× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকরোনা আপডেটকলকাতা কথকতাখোশ আমদেদ মাহে রমজান
ঢাকা, ২ জুলাই ২০২০, বৃহস্পতিবার

করোনায় পুলিশের ১৫ সদস্যের আত্মত্যাগ

এক্সক্লুসিভ

শুভ্র দেব | ৩১ মে ২০২০, রবিবার, ৭:৩০

অদৃশ্য এক পরাশক্তির বিরুদ্ধে চলছে লড়াই। কেবল বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশ্ব আজ প্রতিরোধ-যুদ্ধে ব্যতিব্যস্ত। প্রত্যেকেই নিজের মতো করে লড়ছে। চ্যালেঞ্জটা কমন। প্রতিরোধ কৌশল এবং টার্গেটও প্রায় অভিন্ন। যে করেই হোক প্রাণঘাতী কোভিড-১৯ এর বিস্তার রোধ। প্রাণপণ এই লড়াইয়ে সম্মুখ যোদ্ধা পুলিশের সদস্যরা। পুলিশই সবার আগে মাঠে নেমে ফ্রন্টলাইন ব্যাটেল তৈরি করেছে।
প্রথম থেকেই তারা  দেশ ও মানুষের স্বার্থে মাঠে নেমে কাজ করে যাচ্ছেন।
সামাজিক দুরত্ব নিশ্চিত থেকে শুরু করে করোনা আক্রান্তদের বাড়ি লকডাউন, ঘরবন্দি মানুষের বাড়ি বাড়ি ত্রাণ পৌঁছে দেয়া, আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, করোনা রোগীদের যাতায়াত এমনকি মৃত ব্যক্তির দাফন কাফনের ব্যবস্থা করছে পুলিশ। মৃত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরা  যেখানে ভয়ে দাফনে থাকেনি পুলিশ সদস্যরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে মরদেহ দাফন করছে। গতানুগতিক পুলিশিংয়ের বাইরে করোনাকালে তাদের তৎপরতায় গোটা পুলিশ বাহিনী বাহবা কুড়িয়েছে। জনগণ তাদের মানবিক পুলিশের খেতাবও দিয়েছে। করোনা যুদ্ধে এখন পর্যন্ত কনস্টেবল থেকে শুরু করে এসপিসহ বিভিন্ন পদমর্যাদার ৪৫৪৪ জন আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যুবরণ করেছেন ১৫ জন। উপসর্গ নিয়েও অনেকে মৃত্যুবরণ করেছেন। আর করোনার সঙ্গে লড়াই করে সুস্থ হয়েছেন ১৫৬৩ জন।  
করোনা আক্রান্ত হয়ে পুলিশে প্রথম প্রাণ হারান কনস্টেবল  মো. জসিম উদ্দিন (৪০)। তিনি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ওয়ারী বিভাগের একটি ফাঁড়িতে কমর্রত ছিলেন। করোনার উপসর্গ থাকায় ২৫শে এপ্রিল তাঁর নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য আইইডিসিআরে পাঠানো হয়। ২৮ শে এপ্রিল গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে তাৎক্ষণিক ঢাকা  মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানেই তার মৃত্যু হয়। মারা যাওয়ার পর তার টেস্টের করোনা পজেটিভ আসে। জসিম উদ্দিনের পর ২৯শে এপ্রিল করোনায় প্রাণ হারাণ  এএসআই মো. আবদুল খালেক (৩৬) এবং কনস্টেবল  মো. আশেক মাহমুদ (৪৩)। আবদুল খালেক ডিএমপির পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট দক্ষিণ বিভাগে কর্মরত ছিলেন। এছাড়া কনস্টেবল মো: আশেক মাহমুদ ডিএমপির ট্রাফিক উত্তর বিভাগে কর্মরত ছিলেন। করোনার উপসর্গ থাকায় আশেক মাহমুদ ২৬শে এপ্রিল করোনা পরীক্ষার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নমুনা দেন। পরের দিন তার করোনা পজিটিভ আসায় তাকে আইসোলেশনে রাখা হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে পুলিশ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। মে মাসের প্রথম দিনেই করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন স্পেশাল ব্রাঞ্চের এসআই নাজির উদ্দিন। ২৫শে এপ্রিল তার করোনা ধরা পড়ে।  চিকিৎসাধীন অবস্থায় পুলিশ হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পরদিন করোনায় মারা যান ডিএমপির পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট (পিওএম) পশ্চিম বিভাগের এসআই সুলতানুল আরেফিন (৪৪)। ৬ই মে মৃত্যুবরণ করেন ডিএমপির পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্টের (পিওএম) সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) রঘুনাথ রায় (৪৮)। ভাইরাস ধরা পড়ার পর তিনি পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে নেয়া হলে সেখানেই তার মৃত্যু হয়। সন্মুখযোদ্ধা হিসেবে প্রাণ হারান ডিএমপির ট্রাফিক পূর্ব বিভাগে কনস্টেবল জালাল উদ্দিন খোকা (৪৭)। ২৬শে এপ্রিল তার করোনা ধরা পড়ে। ৯ই মে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। ১৫ই মে করোনা যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক সদস্য  মো: নঈমুল হক (৩৮)।
১৮ ই মে মৃত্যুবরণ করেছেন স্পেশাল বাঞ্চের এসআই মো: মজিবুর রহমান তালুকদার (৫৬)। করোনা ভাইরাস পজেটিভ হওয়ায় গত ১১ মে তাকে রাজধানীর ইমপালস হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে পুলিশ হাসপাতালের আইসিইউতে নেয়া হয়। সেখানে অবস্থার আরো অবনতি হলে তাকে লাইফ সাপোর্টে দেয়া হয়। লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায়ই তিনি মারা যান। মজিবুর রহমানের মৃত্যুর তিনদিন পর মারা যান কনস্টেবল মো. মোখলেছুর রহমান। তিনি চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অধীন সদর কোর্টে কর্মরত ছিলেন। একই দিন মৃত্যুবরণ করেন ডিএমপির পরিবহণ বিভাগের নায়েক আল মামুনুর রশিদ (৪৩)। ২৩শে মে করোনায় প্রাণ হারান রাজশাহী আরআরএফে কর্মরত এসআই মো: মোশাররফ হোসেন শেখ (৫৬)। পরেরদিন ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড ট্র্যান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের পরিদর্শক রাজু আহম্মেদও করোনায় না ফেরার দেশে চলে যান। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তিনি  পুলিশ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সেখানেই  শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। একই দিন মারা যান সিএমপির হালিশহর থানায় কনস্টেবল নেকবার হোসেন (৪২)। করোনার উপসর্গ নিয়ে তিনি চট্টগ্রাম  জেনারেল হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। পরে তার নমুনা সংগ্রহ করে করোনা পরীক্ষার জন্য পাঠালে পরবর্তীতে পজিটিভ রেজাল্ট আসে। সর্বশেষ ২৮ মে করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যান স্পেশাল ব্রাঞ্চের এসআই মো: রাসেল বিশ্বাস (৩৫)। নমুনা পরীক্ষায় ২৪ মে তার তার করোনা পজেটিভ ধরা পড়ে। এরপর থেকে তিনি পুলিশের ভাড়া করা  বেসরকারি ইমপালস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।  সেখানেই তিনি মারা যান।
পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক ও র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) মহাপরিচালক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন মানবজমিনকে বলেন, দেশের এই ক্রান্তি লগ্নে পুলিশ বাহিনী সেবার ব্রত নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। যারা প্রাণ দিয়েছেন আমরা তাদেরকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। পুলিশ কখনই দেশ ও জাতির প্রয়োজনে জীবন বাজি রাখতে কুন্ঠিত হয়নি। করোনকালে তারা সেটি আবারও প্রমাণ করলো। তিনি বলেন, পুলিশ মনোবল অটুট রেখে কাজ রেখে কাজ করে যাচ্ছে। অতীতে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে পুলিশ বিচলিত হয়নি। দৃঢ় মনোবল নিয়ে শতভাগ কাজ করেছে। এখন লড়ছে করোনার বিরুদ্ধে। যেসব সদস্য মারা গেছেন তাদের পরিবারের পাশে বাংলাদেশ পুলিশ সবসময় থাকবে।  
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারী মানবজমিনকে বলেন, দেশ মাটি ও মানুষের জন্য পুলিশের এই আত্মত্যাগ সত্যিই প্রশংসনীয়। দেশের স্বার্থে তাদের এই আত্মত্যাগের জন্য আমরা অবশ্যই মাথা নত করবো। শুধু পুলিশ নয় অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরাও আক্রান্ত হচ্ছেন। তিনি বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে সরকারের কিছু ভুল সিদ্ধান্ত আছে। যখন লকডাউন করার কথা তখন করা হয়নি। দেরীতে করার কারণে বিদেশ থেকে অনেকেই দেশে চলে আসছে। আবার তাদেরকে কোয়ারেন্টিনে রাখাও সম্ভব হয়নি। লকডাউনকে সাধারণ ছুটি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এজন্য মানুষ এটাকে ছুটি হিসাবে ভেবে নিয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করেছে। অথচ প্রতিবেশী দেশ নেপাল, ভুটান শ্রীলঙ্কা করোনা পরিস্থিতিকে খুব সুন্দরভাবে মোকাবিলা করেছে। তাই যারা সিদ্ধান্ত নেন তারা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এবং এর মাধ্যমেই পুলিশ সদস্যদের মৃত্যুবরণের স্বার্থকতা মহিমান্বিত করবে।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর