× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবর
ঢাকা, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, শুক্রবার

দাম বাড়ার প্রতিযোগিতায় পিষ্ট সাধারণ মানুষ

শেষের পাতা

অর্থনৈতিক রিপোর্টার | ২৫ জানুয়ারি ২০২০, শনিবার, ৯:১৫

দেশে আয় যেভাবে বাড়ছে, তার চেয়ে বেশি বাড়ছে ব্যয়। এর মধ্যে সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম লাগামহীন। ফলে দাম বাড়ার বাড়তি প্রতিযোগিতার চাপে পিষ্ট সাধারণ মানুষ। জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে নাভিশ্বাস অবস্থা। একইভাবে বাড়ি ভাড়া, জ্বালানি ব্যয় 
বেড়েছে। সন্তানের লেখাপড়ার খরচ ও চিকিৎসা ব্যয়ও বেড়েছে। কিন্তু ব্যয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আয় বাড়ছে না। ফলে মানুষের জীবনযাত্রার মান কমছে।
অর্থনীতিবিদরা জানান, নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে লাগামহীনভাবে।
সাধারণ একটি সংসারে খাওয়ার জন্য দিনে যা লাগে, তার বেশির ভাগের দামই চড়া। কোনো পণ্যের দাম হঠাৎ কয়েকগুন বাড়ে। কিন্তু কমার সময় সামান্য কমে। এতে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। শ্রমজীবী মানুষের অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বলছে, শ্রমিকদের মজুরি হার বাড়ছে। অর্থাৎ যেহারে আয় বেড়েছে বাজারে জিনিসপত্রের দাম তার চেয়ে বেশি বেড়েছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, জিনিসপত্রের দাম কমার তেমন কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। বরং তা আরো বাড়তে পারে। কারণ বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে তা সরাসরি প্রভাব পড়বে নিত্যপণ্যের ওপর।

বাজার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মাস ছয়য়েক আগে বেড়েছিল সবজির দাম। বাজারে শীতের সবজি আসায় আস্তে আস্তে সেটা নেমে এসেছে মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে। বেড়েছিল পিয়াজের দাম। তেমন একটা না কমলেও স্থিতিশীল রয়েছে পিয়াজের বাজার। এখনো ১০০ টাকার উপরে পিয়াজের কেজি। এছাড়া কিছুদিন ধরেই দাম বেড়ে চলেছে তেল, চিনি ও ডালের। আর দাম কমার সম্ভাবনা নেই আদা-রসুনের। তবে এবার নতুন করে দাম বাড়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে চাল। যা দেশের মানুষের প্রধান খাদ্যপণ্য। মধ্যম আয়ের পরিবারে সবচেয়ে জনপ্রিয় মিনিকেট চালের দাম কেজিতে ৩-৪ টাকা বেড়েছে। ভালো মানের মোটা চালের দাম দুই টাকার মতো বেড়ে কেজি উঠেছে ৩৫ টাকায়।
অন্যদিকে চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও গ্যাস, নিত্যপণ্য, বাড়ি ভাড়া, যাতায়াত ব্যয় বেশি মাত্রায় বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সন্তানের লেখাপড়ার খরচ এবং পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার বাড়তি ব্যয়। এসব ব্যয় মেটাতে কমে যাচ্ছে সঞ্চয়। নিম্ন আয়ের মানুষ বড় কোনো অসুখ না হলে চিকিৎসা নিচ্ছে না।

এদিকে সরকারি-বেসরকারি সংস্থার জরিপে দেখা গেছে, এক বছরে মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বিপরীতে আয় বেড়েছে মাত্র ৪ থেকে ৬ শতাংশ। ফলে তাদের আয় ও ব্যয়ের মধ্যকার ব্যবধান বেড়েছে গড়ে ৬ শতাংশ।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জরিপ অনুযায়ী, ২০১৯ সালে পণ্য ও সেবা মূল্য বেড়েছে ৬.৫০ শতাংশ। বাড়ি ভাড়া বেড়েছে প্রায় ২২ শতাংশ। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, এক বছরে আটা ময়দার দাম বেড়েছে ৪.৪ শতাংশ, মাংসের দাম বেড়েছে ৩ শতাংশ, মুরগির দাম ৬ শতাংশ, মসলা জাতীয় পণ্যের দাম বেড়েছে ১০.২৩ শতাংশ। এককভাবে পিয়াজের দাম বেড়েছে ৭২ শতাংশ। এছাড়া সবজির দাম বেড়েছে ৮.১৩ শতাংশ। পোশাক জাতীয় পণ্যের দাম বেড়েছে ৮ শতাংশ। যদিও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বলছে, ডিসেম্বরে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৫.৭৫ শতাংশ, যা নভেম্বরে ছিল ৬.০৫ শতাংশ। এ সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে হয়েছে ৫.৮৮ শতাংশ, নভেম্বরে ছিল ৬.৪১ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৫.৫৫ শতাংশ, যা ডিসেম্বরে ছিল ৫.৪৭ শতাংশ।
বিবিএস ২০১৬ সালের খানা (একই রান্নায় খাওয়া এবং একসঙ্গে বসবাস) আয়-ব্যয় জরিপে উঠে এসেছে, খানাপ্রতি মাসিক আয় দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৯৪৫ টাকা, যা ২০১০ সালে ছিল ১১ হাজার ৩৫৩ টাকা। অর্থাৎ ৬ বছরের ব্যবধানে খানাপ্রতি মাসিক আয় বেড়েছে ৪ হাজার ৫৯২ টাকা বা ৪০ শতাংশ হারে।

অপরদিকে ২০১৬ সালের হিসাবে খানাপ্রতি মাসিক ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৯১৫ টাকা, যা ২০১০ সালে ছিল ১১ হাজার ২০০ টাকা। অর্থাৎ ৬ বছরের ব্যবধানে খানাপ্রতি ব্যয় বেড়েছে ৪ হাজার ৭১৫ টাকা। ব্যয় বৃদ্ধির এ হার ৪২ শতাংশ।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে পরিবার নিয়ে ভাড়ায় থাকেন রিকশাচালক মিরাজ। প্রতিদিন রিকশা চালিয়ে দিনে তার আয় হয় ৬০০-৭০০ টাকা। এ টাকা দিয়েই চলে পরিবারের চার সদস্যের ভরণ-পোষণসহ অন্যান্য খরচ।
মাসে টিন শেডের দুই রুমের ভাড়া ৮ হাজার টাকা। পরিবারের চার সদস্যের জন্য মাসে চাল লাগে দুই হাজার টাকার ওপরে। মাছ-মাংস বাদেই কাঁচাবাজারের পেছনে খরচ হয় আরো প্রায় ৩ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে সংসার চালাতে তার মাসে খরচ হয় ১৫ হাজার টাকার ওপরে। খরচের এই লাগাম টেনে স্কুল পড়ুয়া দুই সন্তানের চাহিদা খুব একটা পূরণ করতে পারেন না মিরাজ। সংসার ও ছেলে-মেয়ের খরচের ঘানি টানতে বেশিরভাগ দিনই দুপুরে না খেয়ে কাটিয়ে দেন তিনি।

মিপুরের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন আতিক। তিনি বলেন, যা বেতন পান, তা দিয়ে চলা কঠিন। তাই বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় খরচ কমানোর জন্য কম দামি পণ্য কেনা ছাড়া আর কোনো উপায় খুজে পাই না। শুধু মিরাজ ও আতিক নয়, রাজধানীতে বসবাস করা একটি বড় অংশেরই জীবনযাত্রার চিত্র এটি।

বাড়িভাড়া: অনেকের অভিযোগ, ঢাকায় বছরে দুইবার বাড়িভাড়া বাড়ে। বছরের শুরুতে অর্থাৎ জানুয়ারিতে একবার, আর জুনে নতুন বাজেট ঘোষণার পর আরেকবার। এক বছরে বাড়িভাড়া বেড়েছে ১২ শতাংশ। গত বছর যে বাড়ির ভাড়া ছিল ১০ হাজার টাকা। বর্তমানে ওই বাড়ির ভাড়া ১১ হাজার ২০০ টাকা হয়েছে।
বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল: বর্তমান কয়েক দফা বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া গ্যাসের দামও বাড়ানো হয়েছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে।

যাতায়াত ভাড়া: বারবার জ্বালানির দাম বাড়ানোর ফলে যানবাহনের ভাড়া বেড়ে যাচ্ছে। এক বছরে মানুষের যাতায়াত বাবদ ব্যয় ৮ শতাংশ বেড়েছে। যানবাহনের ভাড়া ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় মানুষের বিনোদন ও ভ্রমণ ব্যয়ও বেড়েছে।
লেখাপড়ার খরচ: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বেতন ও কোচিং সেন্টারের খরচসহ সন্তানের লেখাপড়ার খরচ বেড়েছে পাল্লা দিয়ে। লেখাপড়ার খরচের মধ্যে ভর্তি ফি এখন অনেক অভিভাবকের জন্যই বোঝা। একই সঙ্গে স্কুলের বেতন বেড়েছে ব্যাপক হারে। আগে যে স্কুলে বেতন ছিল তিন হাজার টাকা, এখন তা পাঁচ হাজার টাকা হয়েছে। নতুন ভতির্র ক্ষেত্রে ডোনেশনের নামে নেয়া হচ্ছে বাড়তি টাকা।
চিকিৎসা ব্যয়: এক বছর ধরে অব্যাহতভাবে বাড়ছে ওষুধের দাম। একই সঙ্গে চিকিৎসকের ফি, ল্যাবরেটরি টেস্টের খরচ বেড়েছে। ফলে এক বছরে চিকিৎসা ব্যয় ২০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এছাড়া মানুষের অন্য সব খাতে ব্যয় বেড়েছে ১৫ শতাংশ।

একটি পোশাক কারাখানার শ্রমিক অঞ্জনা বেগম থাকেন রামপুরার একটি টিন শেডের বাসায়। কারখানা থেকে মাসে বেতন পান ১২ হাজার টাকা। বাসা ভাড়া দিতে হয় ৫ হাজার টাকা। বাকি টাকা দিয়ে নিজের খাওয়া ও অন্যান্য খরচ মিটিয়ে গ্রামের বাড়িতেও প্রতি মাসে কিছু টাকা পাঠাতে হয় তাকে।
চালের দাম: সরকারি প্রতিষ্ঠান টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, এক মাস আগের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ বেড়ে বর্তমানে এক কেজি সরু চালের দাম দাঁড়িয়েছে ৫০-৬০ টাকা। মোটা চালের দামও মাসের ব্যবধানে বেড়েছে প্রায় ৫ শতাংশ। বর্তমানে প্রতিকেজি মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৩৩-৩৫ টাকায়।

পাশাপাশি আটা, তেল, ডাল, চিনিসহ সব ধরনের নিত্য পণ্যের দাম বেড়েছে। মাসের ব্যবধানে আটার দাম কেজিতে ১৩ শতাংশ বেড়ে ২৬-৪৫ টাকায় উঠেছে। খোলা সয়াবিন তেলের দাম প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ বেড়ে প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ৯০-৯৫ টাকা। মসুর ডালের দাম প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশ বেড়ে প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ৬৫-১৩০ টাকায়। এক কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ৬৬ টাকা।
এদিকে ১০০ টাকার নিচে মিলছে না দেশি নতুন পিয়াজের কেজি। আমদানি পিয়াজের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৬০-৮০ টাকা। টিসিবির হিসাবে, বছরের ব্যবধানে দেশি পিয়াজের দাম ৩১১ শতাংশ এবং আমদানি করা পিয়াজের দাম ২১১ শতাংশ বেড়েছে। রসুনের দাম বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ৮৭ শতাংশ। আদার কেজি বিক্রি হচ্ছে ১১০-১৫০ টাকা। বছরের ব্যবধানে এ পণ্যটির দাম বেড়েছে ১৮ শতাংশ। জিরার দাম বছরের ব্যবধানে ৪ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৩৫-৪৫০ টাকা কেজি। আর এলাচের দাম বছরের ব্যবধানে দ্বিগুণ বেড়ে ৫ হাজার টাকা কেজি হয়েছে।

শিম, টমেটো, গাজর, ফুলকপি, বাঁধাকপি, শালগমসহ শীতের সবজি বাজারে ভরপুর থাকলেও বেশিরভাগ সবজির দাম এখনো শসা ৪০-৬০ টাকা, পেঁপে ৪০-৬০ টাকা, করলা ৫০-৭০ টাকা, দেশি পাকা টমেটো ৪০-৬০ টাকা, শিম ৪০-৫০ টাকা, গাজর ৪০-৫০ টাকা, মুলা ২০-২৫ টাকা, নতুন গোল আলু ২৫-৩০ টাকা, শালগম ৩০-৪০ টাকা, বেগুন ৪০-৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। শীতের অন্যতম সবজি ফুলকপি ও বাধাকপি বিক্রি হচ্ছে ৩০-৩৫ টাকা প্রতি পিস।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
পাঠকের মতামত
**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।
Ziaul
২৫ জানুয়ারি ২০২০, শনিবার, ১০:৩১

very sad

মহিউদ্দিন
২৪ জানুয়ারি ২০২০, শুক্রবার, ৬:৪৫

বলার কিছুই নাই, সবই উন্নয়ন । মানুষ পিষ্ট হয়ে যাক তবে ক্রয় খমতা বাড়ছে , সরকারি সেবার মানের চেয়ে দাম বারছে, এটা কোন ব্যাপার না।

অন্যান্য খবর