× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতা
ঢাকা, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, রবিবার

আজমেরির জীবন বদলে দেয়া ২৭ ঘণ্টা

এক্সক্লুসিভ

কাজল ঘোষ | ৫ আগস্ট ২০২০, বুধবার, ৮:১৪

৯০তম দেশ ফিলিপাইন থেকে শুরু করেছি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ছেলে-মেয়েদের আমার ভ্রমণের গল্প শোনানো। যেন তরুণরা ভ্রমণের জন্য তাদের আত্মবিশ্বাস অনেক দৃঢ় করতে পারে। Travelling is the fun way to learn

কাজী আসমা আজমেরির জীবন বদলে দিয়েছিল দুটি ঘটনা। দুটি ঘটনাই ছিল বাংলাদেশি হওয়ায় বিদেশের মাটিতে লাঞ্ছনার শিকার। একবার ভিয়েতনামের হো চি মিন সিটিতে আর অন্যটি সাইপ্রাসে। ভিয়েতনামে তাকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছিল ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা। আটকে রেখেছিল ২৩ ঘণ্টা। অন্যদিকে সাইপ্রাসে ২৭ ঘণ্টা কারাগারে বন্দি ছিলেন।
কিন্তু কোনোকিছুই তার অদম্য ইচ্ছাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। এরপর তিনি পণ করেছিলেন আর যাই হোক নিজ দেশের সবুজ পাসপোর্ট নিয়েই লড়াইটি চালিয়ে যাবেন শেষ পর্যন্ত। একটি-দু’টি নয় ১১৫টি দেশ ইতিমধ্যে ভ্রমণ শেষ করছেন। এর পাশাপাশি কাজ করছেন দেশের পাসপোর্টের মান উন্নয়নেও। বিদেশের মাটিতে দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়তে চালাচ্ছেন প্রচারণা। আজমেরির ভ্রমণের আদ্যোপান্ত আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা শুনুন তার নিজ জবানিতেই।  

প্রশ্ন: নেপাল বেড়াতে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন দুনিয়া দেখবেন, সেখানকার কোনো ঘটনা আপনাকে এমন স্পার্ক করেছিল?
২০০৯ সালের ঘটনা। আমি প্রথম নেপাল বেড়াতে যাই। আমার মানসিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। অনেকটা ডাক্তারি পরামর্শেই হাওয়া বদলের জন্য নেপালে যাওয়া। ওখানে যাওয়ার পর কাঠমাণ্ডু থেকে এভারেস্ট দেখার এক ঘণ্টার একটি হেলিকপ্টার ট্যুর করি। হিমালয়ের বিশালতা ও সৌন্দর্য দেখে মনে মনে বলি, সত্যি কুয়োর ব্যাঙের মতো ছোট্ট একটি জায়গায় বসে রয়েছি বাংলাদেশে। আপনজনেরা মেয়ে বলে অবজ্ঞা করে। অনেক বিশাল সৌন্দর্য আর জ্ঞানের ভাণ্ডার নিয়ে পৃথিবী বসে রয়েছে। সে সময়ই তাকে দেখার ইচ্ছা প্রবলভাবে জাগে। হিমালয় দেখতে দেখতেই সিদ্ধান্ত নিই বাংলাদেশ থেকে বেরিয়ে পড়ার। বিশ্বটাকে ঘুরে দেখতে হবে। এভাবে ছোট জায়গায় নিজেকে বেঁধে রাখা মানে স্বাধীনতা নষ্ট করা।

প্রশ্ন: ভ্রমণে একেকজনের পছন্দের বিষয় একেক রকম, আপনার কোনো নির্দিষ্ট বিষয় আছে কি?
আমার প্রিয় বিষয় সেই দেশের মানুষ, তার কৃষ্টি-কালচার এবং ইতিহাস ও ঐতিহ্য। আর তার সঙ্গে নীল সমুদ্র আর উষ্ণ আবহাওয়া যদি থাকে তাহলে তো হৃদয় যেন আরো জুড়িয়ে যায়। যেমন প্রথমবার যখন ২০১০ সালে ক্রিসমাসের আগে প্যারিসে যাই শীতকালে, সাদা বরফে সমস্ত শরীর জমে শীতল হয়ে যায়। মনে হয় সেই হাড় কাঁপুনি শীতে তার সৌন্দর্যটা যেন অধরা রয়ে গেছে। এরপর আবার গত বছর গ্রীষ্মকালে গিয়েছিলাম প্যারিস। এবারেও তার সৌন্দর্য যেন সেই বর্ণনাতীত কবিদের তীর্থস্থান মনে হয়েছে।

প্রশ্ন: সবুজ পাসপোর্টে ভ্রমণ করতে গিয়ে কোথাও কোনো অপ্রীতিকর অবস্থায় পড়েছিলেন কিনা?
আমাকে অনেকেই প্রশ্ন করেন এত বছর নিউজিল্যান্ডে বসবাস করার পরও কেন বিদেশি পাসপোর্ট নেইনি। নিজের দেশকে ভালোবাসার প্রশ্নটিই মাথার মধ্যে ঘোরে। যদিও কথা থাকে, বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে খুব কম বাংলাদেশি আছেন যাদেরকে ভোগান্তি পোহাতে হয় না। বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে প্রথমবার যখন ২০১০ সালের ৯ই ফেব্রুয়ারি ভিয়েতনামের হো চি মিন সিটি বেড়াতে গিয়েছিলাম, সাড়ে ৬ ঘণ্টা ইমিগ্রেশন অফিসারদের জেরার মুখে পড়েছি। রিটার্ন টিকিট, হোটেল বুকিং না থাকায় অবৈধ অধিবাসী মনে করে ভিয়েতনাম ইমিগ্রেশন পুলিশ আমাকে ২৩ ঘণ্টা কারাগারে রেখেছে। মনে অনেক ক্ষোভ জন্মেছিল। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম সেই রাতে। মাথায় খালি একটি প্রশ্নই জেগেছিল, কেন এমন হচ্ছে?

তারপর একই বছর মে মাসে গিয়েছিলাম সাইপ্রাসে। যেখানে বাংলাদেশি পাসপোর্টে ভিসা ফ্রি ছিল। কিন্তু ভিসা ফ্রি থাকলেই তো বাংলাদেশিদের ঢুকতে দিবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আগেরবারের অভিজ্ঞতায় এবার হোটেল বুকিং, রিটার্ন টিকিট এবং ব্যাংকের স্টেটমেন্ট নিতে ভুল করিনি। কিন্তু সবকিছু থাকার পরও আমার শুধু সবুজ বাংলাদেশি পাসপোর্ট হওয়ায় সন্দেহবশত সাইপ্রাসে ঢুকতে দিলো না। সেই ২৭ ঘণ্টা আমার জীবনকে বদলে দেয়ার জন্য অনেক কিছু। ভুলবো না সেইদিনের কথা, যখন ইমিগ্রেশন অফিসার আমাকে গলা ধাক্কা দিয়ে জেলখানায় ঢুকিয়ে রাখে। লজ্জায় অপমানে আমি প্রতিজ্ঞা করি বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়েই বিশ্ব ভ্রমণ করবো। আমি দেখিয়ে দিতে চাই, বাংলাদেশিরা কর্মক্ষেত্রে যেমন বিদেশে যায়, তেমনি ভ্রমণও করে।

প্রশ্ন: ‘হু’ বলেছে করোনাকে সঙ্গী করেই আমাদের বাঁচতে হবে, সেক্ষেত্রে ট্রাভেলপ্রেমীরা কী ধরনের সংকটে পড়বে?
করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কার হলে এটা অনেকটাই মানুষের হাতের নাগালে চলে আসবে। আমরা লক্ষ্য করলে দেখতে পাব, এক সময় চিকেন পক্স, কলেরাও মহামারি আকারে পৃথিবীতে এসেছিল। কিন্তু মানুষ বেঁচে ছিল, কেউ কেউ দেশ পরিবর্তন করে ভ্রমণ করেছে। বিশ্বে ভ্রমণকারীদের যেসব দেশে এসব মহামারি বড় আকারে ধারণ করেছে ওইসব দেশগুলোকে বাদ দিয়ে ভ্রমণ পরিকল্পনা করতে হবে। আগের মুক্ত বিহঙ্গের মতো এখন আর আমরা ঘুরতে পারবো না বাস্তব কারণেই। এটা মেনে নিয়ে আমাদের ভ্রমণ পরিকল্পনায় কিছুটা শিথিলতা আনতে হবে। তবে করোনা-পরবর্তী পরিস্থিতি এক বছরের মধ্যেই পরিবর্তন হবে বলে আমি আশাবাদী।

প্রশ্ন: ভ্রমণ নিয়ে আপনার সমানের দিনে ভাবনা কি? কতদূর এগুতে চান?
বিশ্বের ২৪৭ দেশের সমস্ত জায়গায় বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে ভ্রমণ করতে চাই। আমি মনে করি, ভবিষ্যৎ শুরু হয় ‘আজ’কে দিয়ে, এখান থেকেই। আমি গত দুই বছর যাবত কাজ করছি ‘অবৈধভাবে বিদেশ ভ্রমণকে নিরুৎসাহিত করা’ এবং ‘বাংলাদেশি সবুজ পাসপোর্টে স্বল্প টাকায় ভ্রমণে উৎসাহিত করা’। আজকে যখন আমি কিংবা আমার দেশের একজন মানুষ সবুজ পাসপোর্ট নিয়ে ভ্রমণ করছেন তখন তিনি বা আমি বাংলাদেশের পাসপোর্টের মান উন্নয়নেই সহায়তা করছি। কারণ আমাদের পাসপোর্টের মান কিছু কিছু ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠী অবৈধ পথে, অবৈধভাবে ট্যুরিস্ট ভিসায় বিদেশে গিয়ে আমাদের বদনাম ছড়িয়েছে। এটাকে উন্নয়নের জন্য সকল বাংলাদেশি ভ্রমণকারীকে চেষ্টা করতে হবে। তবেই আমাদের পাসপোর্টের মানোন্নয়ন সম্ভব।

প্রশ্ন: একজন নারী ট্রাভেলার হিসেবে কোনো ধরনের বিড়ম্বনায় পড়েছেন কিনা?
একজন নারী ট্রাভেলার হিসেবে কখনোই কোনো বিড়ম্বনায় পড়িনি। খুবই ছোট কিছু ঘটনা আছে, যেমন মুম্বই আমি সস্তায় কোনো হোটেলে উঠতে পারছিলাম না, বাংলাদেশি নারী হওয়ায়। মরক্কো, দুবাই সন্ধ্যা/রাতের বেলা একা হাঁটলে ছেলেরা কিছুটা পিছু নেয়, হ্যাংলার মতো গায়ে পড়ে কথা বলতে চায়। এগুলো সাধারণত মুসলিম কান্ট্রিগুলোতে দেখা যায়। তবে ইজিপ্টে মেয়েদের জন্য আলাদা মেট্রো কম্পার্টমেন্ট ছিল- দেখেছি দশ বছর আগেই।

প্রশ্ন: নারীদের একা ভ্রমণে কি ধরনের সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার?
বাংলাদেশের অনেক নারীরা চাকরি-বাকরি করলেও অনেক ক্ষেত্রে নিজের সিদ্ধান্ত নিজেরা নিতে পারেন না। সেজন্য যারা একা বেড়াতে যেতে চান বা সলো নারী ট্রাভেলারদের কথা আমি বলবো ‘সলো’ ভ্রমণ একটি মাধ্যম। যেখান থেকে আপনি আপনার নিজের সিদ্ধান্ত কিংবা মতামত নিতে পারবেন, আপনার চলার পথে। একা চলার কনফিডেন্স পাবেন, শারীরিক কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি পাবে নিজের লাগেজ বহন করার মাধ্যমে। একা ভ্রমণে সময় জ্ঞান সম্পর্কে ধারণাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তারও চর্চা হবে সলো ট্রাভেল করলে। সবচেয়ে বড় বিষয় দেশের বাইরে ভ্রমণ করে আপনি স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারবেন। সেজন্য বাংলাদেশের প্রতিটি নারীর জীবনে একবার, অন্তত একবার একা ভ্রমণ করা উচিত।

প্রশ্ন: সাধারণ মানুষের ট্রাভেলের প্রয়োজনীয়তা কেন বলে আপনি মনে করেন? একজন সাধারণ বাংলাদেশি সহজে কীভাবে ভিসা পেতে পারেন?
 ট্রাভেলের মাধ্যমে মানুষ খুব সহজেই অনেক কিছু শিখতে পারে। ভ্রমণ মানুষকে উদার করে, সহজেই ইংরেজি ভাষা শিখতে সাহায্য করে, সময়জ্ঞান সম্পর্কে ধারণা দেয় এবং বহির্বিশ্বে কি ঘটছে তার সম্পর্কে সে স্বচক্ষে অবগত হতে পারে। একজন ভ্রমণকারী কয়েকটি দেশ ভ্রমণ করে প্রমাণ করেন যে তিনি একজন ট্রাভেলার। তখন তার জন্য খুব সহজেই অন্য দেশগুলোতে ভিসা পাওয়ার পথ উন্মুক্ত হয়।

প্রশ্ন: ভ্রমণের পাশাপাশি বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কার্যক্রমেও আপনি জড়িত আছেন।
ভ্রমণের সঙ্গে সঙ্গে ছোটবেলা থেকে সুযোগ পেলেই মানুষের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছি। টিনেজার অবস্থাতেই রোটারি ইন্টারন্যাশনাল, রেডক্রস ও সন্ধানী ডোনার ক্লাবের সদস্য। আমার বেড়ে ওঠা এমন একটি পরিবারে যেখানে আমার নানা দুপুরে খাওয়ার আগে ২০-৩০ জন দরিদ্র মানুষকে না খাইয়ে  খেতেন না। সেজন্য ছোটবেলা থেকেই দরিদ্র মানুষের প্রতি সহানুভূতি ও ভালোবাসা বিলিয়ে দিতে শিখেছি। আমার ৯০তম দেশ ফিলিপাইন থেকে শুরু করেছি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ছেলে-মেয়েদের আমার ভ্রমণের গল্প শোনানো। যেন তরুণরা ভ্রমণের জন্য তাদের আত্মবিশ্বাস অনেক দৃঢ় করতে পারে।

Travelling is the fun way to learn এই স্লোগান নিয়ে আজ পর্যন্ত দেশ-বিদেশে প্রায় ২৯ হাজার ছেলেমেয়েকে ইন্সপায়ার্ড করছি ‘এক্সপ্লোর দ্যা ওয়ার্ল্ড’ এই স্বপ্নে। ইচ্ছে আছে মুজিব জন্মশতবর্ষে ১ লাখ ছেলেমেয়ের সঙ্গে আমার ভ্রমণ অভিজ্ঞতা শেয়ার করবো। এছাড়াও বিদেশে যখন গিয়েছি সবচেয়ে বেশি খারাপ লেগেছে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বিষয়টি। যা সত্যিই ঘৃণ্যতম মধ্যযুগীয় ব্যাপার। এখনো পর্যন্ত আমাদের বাসার কাজের বুয়া, দারোয়ান, ড্রাইভার কিংবা রিকশাওয়ালার সঙ্গে আমরা অমানবিক ব্যবহার করে থাকি। এসব মেহনতী মানুষের অধিকার রক্ষায় সোশ্যাল অ্যাওয়ারনেস তৈরির চেষ্টা করছি। ‘আপনি যা খাচ্ছেন আপনার বাসার কাজের লোককে খেতে দিচ্ছেন তো?’ এই স্লোগান নিয়ে আমি আমার ১০১তম দেশ থেকে ১১৫তম দেশ পর্যন্ত ভ্রমণ করেছি। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কাছে পৌঁছে দিতে চাই মানবিক শিক্ষা, যাতে করে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ছেলেমেয়েরা বেড়ে উঠতে পারে উন্নয়নশীল চিন্তা-ভাবনা নিয়ে।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর