× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবর
ঢাকা, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, শুক্রবার

তদন্তেই পার বছরের পর বছর

এক্সক্লুসিভ

রাশিম মোল্লাহ | ৯ ডিসেম্বর ২০১৯, সোমবার, ৮:০৯

নৃশংস খুন। শিশু থেকে বৃদ্ধ কেউই রেহায় পাচ্ছে না এ নৃশংসতা থেকে। কোন কোন খুনের পর ক্ষোভে ফুঁসে উঠে দেশবাসী। আবার কোন কোন খুন একেবারে আড়ালেই থেকে যায়। তবে, আলোড়িত, আলোচিত খুন নিয়ে প্রশাসন আশ্বাস দেয় দ্রুত আসামি গ্রেপ্তার ও শাস্তি নিশ্চিতের।  অবশ্য কখনো কখনো গ্রেপ্তারও হয় খুনি। আদালতে হাজির করা হয়। রিমান্ড মঞ্জুর হয়। বের হয়ে আসে মামলা সংশ্লিষ্ট অনেক ক্লু।
শুরু হয় তদন্ত কার্যক্রম। দিন যায়, মাস যায়। বছর যায়। তবুও শেষ হয় না মামলার তদন্ত। ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৭ ধারায়, অপরাধ সংঘটন সম্পৃক্ত সংবাদ প্রাপ্তির তারিখ অথবা এরূপ তদন্তের জন্য ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ প্রাপ্তির তারিখ থেকে চার মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে বলা হয়েছে। তবে ফৌজদারী বিশেষজ্ঞ আইনজীবীরা বলেন, এটি নির্দেশনামূলক। এই সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে না পারলে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে সময়ের আবেদন করতে পারবেন এবং আদালত প্রয়োজন মনে করলে সময় দিতে পারবেন। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা কত দিনের কিংবা কতবার সময় আবেদন করতে পারবেন, এমন কোনো বিধান আইনে নেই। আর এই সুযোগে একটি মামলার তদন্ত বছরের পর বছর পার হয়, কিন্তু শেষ হয় না তদন্ত। এ ব্যাপারে ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার মো. আলমগীর হোসেন বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা কতবার সময় আবেদন করতে পারবেন এবং ম্যাজিস্ট্রেট তাকে কতদিন পর্যন্ত সময় দিতে পারবেন, ফৌজদারী কার্যবিধিতে তার উল্লেখ নেই। এটি এই আইনের একটি সীমাবদ্ধতা বলা চলে। তিনি বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন আইন এবং মানব পাচার মামলায় তদন্তে একটি নির্দিষ্ট সময়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওই সময়ের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করতে না পারলে তদন্ত কর্মকর্তাকে কারণ ব্যাখ্যা করতে বলা হয়। ব্যাখ্যাটি যথোপযুক্ত মনে না হলে তাকে পেশাগত অদক্ষ হিসেবে ঘোষণা করতে বলা হয়। এমনকি তদন্ত কর্মকর্তাকে পরিবর্তনও করা হয়। নির্দিষ্ট সময়ে তদন্ত শেষ  করতে না পারার ব্যাখ্যা দিতে হয় বলে এসব মামলার তদন্ত অনেকটা দ্রুত গতিতেই শেষ হয় বলে তিনি জানান। এ ব্যাপারে লিগ্যাল ভয়েস ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট জামিউল হক ফয়সাল বলেন, ১২০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে না পারলে আসামি পক্ষ জামিনের সুবিধা পায়। অনেক সময় আসামিপক্ষ তদন্ত কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে তদন্ত দীর্ঘায়িত করে। এজন্য মামলার তদন্ত শেষ করতে অনন্তকাল সময় না দিয়ে একটি যৌক্তিক সময় পর্যন্ত দেয়া উচিত বলে মনে করি।

২০১২ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজা বাজারে সাংবাদিক দম্পতি মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি নিজ বাসায় খুন হন। পর দিন ভোরে তাদের ক্ষত-বিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় মেহেরুন রুনির ছোট ভাই নওশের আলম রোমান শের-ই বাংলা নগর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। শের-ই বাংলা নগর থানা পুলিশ মামলাটির তদন্ত শুরু করে। চারদিন পর এর তদন্তভার দেয়া হয় ঢাকা মহানগর ডিবি পুলিশকে। দুইমাসেরও বেশি সময় তদন্ত করে তারা এর রহস্য উদঘাটন করতে ব্যর্থ হয়। এরপর ২০১৪ সালের ১৮ই এপ্রিল হাইকোর্টের নির্দেশে হত্যা মামলাটির তদন্তভার পড়ে র‌্যাবের ওপর। কিন্তু এখন পর্যন্ত র‌্যাব মামলার তদন্তটি শেষ করতে পারেনি। এজন্য গত ২০শে অক্টোবর হাইকোর্ট তদন্ত কর্মকর্তাকে মামলার সিডিসহ তলব করেন। ১১ই নভেম্বর তলবে হাজির হয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার খন্দকার শফিকুল আলম হাইকোর্টে জানান, তদন্তে কোনো ক্লু পাওয়া যায়নি। চারটি ডিএনএ প্রতিবেদনের মধ্যে দুটি মিলেছে। এ দুটিতে আসামিদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি বলে সেগুলো ফের যুক্তরাষ্ট্রে এফবিআইর ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু নমুনা দুটির বিষয়ে এখনো কোনো অগ্রগতি নেই। ১২০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে না পরলে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতের কাছে সময়ের আবেদন করতে পারেন এবং আদালত প্রয়োজন মনে করলে তার আবেদন মঞ্জুর করতে পারেন। এই সুযোগেই ৮ বছর পেরুলেও এই মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। ঢাকা মহানগর পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, অনেক সময় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন বিলম্বে পাওয়ায় কাঙ্খিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করা সম্ভব হয় না। মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বিবিসিকে বলেন, কোনো মামলায় যখন নানারকম চাপ কিংবা বাধা তৈরি হয়, তখন অনেক সময় তদন্তকারী সংস্থা তদন্ত শেষ না করে সময় ক্ষেপনের কৌশল নিয়ে থাকেন।

রাজধানীর গোপীবাগের কথিত পীর লুৎফার রহমান ফারুকী ও তার ছেলেসহ ছয় জনকে গলা  কেটে হত্যার ঘটনায় ছয় বছরেও তদন্ত শেষ হয়নি। এ ঘটনায় দুই জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর মধ্যে একজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। একজনের স্বীকারোক্তি মতে এখনো অধরা রয়েছে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) চার সদস্য। ২০১৩ সালের ২১শে ডিসেম্বর সন্ধ্যায় রাজধানীর  গোপীবাগের আর কে মিশন রোডের ৬৪/৬ নম্বর আয়না বাড়ির দোতলায় কথিত ইমাম মাহাদীর প্রধান সেনাপতি পরিচয় দানকারী লুৎফার রহমান ফারুক, তার ছেলে মনির হোসেন, মুরিদ সাইদুর রহমান, মজিবর রহমান, রাসেল ও বাসার তত্ত্বাবধায়ক মঞ্জুর আলম ওরফে মঞ্জুকে গলাকেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ঘটনার প্রায় দুই বছর পর ২০১৫ সালের ২৭শে নভেম্বর হামলার দায় স্বীকার করে জেএমবির সদস্য তরিকুল ইসলাম। জেএমবির শীর্ষ নেতারাই এই হত্যাকান্ডের পরিকল্পনা করেন বলে তারিকুল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। কিন্তু আদালতে এখনো চার্জশিট দাখিল করা হয়নি।

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যার তদন্ত শেষ হয়নি তিন বছরেও। ২০১৬ সালের ২০শে মার্চ সন্ধ্যায় টিউশনি করতে গিয়ে নিখোঁজ হন তনু। কয়েকঘণ্টা পর ওই  রাতেই তার স্বজনরা বাসার অদূরে একটি জঙ্গলে দেখতে পান তনুর লাশ। খবর পেয়ে পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে। পরদিন তনুর বাবা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। প্রথমে থানা পুলিশ ও পরে গোয়েন্দা পুলিশের পর ২০১৬ সালের ১লা এপ্রিল থেকে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কুমিল্লা শাখাকে। কিন্তু এখনো শেষ হয়নি মামলাটির তদন্ত।

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার তদন্ত শেষ হয়নি ছয় বছরেও। গত ৫ মার্চ ত্বকী হত্যাকাণ্ডের ছয় বছর শেষ হয়েছে। ২০১৩ সালের ৬ মার্চ বিকালে শহরের শায়েস্তা খান সড়কের বাসা থেকে বেরিয়ে আর বাসায় ফেরেনি ত্বকী। পরে ৮ই মার্চ সকালে শহরের চারারগোপে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে ত্বকীর লাশ পাওয়া যায়। সে রাতেই নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় মামলা করেন তার বাবা তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ রক্ষা জাতীয় কমিটির জেলা শাখার আহ্বায়ক রাফিউর রাব্বি। ত্বকীর বাবার দায়ের করা মামলাটি প্রথমে তদন্ত করেন তখনকার নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি মঞ্জুর কাদের। পরে রাফিউর রাব্বির আবেদনে হাইকোর্ট মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দেন র‌্যাবকে। ২০১৩ সালের ২০শে জুন থেকে তারা এ মামলার তদন্ত করছে।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর