× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ঢাকা সিটি নির্বাচন- ২০২০ষোলো আনা মন ভালো করা খবর
ঢাকা, ২৯ জানুয়ারি ২০২০, বুধবার
মোবারকগঞ্জ চিনিকল

১৯৪ টাকায় উৎপাদিত চিনি ৫৫ টাকায় বিক্রি

এক্সক্লুসিভ

কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি | ১১ ডিসেম্বর ২০১৯, বুধবার, ৭:৪৪

১৯৪ টাকা ১৯ পয়সা খরচে উৎপাদিত চিনি বিক্রি করা হচ্ছে ৫৫ টাকায়। প্রথম দেখায় ভুল মনে হলেও ২০১৮-১৯ মাড়াই মৌসুমে মোবারকগঞ্জ সুগার মিলের চিত্র ছিল এমনই। বছরের পর বছর ধরে এভাবেই চলছে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে অবস্থিত মোবারকগঞ্জ সুগার মিলে চিনি উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ। যদিও উৎপাদন খরচের এই টাকার অঙ্কটা একেক বছর একেক রকম হয়ে থাকে। ফলে প্রতি বছরই কোটি কোটি টাকার লোকসান গুনতে হচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম এই ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠানটিকে। এদিকে মিলের রেকর্ড বই বলছে, ২০১৫-২০১৬ মাড়াই মৌসুমে প্রতিকেজি চিনির উৎপাদন ব্যয় হয়েছিল ১৭৬.৪০ টাকা। ২০১৬-২০১৭ মৌসুমে তা বেড়ে হয় ১৯৯.০৮ টাকা। এরপর ২০১৭-২০১৮ মাড়াই মৌসুমে এসে সেই খরচ দাঁড়ায় ১৮৯.১২ টাকায়।
আগের বছরগুলোতে চিনির কেজিপ্রতি বিক্রয় মূল্য ছিল যথাক্রমে ৪৫, ৪৭ ও ৫০ টাকা। বছরের পর বছর ঐতিহ্যবাহী এ মিলটির মোটা অঙ্কের লোকসানের কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা যায় চমকপ্রদ নানা তথ্য। মিলটির পরিচালনায় অব্যবস্থাপনা, মোটা অঙ্কের ব্যাংক সুদ প্রদান ও মান্ধাতার আমলের ম্যানুয়াল পদ্ধতির কারখানাকে লোকসানের জন্য প্রধানতম কারণ বলছেন মিল সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অন্যদিকে চিনি উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের শ্রমিক মজুরি খরচ, আখ ক্রয়, মিলে অপরিষ্কার আখ সরবরাহ, রস ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত দৈনিক আখ মাড়াই, পরিবহন খরচ, কারখানা মেরামত এবং বয়লারের জ্বালানিসহ অর্ধশতাধিক খাতের খরচ মিটিয়ে প্রতি বছরই বাড়ছে চিনি উৎপাদন খরচের এই অঙ্ক।

 মোবারকগঞ্জ চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার কবীর বলছেন, পুরাতন যন্ত্রপাতি, কৃষক পর্যায়ে আখের মূল্য বৃদ্ধি, জনবল সংকট, শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সঙ্গতিহীন মূল্য নির্ধারণের ফলে লোকসান বাড়ছে। সঙ্গে পুঞ্জীভূত মোটা অঙ্কের ব্যাংক ঋণের সুদ প্রদানকেও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণ বলছিলেন এই ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

এদিকে অব্যাহত এই লোকসানের জন্য সরকারের নীতিনির্ধারণকে দুষছেন মিলের কর্মকর্তা ও শ্রমিক-কর্মচারীরা। ফলে বছরের পর বছর বেড়েই চলেছে লোকসানের বোঝা। তবে, চিনিকলটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার কবীর সরকারের নীতিনির্ধারণকে ভুল বলতে রাজি নয়। তার ভাষ্য, উৎপাদন খরচ বেশি হলেও বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনীয় ও পুষ্টিকর এই খাদ্যপণ্যটি জনসাধারণের মধ্যে সহনীয় রাখতেই সরকার নির্ধারিত মূল্য ৫৫ টাকায় তারা চিনি বিক্রি করছেন।

বিগত ২০১৮-১৯ মাড়াই মৌসুমে মিলটি চিনি উৎপাদন করে ৫ হাজার ৭৮৫ টন। প্রতি কুইন্টাল চিনি উৎপাদনে খরচ হয়েছে ১৯৪১৯.৬৫ টাকা। সে হিসাবে প্রতি কেজি উৎপাদন করতে খরচ হয় ১৯৪.১৯ টাকা। ওই বছরে এ পরিমাণ চিনি উৎপাদন করতে মিলটির লোকসান গুনতে হয় ৭৭ কোটি ৬৯ লাখ ৫৫ হাজার টাকা।

একই বছর এক লাখ আট হাজার ৪২৩ টন আখ মাড়াই করে ৮ হাজার ১৩২ টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। আর চিনি আহরণের হার ধরা হয়েছিল ৭.৫০ কিন্তু গড় চিনি আহরণ করা হয় ৫.৬৮ ভাগ। আর চিনি উৎপাদন হয় ৫ হাজার ৭৮৫ টন। ওই মৌসুমে মিলটি আখের মণ কিনেছিল ১৪৪.৫৪ টাকা। সে হিসাবে প্রতি কেজি আখের দাম পড়েছিল ৩.৬১ টাকা।

এর আগে ২০১৭-২০১৮ মাড়াই মৌসুমে ৭০ কোটি ২৮ লাখ ২২ হাজার টাকা এবং ২০১৬-২০১৭ মৌসুমে লোকসান হয় ৩৫ কোটি ৫৫ লাখ ৯৭ হাজার টাকা। এ পর্যন্ত ৩৫ মাড়াই মৌসুমে মিলটির লোকসান হয় ৩০১ কোটি টাকা।
আর সর্বশেষ ২০০৫-০৬ মাড়াই মৌসুমে লাভ হয় ৫ কোটি ৮৬ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। এ নিয়ে মিলের ৫২ মাড়াই মৌসুমের মধ্যে ১৬ মৌসুমে লাভ হয়েছে ৩৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।

সর্বশেষ লাভের মুখ দেখা যায় ২০০৫-০৬ মৌসুমে। এই মৌসুমে মিলটি ১৩৮ মাড়াই দিবসে এক লাখ ৮১ হাজার ৫৮২ টন আখ মাড়াই করে ১৩ হাজার ৪৩০ টন চিনি উৎপাদন করে। চিনি আহরণের হার ছিল গড় ৭.৪০ ভাগ। ওই বছর মিলের কর্মকর্তা ও কর্মচারী ছিল ৯৮৩ জন। কিন্তু বর্তমানে মিলে কর্মকর্তা ও শ্রমিক-কর্মচারী রয়েছে ৮৯৫ জন। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা শহরে ১৯৬৫ সালে ৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০৭.৯৩ একর নিজস্ব জমির উপর নেদারল্যান্ডস সরকার মোবারকগঞ্জ চিনিকলটি স্থাপন করে। এরমধ্যে ২০.৬২ একর জমিতে কারখানা, ৩৮.২২ একর জমিতে কর্মকর্তা ও শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য আবাসিক কলোনি, ২৩.৯৮ একর পুকুর এবং ১০৭ একর জমিতে পরীক্ষামূলক ইক্ষু খামার। এ ছাড়া ১৮.১২ একর জমিতে জুড়ে রয়েছে সাব- জোন অফিস ও আখ ক্রয়কেন্দ্র।

প্রতিষ্ঠাকালীন মৌসুমে পরীক্ষামূলকভাবে ৬০ কর্মদিবস আখ মাড়াই চলে। লক্ষ্য পূরণ হওয়ায় ১৯৬৭-১৯৬৮ মাড়াই মৌসুম থেকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উৎপাদন শুরু করে। ঝিনাইদহের ৬ উপজেলা ছাড়াও যশোরের দুটি উপজেলা নিয়ে গঠিত মোচিক জোন। মিলের আটটি জোনের আওতায় চাষযোগ্য জমির পরিমাণ রয়েছে সাড়ে তিন লাখ একর। আখ ক্রয়কেন্দ্র রয়েছে ৪৮টি। এদিকে প্রায় তিনশ’ কোটি টাকার পুঞ্জীভূত ব্যাংক ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে চলতি মাসের ৬ই ডিসেম্বর ২০১৯-২০২০ মৌসুমে আখ মাড়াই শুরু করেছে। এ বছর ১ লাখ ২৩ হাজার টন আখ মাড়াই করে ৭ হাজার ৬৮৮ টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর চিনি আহরণের হার ধরা হয়েছে ৬.২৫ ভাগ। ৯০ দিন মিলটি চলবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর