× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকরোনা আপডেটকলকাতা কথকতাখোশ আমদেদ মাহে রমজান
ঢাকা, ১১ জুলাই ২০২০, শনিবার

ঘুষের টাকার লেনদেনে আলোচনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়কের ৩ নেতা

শেষের পাতা

স্টাফ রিপোর্টার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে | ৩০ জুন ২০২০, মঙ্গলবার, ৮:২৩

ঘুষের টাকা লেনদেনে আলোচনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়ক ও জনপথ বিভাগের তিন শ্রমিক-কর্মচারী নেতা। তাদের দেয়া পাঁচ লাখ টাকাসহ ধরা পড়েছেন জেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের অডিটর কুতুব উদ্দিন। ৫৪ ধারায় জেলে পাঠানো হয় তাকে। সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এ কর্মকর্তাকে। ঘুষ প্রদানকারীদের একজন নজরুল ইসলাম স্বপন এ ব্যাপারে একটি অভিযোগ দেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানায়। ঘুষ দিতে যাওয়া অন্য দুইজন হুমায়ুন কবির ও আবদুল হাই সাক্ষী হন অভিযোগে। ওই অভিযোগে তাদের বিভাগের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন- ভাতার বিল পাসের জন্য কুতুব উদ্দিন ৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন বলে উল্লেখ করা হয়। বিষয়টি তারা গোয়েন্দা সংস্থাকেও অবহিত করেন।


জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা-এনএসআই’র জালে গত ২৫শে জুন ঘুষের ওই টাকাসহ হাতেনাতে ধরা পড়েন তারা ৪ জন। এরআগে ২৩শে জুনও তিন নেতা ৬ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে যান ট্রেজারি অফিসে। ঘুষের লেনদেনে অডিটর কুতুব উদ্দিন পুরোপুরি ফাঁসলেও সড়ক ও জনপথের কর্মচারী ও শ্রমিক সংগঠনের ওই তিন নেতা  অভিযোগকারী আর সাক্ষী হয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন। কার্য সহকারী হুমায়ুন কবির ও নজরুল ইসলাম স্বপন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। গার্ড আবদুল হাই শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়ক ও জনপথ বিভাগের শ্রমিক-কর্মচারীদের কাছে এ তিনজনই ‘রক্তচোষা’ নেতা হিসেবে পরিচিত। সাধারণ শ্রমিক-কর্মচারীদের কাছ থেকে পদে পদে টাকা আদায়, শোষণ করাই তাদের কাজ। অভিযোগ রয়েছে শ্রমিক- কর্মচারীদের যেকোনো কাজের জন্য টাকা দিতে হয় তাদেরকে। জোর করেও টাকা রেখে দেন তারা।

জেলায় কর্মরত ৬৩ জন মাস্টার রোল কর্মচারীর চাকরি নিয়মিতকরণ হলে বড় মওকা পেয়ে যান তিন নেতা। বকেয়া বেতন-ভাতা উত্তোলনে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে রাখার পরিকল্পনা করেন হুমায়ুন, নজরুল আর আবদুল হাই। ট্রেজারি অফিসে দেয়ার কথা বলে ১৮ পার্সেন্ট টাকা কেটে রাখা হবে বলে সিদ্ধান্ত দেন তারা। ধাপে ধাপে শ্রমিক- কর্মচারীদের বিল পাস করিয়ে এনে নিজেদের ভাগের টাকা কেটে রাখেন তারা। সূত্র জানায়, বিল পাস হওয়ার পর ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করে অফিসে আনার পর ওই নেতারা এবং হেডক্লার্ক ও হিসাবরক্ষক একত্রে বসে পার্সেন্টেজের টাকা কেটে রাখেন। টাকা না পাওয়া পর্যন্ত যেসব কর্মচারীর বিল পাস হয়েছে তাদের ছায়ার মতো ঘিরে রাখেন তারা। শুধু তাই নয়, এর বাইরে ওই তিন নেতা আম খাওয়ার কথা বলে প্রত্যেকের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা কেটে রাখেন। অসহায় শ্রমিক-কর্মচারীরা পদে পদে টাকা খুইয়ে চোখের জল ফেলতে ফেলতে ঘরে ফেরেন। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী জানান, তার সাড়ে ৪ লাখ টাকা বিলের মধ্যে তিনি পেয়েছেন ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকার মতো।  ট্রেজারি খরচ হিসেবে তার কাছ থেকে এই টাকা কেটে নেয়া হয় বলে জানান তিনি। আরেকজন কর্মচারী ৪ লাখ ৮ হাজার টাকার মধ্যে পেয়েছেন ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এভাবে সব কর্মচারীর কাছ থেকেই টাকা কেটে রাখেন তারা। এর আগে বিল তৈরির জন্যও প্রত্যেকের কাছ থেকে ৭/৮ হাজার টাকা আদায় করা হয়। চাকরি নিয়মিতকরণ হলে বদলির জন্যও অনেকের কাছ থেকে ৪০/৫০ হাজার টাকা আদায় করেন ওই নেতারা। কার্য সহকারী নজরুল ইসলাম ও হুমায়ুন কবির সড়ক মেরামত ও উন্নয়নের বিভিন্ন কাজে অনিয়মের সুযোগ দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা কামাই করছেন। গার্ড পদে থাকা আবদুল হাই কখনো নিজের দায়িত্ব পালন করেন না বলেই অফিস সূত্র জানায়। তার ডিউটি করেন আরেকজন। নজরুল ইসলাম স্বপনের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিকৃতির পাশে দাঁড়িয়ে উঠানো একটি ছবি দেখিয়ে কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। কিন্তু এখন সাধু সেজেছেন তারা। হিসাবরক্ষণ অফিসের চাপে পড়ে ঘুষ নিয়ে গেছেন- এমন গল্প তাদের মুখে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানার ২ নম্বর ফাঁড়ির ইনচার্জ সোহাগ রানা জানান, ওই ঘটনায় নজরুল ইসলাম স্বপন বাদী হয়ে আমাদের কাছে একটি অভিযোগ দেন। এতে সাক্ষী হয়েছেন হিসাবরক্ষণ অফিসে ঘুষ নিয়ে যাওয়া তার অন্য দুই সঙ্গী হুমায়ুন ও আবদুল হাই। বিষয়টি দুদকের এখতিয়ার হওয়ায় আমরা অভিযোগটি জিডি হিসেবে গ্রহণ করে সেটি দুদক বরাবর পাঠিয়ে দিয়েছি। এখন তারা এর তদন্ত করবেন।

ওদিকে ঘুষ কেলেঙ্কারিতে তোলপাড় চলছে হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে শুরু করে জেলা অ্যাকাউন্টস অফিস পর্যন্ত।  রোববার সাময়িক বরখাস্ত করা হয় ঘুষ গ্রহণকারী কর্মকর্তা অডিটর কুতুব উদ্দিনকে। একই সঙ্গে জেলা অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স অফিসের সুপার আবু ইউসুফ নূরুল্লাহ এবং জেলা অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স অফিসার মোহাম্মদ আলীকে ঢাকায় বদলির আদেশ পাঠানো হয়। উপ-হিসাব মহানিয়ন্ত্রক (প্রশাসন-১) খায়রুল বাশার মো. আশফাকুর রহমান স্বাক্ষরিত আদেশে আবু ইউসুফ নূরুল্লাহকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে এবং মোহাম্মদ আলীকে খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি তদন্তও শুরু হয়েছে। মহাহিসাব নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের ডেপুটি কন্ট্রোলার অব অ্যাকাউন্টস একেএম ওয়াহিদুজ্জামান এক সদস্য বিশিষ্ট এই তদন্ত কমিটির প্রধান। তিনি রোববার ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তদন্তে আসেন। জেলা প্রশাসক, সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ও অ্যাকাউন্টস অফিসের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন। এ ছাড়া কারাগারে গিয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তা এবং এনএসআই’র কর্মকর্তাদের সঙ্গেও কথা বলেন তিনি। আগামী ২ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। অন্যদিকে বিভিন্ন কাজের নামে জোরপূর্বক শ্রমিক-কর্মচারীদের কাছ থেকে টাকা আদায় এবং ঘুষ প্রদানে জড়িত তিন কর্মচারীর ব্যাপারে নীরব সড়ক ও জনপথ বিভাগ। তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়ার আলামত নেই। জেলা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পঙ্কজ ভৌমিক জানান, কর্মচারীরা তাদের চাকরি নিয়মিতকরণের জন্য ২০১৫ সালে মামলা করেন। এরপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালে তাদের চাকরি রেগুলার হয়। সে হিসাবে তারা বকেয়া বেতন-ভাতা প্রাপ্য হন। এখানে কর্মরত ৬৩ জনের জন্য ১ কোটি টাকার ওপরে বরাদ্দ আসলে তা পাস করাতে ট্রেজারি অফিস থেকে ঘুষের জন্য চাপ দেয়া হয় বলে কর্মচারী নেতারা আমাকে জানান। ১৬ জনের প্রাপ্য ৪৩ লাখ টাকা বিল পেতে ওইদিন ৫ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে গিয়েছিলেন তারা।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর