× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতা
ঢাকা, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, শুক্রবার

বাঁধের জন্য সীমাহীন দুর্ভোগ

শেষের পাতা

পিয়াস সরকার ও সিদ্দিক আলম দয়াল, গাইবান্ধা থেকে | ৭ আগস্ট ২০২০, শুক্রবার, ৯:১২

কাঁচামাটির তৈরি বাঁধ। দারিদ্র্যপীড়িত ব্রহ্মপুত্র নদের কোলঘেঁষা বালাসীঘাট এলাকা। এই ছোট বাঁধের ধারে মাথাগোঁজার ঠাঁই করেছেন কয়েক হাজার মানুষ। দরিদ্র এই মানুষগুলোর বাড়িতে এখনো পানি। তবে, পানি নেমে গেলেও এখনো অধিকাংশ মানুষই যেতে পারছেন না ঘরে। অসহনীয় কষ্ট তাদের। করোনাকালের এবারের বন্যা হার মানিয়েছে পূর্বের বন্যাগুলোকে। ১ মাস ১৩ দিন ধরে পানিবন্দি তারা।


দেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকায় (৩৩ জেলা) আঘাত হেনেছে বন্যা। কিন্তু গাইবান্ধার এই এলাকার মানুষের বন্যা যেন প্রতিবছরের ক্যালেন্ডার রুটিন। ২০১৯ সালে বন্যার তোড়ে নিঃস্ব হয়েছেন আমিনুর রহমান। বলেন, সেবার হঠাৎ করে বাঁধ ভেঙে যায়। ভাসিয়ে নিয়ে যায় সব। স্রোত শেষে দেখি কিছুই নাই- সব ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। আর এবারের বন্যায় ভাসিয়ে নিয়ে না গেলেও ২০ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে পানি চলে আসায় কিছুই নিতে পারেনি কেউ।

তিনি আরো জানান, ২০১৯ সালের মতো সব ভাসিয়ে না নিলেও লাভ হয়নি খুব একটা। বন্যার পানি দীর্ঘদিন ঘরে থাকায় ব্যবহার্য্য জিনিসপত্র সব নষ্ট হয়েছে। আমিনুর কাজ করতেন রাজধানীর একটি রেস্টুরেন্টে। করোনার কারণে কাজ হারিয়ে বাড়িতে এসেই পড়েছেন বন্যার কবলে।

তার পক্ষে খাবারের জোগান দেয়াটাই যেখানে দুষ্কর, সেখানে পেটপুরো খাওয়াটা যেন স্বপ্ন। সুবর্ণা রানী জানান, তার শ্বশুর-শাশুড়িসহ ৫ জনের সংসার। আগে দিনে দুইবার রান্না হতো ১ কেজি করে চাল। প্রতিবেলা রান্না করেন আধা কেজি চাল। মাঝে মাঝে রান্না হয় দিনে একবার। এমন আরো প্রায় ১০ জনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের প্রত্যেকেরই খাবারের পরিমাণ কমে এসেছে গড়ে ৪০ শতাংশ।

কোরবানি ঈদের জন্য গরু পালন করছিলেন বালাসীঘাট এলাকার অনেক লোক। এই গরুগুলো নিয়েও বিপদে পড়েছেন অনেকে। আমেনা খাতুন নিজের ঘর বাঁধে তুললেও তার পালিত ৪টি গরুর ঘর করেছেন স্কুল মাঠে। গরুর সেবা করতে করতে জানান, এই গরুগুলো কোরবানি ঈদে বিক্রির জন্য পালছিলেন। কিন্তু বন্যার কারণে পাইকারি ক্রেতারা গরু নিয়ে যেতে পারেননি। গরুগুলো নিয়ে দুশ্চিন্তায় তিনি। তিনি বলেন, গরুগুলোর পেছনে খরচ করতে হয়েছে অনেক টাকা। আরো যদি একবছর গরুগুলো পালতে হয় তবে বিপদের মুখে পড়ে যাবেন তিনি। একেকটা গরুর পেছনে মাসে হাজার টাকা করে খরচ হয় তার। দ্রুতই চান গরুগুলো বিক্রি করতে। তবে কোরবানি ঈদ ছাড়া বিক্রি করতে দাম নিয়ে শঙ্কাও রয়েছে তার।

এই এলাকার মানুষের কষ্টের সীমা নেই। প্রতিবছরই বন্যা তাদের স্বপ্ন গিলে খায়। সেই সঙ্গে নদী ভাঙনের ঘটনাও নিয়মিত। এই বাঁধে আশ্রয় নেয়া অধিকাংশ মানুষেরই বাড়ি কেড়ে নিয়েছে নদী। আকবর আলী। বয়স আনুমানিক ৭০ বছর। বয়সের ভারে কাবু। তিনি জানান, তার বাড়ি ভেঙেছে নদীতে চারবার। বারবার ঘর তুলেছেন এখন ভিটামাটিহীন। নদীর পাড়ে বাড়ি করে বাস করলেও সেই বাড়ি প্রতিবছর বন্যা আঘাত করছে। এই এলাকার মানুষের একটাই চাওয়া বাঁধ নির্মাণ ও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ করা।

আরিফুল ইসলাম বলেন, বন্যার পানি নেমে গেছে কিন্তু বাড়ির যে ক্ষতি হয়েছে এ থেকে রক্ষা পেতে প্রয়োজন কয়েক হাজার টাকা। বাড়িতে ফিরলেও অর্ধ নষ্ট বাড়িতে থাকতে পারবো না হয়তো। প্রয়োজন টাকা। ২০১৯ সালের বন্যার পর ঋণের টাকায় বাড়ি বানাই। এখনো সেই টাকা শোধ দিতে পারি নাই। তার মধ্যে আবার নতুন করে বন্যা। বালাসীঘাট বাজারে তার একটি চা ও পান-সিগারেটের দোকান রয়েছে। জানান, করোনার কারণে সেই ব্যবসাতেও ভাটা পড়েছে। আয় নেমে এসেছে অর্ধেকে।

গাইবান্ধায় বন্যা ও বাঁধ ভাঙন প্রতিরোধ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে পানি উন্নয়ন বোর্ড, গাইবান্ধার নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, বন্যা প্রাকৃতিক বিষয়। এটি অতি বৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলে গাইবান্ধায় বন্যা দেখা দেয়। তিস্তা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীতে পানি বৃদ্ধি ও পানি কমতে থাকলে গাইবান্ধায় অন্তত ৩৩টি পয়েন্টে নদী ভাঙন দেখা দেয়। আর নদীর বাঁধগুলো অন্তত ৪ যুগ আগে নির্মিত। তারপরও মূল বাঁধ অনেক আগেই নদীগর্ভে চলে গেছে। পরে আমরা পালাক্রমে বাঁধ নির্মাণ করেছি কিন্তু নদী ভাঙনের কবলে পড়েছি প্রায়শই।
তিনি আরো বলেন, নদী ভাঙন প্রতিরোধে ও বাঁধ রক্ষায় আমরা প্রতি বছর পরিকল্পনা করি। কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্প অনুমোদন হয় না। সে কারণে যথাসময়ে বাঁধ রক্ষায় আমরা কাজ শুরু করতে পারি না। ২শ’ ৪০ কিলোমিটার বাঁধের অধিকাংশই মেরামতের উপযোগী।

গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক আব্দুল মতিন বলেন, বাঁধগুলো দীর্ঘদিনের পুরাতন। বাঁধের সম্পূর্ণ অংশেই নদী ভাঙা দরিদ্র মানুষ বাঁধ কেটে বাড়িঘর করেছে। সে কারণে বাঁধগুলো প্রতিবছর হুমকির মুখে পড়ে। কোথাও কোথাও বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়। তবে বন্যার সময় সতর্ক থাকি ও মেরামত কাজ করি।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর