× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতা
ঢাকা, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, শুক্রবার

নিমতলী থেকে চক বাজার হয়ে বৈরুত: রাসায়নিক আগুন এবং আমাদের সাবধানতা

অনলাইন

ড. শেখ মাহাতাবউদ্দিন | ৫ আগস্ট ২০২০, বুধবার, ৭:২৪

গত ৪ঠা আগস্ট লেবাননের বৈরুতে এ্যামোনিয়াম নাইট্রেট (NH4NO3) এর গুদামের কাছাকাছি আগুন লাগার ফলে প্রায় ৩-৪ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকা ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। ২৭০০০ টন NH4NO3 নামক রাসায়নিক এর বিস্ফোরণের শব্দ এতটাই বিকট ছিল যে তা ২০০ কিলোমিটার দূরবর্তী সাইপ্রাস থেকেও শুনা যায়! NH4NO3 সাধারণত নিজ থেকে কোন ধরনের বিস্ফোরকের ভূমিকা নেয় না কিন্তু অন্যান্য কেমিক্যালের সঙ্গে যেমন এজ্যাইড জাতীয় যৌগের সঙ্গে মেশালে মিশ্রণটি বিস্ফোরক হিসেবে কাজ করতে পারে। এই NH4NO3 নাইট্রোজেন এর উৎস হিসেবে কৃষিজমিতে সার হিসেবে ব্যবহার যোগ্য, অথচ এই যৌগটিই সামান্য আগুনের সংস্পর্শে এসে বৈরুত শহর তথা পুরো লেবাননকে হুমকির মুখে ফেলে দিল! এমন একটি ঘটনা আমাদের ঢাকা শহরে ঘটলে কি সহ্য করার ক্ষমতা আমাদের আছে? অথবা এমন ঘটনা যেন না ঘটে সে জন্য আমরা কি কোন প্রস্তুতি নিতে পারি?

রাসায়নিক আগুন সম্পর্কে কি এই প্রথম আমরা জানতে পারলাম?
২০১০ সালের ৩রা জুন নিমতলি এবং ২০শে ফেব্রুয়ারি ২০১৯ এ চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডের কথা আমাদের সকলেরই জানা আছে। এই দুই অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের পরিমাণ দেখে আমরাও বাকরুদ্ধ ছিলাম, অনেক প্রতিশ্রুতি হয়েছিল পুরানো ঢাকার এই রাসায়নিক গুদামগুলো সরিয়ে নেয়ার জন্য। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়েছিল কি? প্রশ্ন থাকল পাঠকগণের উদ্দেশ্যে। আমার অভিজ্ঞতা যদি বলি তবে বলব, গত বছর মোহাম্মদপুরে একটি বাসা ভাড়া নেয়ার পরে জানতে পারি ঐ আবাসিক বাসার নীচতলা রাসায়নিক পদার্থের গুদাম হিসেবে ব্যবহার হয়! খোদ মোহাম্মদপুরেই যদি এমন হয় তবে পুরনো ঢাকার কি অবস্থা? আমারা যারা রসায়নবিদ তারা সকলেই জানি রাসায়নিক পদার্থের মধ্যে খুব কমই সেলফ এক্সপ্লোসিভ কিন্তু অনেক রাসায়নিক পদার্থ আছে যা নিজে বিস্ফোরক না হলেও সামান্য আগুনের সংস্পর্শে এলে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ক্ষমতা রাখে যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হল বৈরুত, চকবাজার এবং নিমতলি! অথচ আমাদের রাসায়নিক ব্যবসায়ীরা এই বিস্ফোরক বা বিস্ফোরক নয় এই দুই যুক্তি দিয়েই টনকে টন রাসায়নিক মজুদ করছেন আবাসিক এলাকার মধ্যে! খুব সহজ একটি উদাহরণ দেই, যেমন পলিমার তৈরির কাঁচামাল স্টাইরিন যা মিটফোর্ডে গেলেই আপনি দেখতে পাবেন এক ধরনের সাদা ব্যাগে করে বহন করা হচ্ছে হরহামেশাই অথবা স্তুপ করে রাখা আছে হয়ত কোন এক আবাসিক ভবনের বেজমেন্টে। যদিও এই রাসায়নিক নিজে বিস্ফোরক নয় কিন্তু আগুন ধরে গেলে এটিও হতে পারে NH4NO3 এর মত ভয়ংকর কোন বিস্ফোরক কিংবা আগুন জালিয়ে রাখার এক অনবদ্য জ্বালানি!

আমাদের রাসায়নিক এবং জৈবরাসায়নিক হ্যাজারড ম্যানেজমেন্ট কি কার্যকরঃ
আমেরিকা কিংবা জাপানে আমরা যারা কাজ করেছি তারা সকল ধরনের রাসায়নিক এবং জৈবরাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার ও ব্যবহারের পরে ফেলে দেয়া কিংবা নতুন ভাবে ব্যবহার উপযোগী করা যায় সে বিষয়ে প্রতি ৬ মাস পরে একটি করে ট্রেনিং করতে হত। এই ট্রেনিং শুধু আমাদের স্কলারদের জন্য নয়, যে কেউ যদি ঐ রাসায়নিক কিংবা জৈবরাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার, ট্রান্সফার বা অন্য ুেকান ভাবে ঐ পদার্থের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা থাকে তাদের জন্য এমন ট্রেনিং বাধ্যতামূলক।
তদুপুরি, প্রতিটি রাসায়নিক বা বায়োলজিক্যাল পদার্থের সঙ্গে এগুলোর ব্যবহার বিধি এবং ধর্ম সংক্রান্ত একটি বিবরণ থাকে যাকে এমএসডিএস (Material Safety Data Sheet-  MSDS) বলে। এই বিবরণে প্রতিটি বস্তুর ভৌত এবং রাসায়নিক ধর্মেন সঙ্গে সঙ্গে এই পদার্থটি কিভাবে মজুদ করতে হবে, এটির সংস্পর্শে এলে কি ক্ষতি হতে পারে কিংবা কিভাবে ক্ষতির পরিমাণ কমানো যাবে এই সকল ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয় বিশদ বর্ণনা দেয়া থাকে। এত বিশদ বিবরণ হাতের কাছে থাকা সত্ত্বেও আমরা কেন ৩রা জুন কিংবা ২০ শে ফেব্রুয়ারির মত ঘটনার সাক্ষী হব? রাসায়নিক আগুন কেন আমাদের বারে বারে আমাদের হৃদয়েক্ষত তৈরি করে দিয়ে যাবে? এই দুর্ঘটনাগুলোর পরেও কি আমাদের কোন সাবধানতা আছে বা এমন কোন কার্যকর পদক্ষেপ কি আমরা নিয়েছি? পুরনো ঢাকাতে যাদের যেতে হয় তারা সকলেই জানে উত্তর অনেকটাই না বোধক! কেন এই ঘটনাগুলো আমাদের সঠিক পথ বাতলে দিতে ব্যর্থ হচ্ছে? কারণ মোটা দাগে দুটি-

১। আমাদের রাসায়নিক কিংবা জৈবরাসায়নিক পদার্থ সম্পর্কে সীমিত জ্ঞান।
২। এ সকল ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সঠিক প্রশিক্ষণ এবং সুসংবদ্ধ জ্ঞানের অভাবে সুসংগঠিত অপারগতা।
প্রথমোক্ত বিষয়টি যদি একটি উদাহরণ দিয়ে বলি তবে আমার সেই প্রাক্তন বাড়ির মালিক চাচার একটি ঘটনা দিয়ে বলতে হবে, আমি রাসায়নিক গুদামের সম্পর্কে জানতে পেরে উনাকে জিজ্ঞেস করলাম, কাকা আপনার এই গুদামে কি কি রাসায়নিক আছে আপনি কি জানেন? উনি বললেন, “খারাপ কিছু নাই, খালি সিনথেটিক রঙ্গের কাঁচামাল!” আমি বললাম, লিস্টটা একটু কষ্ট করে আমাকে দিবেন। উনি দিতে পারলেন না! অর্থাৎ উনি জানেনই না ওখানে কি কাঁচামাল রাখা আছে? আর সিনথেটিক রঙের জন্য ব্যবহৃত রাসায়নিকের বেশিরভাগই দাহ্য পদার্থ, অর্থাৎ কোন কারণে বাড়িতে বা আশেপাশে কোথাও আগুন লাগলে এই বাড়ির গোডাউনই পুরো এলাকাকে আঙ্গারে পরিণত করতে যথেষ্ট হবে। প্রভাবক হিসেবে যুক্ত হবে আমাদের রাসায়নিক আগুন নেভানোর সীমিত সক্ষমতা! অর্থাৎ একটি আবাসিক এলাকার ভবনে এমন এক ভয়াবহ রাসায়নিকের গুদামের জন্য জায়গা বরাদ্ধ দেবার পূর্বে উনি একুটও ভেবে দেখেন নাই কিংবা কোন রসায়নবিদের সঙ্গে আলাপ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভবও করেন নাই।
শেষোক্ত কারণ সম্পর্কে যদি বলি, তবে নিমতলি এবং চকবাজারের ঘটনাই প্রমাণ করে আমাদের সম্মানিত ব্যবসায়ীগণ কতটা সচেতনতার সহিত এই সকল রাসায়নিক মজুদ এবং বাজারজাত করেন। কেউ যদি এই সকল পদার্থকে কেবল ব্যবসার পণ্য হিসেবে দেখেন তাহলে এমন করাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তদের যদি আমরা প্রতিটি রাসায়নিক পদার্থের ভৌত এবং রাসায়নিক ধর্মের সঙ্গে সঙ্গে এমএসডিএস এর সঠিক ব্যবহার ও এর নির্দেশনা মেনে চলতে শেখাই তাহলে নিজেদের পরিবার পরিজনের নিরাপত্তার কথা ভেবেই তারা সাবধান হবেন। একইসঙ্গে এই সকল দাহ্য এবং বিস্ফোরকধর্মী রাসায়নিকের সঠিক মজুদ পদ্ধতি ও ব্যবহারবিঁধি মেনে চলবেন।

আমাদের করণীয়ঃ
বাণিজ্য এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে দেশের যে সকল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকগণ রাসায়নিক, জৈবরাসায়নিক এবং বায়োলজিক্যাল হ্যাজার্ড সম্পর্কিত উচ্চ পর্যায়ের প্রশিক্ষণ ও ব্যবহারবিঁধি সংক্রান্ত বিষয়ে বিশেষজ্ঞ তাদের নিয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে করণীয় নির্ধারণ করা এখন সময়ের দাবি। নামসর্বস্ব নয়, গঠন করতে হবে কার্যকর এক কমিটি কিংবা সংস্থা। যারা শুধু গুগল সার্চ করে কিছু উপায় বাতলে নয় বরং নিজেদের প্রজ্ঞা, জ্ঞান এবং সরকারের প্রশাসনিক অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণ এবং জনগণকে এই বিষয়ে সচেতন করে তুলবে। এই সচেতনতাই হয়ত ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজেদের এবং নিজেদের অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ কল্পনা করত সরকার প্রদত্ত সকল নিয়মাবলী মেনে চলতে সহযোগিতা করবে। কারণ আইন জোর করে মানানোর চেয়ে আইনের সুবিধা বুঝিয়ে মানতে সাহায্য করাই উত্তম শাসন ব্যবস্থার এক উজ্জ্বল নিদর্শন। সুতরাং আসুন নিজেদের স্বার্থে এবং আরেকটি বৈরুত পৃথিবীবাসীদের উপহার না দিতে নিজেরা উদ্যোগী হয়ে নিজেদের প্রাণের শহর ঢাকা এবং চট্টগ্রামকে রক্ষা করতে সচেষ্ট হই। এমন কোন উদ্যোগে নিজেকে শামিল করার অপেক্ষাতে থাকব এবং চেষ্টা করব এই শহরকে আগামীর প্রজন্মের জন্য এক নির্মল ও রাসায়নিক বা বায়োলজিক্যাল হ্যাজার্ড এর হুমকিমুক্ত এক বাসস্থান হিসেবে উপহার দিতে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, পুষ্টি এবং খাদ্য প্রকৌশল বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর