× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতা
ঢাকা, ১০ আগস্ট ২০২০, সোমবার

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবি এইচআরডব্লিউর

বিশ্বজমিন

মানবজমিন ডেস্ক | ২ জুলাই ২০২০, বৃহস্পতিবার, ১০:২৪

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) বলেছে অধিকারকর্মী, সাংবাদিক, সরকারের সমালোচক ও রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে ‘নির্যাতনমুলক’ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ব্যবহার করছে বাংলাদেশ। তাই মুক্ত মত প্রকাশের অধিকারকে সুরক্ষিত রাখতে অবিলম্বে এই আইনটি সংশোধন অথবা বাতিল করা উচিত। ১লা জুলাই নিউ ইয়র্ক থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে এ কথা বলেছে মানবাধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক এই সংগঠন। এর এশিয়া বিষয়ক পরিচালক ব্রাড এডামস বলেছেন, সরকার, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবারের সমালোচক মনে হলেই যেকাউকে খেয়ালখুশি মতো গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে আইনের শাসনের প্রতি অবজ্ঞা করছে বাংলাদেশ। কোভিড-১৯ এর বিস্তারের বিরুদ্ধে জেলখানায় যখন বন্দি কমিয়ে আনা উচিত, তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুধু মন্তব্য করার কারণে সেই জেলে আরো মানুষকে ঢোকানো হচ্ছে। ২৮শে জুন সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলের জামিন আবেদন আবারও প্রত্যাখ্যান করে তাকে ২ দিনের রিমান্ড দেয়া হয়, যাতে তার বিরুদ্ধে আনীত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে করা তিনটি মামলার একটিতে তথ্য পাওয়ার জন্য জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে কর্তৃপক্ষ।
এইচআরডব্লিউ আরো বলেছে, তদন্তের জন্য আসামীকে রিমান্ডে নেয়া হয়।
কিন্তু সেই রিমান্ডে লোকজনের ওপর নির্যাতনের প্রামাণ্য তথ্য আছে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে বাংলাদেশ হাইকোর্টের নির্দেশনা আছে। সে অনুযায়ী, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে জেলখানার ভিতরে কাচের দেয়ালে তৈরি একটি কক্ষে, যেখানে তার আইনজীবী এবং আত্মীয়রা পর্যবেক্ষণে আশপাশে থাকতে পারেন। কিন্তু এই নির্দেশনা পালন করা, এমনকি কখনো পালন করার বিষয় বিরল।
সাংবাদিক কাজলকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে অভিযুক্ত করার আগে ৫৩ দিন জোরপূর্বকভাবে গুম করা হয়েছিল। তারপর তাকে ফৌজদারি দন্ডবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করা হয়। এটা হলো নির্যাতনের একটি বড় ফাঁকফোকর। কারণ, এর অধীনে কোনো ওয়ারেন্ট ছাড়াই যেকাউকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারে এবং তাকে কোনো আইনজীবীর সহায়তা ছাড়াই ১৫ দিন পর্যন্ত আটক রাখতে পারে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আরো বলেছে, প্রায় দুই মাস কাজলকে বিচার ছাড়াই আটক রাখা হয়েছে ৫৪ ধারার অধীনে, যা বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক আইনের বেঁধে দেয়া সীমারও অনেক বেশি।
আরেকটি ঘটনায় ২৪শে জুন কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর, অধিকারকর্মী মুস্তাক আহমেদ ও দিদারুল ভুইয়া, এবং ব্যবসায়ী মিনাজ মান্নান ইমনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আরো দু’দিনের জন্য রিমান্ড মঞ্জুর করেছে ভার্চুয়াল কোর্ট। ফেসবুকে গুজব ও মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগে এক মাসেরও বেশি সময় আগে তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে। তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, কারণ, তারা কোভিড-১৯ নিয়ে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের সমালোচনা করেছিলেন।
আন্তর্জাতিক আইন, এমনকি ওয়ার্ল্ড প্রিজন ব্রিফের অধীনে যে প্রতিশ্রুতি আছে বাংলাদেশের, তা ভঙ্গ করা হচ্ছে অনির্দিষ্ট সময় বিচারের আগে বন্দি রাখার ঘটনায়। বাংলাদেশে প্রায় ৯০ হাজার বন্দির মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগেরও বেশিকে আটক করা হয়েছে বিচারের আগে বা প্রিট্রায়াল ডিটেনশনে নেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে বিচারের আগে এভাবে আটক করা যেতে পারে বিশেষ কোনো ব্যতিক্রমে, সেটা আইনের শাসনের জন্য নয়। সেটা ব্যবহার করা যেতে পারে যতটা সম্ভব কম সময়ের জন্য এবং যদি প্রয়োজনীয় বিশেষ যৌক্তিক কারণ থাকে। যেমন ফ্লাইটে ঝুঁকি অথবা প্রত্যক্ষদর্শীর প্রতি হুমকি থাকা। এতে আরো বলা হয়, বাংলাদেশে বহু বন্দি তার সর্বোচ্চ শাস্তি হলে যে শাস্তি পেতেন তার চেয়ে বেশি সময় বিচারের জন্য অপেক্ষমাণ।
সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে সম্প্রতি যে গ্রেপ্তার ও অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্দি করা হচ্ছে, তাতে এটাই জোরালোভাবে ফুটিয়ে তোলে যে, ক্ষমতাসীন দল ও তার সমর্থকরা কোন পথে ব্যবহার করছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। এই আইনে মুক্ত মত প্রকাশের অধিকার ও সমালোচকদের কণ্ঠরোধের অস্পষ্ট এবং বিস্তৃত ব্যবস্থা রয়েছে।
ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রীর মানহানী করার অভিযোগে ২০শে জুন পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে ১৫ বছর বয়সী একটি বালককে। এ বিষয়ে স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের এক রাজনীতিক বলেছেন, ওই বালকটি আমাদের মায়ের মতো নেত্রীর সম্পর্কে খারাপ কথা বলেছে। এরপর ওই শিশুটিকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে। পুলিশ বলেছে, সেখানে সে ততটা সময় থাকবে, যতদিন সে তার ভুল বুঝতে না পারবে এবং চরিত্র সংশোধন করতে না পারবে।
ক্ষমতাসীন দল ও ধর্মীয় নেতাদের সমালোচনা করার কারণে ফেব্রুয়ারিতে কর্তৃপক্ষ গ্রেপ্তার করে একজন প্রকাশক নূর মোহাম্মদ এবং একজন সুফি গায়ক শরিয়ত সরকারকে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আরো লিখেছে, বহুল বিতর্কিত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের (আইসিটি) ৫৭ ধারার পরিবর্তে কার্যকর করা হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারের সমালোচনা করা কোনো পোস্ট, এমনকি তা লাইক বা শেয়ার করার কারণে বিপুল সংখ্যক মানুষকে খেয়ালখুশি মতো গ্রেপ্তারে ব্যবহার করা হয়েছিল আইসিটির অধীনে। কিন্তু নতুন আইনে আইসিটির সবচেয়ে জটিল ধারাগুলোর কিছু শুধু ফিরেই আসে নি, একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ বক্তব্যকে ক্রিমিনালাইজ করার জন্য অধিক ধারা যুক্ত হয়েছে।
সংবাদপত্র সম্পাদকদের সংগঠন বাংলাদেশ এডিটরস কাউন্সিল এই আইন নিয়ে সতর্কতা দিয়েছেন। তারা বলেছেন, ‘সংবিধানে স্বাধীনতা, মিডিয়ার স্বাধীনতা ও মুক্ত মত প্রকাশের যে স্বাধীনতা আছে, এই আইনটি তার বিরোধী’। এই আইনের অস্পষ্টতা ও ব্যাপক বিস্তৃত ধারা, যা নির্যাতনে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে, তা বাতিল করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ যে দাবি তুলেছে, তা চিন্তাভাবনা করা উচিত বাংলাদেশের। একই সঙ্গে কোভিড-১৯ এর এই সময়ে জেলখানায় বন্দির সংখ্যা যতটা সম্ভব কমিয়ে আনার সব রকম প্রচেষ্টা নেয়া উচিত সরকারের। এক্ষেত্রে যারা খুব বেশি ঝুঁকিপূর্ণ নয়, এবং অন্যদের ক্ষেত্রে দৃঢ় ঝুঁকির নয় তাদেরকে মুক্তি দেয়া যেতে পারে। গত ২৫ শে মার্চ জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার মিশেলে ব্যাচেলেট সরকারকে সতর্ক করেছেন এই বলে যে, যদি কোভিড-১৯ এর সময়ে জেলখানায় বন্দিদের বিষয়ে পদক্ষেপ না নেয়া হয়, তাহলে বিপর্যয়কর এক পরিণতি আসতে পারে। একই সঙ্গে তিনি তাদের প্রতি জেলখানায় বন্দিসংখ্যা দ্রুততার সঙ্গে কমিয়ে আনার আহ্বান জানান।
এইচআরডব্লিউ আরো বলেছে, এক বছরেরও কম মেয়াদে শাস্তি পাওয়া অথবা হালকা অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত এমন ৩ হাজারেরও কম বন্দিকে মুক্তি দিয়েছে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ। ১১ই মে ভার্চুয়াল কোর্ট সৃষ্টির পর থেকে আদালত জামিন দিয়েছে কমপক্ষে ৩৩ হাজার বন্দিকে। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের সমালোচনার জন্য আটক ব্যক্তিরা দৃশ্যত এসব বন্দিমুক্তির মধ্যে নেই। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, যদি বন্দিরা গুরুত্বর কোনো ঝুঁকি না হন, অন্যদের ক্ষেত্রে সুদৃঢ় ঝুঁকি না থাকে তাহলে এমন বন্দি, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে সহ আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দেয়ার ক্ষেত্র বিস্তৃত করা উচিত বাংলাদেশের। এর মধ্যে থাকতে হবে বিচারের আগে আটক সব বন্দিও।
ব্রাড এডামস বলেছেন, বৈশ্বিক মহামারির মধ্যেও কৃত্রিম অভিযোগের অধীনে অনিদিষ্টকালের জন্য মানুষকে বন্দি করে রেখে মানুষের জীবন নিয়ে আক্ষরিক অর্থেই খেলা করছে ক্ষমতাসীন দল। কোভিড-১৯ এর সময়ে সমালোচকদের জেলে পাঠানোর চেয়ে এই মহামারির সময়ে কর্তৃপক্ষের উচিত কাজলের মতো ব্যক্তিদের, খেয়ালখুশি মতো যাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যারা অন্যের প্রতি কোনো বিপদের কারণ নন, তাদেরকে মুক্তি দেয়া।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর