× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতা
ঢাকা, ৭ আগস্ট ২০২০, শুক্রবার

মুম্বইয়ে হিন্দুদের মৃতদেহ দাহ করছেন মুসলিমরা

বিশ্বজমিন

মানবজমিন ডেস্ক | ১২ জুলাই ২০২০, রবিবার, ১০:০৫

ডোমবিভালি ইস্টের বাসিন্দা প্রথমেশ ওয়ালাভালকার। করোনা ভাইরাস সংশ্লিষ্ট জটিলতায় তার ৫৭ বছর বয়সী পিতা মারা যান। মৃতদেহের সৎকারে তিনি প্রতিবেশীদের সহায়তা কামনা করলেন। পেলেন না। শতাধিক আত্মীয়ের কাছে অনুনয় করলেন। কেউ এগিয়ে এলো না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এগিয়ে এসেছেন মুসলিমরা। তারাই তার পিতার সৎকার সম্পন্ন করেছেন।
ইকবাল মাদানি ও তার স্বেচ্ছাসেবক গ্রুপ এই সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তারা এ পর্যন্ত হিন্দুদের আড়াইশ মৃতদেহের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। এ নিয়ে অনলাইন আরব নিউজে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
এতে প্রথমেশ ওয়ালাভালকারের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তিনি এমন একটি এলাকায় বসবাস করেন যেখানে প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের মধ্যে চমৎকার ভাল সম্পর্ক রয়েছে। এমন সম্পর্কের জন্য তিনি সব সময় গর্ববোধ করেন। ভারতের অর্থনীতির রাজধানী বলে পরিচিত মুম্বই থেকে তার বসতি প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার তিনি কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হন। তার পিতা মারা যাওয়ার পর কেউ এগিয়ে যান নি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য। প্রথমেশ ওয়ালাভালকার বলেন, কেউ আমার ডাকে সাড়া দেন নি। এমনকি আমার ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীরাও না। কারণ, বাবার করোনা ভাইরাস সংশ্লিষ্ট জটিলতা ছিল। এ ভয়ে কেউই আমাদের কাছে ঘেঁষতে রাজি হননি। কিন্তু এই সঙ্কটের সময় আমাদেরকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এসেছেন মুসলিম স্বেচ্ছাসেবক ভাইয়েরা।


একই রাতে ৫০ বছর বয়সী ইকবাল মাদানি ও তার স্বেচ্ছাসেবকরা আরো একটি পরিবারের মৃতদেহের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পাদন করেছেন। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলেন বয়সী হিন্দু সম্প্রদায়ের ৮০ বছর বয়সী এক নারী। তারা তার দাহ সম্পন্ন করেন।
স্থানীয় নাগরিক পরিষদ ঘোষণা করেছিল, কোভিড-১৯ এ যেসব রোগী মারা যাবেন, তাদের সবার মৃতদেহ নিকটবর্তী অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করার স্থানে ধর্মীয় পরিচয় যা-ই হোক, দাহ করা উচিত। এমন ঘোষণার পর মার্চের শেষের দিকে মুসলিমদের এই গ্রুপটি গঠন করা হয়। শহরের মালওয়ানি এলাকায় একজন মুসলিমের মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলার খবর প্রকাশ হওয়ার পর মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। তারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং ওই নির্দেশ রিভাইজ করাতে সম্মত হন।
ইকবাল মাদানি বলেছেন, তখন থেকেই মুম্বইয়ের বড় কবরস্তানের সদস্যরা মৃতের দাফন বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অন্য সম্প্রদায়ের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেছেন, আমরা বিভিন্ন হাসপাতাল ও লোকজনের কাছ থেকে ফোন পাই। তারা মৃতদেহ দাফন বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য আমাদের সহায়তা চান। তাই এই সঙ্কটের সময়ে আমরা তাদেরকে সহায়তা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কারণ, এখন শহরে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এতে এক বিশৃংখল অবস্থা ও পীড়ার সৃষ্টি হয়েছে। এখন পর্যন্ত আমার গ্রুপ মুসলিমদের ৪৫০টি মৃতদেহ দাফন করেছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের কমপক্ষে আড়াইশ মৃতদেহ দাহ করেছে। তিনি বলেছেন, বড় কবরস্তানের তদারকির দায়িত্বে আছে জামা মসজিদ ট্রাস্ট। তাদের সহযোগিতা ছাড়া এই কাজ অসম্ভব ছিল। তিনি আরো বলেন, আমাদের অনুরোধের প্রেক্ষিতে সরকার মৃতদেহকে সাতটি কবরস্থানে দাফন করার অনুমতি দিয়েছে।


তা সত্ত্বেও একটি সমস্যা রয়ে গেছে।
মাদানি বলেন, হাসপাতাল থেকে মৃতদেহগুলো নিতে বা তার শেষ আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার জন্য কেউই এগিয়ে আসেন না। এমন অবস্থায় সাতজন মুসলিম স্বেচ্ছাসেবক দ্রুত আমাকে সাহায্য করার প্রস্তাব দেন। এক্ষেত্রে আমাদের প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল এম্বুলেন্সের সঙ্কট। কারণ, করোনার কারণে পর্যাপ্ত এম্বুলেন্স নেই। তাই শুরুতেই আমরা বেসরকারি এম্বুলেন্স ভাড়া করার চেষ্টা করি। কিন্তু এক্ষেত্রে করোনায় মারা যাওয়া দেহ বহন করতে এর মালিকরা ভাড়া দিতে রাজি হন নি। ফলে আমাদের হাতে তখন আর কোনো বিকল্প ছিল না। তাই আমরা আমাদের জমানো সম্পদ ব্যবহার করে পরিত্যক্ত এম্বুলেন্স কিনি। শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে এ রকম ১০টি এম্বুলেন্স সংগ্রহ করি আমরা। মেকানিক্স এবং অন্যান্য রিসোর্স ব্যবহার করে আট দিনের মধ্যে আমরা রাস্তায় এম্বুলেন্স নামাতে সক্ষম হই।
স্বেচ্ছাসেবকরা যখন হাসপাতাল থেকে মুসলিমদের মৃতদেহ সংগ্রহ করে তা দাফন করা শুরু করলেন তখন তারা দেখলেন, বেশ কিছু হিন্দুর মৃতদেহ বেওয়ারিশের মতো পড়ে আছে। কারণ, তাদের আত্মীয়রা করোনার ভয়ে ওইসব মৃতদেহ দাহ করতে এগিয়ে যান নি। এ অবস্থায় তাদের দাহ করতে এগিয়ে যান মাদানিরা।
এই গ্রুপের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। মুম্বইয়ের কুপার হাসপাতালের ড. সুলভা সাদাফুলে বলেছেন, মুসলিম স্বেচ্ছাসেবকরা প্রকৃতপক্ষেই এক মহৎ সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছেন। মুম্বইয়ে যখন পুরোপুরি এক বিশৃংখল এবং পীড়া কাজ করছে, তখন তারা এই কাজ শুরু করেছেন।
ভারতে কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়েছেন ৮ লাখ ২০ হাজার মানুষ। এর মধ্যে এক লাখ মুম্বইতে। এখানে প্রায় ৫৫০০ মানুষ মারা গিয়েছেন। দেশজুড়ে মৃতের সংখ্যা প্রায় ২২,৫০০। ড. সুলভা সাদাফুলে বলেছেন, এম্বুলেন্স এবং স্টাফের অভাবে মর্গগুলোতে উপচে পড়ছে মৃতদেহ। যখন হাসপাতালে স্টাফ এবং স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্কট তখন তারাই আমাদেরকে সাহায্য করছেন।
মাদানি বলেছেন, তাদের এই কাজের নেপথ্যে অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই। তিনি বলেন, আমরা ধর্মের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্যে বিশ্বাস করি না। এই বিশ্বাস থেকেই আমরা আমাদের কাজ শুরু করেছি।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর