× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতা
ঢাকা, ২০ অক্টোবর ২০২০, মঙ্গলবার

শরণার্থী স্রোত ও রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ

অনলাইন

ড. মাহফুজ পারভেজ | ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, মঙ্গলবার, ৭:৪৭

৭৩ বছর আগে, দেশভাগের (১৯৪৭) সময় ভারত ও পাকিস্তানে সৃষ্ট শরণার্থী স্রোতের ফলে উদ্ভূত  উদ্বাস্তু সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছিল সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশ। পাঞ্জাব ও বাংলায় স্টেশন-প্ল্যাটফর্ম-শহর জুড়ে ছিন্ন ছিন্ন সংসারের মলিন ছবি এখনো মানবিক বিপর্যয়ের  ইতিহাসকে মনে করিয়ে দেয়। সেই নির্মমতার ইতিবৃত্ত মুছে না যেতেই দক্ষিণ এশিয়ার পূর্ব প্রান্তে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবতী টেকনাফ-কক্সবাজারের নদী-সমুদ্র-পাহাড়ের কঠিন পথ পেরিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে উদ্বাস্তু বসতি এসে গড়ে তুলেছে। দেশান্তরের স্রোত আছড়ে পড়েছে দক্ষিণের বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী বিস্তীর্ণ জনপদে। 
 
বাংলাদেশের পাশের মিয়ানমারে ঘটে চলেছে যে নারকীয় গণহত্যা ও জাতিগত নিধন, তার আঁচে জ্বলছে রাখাইন-আরাকানের ঘর-বাড়ি-মানুষ। সীমাহীন উদ্বাস্তু চাপে হীমসীম খাচ্ছে বাংলাদেশও। জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী প্রতিটি দেশের নাগরিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থানের দ্বারা রাষ্ট্র চিহ্নিত ভূমিতে জন্ম নেওয়া প্রতিটি শিশু জন্মের সাথে সাথেই তার শিক্ষা, চিকিৎসা, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানসহ সকল দায়-দায়িত্ব ঐ রাষ্ট্রের উপর বর্তায়। কিন্তু ব্যতিক্রম শুধু মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির ক্ষেত্রে।
তাদেরকে নির্মম নির্যাতন করেই থাকেনি শাসকরা, তাদের বাস্তুভিটার নিশানা পর্যন্ত মিটিয়ে দিচ্ছে, যাতে ফিরে এলেও বাড়িঘরের কোনো হদিস রোহিঙ্গারা যেন না পায়।     
 
১৯৪৮ সালে মিয়ানমার ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করলে রাখাইন রাজ্যও মিয়ানমারের অর্ন্তর্ভুক্ত হয়। সেই সময় থেকেই রাখাইন রাজ্যের অধিবাসীগণ অন্যান্যদের মতই তাদের নাগরিক অধিকার ভোগ করতে থাকে। রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি মিয়ানমারের জাতীয় সংসদেও প্রতিনিধিত্ব করত। এক পর্যায়ে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হয়। এর পর থেকেই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির উপর নানাভাবে বিমাতা সুলভ আচরণ ও জাতিগত নিধন শুরু করে। তাদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। রোহিঙ্গা শিশুদের স্কুলে যাওয়া নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। এক কথায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে যাবতীয় নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে দুর্বিষহ জীবন যাপনে বাধ্য করে মিয়ানমারের শাসকচক্র। 
 
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি ধর্মীয় পরিচয়ে মুসলিম হলেও তারা মিয়ানমারের নাগরিক। আকিয়াব, মংডু শহরগুলো তৎকালীন আরাকান রাজ্যেরই অংশ। তৎকালীন চাটিগাম বা চট্টগ্রামও আরাকান রাজ্যের অংশ ছিল বলে ইতিহাসে উল্লেখ আছে। মুঘল আমলে চাটিগাম বা চট্টগ্রামকে মগদের করায়ত্ত থেকে মুক্ত করা হয়। আকিয়াব ও মংডুর অধিবাসীরা টেকনাফ-উখিয়ার আঞ্চলিক ভাষাভাষীদের মতই কথা বলে। মিয়ানমারের জান্তার মূল লক্ষ্য হলো মুসলিম সম্প্রদায়কে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত করা। ১৯৭৮ সাল থেকে মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর তাদের নির্যাতনের মাত্রাটা বৃদ্ধি পায়। জানমাল রক্ষার তাগিদে ঐ অঞ্চলের মুসলিম অধিবাসীরা দলে দলে অবৈধভাবে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে থাকে। লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা মুসলমান মহিলা, পুরুষ ও শিশু বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। তারপর দফায় দফায় বাংলাদেশে আসতে থাকে নিপীড়িত রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ, শিশুরা।   
 
অবশিষ্ট যারা আছে তাদেরকেও বিতাড়িত করার জন্য  থেমে থেমে নির্যাতন অব্যাহত থাকে, যা বর্তমানে মিয়ানমারে অং সান সুচির নেতৃত্বাধীন দল রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকে সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে পরিচালনা করছে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের জন্য নোবেল শান্তি পুরষ্কারে ভূষিত সুচির কাছে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা ছিল যে তিনি একজন শান্তিপ্রিয় ও গণতান্ত্রিক নেত্রী হিসাবে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়কে নির্যাতন থেকে রক্ষা করবেন। কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য যে শান্তির জন্য নোবেল পুরষ্কার ধারী সুচির সরকারের সামরিক ও পুলিশ বাহিনী পুনরায় অকাতরে মুসলিম নিধনযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। আক্রমণের পুরো সময় নীরব সম্মতি জানিয়ে সুচি  গণহত্যার পক্ষেই সাফাই গেয়েছেন।
 
দক্ষিণ এশিয়ার দেশভাগ বাংলায় ও পাঞ্জারে দাঙ্গা-হাঙ্গামা-রক্তপাত ও দেশত্যাগের বহু ঘটনার জন্ম দিয়েছে। কিন্তু সকলের চোখের বাইরে দক্ষিণ প্রান্তের বাংলাদেশ সংলগ্ন মিয়ানমানের আরাকান বা রাখাইন অঞ্চলের গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের ফলশ্রুতিতে অব্যাহত দেশত্যাগ বিশ্বের মনোযোগে আসে নি। এতো বড় একটি মানবিক বিপযয়ে বিশ্ব নেতৃত্ব উচ্চকণ্ঠে সরবও হতে পারেন নি। শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র-গবেষণায় মানবিক যন্ত্রণার চিত্রটিও ব্যাপকভাবে ফুটে ওঠে নি। যদিও দেশত্যাগ নামক ঘটনাটির চর্চা সাধারণত ইতিহাসের অঙ্গনের বিষয়, সাহিত্যে নয়। সাহিত্যে যদি-বা সন্ধান চলে, পাঞ্জাব আর পশ্চিমবঙ্গই গুরুত্ব পায়, রোহিঙ্গাদের প্রান্তিক চিত্রটি মনোযোগ পায় না।
 
রোহিঙ্গা দেশত্যাগ নিয়ে বাংলা সাহিত্য মোটের উপর স্তব্ধ।  বাঙালি লেখকরা রোহিঙ্গা দেশত্যাগ, উদ্বাস্তু জীবন, নিপীড়ন ইত্যাদি ঘটনা এড়িয়ে গেছেন। কেউই অসহায় মানুষগুলোর দশকের পর দশক ধরে দীর্ঘ যন্ত্রণাময় কাহিনিকে নিজেদের রচনার মধ্যে ধরে রাখেন নি। বহু কিছু হারিয়ে গেছে আরাকানের জঙ্গলের গভীরে, বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ে। ভেসে গেছে লাশ, স্মৃতি ও স্বদেশ হারানোর অতীত।  ইতিহাসের আর্কাইভ এই সব লিটল্ হিস্টরি বা ছোট ছোট ইতিহাসের খোঁজ দিতে পারে না। সাহিত্যই পারতো। কিন্তু করে নি।
 
দেশভাগ, দেশত্যাগ, উদ্বাস্তু বিষয়ক সাহিত্যের  নানা রকম ধারা আছে। পাঞ্জাবের  প্রেক্ষিতে যেমন ধ্বংস-হত্যা-ধর্ষণের মতো মারাত্মক তাণ্ডব ফুটিয়ে তোলার মতো সাহিত্য তৈরি হয়েছে, বাংলার প্রেক্ষিতে কিন্তু সেই সাহিত্য তুলনায় অন্তর্লীন, কম সরব। এবং রোহিঙ্গা বিষয়ে একেবারেই নেই। বাংলার দেশভাগ অনেক দিন ধরে বহমান বলে তাকে বলা হয় ‘লং পার্টিশন’। আর, সাম্প্রদায়িক হিংসা-দাঙ্গা-ধ্বংসের থেকে ‘ডিসপ্লেসমেন্ট’ বা ঠাঁইহারা হওয়ার উপর বেশি জোর পড়েছে ‘পার্টিশন হিস্টরি’র মধ্যে ‘লাইফ স্টোরি’তে। রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে সব ধরনের উপাদান থাকলেও সেসব ইতিহাস বা সাহিত্যের পাতায় স্থান পায় নি। চোখের সামনে ঘটে যাওয়া চরম মানবিক ধ্বংসাত্মক কাযক্রমগুলো কোনো গবেষক বা সাহিত্যিক ধরে রাখার জন্য এগিয়ে আসেন নি।
 
সাহিত্যের অনাদৃত ধারার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ যদি একজন লেখকের প্রথম কৃতিত্ব হয়, তবে দ্বিতীয় কৃতিত্ব, অবশ্যই ‘ডিসপ্লেসমেন্ট’-এর উপর জোর দেওয়া। গণহত্যা ও জাতিগত নিধন সংক্রান্ত সমাজ বিজ্ঞানের প্রধান সূত্র ‘ডিসপ্লেসমেন্ট’-এর থিম-টি ইতিহাস হয়ে সাহিত্যের শাখা-প্রশাখায় বিস্তৃত হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেশেই। শারীরীক-মানসিক আঘাত বা  ট্রমা সেখানে প্রবলভাবে উপস্থিত। বাংলা সাহিত্যে দেশভাগের ট্রমা-র আধার ও আকার কত বিচিত্রভাবে লেখকরা তুলে ধরেছেন।  আশাপূর্ণা দেবীর ‘মিত্তির বাড়ি’ ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘স্বাধীনতার স্বাদ’ উপন্যাস দুটিকে ধরা যেতে পারে।  ব্যক্তি-সম্পর্ক ও পরিবার কাঠামোর পুনর্নির্মাণের মধ্য দিয়ে নাগরিক সংকটের মোকাবিলা, আর নতুন দেশ তৈরির বোঝাপড়া প্রতিনিধিত্ব করেছে এক্ষেত্রে।
 
বাংলা সাহিত্যের কোনো কোনো লেখক কলকাতা বা নোয়াখালির স্মৃতি সম্বলিত সাহিত্য রচনা করেছেন। অশোকা গুপ্ত ও রেণু চক্রবর্তীর স্মৃতিকথা, আর  অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’, প্রফুল্ল রায়ের ‘কেয়াপাতার নৌকা’, প্রতিভা বসুর ‘সমুদ্রহৃদয়’। দৃষ্টান্তগুলিই বলে দেয়, সংকটবিধ্বস্ত সমাজের মধ্যে নারীজীবনের লড়াই এখানে আলাদা গুরুত্ব পায়। দেশভাগ-পরবর্তী বাঙালি সমাজের অবধারিত ভবিতব্য বাঙালি মেয়েদের এই লড়াই ছাড়াও চিত্রিত হয়েছে উদ্বাস্তু কলোনির কাহিনি। শক্তিপদ রাজগুরুর ‘মেঘে ঢাকা তারা’, সাবিত্রী রায়ের ‘বদ্বীপ’, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘অর্জুন’ ইত্যাদি লেখা নতুন জীবনযাপনের প্রতিরূপ তৈরি করেছে। উদ্বাস্তু জীবনেও একটা বড় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থেকে যায় উদ্বাস্তু পরিবারের সংগ্রামী মেয়েদের, যার সঙ্গে যুক্ত হয় মরিচঝাঁপি ও দণ্ডকারণ্যের উদ্বাস্তু জীবনের গল্প। সাধারণত সাহিত্য যে মধ্যবিত্ত দৃষ্টিভঙ্গির দ্যোতনার মধ্যে আবদ্ধ থাকে, শক্তিপদ রাজগুরুর ‘দণ্ডকারণ্য থেকে মরিচঝাঁপি’ তার বাইরে বৃহত্তর ক্যানভাসে চলে গেছে।  
 
বিশেষ কয়েকজন লেখক উত্তরপূর্ব ভারতে, প্রধানত আসাম ও ত্রিপুরায়, উদ্বাস্তু জীবনের লড়াই-এর কথা, কী ভাবে তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গিয়েছিল এই অঞ্চলের নিজস্ব বিশিষ্ট ভাষাভিত্তিক আইডেন্টিটির সংগ্রামের কাহিনি, সেসবও তুলে ধরেছেন। অর্থাৎ দেশভাগ-দেশত্যাগ এখানে কেবল দেশের থেকে বিচ্যুতি নয়, ভাষা-সংস্কৃতির নিজস্ব বৃত্ত থেকেও বিচ্যুতি এবং বতমানে দাঁড়িয়ে অতীত ও ভবিষ্যতকে ফিরে তাকিয়ে দেখার কাহিনীও বটে। ব্যক্তি হিসাবে নতুন রাষ্ট্রনির্মাণের প্রেক্ষিতে জীবনের থেমে পড়া আর এগিয়ে চলার কাহিনি। হাসান আজিজুল হকের ‘আগুনপাখি’, সুনন্দা সিকদারের ‘দয়াময়ীর কথা’, মিহির সেনগুপ্তর ‘বিষাদবৃক্ষ’, সেলিনা হোসেনের ‘ভূমি ও কুসুম’ দেশত্যাগের উত্তর-পর্ব হিসাবে বিবেচিত হওয়ার যোগ্য।
 
দেশত্যাগের সাহিত্য পড়তে পড়তে মনে ধাক্কা দিয়ে যায় আরও কত স্মৃতিকথা, ছোটগল্প, উপন্যাস। যাকে বলা যায় ভূ-রাজনীতিক বন্দোবস্তের শৈল্পিক প্রতিক্রিয়ার বর্ণময় দৃষ্টান্ত। সঙ্গে সঙ্গে মনে একটা প্রশ্নও তুলে দেয়। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তকরণ ও দেশত্যাগের অভিঘাতটি কেন তুলনায় খুবই কম? প্রশ্ন জাগে, দেশত্যাগের ‘স্মরণ’-এর পাশে ‘বিস্মরণ’ হয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের সামান্য জায়গাও কি দেওয়া যায় না? তবে কি সাহিত্য-আলোচকরা এত দিন যে দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করেছেন— বাংলা সাহিত্যে দেশভাগ বিষয়ে স্তব্ধতার পরিসর থেকেই গিয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে, সেটা আমাদের মানতেই হবে?
 
রোহিঙ্গা সমস্যা সম্পর্কে ওই স্তব্ধতার সম্ভাব্য কারণ, শিল্পসাহিত্যের ‘ফর্ম’-এর মধ্যে ভয়ঙ্কর বাস্তবকে তুলে ধরার একটা দীর্ঘকালীন অক্ষমতা ও সম্পর্কহীনতা। ধর্মসম্প্রদায়-বিষয়ক সংকটের মুখোমুখি হতে বিশেষ দল, ব্যক্তি, গোষ্ঠীর যে অনিচ্ছা, তারও কিছু ভূমিকা আছে এই স্তব্ধতার পিছনে। এভাবেই এ সব ছাপিয়ে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু, নিধন ও দেশত্যাগ নিয়ে বিশেষ কিছুই লেখা হয়নি বাংলা সাহিত্যে। বাংলা সাহিত্যে দেশত্যাগ নিয়ে যন্ত্রণাময় উচ্চারণের পাশাপাশি একটা স্তব্ধতার বাস্তবও আছে; , ঘোরতর ও প্রকটভাবেই আছে। ওই স্তব্ধতার মধ্যে সমাজগত কিছু প্রবণতা লুকিয়ে আছে, এটা মেনে নিলে দক্ষিণ এশিয়ার সবগুলো দেশত্যাগের ঘটনা ও অভিজ্ঞতাকে বোঝাটাও সম্পূর্ণ হতে পারে।
 
রোহিঙ্গা জাতির নিপীড়ন ও দেশত্যাগের ঘটনাকে মূলপরিসরের মধ্যে আনতে না পারার দুর্বলতা  বাংলা সাহিত্যের ‘সম্পূর্ণতা’কে প্রশ্নবিদ্ধ করে। কারণ মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতনের প্রকৃতি এমন যে, এক কথায় বীভৎস, যা কোন বিবেকবান মানুষ ঘৃণা না করে পারে না। ছোট ছোট শিশুদের জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষেপ করার মত ঘটনাও ঘটেছে। ইতিহাস ও সাহিত্যের অক্ষমতা ক্ষমার অযোগ্য হবে, যদি না একবিংশ শতকের এই নরহত্যার চিত্র লিপিবদ্ধ করা না হয়। লাঞ্ছিত ও ধষিতা হয়ে শুধুমাত্র জান নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের মুখের বিবৃত শুনে গা ছম ছম করে এই অতি-আধুনিক, অগ্রসর সময়েও।  ছোট ছোট শিশুর লাশ সাগরের পানিতে ভাসছে, যেন মৃত মানবতা পানিতে ভাসছে। এবারের নিষ্ঠুরতার আরেকটি সংস্করণ বিশ্ববাসী দেখল। এদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা যাতে পুনরায় ফেরৎ যেতে না পারে, সেজন্য সীমান্তে স্থল মাইন পুঁতে রাখা হয়েছে এবং তা অব্যহত রয়েছে। ইতিমধ্যে স্থল মাইন বিস্ফোরণে অনেকে মারা গেছে, আবার অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। ১০ বৎসরের উর্ধ্বের তরুণ, যুবক ও পুরুষদের সেনা ক্যাম্পে ধরে নিয়ে গিয়ে অমানবিক নির্যাতন করে হত্যা করা হচ্ছে। নারীদেরও বাড়িঘর থেকে সেনা ক্যাম্পে ধরে নিয়ে গিয়ে গণধর্ষণ করা হচ্ছে। বাড়িঘরে অগ্নি সংযোগ করে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়হীন ও উদ্বাস্তু করা হচ্ছে।
 
বিগত শতাব্দীতে দুই বিশ্বযুদ্ধ আর অসংখ্য গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের পর বিশ্ব আশা করেছিল শান্তি ও নিরাপত্তা। কিন্তু মিয়ানমারের রক্তাক্ত মাটিতে বৈশ্বিক মানবিক আশার সমাধি রচিত হয়েছে। আর্ন্তজাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যুগ যুগ ধরে শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থানসহ নানা কাজে অন্যান্য নাগরিকদের তুলনায় বৈষম্যের শিকার হচ্ছে মুসলিম জনগোষ্ঠী। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর প্রধান জন ম্যাকইসিক অভিযোগ করেন যে , “মিয়ানমার সরকার মুসলিম রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন অভিযান চালাচ্ছে”। অর্থাৎ মিয়ানমারের মুসলিম সম্প্রদায়কে মিয়ানমার সরকার নিশ্চিহ্ন করতেই এ ধরনের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।  জাতিসংঘ সনদে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ আছে, কোন নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাসরত কোন সম্প্রদায়কে রাষ্ট্র বা সরকার কর্তৃক জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা যাবে না।  কিন্তু মিয়ানমারে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের উপর এমনই নির্যাতন, নিপীড়ন ও উচ্ছেদযজ্ঞ চালানো হচ্ছে।  প্রায় দশ লক্ষাধিক উদ্বাস্তু বাংলাদেশের স্থায়ী বা অস্থায়ী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে। হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। অসংখ্য নারী ধষিতা হয়েছে। হাজার হাজার শিশু পিতৃ-মাতৃহীন হয়ে আকাশের ঠিকানার নীচের নিজের জন্য একটু দাঁড়ানোর জায়গা খুঁজছে।
 
এদের কথা কি মনে রাখবে ইতিহাস, সাহিত্য? নাকি বিস্মৃতির অতল অন্ধকারেই হারিয়ে যাবে সব কিছু? নদী, পাহাড় ও অরণ্যেই কি লুপ্ত হবে নিপীড়িত-দেশত্যাগী রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশুদের ক্ষত-বিক্ষত-রক্ষাক্ত শরীর আর দগদগে ইতিহাস? তারাও কি ভেসে যাবে বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর আদিঅন্তহীন নগ্ন পদধ্বনিতে ক্রন্দিত মিছিলে?     
 
 
ড. মাহফুজ পারভেজ: প্রফেসর, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।  
 

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
পাঠকের মতামত
**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।
Sazzad Hossain
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, বুধবার, ৩:০৫

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর প্রধান জন ম্যাকইসিক অভিযোগ করেন যে , “মিয়ানমার সরকার মুসলিম রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন অভিযান চালাচ্ছে”। এটার কোন রেফারেন্স দিতে পারবেন? জন ম্যাকইসিক নামে ইউএনএইচসিআর-এর কোন প্রধান ছিলেন না। আর ইউএনএইচসিআর কখনো কি রোহিঙ্গাদের জাতিগত নিধনের কথা বলেছে? বলে থাকলে কোথায় বলেছে? ধন্যবাদ।

অন্যান্য খবর