে বিরোধীতা করেছেন বিভিন্ন পর্যায়ের ভোক্তারা। তারা বলেছেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বমুখীবাজারে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব মানি না। এ মুহুর্তে বিদ্যুতের দাম বাড়ালে সবকিছুতে এর প্রভাব পড়বে বলে তারা মনে করেন।
কল কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়বেন। বিদ্যুত খাতের ৫০ শতাংশ দুর্নীতি বন্ধ করতে পারলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হবে না বলে তারা মনে করেন।

এখন গড়ে প্রতি ইউনিট পাইকারি বিদ্যুতের গড় দাম ৪ টাকা ৮৭ পয়সা। গত চারদিন কমিশনের শুনানিতে বিইআরসি সুপারিশ করেছে এবার পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানো যেতে পারে ৯৩ পয়সা। অর্থাৎ কমিশনের কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ মেনে নিলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের পাইকারি দর হবে ৫ টাকা ৮০ পয়সা। এর সঙ্গে সঞ্চালন চার্জ আরো ৬ দশমিক ৯২ ভাগ মূল্য সমন্বয় করা হলে দাম আরো বাড়বে। এই অর্থের পুরোটা পাস-থ্রু হিসেবে খুচরা পর্যায়ে পাঠানোর সঙ্গে যোগ হবে বিতরণ চার্জ। এই বিতরণ চার্জ যোগ করেই কমিশন খুচরা বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করবে। অর্থাৎ এখন পর্যন্ত শুনানিতে আসা প্রস্তাব এবং মূল্যায়ন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, খুচরা বিদ্যুতের সর্বোচ্চ দাম হতে পারে ৭ টাকা ২৬ পয়সার মতো। যদিও সরকার ভর্তুকির অংক ঠিক না করা পর্যন্ত এর সঠিক পরিমাণ এখনই বলা সম্ভব নয়।

কমিশন চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলাম শুনানিতে বলেন, বিতরণ কোম্পানিগুলোর অবস্থা আগের চেয়ে ভালো হয়েছে। তবে ভোক্তাদের স্বার্থ দেখতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। আগামী ৯০ দিনের মধ্যে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে কমিশন মূল্যহারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বেশিরভাগ শুনানির পর বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। তবে কখনো কখনো পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়নি। ২০১০ সালের ১লা মার্চ গ্রাহক পর্যায় ৬ দশমিক ৭ ভাগ বেড়েছিল। সেবার পাইকারিতে বাড়েনি। ২০১১ সালের ১লা  ফেব্রুয়ারি গ্রাহক পর্যায় ৫ ভাগ এবং পাইকারিতে ১১ ভাগ বেড়েছিল। ২০১১ সালের ১লা আগস্ট গ্রাহক পর্যায়ে বাড়েনি। তবে পাইকারিতে ৬ দশমিক ৬৬ ভাগ বাড়ানো হয়। ২০১১ সালের ১লা ডিসেম্বর গ্রাহক পর্যায়ে ১৩ দশমিক ২৫ ভাগ এবং পাইকারিতে ১৬ দশমিক ৭৯ ভাগ বাড়ানো হয়। ২০১২ সালের ১লা সেপ্টেম্বর গ্রাহক পর্যায়ে ১৫ ভাগ এবং পাইকারিতে ১৭ ভাগ, ২০১৫ সালের ১লা আগস্ট গ্রাহক পর্যায়ে ২ দশমিক ৯৩ ভাগ বাড়ানো হয়। সেবার পাইকারিতে বাড়েনি। এরপর সর্বশেষ ২০১৭ সালের ১লা ডিসেম্বর গ্রাহক পর্যায়ে ৫ দশমিক ৩ ভাগ বাড়ানো হয়। সেই সময়ও পাইকারিতে বাড়েনি। বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো-না বাড়ানো সরকারের ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল। সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনে কতটা ভর্তুকি দিতে সম্মত হবে, তার হিসাবে দামের অংক নির্ধারণ করা হবে। তবে উৎপাদন পর্যায়ের অর্ধেক ভর্তুকি দিলেও প্রস্তাবের অর্ধেক বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানো হবে।

বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি বলছে, পিডিবি যে ঘাটতির কথা বলছে, তা সমন্বয় করতে ইউনিট প্রতি ৯৩ পয়সা বাড়ানো প্রয়োজন। সরকার যে পরিমাণ ভর্তুকি দেবে তা বাদ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাকি অর্থ গ্রাহকের কাছ থেকে নেয়া হতে পারে। জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং ক্যাব’র উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম বলেন, পিডিবি তার মূল্যহার বৃদ্ধিও যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে পারেনি। সঙ্গত কারণে এই দাম বৃদ্ধি করা সমীচীন হবে না। তবে দাম বৃদ্ধি সরকারের ভর্তুকির ওপর নির্ভর করে। বিইআরসি যে মূল্যায়ন করেছে, তার ওপর নির্ভর করে সরকার ভর্তুকি দেবে। সরকারের ভর্তুকি দেয়ার পরই বলা যাবে প্রকৃত অর্থে কতটা দাম বাড়ছে। শুনানির শেষ দিনে তিনি আরো বলেন, শুনানিতে পেশকৃত বিবেচ্য বিষয়গুলোর সঙ্গে তথ্য অধিকার আইন ও মানবাধিকার আইন বিবেচনায় নিতে হবে। রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ ক্রয়ে প্রদত্ত ক্যাপাসিটি চার্জ মূল্যহারে সমন্বয়ে আপত্তি রয়েছে ক্যাব’র। উৎপাদনে বিদ্যমান ঘাটতি প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। সে ঘাটতি সমন্বয়ে মূল্যহার বৃদ্ধির প্রস্তাব। উৎপাদন ব্যয় ও ব্যয় বৃদ্ধিতে ঘাটতি বিধায় যে ব্যয় ও ব্যয় বৃদ্ধির ন্যায্যতা ও যৌক্তিকতা গণশুাননিতে প্রমাণিত হয়নি বলে এই বিশেষজ্ঞ উল্লেখ করেন।

গণশুনানিতে অংশ নিয়ে ক্যাবের জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. শামসুল আলম আরো বলেন, স্বচ্ছতা ও সততার সঙ্গে অনুসরণ ব্যতীত পাইকারি বিদ্যুতের মূলহার নির্ধারণ ন্যায্য যৌক্তিক হবে না। মূল্যহার বৃদ্ধিও প্রস্তাব তখনই যৌক্তিক ও ন্যায়সংগত হবে যখন ঘাটতি যৌক্তিক ও ন্যায়সংগত হবে। তিনি বলেন, পিডিবিকে ভোক্তারা বিদ্যুৎ খাত পরিচালনায় আদর্শিক মানদন্ড হিসেবে দেখতে চায়। এটি সরকারি সংস্থা। মুনাফা আহরণকারী কোম্পানি নয়। তার ট্যারিফ কস্ট প্লাস নয়, কস্টভিত্তিক হবে। ড. শামসুল আলম বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৭০ হাজার কোটি  টাকা মজুদ আছে। বিএনপি’র যুগ্ম মহাসচিব এডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল গণশুনানিতে অংশ নিয়ে বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বমুখী বাজারে সাধারণ মানুষ খুব যন্ত্রণার মধ্যে আছেন। ২০১০ সালের মার্চ থেকে এই পর্যন্ত আটবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। তাই এই মুহূর্তে বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর দাবি জানান তিনি। জনগণের ভোগান্তি কমানোর জন্য বিইআরসি’র প্রতি আহবান জানান এই নেতা। সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, অপচয় দুর্নীতি, লুটপাটের মহোৎসব করা হচ্ছে। এর দায় কেনো জনগণ বহন করবে। আমি মনে করি দাম বাড়ানোর পরিবর্তে কমানোর যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে। শুনানিতে বিজিএমইএ’র প্রতিনিধি আনোয়ার হোসেন চৌধুরী ধারাবাহিকভাবে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এবছর তৈরি পোশাক শিল্পের ৬৯টি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। তাদের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। ফলে আরো অনেক কারখানা বন্ধের উপক্রম দেখা দিয়েছে।

তিনি বলেন, এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চার কোটি লোক জড়িত। সরাসরি জড়িত ৪৪ লাখ মানুষ। এ মুহূর্তে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে আরো বহু কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। তাই বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর দাবি জানান বিজিএমইএ’র এই প্রতিনিধি। শুনানিতে বিকেএমইএ’র প্রতিনিধি সজিব হোসেন বলেন, তাদের ১২শ’ কারখানার মধ্যে ইতিমধ্যেই ৬শ’ বন্ধ হয়ে গেছে। বিদ্যুতের দাম বাড়ালে অন্য কারখানাগুলোও দ্রুত বন্ধ হয়ে যাবে। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা নেই বলেও তিনি মনে করেন। গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি গণশুনানিতে অংশ নিয়ে বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়লে সব কিছুর দাম বেড়ে যাবে। সরকার বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেয়ার জন্য কুইক রেন্টাল করেছে। বিদ্যুতের ভুল নীতি ও দুর্নীতির কারণে রয়েছে বিশেষ গোষ্ঠীর সুবিধা। তিনি বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর দাবি জানান। সিপিবি নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স শুনানিতে বলেন, বিদ্যুৎ সেক্টরে দুর্নীতির হাঙ্গার ও কুমির রয়েছে। এখানে সর্বত্র দুর্নীতি। এখাতে ৫০ শতাংশ দুর্নীতিরোধ করতে পারলে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে না।

বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক এসোসিয়েশন সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ শুনানিতে বলেন, বিদ্যুতের যন্ত্রপাতি ক্রয়ে দুর্নীতি রয়েছে। এজন্য অডিট করা প্রয়োজন। এ মুহুর্তে বিদ্যুতের দাম বাড়লে জীবনযাত্রার ওপর চরম প্রভাব পড়বে। তাই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব মানি না। সংগঠনটি আজ ‘বিদ্যুতের অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব বাতিলের দাবিতে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি’ পালন করবে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে।

এদিকে, বিদ্যুতের মূল্যহার পরিবর্তনে বিইআরসি গণশুনানিকে অবৈধ উল্লেখ করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)।  শুনানির শেষ দিন টিসিবি ভবনের সামনে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তারা বলেন, গণশুনানি নামটি শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু দুঃখের বিষয় গণশুনানিতে জনগণের জন্য কোনো সুখবর থাকে না। এই গণশুনানিকে অবৈধ উল্লেখ করে তারা বলেন, গণশুনানিতে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন জনপ্রতিনিধি ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতামত উপেক্ষা করে অবৈধভাবে বারবার তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ায়। এটা তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয় বলে তারা মনে করেন।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর