× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবর
ঢাকা, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০, বুধবার
থানা হেফাজতে এফডিসি কর্মকর্তার মৃত্যু

সহকর্মীদের বিক্ষোভ নানা প্রশ্ন

শেষের পাতা

স্টাফ রিপোর্টার | ২১ জানুয়ারি ২০২০, মঙ্গলবার, ১০:০৮

তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা হেফাজতে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনের কর্মকর্তা আবু বকর সিদ্দিকী বাবুর মৃত্যু নিয়ে রহস্য কাটছে না। পুলিশের দাবি, হাজতের গ্রিলের সঙ্গে শীতের পোশাক দিয়ে বাবু আত্মহত্যা করেছেন। আর বাবুর সহকর্মী ও স্বজনরা দাবি করছে সে আত্মহত্যা করেনি। পুলিশি নির্যাতনে তার মৃত্যু হয়েছে। তাই তারা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন। আর জড়িতদের শাস্তি দাবি করেছেন। অন্যদিকে বাবুর লাশের ময়নাতদন্ত করে ফরেনসিক চিকিৎসক জানিয়েছেন বাবুর গলায় কালো দাগ, মাথা ও পায়ে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসকরা মৃত্যুর সঠিক কোনো কারণ জানাতে পারেননি।
পুলিশের পক্ষ থেকে ঘটনার তদন্তে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। ডিএমপি কমিশনার গতকাল এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, থানা হাজতে আসামির আত্মহত্যার দায় এড়াতে পারে না পুলিশ। তদন্তে যদি কারো দোষ পাওয়া যায় তবে তার বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে। পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে এ ঘটনায় যদি কোনো পুলিশ সদস্যর গাফিলতি পাওয়া যায় তবে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

পুলিশ হেফাজতে এফডিসি কর্মকর্তার মৃত্যু নিয়ে নানা প্রশ্নের দেখা দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে দায়িত্ব পালন শেষে সুস্থ আবু বকর থানায় গিয়ে কেন আত্মহত্যা করবেন? সহকর্মীরা জোর দিয়েই বলছেন তিনি আত্মহত্যা করতে পারেন না। এছাড়া আত্মহত্যা করার জন্য থানা হাজতে এমন কোনো সুযোগ বা উপকরণ ছিল না। পুলিশের ভাষ্যমতে আবু বকর শীতের পোশাক দিয়ে হাজতের গ্রিলের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করেছেন। পুলিশ বলছে তাদের কাছে সিসি ক্যামেরার ফুটেজও রয়েছে। আবু বকরের স্বজনরা জানিয়েছেন, মায়া নামের এক নারীর সঙ্গে তার আর্থিক লেনদেন আছে। ওই টাকা চাওয়াতে নারীর সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। তাই সে পরিকল্পিতভাবে মামলা করে পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে দিয়েছে। এরসঙ্গে পুলিশের যোগসাজোশ রয়েছে। এছাড়া যে মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সে মামলটি তার মৃত্যুর একদিন পরে হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা।

এদিকে আবু বকর সিদ্দিকী বাবুর লাশের ময়নাতদন্ত গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে সম্পন্ন হয়েছে। পরে ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ জানান, ময়নাতদন্তে লাশের গলায় কালো ও মাথায় এবং পায়ে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তবে এই আঘাতে তার মৃত্যু হয়েছে কি-না এখনি বলা যাচ্ছে না। লাশ থেকে আলামত সংগ্রহ করে হিস্টোপ্যাথলজিতে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে রিপোর্ট এলে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট জমা দেয়া হবে। ঢামেকে মৃত আবু বকরের সাবেক স্ত্রী আলেয়া ফেরদৌসী সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করে বলেন, আবু বকরকে নির্যাতন করেই মেরে ফেলা হয়েছে। চিকিৎসকের বক্তব্যেও নির্যাতনে মৃত্যুর বিষয়টি উঠে এসেছে। আমরা এর বিচার চাই। তাকে মাথায় আঘাত করেই মারা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে সিসিটিভির যে ফুটেজ দেখানো হয়েছে তার সঙ্গে আবু বকরের কোনো মিল নেই। কারণ ফুটেজের ওই লোকের পরনে জিন্স প্যান্ট ও এ্যাশ কালারের গেঞ্জি, আর আবু বকরের পরনে ছিলো টাউজার ও টি শার্ট। সুতরাং ফুটেজটি সাজানো বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

এ বিষয়ে ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেন, থানা হাজতে আসামি আত্মহত্যা করলে পুলিশ এর দায় এড়াতে পারে না। প্রাথমিকভাবে এই মৃত্যু আত্মহত্যা বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় তিন সদস্যর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে কেউ দোষী প্রমাণিত হলে তার বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। গতকাল দুপুরে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) মো. সোহেল রানা সাক্ষরিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়, হেফাজতে মৃত্যু নানা কারণে হতে পারে। নির্যাতনের অভিযোগ যেমন উঠে আসে, তেমনি অসুস্থতাজনিত কারণে মৃত্যুর উদাহরণও রয়েছে। হেফাজতে আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে কখনও কখনও। পুলিশি হেফাজতে যে কারণেই মৃত্যু ঘটুক না কেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা পুলিশ সদস্যদের কোনো গাফিলতি, বিচ্যুতি বা অপরাধ প্রমাণিত হলে তার বা তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই উপযুক্ত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এফডিসির কর্মচারি ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক ফিরোজা বেগম বলেন, পুলিশ আবু বকরকে গ্রেপ্তার করেছে শনিবার। অথচ মামলা হয়েছে রোববার। পুলিশ তাকে হত্যা করে মামলার নাটক সাজিয়েছে। আমাদের একটাই দাবি দোষীদের শাস্তি চাই। থানায় কম্বল পেচিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে বলে পুলিশ দাবি করছে। কিন্তু তার গলায় চিকন দাগ রয়েছে। তার মানে এটি পরিকল্পিত হত্যা। তিনি বলেন, ঘটনার দিন ডিউটি শেষ করে আমাদের সঙ্গে দেখা করে বাসায় ফিরছিলো তারপরই শুনলাম সে মারা গেছে। জামাল শেখ নামের এক আন্দোলনকারী বলেন, সরকারি কর্মচারিদের গ্রেপ্তার করতে অনুমতি লাগে। পুলিশ কেন তা নিল না? আর আমরা জানি থানা হাজতে ফাঁসি দেবার মতো কোন অবস্থা থাকে না। ফিরোজা বেগম বলেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের জন্য আবু বকর চিঠি পেয়েছিলেন। শেওড়া পাড়ার একটি সেন্টারে তার ডিউটি করার কথা ছিল।

আবু বকরের সহকর্মী হিমাদ্রী বড়ুয়া বলেন, একজন সরকারি কর্মচারী থানা হাজতে মারা গেল। পুলিশের ভাষ্য সে আত্মত্যা করেছে। কিন্তু থানা হাজতে সে কীভাবে আত্মহত্যা করলো সেটাই আমাদের প্রশ্ন। আত্মহত্যা না বলে কেন হত্যা বলছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তার শরীরের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। আর তার মনোবলের দিকে চিন্তা করলে সে আত্মহত্যা করার মত ছেলে না। রোকসানা আক্তার মায়া নামের এক নারীর অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে ধরে নেয়া হয়েছিলো। মাহমুদুল আজিজ নামের আরেক সহকর্মী বলেন, পুলিশ বলেছে থানা হাজতেই সে মারা গেছে। সেজন্য আমরা ধরে নিয়েছি পুলিশই তাকে পিটিয়ে মেরেছে। আমরা এমন মৃত্যু কামনা করি না। হাজতের ভেতরে এমন কিছু নেই যেখানে সে ঝুলে মরতে পারে। সাইদুল ইসলাম বলেন, একটা সুস্থ মানুষকে মোটরসাইকেল থেকে গ্রেপ্তার করে থানায় নেয়ার পর সেখানে কীভাবে তার মৃত্যু হলো। থানা হাজতেতো তার নিরাপদে থাকার কথা। এ মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। জুনিয়র ক্যামেরা সহকারী মোতালেব হোসেন বলেন, ‘আমরা তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ওসির বিচার চাই। কেন এমন ঘটলো, আমরা তা জানতে চাই।’

সহকর্মীদের তথ্যমতে, নোয়াখালীর সেনবাগের নুরুল ইসলামের ছেলে ৪৫ বছর বয়সী আবু বকর সিদ্দিক বাংলাদেশ চলচিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের ফ্লোর ইনচার্জ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। শনিবার সন্ধ্যায় অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে সাতরাস্তা এলাকা থেকে পুলিশ তাকে আটক করে নিয়ে যায়। থানা হাজতে তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে থানা পুলিশের দাবি।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর