× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতা
ঢাকা, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, শনিবার

ছিনতাইকারী থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী সিলেটের মিনহাজ

দেশ বিদেশ

ওয়েছ খছরু, সিলেট থেকে | ২৭ জুলাই ২০২০, সোমবার, ৮:৫৯

সুরমার দু’তীরে অপরাধ রাজ্য গড়ে তুলেছিল সিলেটের শীর্ষ সন্ত্রাসী মিনহাজ ইসলাম। চিহ্নিত ছিনতাইকারী হিসেবে কোতোয়ালি থানায় অপরাধীর তালিকায় তার ছবি ও নাম টানানো ছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও চোখ ছিল তার দিকে। এরপরও চোখের সামনেই সে অপরাধ রাজ্য গড়ে তোলে। তার ভয়ে তটস্থ ছিলেন সিলেট নগরীর পশ্চিম শেখঘাট ও দক্ষিণ সুরমার খালোপাড়ের মানুষ। প্রতিবাদ করলেই অস্ত্র নিয়ে তাড়া করতো। হুমকির পর হুমকি দিয়ে নিকটজনকেও দমিয়ে রাখতো। সিলেটের অপরাধ জগতের মূর্তিমান আতঙ্ক সেই মিনহাজুল ইসলাম আবারো গ্রেপ্তার হয়েছে।
দুটি আগ্নেয়াস্ত্র সহ সিলেটের র‌্যাব সদস্যরা তাকে পাকড়াও করেন। মিনহাজুল ইসলামের মূল বাড়ি সুরমার দক্ষিণ তীরের খালোপাড়ে। দীর্ঘদিন ধরে তাদের বাস সিলেট নগরীর পশ্চিম শেখঘাটের উত্তরণ আবাসিক এলাকায়। তার পিতা আমিরুল ইসলাম। সিলেট মহানগর পুলিশের তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারী সে। সুরমার তীরের এক পাশে শেখঘাট ও অপরপাশে খালোপাড়। দুই এলাকায়ই তাদের বাড়ি রয়েছে। কয়েক বছর ধরে মিনহাজ শেখঘাট ও খালোপাড় এলাকায় তার আস্তানা গড়ে তুলেছে। এই আস্তানা হয়েছে দুটি বাসাকেন্দ্রিক। এরপর সে সিলেট নগরীর ছিনতাইকারী হিসেবে পরিচিতি পায়। এক সময় ছাত্রদলের সঙ্গে জড়িত থাকলেও পরবর্তীতে অপরাধ কর্মকাণ্ডের কারণে তাকে রাজনীতিতে ঠাঁই দেয়া হয়নি। এক যুগ আগের কথা। মিনহাজ যখন ছাত্রদল কর্মী ছিল তখন সে সহযোগীদের নিয়ে একটি ছিনতাই গ্রুপ গড়ে তুলেছিলো। পশ্চিম শেখঘাট, নবাব রোড, সুরমার তীরের কাজিরবাজার রুট, বাগবাড়ি এলাকায় সে কয়েকটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটায়। তার এবং তার গ্রুপের ছিনতাইয়ের কারণে আতঙ্ক শুরু হয়েছিলো সিলেটে। পরে অবশ্য তাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। এরপর থেকে প্রায় প্রতি বছর ছিনতাই সহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হতে হয়েছে মিনহাজকে। তবে গ্রেপ্তার হলেও তার কারাবাস বেশি দীর্ঘ হয়নি। খুব সহজেই সে জামিনে বেরিয়ে আসে। এবং জেলা থেকে ফেরত এসেই দ্বিগুণ গতি নিয়ে অপরাধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায়। এভাবে ছিনতাই কর্মকাণ্ড থেকে শুরু করে অপরাধ জগতে পা বাড়ায় মিনহাজ। এক সময় নগরীর শেখঘাট এলাকায় হেরোইন ও ফেনসিডিলের হাট বসিয়েছিলো মিনহাজ। সে নিজেও ফেনসিডিল ও হেরোইন সেবন করতো। শেখঘাটের নদী তীরবর্তী এলাকায় সে তার সহযোগীদের নিয়ে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি করতো। এলাকার অনেক যুবকই তার গ্রুপে ঢুকে মাদকাসক্ত হয়। দু’একজনকে মাদক নিরাময় সেন্টারে পাঠাতে হয়েছিলো। মিনহাজের বেলায়ও ঘটেছিলো এমন ঘটনা। মাদকের মধ্যে নিজেই ডুবে থাকতো সে। এ কারণে তাকে নিয়ে তার পরিবারও ছিল দুশ্চিন্তায়। গত তিন বছর ধরে বেপরোয়া মিনহাজ। ছিনতাইকারী থেকে সে ধীরে ধীরে শীর্ষ সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। করোনাকালীন সময়ে গত ৫ মাস তাকে নিয়ে রীতিমতো অস্থির হয়ে পড়েছিলেন নগরের শেখঘাট ও দক্ষিণ সুরমার খালোপাড়ের মানুষ। যাকে তাকে অস্ত্র নিয়ে তাড়া, নিকটজনকে হুমকি, প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি ও অসামাজিক কাজ চালাতো নির্বিঘ্নে। তার অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল স্থানীয় ফাঁড়ির কিছু পুলিশ সদস্য। তারা নিয়মিতই তার কাছ থেকে টাকা নিতো এবং নির্বিঘ্নে কাজ করার সুযোগ দিতো। ফলে এলাকার অনেকেই তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতেন না। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, পশ্চিম শেখঘাটের ডাকবাংলোর পাশেই তাদের বাসা। বাসার সামনেই বালু ও পাথরের ব্যবসার জন্য মিনহাজ একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলেছে। কিন্তু নামেই সেটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। তার আড়ালে মিনহাজ ছিল ইয়াবার ডিলার। ওই এলাকার অর্ধশতাধিক কিশোরকে নিয়ে সে একটি ‘গ্যাং গ্রুপ’ তৈরি করেছে। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত ওই কিশোরদের নিয়ে সে আড্ডা দিতো। পাশাপাশি কয়েকজনকে দিয়ে শেখঘাট কাজিরবাজার ব্রিজ, ঘাষিটুলা, কলাপাড়া এলাকায় ইয়াবা বিক্রি করাতো। এ ছাড়া, তার গ্রুপের অনেক কিশোরকে সে ইতিমধ্যে ইয়াবা আসক্ত করে তুলেছে। এলাকার লোকজন জানান, পশ্চিম শেখঘাটে মিনহাজের ইয়াবা হাটের অন্যতম সহযোগী হচ্ছে আব্দুল্লাহ ও ইংলিশ নামের দুই ব্যক্তি। তারাও ওই এলাকার বাসিন্দা।
আব্দুল্লাহ ও ইংলিশ নগরীর নবাব রোড এলাকায় ইয়াবা বিক্রি করে। নগরীর বিভিন্ন স্থান থেকে ইয়াবার খুচরা বিক্রেতারা গিয়ে তাদের কাছ থেকে ইয়াবা নিয়ে আসে। এক মহিলাও রয়েছে তার গ্রুপের সদস্য। ওই মহিলা পার্শ্ববর্তী ওসমানী মেডিকেল এলাকায় ইয়াবা বিক্রি করে। পশ্চিম শেখঘাটের অনেক মানুষই জানেন মিনহাজের ইয়াবা বিক্রির ঘটনা। কিন্তু ভয়ে কেউ মুখ খুলেন না। কারণ, যারাই প্রতিবাদ করেছে তাদেরকে সে অস্ত্র নিয়ে ধাওয়া করেছে। মিনহাজের ফুপাতো ভাই খালেদ ও জুনেদ। তারা প্রায় সময়ই মিনহাজের এসব অপকর্মের প্রতিবাদ করতেন। এ কারণে তাদের সঙ্গে তার বনিবনা হতো না। কয়েক দিন আগে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে মিনহাজ ও তার সহযোগীরা প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে ফুপাতো বড় ভাই খালেদ ও জুনেদকে ধাওয়া করেছে। এ নিয়ে এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। পশ্চিম শেখঘাটে রয়েছে একটি মুখবধির স্কুল (বোবা স্কুল)। এই স্কুলের একটি ভবনের নির্মাণ কাজ চলছে। ওই ঠিকাদারের কাছে চাঁদা দাবি করে মিনহাজ। চাঁদা না দিলে প্রাণনাশেরও হুমকি দেয়। এ নিয়ে ঠিকাদার স্থানীয় কাউন্সিলর মো. সিকান্দর আলীর কাছে বিচারপ্রার্থী হয়েছিলেন। কাউন্সিলর মিনহাজের বিচারের বিষয়টি আমলে নেননি। ঠিকাদারকে পরিবারের কাছে বিচার দেয়ার অনুরোধ করেন। পরিবারের কাছে বলেও কোনো কাজ হয়নি। বাধ্য হয়ে চাঁদা দিয়েই ওই ঠিকাদারকে কাজ করতে হচ্ছে। স্থানীয় কাউন্সিলর জানান, প্রায় সময় মিনহাজের ব্যাপারে তার কাছে বিচার আসে। তিনি আগে বিচার করে দিতেন। পরিবারকে বার বার বলেছেন তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে। কিন্তু সে নিয়ন্ত্রিত হয়নি। এখন তো সে কন্ট্রোলের বাইরে চলে গেছে। কথা না শুনলে তো বিচার করা সম্ভব নয় বলে জানান কাউন্সিলর। সুরমার দক্ষিণ তীরে খালোপাড়। এই এলাকার মসজিদের সামনে মিনহাজের প্রধান আস্তানা। বিকাল পর্যন্ত সে শেখঘাটের দলবলকে নিয়ে থাকে ওখানে। আর সন্ধ্যা নামলেই নদী পাড়ি দিয়ে চলে যায় খালোপাড় এলাকায়। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, খালোপাড় এলাকায় অস্ত্র নিয়ে অনেকটা প্রকাশ্যেই থাকতো মিনহাজ। ওখানে তাদের পৈতৃক সম্পত্তিতে রয়েছে বাসা ও ভাড়াটিয়ারা। কয়েকটি রুম মিনহাজের দখলে থাকে। এসব রুমে তার লোকজন প্রকাশ্যেই ইয়াবা বিক্রি এবং সেবন করে। মিনহাজ তার খালোপাড়ের আস্তানায় ইয়াবা সেবনের জন্য ‘রঙ্গশালা’ গড়ে তুলেছিলেন। এসব রঙ্গশালায় রয়েছে নারীরাও। রাতভর সেখানে আমোদ-ফুর্তি হয়। স্থানীয় খালোপাড় মসজিদের কয়েকজন মুসল্লি জানান, বিকাল হলেই ৫০-৬০ যুবক জড়ো হয় মিনহাজের আস্তানায়। তারা আড্ডা দেয়, ইয়াবা সেবন করে। এমন দৃশ্য প্রতিদিনই মুসল্লিরা দেখছেন। যুবকরা খালোপাড় সহ কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দা। মিনহাজের পাল্লায় পড়ে তারা পেশাদার হেরোইনসেবী হয়ে গেছে। এখন আর তারা পিতা-মাতার কথা শোনে না। রাত হলেই দূর-দূরান্ত থেকে গাড়ি নিয়ে ছুটে আসে হরেক রকমের মানুষ। আসে সুন্দরী মহিলা। তারা মিনহাজের আস্তানায় ঢুকে ইয়াবা সেবন ও নাচগানে ব্যস্ত থাকে। মানুষ যখন ফজরের নামাজে মসজিদে আসে তখন ভাঙে তাদের রঙ্গশালার কর্মকাণ্ড। এতে করে মুসল্লিরাও বিব্রত হন। কয়েক বার কথা বললেও মিনহাজ উল্টো হুমকি দেয়। এসব ঘটনার প্রতিবাদী হলে তার চাচা জিয়াউলকে হুমকি দেয় মিনহাজ। এদিকে শনিবার র‌্যাবের পক্ষ থেকেই এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে মিনহাজকে গ্রেপ্তারের কথা জানানো হয়। র‌্যাব জানায়, মিনহাজ সিলেটের শীর্ষ সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ী। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শুক্রবার রাতে র‌্যাবের একটি দল নগরীর জিতু মিয়ার পয়েন্ট এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। এ সময় তার কাছ থেকে দুটি বিদেশি রিভলবার, ১৩ রাউন্ড গুলি, ১৭০ পিস ইয়াবা, ২০০ গ্রাম গাঁজা ও তিনটি দেশীয় অস্ত্র জব্দ করে। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক আইনে মামলা দায়েরের পর কোতোয়ালি থানা পুলিশের কাছে তাকে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন র‌্যাবের মিডিয়া অফিসার এএসপি ওবায়ইন।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর