× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতা
ঢাকা, ২১ অক্টোবর ২০২০, বুধবার
ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন

এক বিচারপতির বিদায়: মার্কিন কংগ্রেসে মহাযুদ্ধ আসন্ন

বিশ্বজমিন

মানবজমিন ডেস্ক | ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, রবিবার, ৮:২৬

রুথ বেদার গিন্সবার্গ। মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের উদারমনা অংশের উজ্বল প্রদীপ। দেশটির নারীবাদী আইকনও তিনি। ৮৭ বছর বয়সে ১৮ সেপ্টেম্বর মারা গেছেন। চার দফায় ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। প্রতিবারই লড়াই করে ফিরে এসেছেন। ছাড়েননি সুপ্রিম কোর্টের গুরুতর দায়িত্ব। এই বসন্তে পঞ্চমবারের মতো ক্যান্সার ফিরে এলো তার শরীরে।
তবুও অঙ্গীকার করে বলেছিলেন, অবসর নেবেন না। এই বক্তব্য যতটা না তীব্র ব্যক্তিগত দৃঢ়তার বিষয় ছিল। তার চেয়েও বেশি ছিল প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে নতুন বিচারপতি নিয়োগের সুযোগ না দেয়া। ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টে রক্ষণশীলরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। আরেক দফায় রক্ষণশীল বিচারপতি বসলে আগামী কয়েক দশক ধরে সর্বোচ্চ আদালতের আদর্শিক ভারসাম্য হেলে পড়বে একচ্ছত্রভাবে রক্ষণশীলদের দিকে। বৃটেনের প্রভাবশালী ম্যাগাজিন ইকোনমিস্টের এক নিবন্ধে এমনটাই বলা হয়েছে।
যেদিন রাতে তিনি মারা গেলেন, শত শত মানুষ মোমবাতি হাতে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে এলেন। শ্রদ্ধা জানালেন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে বিচারপতি গিন্সবার্গ তার নাতনিকে বলেছিলেন যে ‘আমার সবচেয়ে ঐকান্তিক ইচ্ছা হলো, নতুন প্রেসিডেন্ট আসার আগে যেন আমি স্থলাভিষিক্ত না হই।’ সুপ্রিম কোর্টের প্রাঙ্গণে তা-ই কেউ কেউ স্লোগান তুলছেন, ‘তার ইচ্ছাকে সম্মান দেখান।’ পূর্বের নজিরও তার পক্ষে।
২০১৬ সালে রক্ষণশীল বিচারপতি অ্যান্টোনিন স্ক্যালিয়া যখন মারা গেলেন, তখন রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত সিনেট তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বেছে নেয়া প্রার্থী মেরিক গারল্যান্ডকে বিবেচনা করতেও অস্বীকৃতি জানায়। তখন সিনেট সংখ্যাগুরু দলের নেতা হিসেবে মিচ ম্যাককনেল বলেছিলেন, এই নির্বাচনে (২০১৬) যিনি প্রেসিডেন্ট হবেন, তিনিই স্ক্যালিয়ার আসনে নতুন কাউকে বেছে নেয়ার সুযোগ পাবেন। এরপর এই পদে আসেন নিল গোরসাচ। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে ডনাল্ড ট্রাম্প রক্ষণশীল এই বিচারপতিকে স্ক্যালিয়ার স্থলাভিষিক্ত করেন। এরপর ২০১৮ সালে ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের মতো সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি মনোনয়নের সুযোগ পান। এবার নিযুক্ত হন ব্রেট কাভানাহ।
আইনের চোখে পূর্বেকার নজিরকে সম্মান দেয়া হয়। কিন্তু রাজনীতিতে এর তেমন গুরুত্ব নেই। গত বছরই মিচ ম্যাককনেলকে জিজ্ঞেস করা হয় যে, ২০২০ সালের নির্বাচনের বছরে যদি বিচারপতি মনোনয়নের প্রশ্ন ওঠে, তাহলে কি তিনি সেই মনোনয়নকে বিবেচনা করবেন? কোনোরকম দ্বিধা না করেই ম্যাককনেল জবাব দেন, ‘ওহ, আমরা এবার নিয়ে নেব।’
গিন্সবার্গের মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এবার ম্যাককনেল ঘোষণা দেন, ট্রাম্পের মনোনীত প্রার্থীর শুনানি হতে দেবেন তিনি। তবে অন্তত একজন রিপাবলিকান সিনেটর লিসা মার্কোস্কি বলেছেন, নতুন প্রেসিডেন্ট শপথ গ্রহণের আগে গিন্সবার্গের স্থলাভিষিক্ত হতে মনোনীত কাউকে তিনি ভোট দেবেন না। আরও কয়েকজন রিপাবলিকান সিনেটরও একই ধরণের বক্তব্য দিয়েছিলেন। তবে সেটা ছিল গিন্সবার্গের মৃত্যুর আগে, যখন আসন খালিই ছিল না। যদি অন্তত ৪ জন রিপাবলিকান সিনেটর এই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে বিচারপতি মনোনয়নে ভোট দিতে অস্বীকার না করেন, তাহলে ট্রাম্প হয়তো সুপ্রিম কোর্টের রক্ষণশীল বিচারপতিদের সংখ্যা ৬ জনে উন্নীত করার সুযোগ পাবেন। যেখানে উদারমনা থাকবেন মাত্র ৩ জন। অথচ, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদও শেষ হয়নি।
সাধারণত, সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতি মনোনয়ন থেকে শুরু করে সিনেটের ভোট পেতে কয়েক মাস সময় লেগে যায়। বিচারপতি গরসাচের ক্ষেত্রে ৯ সপ্তাহ আর কাভানাহর ক্ষেত্রে ১৩ সপ্তাহ লেগেছিল।
তবে ট্রাম্প ইতিমধ্যেই বিচারপতি পদে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা প্রস্তুত করে রেখেছেন। এক সপ্তাহ আগেও ২০ জনের নাম যুক্ত করা হয়েছে। ফলে মনোনয়নের কাজে খুব সময় লাগবে না। আর সিনেটে যদি রিপাবলিকানরা উৎসাহী হয়, তাহলে ২০শে জানুয়ারি নতুন প্রেসিডেন্টের শপথ গ্রহণের আগেই, এমনকি নভেম্বরের নির্বাচনের আগে আগেই সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করা সম্ভব। আর তা হলে ট্রাম্পের পুনঃনির্বাচনের জন্যও তা সহায়ক হতে পারে। এছাড়া ২০০০ সালে ফ্লোরিডা নিয়ে অচলাবস্থার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে, সুপ্রিম কোর্টের রক্ষণশীল বিচারপতিদের আধিক্য হয়তো ট্রাম্পের জন্য নগদ আশীর্বাদ হয়ে দেখা দেবে।
‘পিপল অব প্রেইজ’ নামে একটি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত গোঁড়া ক্যাথলিক খ্রিস্টান অ্যামি কোনি ব্যারেটকে সুপ্রিম কোর্টের শূন্য আসনে মনোনয়ন দিতে পারেন ট্রাম্প। ব্যারেটকে ২০১৭ সালে আপিল কোর্টে নিয়োগও দিয়েছিলেন ট্রাম্প। অ্যামি কোনি ব্যারেট যার স্থলে আসতে পারেন, সেই রুথ গিন্সবার্গের পুরোই উল্টো তিনি। গিন্সবার্গ ছিলেন লিঙ্গ সমতার পক্ষে বড় আইকন। তিনি বিচারপতি হওয়ার আগেই আইনজ্ঞ হিসেবে এ নিয়ে লড়াই করেছেন। নারীদের গর্ভপাতের অধিকার, সমকামীদের অধিকার ইত্যাদি ইস্যুর পক্ষে তিনি কড়া অবস্থান নিয়েছিলেন। অস্ত্র ধারণ করার মতো রক্ষণশীলদের প্রিয় বিষয়ে তিনি বিরোধিতা করেছেন। অপরদিকে বিচারক ব্যারেট বন্দুক অধিকারের পক্ষে কড়া অবস্থান নিয়েছেন। গর্ভপাত নিয়ে ১৯৭৩ সালে যে ‘রো বনাম ওয়েড’ শীর্ষক যুগান্তকারী রায় দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট, তা নিয়ে সংশয়ও প্রকাশ করেন এই বিচারক। ১৯৯৮ সালেও তিনি লিখেছেন, গর্ভপাত সবসময়ই অনৈতিক। পাঁচ বছর তিনি এক রায়ে লিখেন, এই নজির প্রযোজ্য নয়, কারণ এটি স্পষ্টতই যে সাংবিধানিক বিধিকে ব্যাখ্যা করতে চায়, সেই বিধির সঙ্গেই সাংঘর্ষিক।
গিন্সবার্গ ছিলেন মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে সবচেয়ে উদারমনা বিচারকদের একজন। তবে ১৯৯৩ সালে তিনি যখন প্রথম বিচারপতির আসনে বসেন ( প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন তাকে মনোনয়ন দিয়েছিলেন), তখন তিনি অনেকটা মধ্যপন্থী ছিলেন। প্রায় ২৭ বছর ধরে এই পদে ছিলেন তিনি। তারপরও তিনি সুপ্রিম কোর্টে সবচেয়ে বেশিদিন দায়িত্ব পালন করা শীর্ষ ২০ বিচারপতির একজন নন। কারণ, তিনি ৬০ বছর বয়সে মনোনয়ন পেয়েছিলেন। অপরদিকে তার সহকর্মীরা গড়ে ৫২ বছর বয়সে নিয়োগ পেয়েছিলেন। তার সবচেয়ে স্মরণীয় রায়ের একটি হলো ১৯৯৬ সালের মার্কিন সরকার বনাম ভার্জিনিয়া মামলা। ওই মামলার রায়ের পর ভার্জিনিয়া সামরিক ইন্সটিটিউট তাদের পদধারী কর্মকর্তাদের মধ্যে নারী নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়। তিনি সহকর্মী বিচারপতিদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, লিঙ্গের ভিত্তিতে যদি কারও সঙ্গে ভিন্ন আচরণ করতে হয়, তাহলে সেই কারণের পক্ষে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য শক্ত যুক্তি দেখাতে হবে।
২০০৬ সালে বিচারপতি সান্দ্রা ডে ও’ কনোর বিদায় নেয়ার পর, সুপ্রিম কোর্ট ক্রমেই ডানঘেষা হতে থাকে। এরপরই বিচারপতি গিন্সবার্গের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে সংখ্যাগুরু রক্ষণশীল বিচারপতিদের বিপরীতে তার ডিসেন্ট মতামতের জন্য। এ সময় তিনি একজন সাংস্কৃতিক আইকন হিসেবে পরিগণিত হতে থাকেন। বেশ কয়েকটি সাম্প্রতিক চলচ্চিত্রেও তার চরিত্র দেখানো হয়। এমনকি আদর করে তাকে নাম দেওয়া হয় ‘নটোরিয়াস আরবিজি!’
বিচারপতি থাকা অবস্থায় প্রথম ২৫ বছরে মৌখিক যুক্তি উপস্থাপনের দিনগুলি তিনি একবারও অনুপস্থিত ছিলেন না। তবে ১৯৯৯ ও ২০০৯ সালের মধ্যে ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে থাকলে তার উপস্থিতির হারও কমে যায়। ২০১০ সালে তার স্বামী মার্টি মারা যান। ২০১৯ সালে টানা দুই সপ্তাহ তিনি অনুপস্থিত ছিলেন। তখন তার তৃতীয় দফার ক্যান্সার। ক্যান্সার তার গলব্লাডার আক্রমণ করেছে। ২০২০ সালের মে মাসে তিনি হাসপাতাল কক্ষ থেকে টেলিফোনে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন পর্বে উপস্থিত ছিলেন। তার পেছনে তখন হাসপাতালের মেশিনের শব্দ। আর সেই শব্দকে ছাপিয়ে তিনি টেলিফোনেই নিজের আইনি মত পেশ করেন। মামলাটি ছিল ওবামাকেয়ার (স্বাস্থ্যবীমা) ও নারী স্বাস্থ্য সংক্রান্ত। সেদিন ট্রাম্প প্রশাসনের আইনজীবীদের কড়া ভাষায় ভর্ৎসনা করে বলেন, কংগ্রেস যাকে প্রয়োজনীয় ভেবেছিল, আপনারা সেটাকে স্রেফ বাতাসে ছুড়ে ফেলেছেন!

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর