× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতা
ঢাকা, ২০ অক্টোবর ২০২০, মঙ্গলবার

করোনা ও লকডাউন, জীবনে ও কবিতায়

অনলাইন

ড. মাহফুজ পারভেজ | ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, বুধবার, ৫:৫১

মারী, মন্বন্তর, মানবিক বিপর্যয় নিয়ে সাহিত্যের বৃহত্তর পরিসরে অসংখ্য কাজ হয়েছে। বিশ্বসাহিত্যের অনেক স্মরণীয়
 রচনার মতো বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারেও এ সংক্রান্ত উল্লেখযোগ্য লেখার কমতি নেই। কবি ও সাহিত্যিকরা সব সময়ই সমকাল ও সমসময়ের বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তুলেছেন নিজের কুশলী কলমে।

চলমান করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারীতেও বিশ্বব্যাপী ফিকশন ও নন-ফিকশন পর্যায়ের বহু রচনা প্রকাশিত হয়েছে।
 গবেষকগণ করোনার আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে চর্চা করছেন। অনেকেই গল্প, কবিতায় হাত দিয়েছেন। কিন্তু করোনা-পরিস্থিতিজনিত লকডাউনের ঘরবন্দী অবস্থার দুঃসহ ও তাজা অভিজ্ঞতায় একটি সম্পূর্ণ কাব্যগ্রন্থ রচনা ও প্রকাশের ঘটনাটি শুধু বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্যই নয়, বাংলা
 সাহিত্যের ইতিহাসে ঐতিহাসিক গুরুত্বের সঙ্গে চিহ্নিত।    

পুরো প্রচ্ছদে স্থির হয়ে আছে গোগল ম্যাপের স্থিরিকৃত আবাসস্থল। সমগ্র বিশ্ব থমথমে ও অচল। করোভাইরাসের আগ্রাসী
 দাপটে দমবন্ধ জীবন, সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন সব ধরনের সামাজিক, পেশাগত সংযোগ। এক স্ব-আরোপিত বন্দিত্বের ঘেরাটোপে আবদ্ধ বিশ্বের সকল মানুষের জীবন ও যাবতীয় আয়োজন।
তখন, করোনার প্রলঙ্করী উত্থানকালে, সীমাহীন আতঙ্ক ও নিঃসঙ্গতার প্রহরে রচিত হয়েছে আস্ত একটি কাব্যগ্রন্থ, শিরোনাম
 ‘লকডাউন ও অন্যান্য কবিতা’।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও মানবিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, বাংলা বিভাগের সাবেক সভাপতি, সমকালীন বাংলা
 সাহিত্যের অন্যতম সজীব লেখক প্রফেসর ড. মহীবুল আজিজ (১৯ এপ্রিল ১৯৬২) ৪০টি কবিতার নান্দনিক বিন্যাসে উপস্থাপন করেছেন করোনাকালীন বাস্তবতাকে। করোনার মধ্যেই ২০২০ সালেট জুলাই মাসে চট্টগ্রামের পূর্বা প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের প্রযুক্তিনির্ভর-শৈল্পিক
 প্রচ্ছদও কবি কর্তৃক চিত্রিত।

কবি মহীবুল আজিজ বৈশ্বিক মহামারী করোনাকে ঘরবন্দি আবহে ব্যক্তিগত অনুভূতির সঙ্গে বিশ্বসভ্যতার সমান্তরালে
 জারিত করেছেন। কবিতায় উৎকীর্ণ করেছেন বৈশ্বিক বিপর্যয়কে। যে অবান্ধব ও অমানবিক বিচ্ছিন্নতা করোনার ফলে সৃষ্টি হয়েছেন, তাকেই প্রকাশ করেছেন প্রতীকের হাত ধরে। বলেছেন, ‘আমার বন্ধু গ্রাৎসিয়া মারা গেছে করোনায়/গ্রাৎসিয়া ইতালিয় শব্দ, অর্থ ধন্যবাদ’। করোনা যে শোক ও ধন্যবাদের
 মতো মানবিক-সামাজিক সম্পর্ক ও সম্বোধনকেও ভুলিয়ে দিয়েছে, না বললেও বন্ধুর মৃত্যুচিহ্নিত ঘটনায় সেই চিত্রকল্প স্পষ্ট।

ইতালি যখন ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে বেশি করোনা কবলিত ও বিধ্বস্ত, মহীবুল আজিজ রচনা করলেন মর্মস্পর্শী পংক্তিমালা:
 ‘হে টেনর, কার জন্যে গান গাও তুমি/পেট্রিসিয়ান প্লেবিয়ান সকলেই মরে/ভূমিকম্প ছাড়াই কাঁপে পদতলে ভূমি/তবু তুমি ছড়াও কণ্ঠ বিশ্বচরাচরে’ (রোমের ক্যাথিড্রালে একাকী টেনর)।

পৃথিবীর সামগ্রিক বাস্তবতা ও জীবন্ত উল্লাস যখন স্থবির এবং দূরের স্মৃতিতে পরিণত, তখন ব্যক্তিক স্মৃতিতে
 জারিত হয়ে মহীবুল আজিজ জানিয়েছেন নিজের অভিব্যক্তি: ‘সবার সঞ্চয়ে থাকে অযুত ঋদ্ধ নগরী/তাই স্মৃতি নিয়ে বাঁচি আর মৃত্যুর প্রতীক্ষা করি’ (স্মৃতির নগরী)। মানব-শূন্য পৃথিবীকে মহাকালের ঘোরতম সঙ্কুলে কবির চিরন্তন প্রক্ষেপে অবলোকন করেন প্রাকৃতিক শূন্যতা: ‘আর আমার মনে
 হতে থাকে নির্জন রাস্তায়/মানুষের মতো পথ হেঁটে যায় একটি পূর্ণাঙ্গ পাতা’ (পাতা)। তার বীক্ষণে করোনা-দংশিত বিশ্বায়নের মাতাল পৃথিবীকে পাওয়া যায় এইভাবে: ‘এখন পার্থক্য নেই রিয়াদ আর ঢাকাতে কিংবা ধরো/দোহা-কান্ডিতে, একই কথা, যেখানেই তুমি বাঁচো-মরো/একটাই শহর সবখানে যে-শহরের
 নাম মৃত্যুর শহর’ (বৈশ্বিক গ্রাম:২০২০)।  

করোনা ও মৃত্যু যখন সমার্থক হয়ে কোটি ও লক্ষ মানুষকে আক্রান্ত করে মৃত্যুর নিনাদ ঘোষণা করছে বিশ্বময়, তখন
 বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তের জনপদ থেকে মহাকাবিক দ্যোতনায় মহীবুল আজিজ রচনা করেন এমনই এক কবিতা, যার শিরোনাম ‘এমন মৃত্যু দেখি নি'। বলেন ‘এমন মৃত্যু দেখি নি কখনও যে-মৃত্যু/মৃত্যুর ভেতর দিয়ে জীবনকে চিনিয়ে দেয়’, তারপরই চলে আসেন মহাকালিক পরিভ্রমণে, সুফির জগতে,
 যেখানে সঙ্কট শেষে জীবনেরই কথা লিপিবদ্ধ করে রেখেছে ইতিহাস: ‘কত মঙ্গল-তাতার মুঘল সেলজুক ঝলসে গেল পৃথিবী/তোমার সূর্য নেভে না/আর তার মানবকেন্দ্র তুমি-রুমি।’

বিশ্বসাজিত্য ও সভ্যতার তুলনামূলক পাঠের নিরিখে মহীবুল আজিজ নিজের ও জগতের ক্যানভাসে করোনাকালীন লকডাউনকে
 উপলব্ধি করেছেন ‘লকডাউন ও অন্যান্য কবিতা’য়। যেমন তিনি তার পূর্ববর্তী কাব্যশিল্পে স্বতস্ফূর্তভাবে প্রকাশ  করেছেন, যা উৎকীর্ণ রয়েছে ‘সান্তিয়াগোর মাছ’, ‘হরপ্পার চাকা’, ‘টেরানটেলা’, ‘প্রেমনামা’সহ ২২টি কাব্যগ্রন্থে।


কথাশিল্পে তুলে ধরেছেন ইতালো ক্যালভিনো, আইজাক বশেভিস সিঙ্গারকে। রচনা করেছেন বিলেতের বাঙালি ডায়াসফোরা
 নিয়ে স্মরণীয় উপন্যাস ‘বর্ণ সন্তান’সহ ‘বাড়ব’ ও ‘যোদ্ধাজোড়’ নামে আরো দুইটি উপন্যাস।


গবেষণা করেছেন বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল থেকে হাসান আজিজুল হককে নিয়ে, সার্ত্র, সোলঝেনিৎসিন ছুঁয়ে
 শহীদুল জহির পর্যন্ত। সৃজনে ও মননে ষাটস্পর্শী বহুমাত্রিক সাহিত্যিক মহীবুল আজিজ নিজের নন্দন আলোয় দেখেছেন জীবন ও সাহিত্যকে। গল্প, কবিতা, উপন্যাস, অনুবাদ, গবেষণা মিলিয়ে বাংলা ও ইংরেজিতে রচনা করেছেন পঞ্চাশটি গ্রন্থ, যেগুলো বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির পরিমণ্ডলকে পুষ্ট
 করার সঙ্গে সঙ্গে অ্যাকাডেমিক গবেষকদের নিত্য দিশা দিচ্ছে বহুমাত্রিক প্রক্ষেপে এবং সাধারণ পাঠকদের জারিত করছে অফুরন্ত পাঠের আনন্দে।

 
বৈশ্বিক বিপর্যয় সৃষ্টিকারী করোনার কঠিনতম দহন ও প্রলয়কালেও মহীবুল আজিজ বাংলা সাহিত্য, বিশেষত কবিতার দায়
 শোধ করতে ব্রতী হয়েছেন। যেভাবে বাংলার ও বিশ্বের ঐতিহাসিক প্রভাব বিস্তারকারী আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনাবলী ও প্রপঞ্চ যেমন মন্বন্তর, বিশ্বযুদ্ধ, দেশভাগ নিয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শহীদুল্লাহ কায়সার, আবু ইসহাক, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আরো অনেকের
 কুশলী কলমে রচিত হয়েছে শ্রেষ্ঠসাহিত্যকর্ম, তেমনি একবিংশের বিশ্বমারি করোনা নিয়েও বিশ্বের ও বাংলা সাহিত্যের কবি-লেখকগণ রচনা করবেন তাদের অবিস্মরণীয় লেখাগুলো। কবি মহীবুল আজিজ এই সাহিত্যপ্রচেষ্টায় বৃহত্তর বাংলাসাহিত্যের প্রেক্ষাপটে প্রথমজন, যিনি করোনার মধ্যেই শুধু
 অন্তরীণ থাকেন নি, নিজের সৃজন ও মননকে সচল রেখেছেন মৃত্যু ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিকূলতার ঘেরাটোপ ডিঙিয়ে।  

একজন আশাবাদী কবি, জীবনবাদী মানুষ ও স্বপ্নময় বিশ্বনাগরিকের প্রত্যয়ে মহীবুল আজিজ ঘোষণা করেছেন সকল প্রতিকূলতার
 মধ্যে মানবিকতা ও সভ্যতার জয়গান: ‘সন্ধ্যা ধীরে নামে রোমে, আলো নিভে আসে/অমল প্রাণের হাসি মোনালিসা হাসে/মৃত্যুহাওয়া বয়ে যায় স্তব্ধ উপত্যকায়/তারই মধ্যে জীবনের গান ভেসে আসে।’ কবি করোনাদগ্ধ পৃথিবীর মানুষের মুখে উচ্চারণ করেন জীবনেরই ধ্রুবতম সঙ্গীত: ‘সূর্য ডুবে যাচ্ছে/এ-জীবনে
 যে কত সূর্যাস্ত দেখলাম/আমি নিশ্চিত এই সূর্যাস্ত বলে দিচ্ছে/আর সূযাস্ত দেখা হবে না আমার/কেননা, শীঘ্রই চলো যাবো আমি/তোমরা বেঁচে থেকো/হেইযোম, জয় হোক জীবনের’ (ব্রংক্স-এর মৃত্যুপথযাত্রী শতায়ু বুড়ো:২০২০)।      

করোনার মৃত্যু উপত্যকায় ‘জয় হোক জীবনের’ মর্মে শাশ্বত শব্দবন্ধে কবি ও কথাশিল্পী মহীবুল আজিজ সৎ ও শুদ্ধ
 কবিতার, মানুষের, জীবনের, সভ্যতার এবং পৃথিবীর জয়ধ্বনি উচ্চারণ করেছেন সকল শোক, তাপ, জরা, মৃত্যু, ভীতি ও অন্ধকারের বিরুদ্ধে।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর